কোথাও বাদুড়ের ঘুমন্ত আস্তানায় ছত্রাকের অদ্ভুত জগৎ, কোথাও ফুল তুলতে ব্যস্ত হাতি। কোনো ছবিতে ভালুকের অপ্রত্যাশিত কাণ্ড, কোনোটি আবার মনে করিয়ে দেয় মানুষের কারণেই বন্য প্রাণীদের জীবন কতটা ঝুঁকির মুখে। চলুন, একনজরে দেখা যাক ২০২৬ সালের ইউরোপিয়ান ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতার সেরা দশ ছবি।
.
প্রকৃতিতে ভালো ছবি তুলতে শুধু দামি ক্যামেরা থাকলেই চলে না, মাঝেমধ্যে অপেক্ষা করতে হয় বছরের পর বছর। কখনো একই জায়গায় ক্যামেরা হাতে বসে থাকতে হয় ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আবার কখনো চোখের সামনে ঘটে যায় এমন কিছু, যার জন্য আলোকচিত্রী মোটেই প্রস্তুত ছিলেন না। সেই মুহূর্তটি ধরে রাখতে পারলেই তৈরি হয় অসাধারণ ছবি।
জার্মান সোসাইটি ফর নেচার ফটোগ্রাফির আয়োজনে এ বছর ইউরোপিয়ান ওয়াইল্ডলাইফ ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার প্রতিযোগিতার ২৬তম আসর বসেছে। ৪৬টি দেশের আলোকচিত্রীরা জমা দিয়েছেন ২৬ হাজারের বেশি ছবি। সেখান থেকে নয়টি বিভাগ ও দুটি বিশেষ বিভাগে ১০৭টি ছবিকে বিজয়ী হিসেবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
নির্বাচিত ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে বন্য প্রাণীর বিচিত্র আচরণ, প্রকৃতির ক্ষুদ্র বিস্ময় এবং মানুষের সঙ্গে বন্য প্রাণীদের সম্পর্কের নানা দিক। চলুন, ছবিগুলোর পেছনের গল্প জানা যাক।
.বন্যপ্রাণীর বিরল ছবি তুলে সেরা আলোকচিত্রের পুরস্কার পেলেন যারা, আছেন একজন বাংলাদেশিও.
আলোকচিত্রী: ইমরে পোটিও, হাঙ্গেরি
হাঙ্গেরির বোরজোনি পাহাড়ের একটি পরিত্যক্ত খনির সুড়ঙ্গে ঘুমিয়ে আছে বেশ কিছু বাদুড়। তাদের নিচে জমে থাকা বাদুড়ের বিষ্ঠার ওপর জন্মেছে সাদা রঙের ক্ষুদ্র ছত্রাক। সামনে ছত্রাক, পেছনে অন্ধকারে ঝুলে থাকা বাদুড়ের এই দৃশ্যই ছবিটিকে দিয়েছে এক রহস্যময় রূপ।
হাঙ্গেরির আলোকচিত্রী ইমরে পোটিও ১৩ বছর ধরে ওই খনির সুড়ঙ্গে শীতনিদ্রায় থাকা বাদুড়ের ছবি তুলছেন। এত দিন একই জায়গায় যাতায়াত করেও এমন দৃশ্য তাঁর চোখে পড়েনি। শীতনিদ্রার মধ্যেও ছোট নাকের এই বাদুড় (Rhinolophus hipposideros) মাঝেমধ্যে জেগে উঠে উড়ে যাওয়া পোকামাকড় শিকার করে। এ সময় তাদের বিষ্ঠা জমতে জমতে মাটিতে কালচে স্তর তৈরি হয়। আর সেই স্তরেই জন্ম নেয় একধরনের ক্ষুদ্র ছত্রাক।
পোটিও টর্চের আলোয় ছত্রাকটির উপস্থিতি দেখতে পান। এরপর ছবি তুলতে ব্যবহার করেন ম্যাক্রো লেন্স। ছবির সামনের অংশে ছত্রাককে স্পষ্ট রেখে পেছনে বাদুড়গুলোকেও দৃশ্যমান করেছেন তিনি। দীর্ঘ এক্সপোজার ও ফোকাস বদলের কৌশলে তোলা ছবিটি ধারণ করতে গিয়ে প্রাণীগুলোকে কোনোভাবে বিরক্ত করা হয়নি।
সবচেয়ে ছোট একটি ছত্রাকও যে এত বড় বিস্ময় হয়ে উঠতে পারে, ছবিটি তারই প্রমাণ। প্রতিযোগিতার ২৬ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো উদ্ভিদ ও ছত্রাক বিভাগের একটি ছবি সামগ্রিকভাবে সেরা হয়েছে।
.ছবিতে ভোট দিয়ে ৮০ হাজার টাকা জেতার সুযোগ.
আলোকচিত্রী: হেনলি স্পিয়ার্স, যুক্তরাজ্য
মেক্সিকোর এসপিরিতু সান্তো দ্বীপপুঞ্জের অগভীর পানিতে একটি ছোট সামুদ্রিক সিংহ পালক নিয়ে খেলছে। এমন দৃশ্য দেখলে মনে হতে পারে, প্রাণীটি নিছক আনন্দ করার জন্যই খেলছে। কিন্তু ছোট সামুদ্রিক সিংহের জীবনে খেলার গুরুত্ব আরও বেশি।
বড় সামুদ্রিক সিংহেরা খাবারের খোঁজে গভীর পানিতে ডুব দিতে পারে, কখনো কয়েক দিন ধরে শিকারও করে। কিন্তু বাচ্চাদের শরীরে তখনো সেই শক্তি ও সহ্যক্ষমতা তৈরি হয়নি। তাই তাদের বড়দের সঙ্গে দূরের শিকারে যাওয়া সম্ভব হয় না। উপনিবেশের কাছাকাছি থেকেই তারা বেড়ে ওঠে। খেলা আর ছোটাছুটির মধ্য দিয়ে ধীরে ধীরে নিজেদের শরীর ও দক্ষতা গড়ে তোলে। বড় হলে শিকার করা থেকে শুরু করে পানিতে চলাফেরা করতে সেই অনুশীলন কাজে লাগে।
তবে এই দ্বীপপুঞ্জের সামুদ্রিক সিংহদের জন্য বিপদও রয়েছে। সমুদ্রে পরিত্যক্ত মাছ ধরার জাল ও অন্যান্য সরঞ্জামে তারা আটকে যেতে পারে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবও তাদের জীবনকে কঠিন করে তুলছে। তাই নিরাপদ পরিবেশে বাচ্চাদের বেড়ে ওঠা জরুরি।
ব্রিটিশ আলোকচিত্রী হেনলি স্পিয়ার্সের ছবিতে খেলতে থাকা প্রাণীটির মধ্যে তাই শুধু কৌতূহল নয়, ভবিষ্যতের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার গল্পও রয়েছে।
.প্রাণিজগতের অদ্ভুত ও মজার ৭ ছবি.
আলোকচিত্রী: পেত্র বাম্বোউশেক, চেক প্রজাতন্ত্র
থাইল্যান্ডের কেং ক্রাচান জাতীয় উদ্যানে গিয়ে চেক আলোকচিত্রী পেত্র বাম্বোউশেকের আশা ছিল, বুনো পরিবেশে একটি মালয়ান সূর্যভালুকের দেখা পাবেন। তাঁর সেই আশা পূরণ হয়েছিল ঠিকই, তবে ঘটনাটি ছিল তাঁর কল্পনারও বাইরে।
উদ্যানের দর্শনার্থী কেন্দ্রের কাছে একটি ভালুক প্রায়ই চলে আসত। বনরক্ষীদের রান্নাঘরের পেছনে খাবারের উচ্ছিষ্ট খুঁজত সে। এক দিন ভালুকটি উঠে পড়ে বর্জ্য পোড়ানোর চুল্লির ভেতর। সেখানে গিয়ে আবার ঘুমিয়েও পড়ে!
এখানেই দৃশ্যটির অদ্ভুত দিক। ভালুকটির বিচরণ করার জন্য উদ্যানের প্রায় তিন হাজার বর্গকিলোমিটার জায়গা রয়েছে। তা সত্ত্বেও মানুষের তৈরি একটি স্থাপনা তার বিশ্রামের জায়গা হয়ে উঠেছে। আলোকচিত্রীর চোখে বিষয়টি ছিল প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের তৈরি জগতের এক অদ্ভুত সংঘাত।
চুল্লির গায়ে নির্মাতাপ্রতিষ্ঠানের নামও তাঁর নজরে আসে—ইভোলিউশন। এর অর্থ বিবর্তন। প্রকৃতির দীর্ঘ বিবর্তনে গড়ে ওঠা একটি প্রাণী ঘুমাচ্ছে মানুষের তৈরি বর্জ্য পোড়ানোর যন্ত্রের মধ্যে! নামটির সঙ্গে দৃশ্যের এই বৈপরীত্য ছবিটিকে দিয়েছে বাড়তি অর্থ। ছবিটি শুধু মজার একটি মুহূর্ত ধরে রাখেনি, মানুষের ফেলে দেওয়া খাবার কীভাবে বন্য প্রাণীদের আচরণ বদলে দিতে পারে, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছে।
.ওয়ার্ল্ড নেচার ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ড ২০২৫.
আলোকচিত্রী: মার্ক জিগলে, সুইজারল্যান্ড
স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার পথে সুইজারল্যান্ডের আলোকচিত্রী মার্ক জিগলে নিজের বাড়ির কাছেই একটি শিয়ালের মুখোমুখি হন। উভয়ই যেন অপ্রস্তুত হয়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার পর তিনি বাড়ি ফিরে ক্যামেরা নিয়ে আসেন।
পরে জানা গেল, গ্রামের মাঝখানের একটি পরিত্যক্ত গোয়ালঘরে আশ্রয় নিয়েছে একটি মা শিয়াল ও তার চারটি বাচ্চা। এক দিন ঘরের দরজায় উঁকি দিয়ে বাইরে তাকাচ্ছিল দুটি শাবক। তাদের চোখেমুখে কৌতূহল। দুটি শাবক সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে। এই দৃশ্যই ক্যামেরায় ধরে রাখেন জিগলে।
কিন্তু এই নতুন প্রতিবেশীদের উপস্থিতি গ্রামের সবাই ভালোভাবে নেয়নি। গোয়ালঘরের মালিক শিয়ালগুলোর উপস্থিতিতে বিরক্ত হন। তিনি তাদের দিকে পাথর ছুড়ে তাড়িয়ে দেন। শেষ পর্যন্ত পরিবারটিকে অন্য কোথাও নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে চলে যেতে হয়।
ছবিটির পেছনের গল্প এখানেই শেষ নয়। শিয়ালগুলো মানুষের বসতির মধ্যে এসেছিল বলে তারা যে মানুষের শত্রু, তা নয়। পরিত্যক্ত একটি ঘর তাদের কাছে নিরাপদ আশ্রয় বলে মনে হয়েছিল। অথচ মানুষের কাছে সেই জায়গাটিই ছিল অপ্রয়োজনীয় একটি পুরোনো স্থাপনা।
জিগলের ছবিটি মনে করিয়ে দেয়, শহর কিংবা গ্রামের আশপাশেও বন্য প্রাণীরা আমাদের সঙ্গে একই পৃথিবী ভাগ করে নেয়। তাদেরও নিরাপদে বাঁচার জায়গা দরকার।
.পাখির চোখে পৃথিবী যেমন দেখায়.
আলোকচিত্রী: অডুন রিকার্ডসেন, নরওয়ে
উত্তর মেরু বা আর্কটিকের ঘন বরফের মধ্যে একটি শিকারি মেরুভালুক। বরফের নিচে একটি সিলের শ্বাস নেওয়ার গর্ত। এই গর্তের দিকেই তাকিয়ে আছে ভালুকটি, যেন বুঝতে চাইছে নিচে কী আছে। ছবিটি তোলার জন্য নরওয়ের আলোকচিত্রী অডুন রিকার্ডসেনকে দীর্ঘ প্রস্তুতি নিতে হয়েছিল।
সিলের শ্বাস নেওয়ার গর্তের পাশে বরফে আরেকটি গর্ত তৈরি করে তিনি পানির নিচে ক্যামেরা বসান। বরফের ওপরে লাগান একটি গতিসংবেদী যন্ত্র, যাতে কোনো প্রাণী কাছে এলে ক্যামেরা চালু হয়। এরপর অপেক্ষা।
আট ঘণ্টা পর একটি মেরুভালুককে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। ভালুকটি সোজা গর্তের কাছে চলে আসে। পানির ওপর তখন বরফের পাতলা স্তর তৈরি হয়েছে। ভালুকটি মাথা দিয়ে সেই স্তর সরিয়ে নিচের দিকে তাকায়। আর ঠিক তখনই তার চোখ পড়ে ক্যামেরার দিকে।
রিকার্ডসেনের বহুদিনের পরিকল্পনা করা ছবিটি এভাবেই ধরা পড়ে। কিন্তু এরপর ঘটে আরেক ঘটনা। ভালুকটি সেখানে শুয়ে প্রায় নয় ঘণ্টা ঘুমিয়ে থাকে। ফলে আলোকচিত্রীর পক্ষে তখনই ক্যামেরাটি তুলে আনা সম্ভব হয়নি। প্রাণীটি সরে যাওয়ার পর তিনি দ্রুত সেখানে গিয়ে ক্যামেরা উদ্ধার করেন।
ক্যামেরায় ধরা পড়েছিল তাঁর কল্পনার সেই মুহূর্ত, অর্থাৎ শিকারির চোখ দিয়ে বরফের নিচের জগৎ দেখার সুযোগ। ছবির নামও যেন সেই পরিস্থিতির কথাই বলে।
.বাঘে কুমিরে যুদ্ধ: সনির চোখে বিশ্বসেরা ছবি .
আলোকচিত্রী: হেনলি স্পিয়ার্স, যুক্তরাজ্য
গালাপাগোস দ্বীপপুঞ্জের কালো আগ্নেয়শিলার ওপর রোদ পোহাতে দেখা যায় সামুদ্রিক ইগুয়ানাদের। দূর থেকে দেখলে তাদের শরীরের গড়ন কিছুটা ড্রাগনের মতোই মনে হতে পারে। তবে এই সরীসৃপেরা মূলত নিরীহ উদ্ভিদভোজী প্রাণী। এদের প্রধান খাবার সামুদ্রিক শৈবাল।
ব্রিটিশ আলোকচিত্রী হেনলি স্পিয়ার্স একটি ইগুয়ানার পিছু নিয়ে পানিতে নামেন। সেখানে তিনি দেখেন, প্রাণীটি প্রবল ঢেউয়ের মধ্যেও বেশ দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। তার শক্তিশালী লেজ সাঁতার কাটতে সাহায্য করছে। একসময় পাথরের কাছে পৌঁছে ধারালো নখ দিয়ে সেটি শক্ত করে আঁকড়ে ধরে। এরপর শুরু হয় শৈবাল খাওয়া।
এদিকে পানির নিচে ছবি তুলতে গিয়ে ঢেউয়ে হাবুডুবু খাচ্ছিলেন আলোকচিত্রী নিজেই। কিন্তু ইগুয়ানাটি যেন নিজের কাজে মগ্ন। ঢেউ তাকে এদিক-ওদিক ছুড়ে ফেলতে পারছিল না; সে পাথর আঁকড়ে ধরে ধীরে ধীরে খাবার সংগ্রহ করছিল।
সামুদ্রিক ইগুয়ানাদের জীবন সহজ নয়। রোদ পোহানো তাদের শরীর গরম রাখার জন্য জরুরি, কারণ সরীসৃপেরা শরীরের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে বাইরের তাপের ওপর নির্ভরশীল। আবার খাবারের খোঁজে নামতে হয় ঠান্ডা পানিতে। এই দুই পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিয়েই তাদের বেঁচে থাকতে হয়।
ছবিতে প্রকৃতির সেই সংগ্রাম যেমন আছে, তেমনি আছে প্রাণীটির শান্ত, একাগ্র জীবনযাপনের দৃশ্য।
.ম্যানগ্রোভ ফটোগ্রাফি অ্যাওয়ার্ডস ২০২৫.
আলোকচিত্রী: উইলিয়াম স্টিল, যুক্তরাজ্য
বোতসোয়ানার চোবে নদীর প্লাবিত ভূমি। চারদিকে অগভীর পানি, ভেসে আছে সাদা ও বেগুনি রঙের জলজ ফুল। সেই পানির মধ্যেই ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে একটি আফ্রিকান হাতি। কখনো শুঁড় বাড়িয়ে একটি ফুল তুলছে, কখনো আরেকটি। দৃশ্যটি দেখে মনে হয়, হাতিটি যেন নিজের পছন্দমতো ফুল বেছে নিচ্ছে।
যুক্তরাজ্যের আলোকচিত্রী উইলিয়াম স্টিল ২০২৩ সালের বসন্তে এই ছবি তোলেন। ওই বছর আগে থেকেই পানি বেড়ে যাওয়ায় প্লাবনভূমিতে প্রচুর জলজ উদ্ভিদ ও ফুল জন্মেছিল। তিনি প্রতিদিন নৌকায় বের হতেন, আশা করতেন এমন কোনো প্রাণীর দেখা পাবেন, যে এই ভাসমান উদ্ভিদ খেতে আসবে।
এক বিকেলে সবকিছু যেন ঠিকঠাক মিলে গেল। হাতিটি অগভীর পানির মধ্য দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। নৌকার ভেতর শুয়ে প্রায় পানির সমতল থেকে ছবি তোলেন স্টিল। ফলে হাতিটিকে ঘিরে থাকা ফুল ও পানি ছবিতে আরও সুন্দরভাবে ফুটে উঠেছে।
প্রতি বছর এপ্রিল থেকে মে মাসে অ্যাঙ্গোলা থেকে আসা বিপুল পানি চোবে নদীর প্লাবনভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে। এই পানিই জলজ উদ্ভিদের বেড়ে ওঠার উপযোগী পরিবেশ তৈরি করে। সেই মৌসুমি পরিবর্তনের সঙ্গে হাতির এই সাধারণ খাবার খোঁজার দৃশ্য মিলেই হয়ে উঠেছে অসাধারণ এক মুহূর্ত।
.সনির চোখে প্রকৃতির বিশ্বসেরা ছবি.
আলোকচিত্রী: প্রীতি জন, সংযুক্ত আরব আমিরাত
আলাস্কার লেক ক্লার্ক জাতীয় উদ্যানে কুয়াশার মধ্যে দিয়ে হেঁটে চলে যাচ্ছে একটি গ্রিজলি ভালুক। পেছনে পড়ে আছে একটি পাখি, যেন সে দাঁড়িয়ে দেখছে মঞ্চের প্রধান চরিত্রের বিদায়। চারপাশের কুয়াশা আর ঝাপসা আলো দৃশ্যটিকে নাটকের মঞ্চের মতো করে তুলেছে।
সংযুক্ত আরব আমিরাতের আলোকচিত্রী প্রীতি জন ছবিটি তোলার সময় এমন একটি ফ্রেম তৈরি করতে চেয়েছিলেন, যেখানে প্রাণীগুলো ছবির ওপরের অংশে থাকবে। এতে নিচের বড় অংশজুড়ে থাকা আবছা পরিবেশকে মঞ্চের মতো মনে হয়। কুয়াশা হয়ে ওঠে পর্দা, আর দূরের ঝাপসা আলোগুলো দেখে মনে হয়, মঞ্চের আলো ধীরে ধীরে নিভে যাচ্ছে।
ছবিটির সৌন্দর্য শুধু ভালুকের উপস্থিতিতে নয়, তার চলে যাওয়ার ভঙ্গিতেও। প্রাণীটি পেছনে ফিরে তাকাচ্ছে না, থেমেও নেই। যেন তার কাজ শেষ; এবার মঞ্চ ছেড়ে যাওয়ার পালা। আর পাখিটি রয়ে গেছে সেখানে, নীরব দর্শকের মতো।
প্রকৃতির ছবি তোলার সময় প্রাণীকে সব সময় বড় করে ফ্রেমে রাখতেই হবে, এমন নয়। কখনো চারপাশের পরিবেশই ছবির গল্প বলার সবচেয়ে বড় উপাদান হয়ে ওঠে। এই ছবিতে কুয়াশা, আলো, ফাঁকা জায়গা ও দুটি প্রাণীর অবস্থান মিলে সেই কাজটিই করেছে।
.ওশান ফটোগ্রাফার অব দ্য ইয়ার ২০২৫.
আলোকচিত্রী: অডুন রিকার্ডসেন, নরওয়ে।
নরওয়ের উপকূলের কাছে এক পাহাড়ে সোনালি ঈগলের একটি জুটি বাস করত। বহু বছর ধরে তাদের ছবি তুলেছেন আলোকচিত্রী অডুন রিকার্ডসেন। পাখি দুটিকে তিনি ভালোভাবেই চিনতেন। এক সকালে বাড়িতে কাজ করার সময় হঠাৎ প্রায় পাঁচ মিনিটের জন্য বিদ্যুৎ চলে যায়। তখন তিনি বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দেননি।
কয়েক ঘণ্টা পর কুকুর নিয়ে হাঁটতে বের হয়ে বুঝতে পারলেন, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সঙ্গে ঈগলের মৃত্যুর সম্পর্ক থাকতে পারে। বাড়ির পেছনের বিদ্যুতের তারে ধাক্কা লেগে মারা গেছে পাখিটি। বড় ডানার কারণে বড় শিকারি পাখিরা কখনো একই সঙ্গে দুটি বিদ্যুতের তার ছুঁয়ে ফেলতে পারে। তখন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে প্রাণ হারানোর ঝুঁকি থাকে।
রিকার্ডসেনের কাছে ঘটনাটি বেদনাদায়ক ছিল। যে ঈগলকে তিনি বছরের পর বছর দেখেছেন, যার ছবি তুলেছেন, সেটিই মানুষের তৈরি অবকাঠামোর কারণে মারা গেল।
এই বিপদ শুধু নরওয়ের নয়। পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় বিদ্যুতের তার বড় পাখিদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করে। ছবিটি সেই বিপদের কথাই সামনে আনে। উন্নয়ন মানুষের জীবন সহজ করে, কিন্তু পরিকল্পনায় বন্য প্রাণীদের কথা বিবেচনা না করলে তার মূল্য দিতে হয় প্রকৃতিকেও।
.বার্ড ফটোগ্রাফ অব দ্য ইয়ার ২০২৫.
আলোকচিত্রী: লুকাস শেফার, ইতালি
প্রজনন মৌসুমে পুরুষ ক্যাপারকেইলি পাখির আচরণ বদলে যেতে পারে। তখন তারা কখনো মানুষকেও প্রতিদ্বন্দ্বী ভেবে বসে। ইতালির আলোকচিত্রী লুকাস শেফারের বাড়ির কাছে একটি স্কি রিসোর্টে এমনই এক পাখি প্রতিদিন ঢালের ওপর এসে নিজের জায়গা দখল করে বসত। সেখানে পাখিটা ডাকাডাকিও করত।
পাখিটি স্থানীয় মানুষের কাছে বেশ পরিচিত হয়ে ওঠে। অনেকে ওকে দেখতে আসতেন, ছবি তুলতেন, এমনকি সংবাদমাধ্যমেও এই পাখির কথা প্রকাশিত হয়েছিল। কিন্তু এক দিন সেখানে স্কি প্রতিযোগিতা আয়োজন করা হলো। পাখিটি ঠিক প্রতিযোগিতার পথের মাঝখানে এসে নিজের প্রদর্শন শুরু করে দিল। জায়গাটি তার জন্য নিরাপদ ছিল না।
এ সময় কয়েকজন মানুষ এগিয়ে আসেন। পাখিটিকে আঘাত না করে ধীরে ধীরে সরিয়ে নিরাপত্তাবেষ্টনীর পেছনে নিয়ে যান, যাতে স্কি করতে থাকা কেউ তার গায়ে ধাক্কা না দেন। তবে গল্পের পরের অংশ দুঃখজনক। এক বছর পর একই পাখি একজন স্কিয়ারের চোখে না পড়ায় দুর্ঘটনাবশত মারা যায়।
ছবিটির গল্পে তাই মানুষের দুই ধরনের আচরণ দেখা যায়। কেউ বন্য প্রাণীর নিরাপত্তার কথা ভাবেন, আবার কেউ অসাবধানতায় তাদের বিপদের মুখে ঠেলে দেন। প্রাণীটির জীবন বাঁচানোর জন্য সেদিন যারা এগিয়ে এসেছিলেন, তাঁদের ছোট্ট উদ্যোগই ছবিটিকে আলাদা অর্থ দিয়েছে।
.আন্ডারওয়াটার ফটোগ্রাফার অফ দ্য ইয়ার
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: [email protected] মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com