সম্প্রতি ইলন মাস্ক একটি বড় ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি ২০২৭ সালে আমেরিকার প্রতিটি শিশুকে একটি করে শেয়ার দেবেন। এ শেয়ারটি হবে তাঁর মহাকাশ গবেষণার প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্সের। পরিকল্পনাটি সত্যি হলে দেশটির কয়েক কোটি শিশু-কিশোর এই শেয়ার পাবে। শেয়ারগুলোর মোট মূল্য হবে শত শত কোটি ডলারের।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তৈরির প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক তাদের শেয়ারের একটি অংশ জনকল্যাণমূলক তহবিলে দান করার পরিকল্পনা করেছিল। ইলন মাস্ক এর সমালোচনা করে বলেন, শেয়ার এভাবে কোনো ফান্ডে না দিয়ে সরাসরি মানুষের হাতে তুলে দেওয়া উচিত।
তবে এই শেয়ার কারা পাবে, কীভাবে দেওয়া হবে কিংবা শিশুদের বিনিয়োগ অ্যাকাউন্টে এটি জমা হবে কি না, সে বিষয়ে মাস্ক এখনো স্পষ্ট কিছু জানাননি। ব্যবসাসংক্রান্ত সাময়িকী ‘ফোর্বস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ইলন মাস্কের এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে আমেরিকার প্রায় ৭ কোটি ২০ লাখ শিশু-কিশোর স্পেসএক্সের শেয়ার পাবে।
.
আগামী ২০২৭ সালে আমেরিকার প্রতিটি শিশুকে স্পেসএক্স কোম্পানির একটি করে শেয়ার দেওয়ার কথা জানিয়েছেন ইলন মাস্ক। আচ্ছা এখানে আগেই বলে রাখি শেয়ার কী? শেয়ার হলো কোনো কোম্পানির ক্ষুদ্র একটি অংশ। সহজ কথায়, একটি বড় কোম্পানির ছোট টুকরা হলো শেয়ার। কেউ কোনো কোম্পানির একটি শেয়ার কিনলে সে ওই কোম্পানির একটি ছোট অংশের মালিক হয়। কোম্পানির লাভ বাড়লে সেই শেয়ারের দামও বাড়ে। তখন মালিক চাইলে লাভ করতে পারেন। ইলন মাস্ক আমেরিকার শিশুদের ঠিক এই রকমই কোম্পানির একটি করে অংশ বা শেয়ার উপহার দিতে চান।
১৯ অক্টোবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের এক পোস্টে তিনি এই পরিকল্পনার কথা জানান। তিনি এটিকে আরও কিছু বড় উদ্যোগের সূচনা বলে উল্লেখ করেন। তবে এই সুবিধা সব শিশুর জন্য নাকি শুধু নির্দিষ্ট শর্ত পূরণকারীদের জন্য প্রযোজ্য হবে, সে বিষয়ে তিনি কিছু বলেননি।
মার্কিন আদমশুমারি ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২১ শতাংশ বা ৭ কোটি ২১ লাখের মতো শিশু রয়েছে। এই হিসাবের মধ্যে দেশের নাগরিক ও অন্য দেশের নাগরিক উভয় ধরনের শিশুরাই অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে মাস্কের এই উপহার কোন কোন শিশু পাবে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
এ ছাড়া এই শেয়ারগুলো কীভাবে শিশুদের হাতে পৌঁছাবে, অভিভাবকদের কোনো নিবন্ধন করতে হবে কি না, বা এগুলো কোনো বিশেষ অ্যাকাউন্টে জমা রাখা হবে কি না, সে বিষয়েও কোনো স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেননি ইলন মাস্ক। এমনকি ভবিষ্যতে এই শেয়ার বিক্রি করা যাবে কি না, সে সম্পর্কেও কিছু জানানো হয়নি।
.প্রিন্সটন থেকে পিএইচডি, ২ হাজার ৩০০টি আবেদন করেও চাকরি মেলেনি.
ইলন মাস্কের এই প্রস্তাবের মোট খরচ নির্ভর করবে কতজন শিশু এই শেয়ার পাবে এবং শেয়ার বিতরণের সময় স্পেসএক্সের একটি শেয়ারের দাম কত থাকে, তার ওপর। আমেরিকার সরকারি হিসাব অনুযায়ী, সে দেশে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুর সংখ্যা প্রায় ৭ কোটি ২১ লাখ। ইলন মাস্কের ঘোষণার সময় স্পেসএক্সের একটি শেয়ারের বাজারমূল্য ছিল প্রায় ১৪৭.৫২ ডলার, যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ১৮ হাজার টাকার বেশি। এই হিসাব অনুযায়ী, সব শিশুকে একটি করে শেয়ার দিলে মোট খরচ হবে প্রায় ১০.৬ বিলিয়ন ডলার বা ১ হাজার ৬০ কোটি ডলার।
তবে এ হিসাবটি একটি আনুমানিক ধারণামাত্র। ভবিষ্যতে শেয়ারের দাম পরিবর্তন হতে পারে এবং ঠিক কতজন শিশু এই সুবিধা পাবে, তা এখনো নির্ধারণ করা হয়নি। তবে ইলন মাস্কের পক্ষে এত বড় অঙ্কের শেয়ার দেওয়া অসম্ভব কিছু নয়। অফিশিয়াল নথি অনুযায়ী, তাঁর নিজের কাছেই স্পেসএক্সের প্রায় ৬৪২ কোটি শেয়ার রয়েছে। তাই ৭ কোটি ২০ লাখ শিশুকে একটি করে শেয়ার দিলেও, তা হবে ইলন মাস্কের মোট শেয়ারের মাত্র ১ শতাংশের সামান্য কিছু বেশি।
.ইলন মাস্কের উড়ন্ত গাড়ি যা করল, ১৯৬৮ সালেই তা করে দেখিয়েছে হট হুইলস.
জনপ্রিয় এআই চ্যাটবট ক্লডের নির্মাতা প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিক একটি বিশেষ ঘোষণা দেওয়ার পরপরই ইলন মাস্কের এই প্রতিশ্রুতির বিষয়টি আলোচনায় আসে। গত ১৮ অক্টোবর অ্যানথ্রোপিক জানায়, তারা তাদের মোট শেয়ারের অন্তত ৫ শতাংশ একটি নতুন পাবলিক বেনিফিট ফান্ডে দান করবে। এই তহবিলের মূল উদ্দেশ্য দাতব্য সংস্থাকে সাহায্য করা এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে সম্পদ বিতরণ করা।
প্রতিষ্ঠানটি জানায়, এই জনকল্যাণমূলক কাজের জন্য তারা একটি আলাদা কোম্পানি তৈরি করেছে। তবে ইলন মাস্ক এই ধারণার সমালোচনা করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে পাল্টা পরামর্শ দিয়ে লেখেন, শেয়ারগুলো কোনো ফান্ডে জমা না রেখে সরাসরি সাধারণ মানুষের হাতে তুলে দেওয়া উচিত। এটা অন্য কেউ না করলেও আমেরিকার জন্য আমি করব।
.পুঁটি মাছের গায়ে বর্ষাকালে লাল রং আসে কেন.
ইলন মাস্কের এই ঘোষণার পেছনে মার্কিন সরকারের ট্রাম্প অ্যাকাউন্টস কর্মসূচিরও কিছুটা যোগসূত্র থাকতে পারে। যদিও মাস্ক নিজে এ বিষয়ে সরাসরি কিছু বলেননি। এর আগে স্পেসএক্সের প্রেসিডেন্ট গুইন শটওয়েল এবং তাঁর স্বামী এই কর্মসূচির আওতায় ২০ লাখের বেশি মার্কিন শিশুর অ্যাকাউন্টে স্পেসএক্স কোম্পানির একটি করে শেয়ার দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। মূলত তরুণ প্রজন্মের মধ্যে বিনিয়োগের অভ্যাস গড়ে তোলার জন্যই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল।
.
ইলন মাস্কের এই বিশাল সম্পদের বড় একটি অংশ জুড়ে রয়েছে তাঁর কোম্পানি স্পেসএক্স ও টেসলা। ব্যবসাসংক্রান্ত সাময়িকী ‘ফোর্বস’-এর তথ্য অনুযায়ী, ১৯ অক্টোবর পর্যন্ত ইলন মাস্কের মোট সম্পদের পরিমাণ ছিল ৯০৮.৫ বিলিয়ন ডলার, যা তাঁকে এখনো বিশ্বের শীর্ষ ধনী ব্যক্তির আসনে রেখেছে।
ওই দিন প্রিমার্কেট ট্রেডিংয়ে স্পেসএক্সের প্রতিটি শেয়ারের দাম ১ শতাংশ বেড়ে ১৪৭.৫২ ডলারে গিয়ে পৌঁছায়। এই বাজারমূল্যকে ভিত্তি ধরেই শেয়ার বিতরণের সম্ভাব্য খরচ হিসেব করা হয়েছে। তবে আগামী দিনে শেয়ার যখন আসলেই বিতরণ করা হবে, তখন সেগুলোর প্রকৃত দাম কত হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়।
.১৩০ বছর পর ভ্যান গঘের আঁকা স্টারি নাইটের রহস্যের সমাধান.
বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ব্যক্তি ইলন মাস্ক ২০১২ সালে ‘গিভিং প্লেজ’ নামে একটি অঙ্গীকারে সই করেছিলেন। এটি ধনী ব্যক্তিদের এমন একটি প্রতিশ্রুতি, যেখানে তাঁরা নিজেদের সম্পদের বড় অংশ দান করার কথা বলেন।
ইলন মাস্কের নিজস্ব একটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যার নাম ‘মাস্ক ফাউন্ডেশন’। এটি মূলত নবায়নযোগ্য জ্বালানি, মহাকাশ গবেষণা এবং শিশুস্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করা সংস্থায় টাকা দান করে। ২০২৪ সালের হিসাব অনুযায়ী, এই ফাউন্ডেশনের সম্পদ ছিল ১৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। তবে কিছু প্রতিবেদনে বলা হয়, মাস্কের দেওয়া অনুদানের বড় অংশই তাঁর নিজের ব্যবসাসম্পর্কিত সংস্থায় গেছে।
ইলন মাস্ক সাধারণ নিয়মে দান করার বিষয়টিকে খুব একটা পছন্দ করেন না। তিনি মনে করেন, শুধু ভালো মানুষ সাজতে টাকা দান করা সহজ। কিন্তু সেই টাকা সত্যি মানুষের কাজে আসছে কি না, তা নিশ্চিত করা খুব কঠিন। ২০২১ সালে তিনি জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচিকে ছয় বিলিয়ন ডলার দেওয়ার কথা বলেছিলেন। তবে শর্ত ছিল, কীভাবে বিশ্ব থেকে ক্ষুধা দূর করা যাবে তার প্রমাণ দেখাতে হবে। শেষ পর্যন্ত সেই দান আর দেওয়া হয়নি।
.
বর্তমানে এআই কোম্পানিগুলো তাদের প্রযুক্তির নিরাপত্তা নিয়ে বেশ সমালোচনার মুখে পড়েছে। এমনকি অ্যানথ্রোপিক নিজেও সতর্ক করে বলেছে, এআই মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। প্রযুক্তি বৃদ্ধির ফলে মানুষের চাকরি হারানো এবং বড় বড় ডেটা সেন্টারের পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে নানা উদ্বেগ তৈরি হচ্ছে।
প্রযুক্তি জগতের বড় বড় প্রতিষ্ঠান এখন কঠিন নজরদারির মধ্যে রয়েছে। ফেসবুকের অনিরাপদ কাজকর্ম ও বিভিন্ন ভুয়া স্টার্টআপ নিয়ে তৈরি চলচ্চিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র মানুষকে সচেতন করছে। এগুলো মনে করিয়ে দিচ্ছে, কিছু প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান কতখানি দায়িত্বহীন হতে পারে। সব মিলিয়ে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, ইলন মাস্কের এই দান করার ঘোষণাটি মূলত প্রযুক্তি খাতের সেই নেতিবাচক ভাবমূর্তি সামলানোরই একটি চেষ্টা। তবে তাঁর এই পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা সত্য হয়, তা দেখতে ২০২৭ সাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।
সূত্র: নিউইয়র্ক টাইমস, ফক্স নিউজ, ইয়াহু বিজনেস, সিএনএন, ফোর্বস
.ফাতেমা: স্বপ্ন হোক আকাশসমান
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: [email protected] মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com