যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির বিপর্যয়ের পর প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে সরিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে গুঞ্জন ছড়িয়ে পড়েছে। এ অবস্থায় তাঁর প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। গতকাল বুধবার তিনি এ সমর্থন জানান। এর এক দিন আগে মধ্যবর্তী নির্বাচনে কংগ্রেসের দুই কক্ষের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছেন ডেমোক্র্যাটরা। নির্বাচনের ফলাফলে ইরান যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের ক্ষোভের প্রতিফলন ঘটেছে বলে উঠে এসেছে।
হেগসেথকে সরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবছেন কি না, সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘না, আমার মনে হয়, তিনি খুব ভালো কাজ করছেন।’ হেগসেথকে যুদ্ধের সমর্থক বলে মন্তব্য করেন ট্রাম্প।
ট্রাম্পের এই বক্তব্য ২০০৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর তৎকালীন রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশের পদক্ষেপের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। ওই নির্বাচনে ইরাক যুদ্ধ নিয়ে ভোটারদের অসন্তোষের কারণে ডেমোক্র্যাটরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ পেয়েছিলেন। নির্বাচনের পরদিন সকালে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডকে বরখাস্ত করেছিলেন জর্জ ওয়াকার বুশ।
.
তবে বিভিন্ন সূত্র বলেছে, রিপাবলিকানরা নির্বাচনে নিজেদের পরাজয়ের কারণ পর্যালোচনা করার সময় হেগসেথকে সরিয়ে দিতে পারেন ট্রাম্প। তাঁর এক উপদেষ্টা বলেছেন, যুদ্ধের কারণে হেগসেথ ‘ছাঁটাইয়ের মুখে পড়তে পারেন’।
ওই উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘এই হারের জন্য কাউকে না কাউকে দায়ী করা হবে। আর আপনারা জানেন, সেই ব্যক্তি ট্রাম্প হবেন না।’
হেগসেথকে অজনপ্রিয় ইরান যুদ্ধের অন্যতম প্রধান সমর্থক হিসেবে বর্ণনা করেছেন ট্রাম্প। গত ২৩ মার্চ তিনি বলেছিলেন, ‘পিট, আমার মনে হয়, আপনিই প্রথম কথা বলেছিলেন। আপনি বলেছিলেন, ‘চলুন, আমরা এটা করি। কারণ, তাদের (ইরানকে) পারমাণবিক অস্ত্র পেতে দেওয়া যায় না।’
ইরান যুদ্ধের আদৌ কোনো যৌক্তিকতা ছিল কি না, তা নিয়ে গতকাল প্রকাশ্যে প্রশ্ন তুলেছেন মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি বলেছেন, এই যুদ্ধের কারণে রিপাবলিকানরা কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছেন।
মন্তব্য জানতে চাইলে হোয়াইট হাউস রয়টার্সকে বলেছে, ট্রাম্প প্রকাশ্যে হেগসেথ সম্পর্কে কী বলছে, আপনারা তা খেয়াল করতে পারেন।
প্রতিরক্ষা দপ্তর জানিয়েছে, ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হওয়া পর্যন্ত পেন্টাগনের নেতৃত্ব দিতে হেগসেথ ‘শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ’। ট্রাম্পের মেয়াদ শেষ হবে ২০২৯ সালের ২০ জানুয়ারি।
.
২০০৬ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ফল বিপর্যয়ের পর তৎকালীন রিপাবলিকান পার্টির প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী ডোনাল্ড রামসফেল্ডকে বরখাস্ত করেছিলেন। কিন্তু ট্রাম্প এবার প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথকে বরখাস্ত না করে রক্ষা করতে চাইছেন।
.
অভিশংসনের হুমকি
হেগসেথ মার্কিন রাজনীতিতে বিতর্কিত ব্যক্তি। এমনকি নিজের রিপাবলিকান দলের মধ্যেও তিনি শত্রু তৈরি করেছেন।
রিপাবলিকান আইনপ্রণেতা ও প্রতিনিধি পরিষদের সদস্য টমাস ম্যাসি এ বছরের শুরুতে তাঁর বিরুদ্ধে অভিশংসনের প্রস্তাব এনেছিলেন। তাঁর অভিযোগ, কংগ্রেসের অনুমোদন ছাড়াই ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান শুরু করে হেগসেথ ক্ষমতার অপব্যবহার করেছেন।
রিপাবলিকান সিনেটর টম টিলিস গত মঙ্গলবার রাতে সিবিএস নিউজকে বলেন, হেগসেথকে জবাবদিহির মুখে পড়তে হবে। আইনপ্রণেতাদের সঙ্গে তাঁর টানাপোড়েনের সম্পর্ক ট্রাম্প প্রশাসনের দেড় লাখ কোটি ডলারের প্রতিরক্ষা ব্যয় প্যাকেজ কংগ্রেসে পাস করানোর প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফলাফল আসার সময় টিলিস বলেন, ‘প্রতিরক্ষা খাতের প্রয়োজন ও ব্যয় প্যাকেজ কংগ্রেসে তুলে ধরার জন্য হেগসেথই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি কি না, নির্বাচনের পর তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। এই কংগ্রেসের মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র ৬০ দিন বাকি। এর মধ্যে তিনি যদি কিছু করতে চান, তাহলে বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।’
.
ডেমোক্র্যাটরা হেগসেথ ও যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগন পরিচালনায় তাঁর ভূমিকা তদন্ত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলেছেন, এই তদন্তে ইরান যুদ্ধ পরিচালনা থেকে শুরু করে শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তাদের অপসারণের বিষয়গুলোও থাকতে পারে। অপসারিত কর্মকর্তাদের মধ্যে জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যানও রয়েছেন।
ইউক্রেন নীতি ও লাতিন আমেরিকার জলসীমায় মাদক পাচারের সন্দেহে নৌযানের ওপর মার্কিন সামরিক হামলার বিষয়েও হেগসেথকে তদন্তের মুখে পড়তে হতে পারে। কিছু ডেমোক্র্যাটের মতে, এসব হামলা ‘যুদ্ধাপরাধের শামিল’ বলে গণ্য হতে পারে।
.
দলীয় রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চাওয়া বা কোনো অন্যায় না থাকা সত্ত্বেও ভুয়া তদন্ত শুরু করতে চাওয়া রাজনীতিকদের কাছে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ নতি স্বীকার করবেন না বা দমে যাবেন না।
শন পারনেল, প্রধান মুখপাত্র, পেন্টাগন
.
কংগ্রেসের সদস্যদের সঙ্গে হেগসেথের বিরোধ কখনো কখনো ব্যক্তিগত পর্যায়েও গড়িয়েছে। গত বছর ডেমোক্র্যাট সিনেটর মার্ক কেলিকে বিচারের মুখোমুখি করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন হেগসেথ।
কেলি এবং সামরিক ও গোয়েন্দা বিভাগে কাজের অভিজ্ঞতা থাকা কংগ্রেসের আরও পাঁচ ডেমোক্র্যাট সদস্য মার্কিন সেনাদের অবৈধ আদেশ পালন না করার আহ্বান জানিয়েছিলেন। হেগসেথ তাঁদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ তুলেছিলেন।
.
আগামী বছর প্রতিনিধি পরিষদের সশস্ত্র বাহিনী–বিষয়ক কমিটির নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ডেমোক্র্যাট অ্যাডাম স্মিথের। তিনি ইরান যুদ্ধ থেকে শুরু করে সশস্ত্র বাহিনীর ‘রাজনৈতিক নিরপেক্ষতার ভিত্তি’ নড়বড়ে হয়ে যাওয়ার বিষয়ে কঠোর নজরদারির প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র জানিয়েছে, হেগসেথকে নিয়ে ক্যাপিটল হিলে তীব্র বিরোধের কারণে তাঁকে সরিয়ে অন্য কাউকে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়টি হোয়াইট হাউসের আলোচনায় এসেছে।
সূত্রটি বলেছে, এমন কাউকে দায়িত্বে আনার প্রয়োজন, যিনি ডেমোক্র্যাটদের তদন্তের মুখে থাকা ঘটনাগুলো থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারবেন।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পারনেল বলেছেন, হেগসেথ ট্রাম্পের কর্মসূচি বাস্তবায়নে কাজ চালিয়ে যাবেন। পেন্টাগন ‘আইন মেনেই কাজ করেছে’।
পারনেল বলেন, ‘দলীয় রাজনৈতিক ফায়দা নিতে চাওয়া বা কোনো অন্যায় না থাকা সত্ত্বেও ভুয়া তদন্ত শুরু করতে চাওয়া রাজনীতিকদের কাছে প্রতিরক্ষামন্ত্রী হেগসেথ নতি স্বীকার করবেন না বা দমে যাবেন না।’
.
প্রতিরক্ষা খাতের প্রয়োজন ও ব্যয় প্যাকেজ কংগ্রেসে তুলে ধরার জন্য হেগসেথই সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি কি না, নির্বাচনের পর তা নিয়ে আমাদের ভাবতে হবে। এই কংগ্রেসের মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র ৬০ দিন বাকি। এর মধ্যে তিনি যদি কিছু করতে চান, তাহলে বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
থম টিলিস, সিনেটর, রিপাবলিকান পার্টি
.
টেনেসির সিনেট আসনে কি হেগসেথ
হেগসেথকে নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচিত একটি সম্ভাবনা হলো, সিনেটর মার্শা ব্ল্যাকবার্নের ছেড়ে দেওয়া আসনে তাঁকে দায়িত্ব দেওয়া। মঙ্গলবারের নির্বাচনে ব্ল্যাকবার্ন টেনেসির গভর্নর নির্বাচিত হয়েছেন। আগামী জানুয়ারিতে তিনি গভর্নরের দায়িত্ব নেবেন। তখন সিনেটের আসনটি ছেড়ে দিতে হবে তাঁকে।
সিনেটে ব্ল্যাকবার্নের মেয়াদের আরও চার বছর বাকি (সিনেটররা ছয় বছরের জন্য নির্বাচিত হন)। টেনেসির বাসিন্দা হেগসেথ মঙ্গলবার সেখানেই ভোট দিয়েছেন। তাঁকে ওই আসনে অন্তর্বর্তী সিনেটর হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলে আপাতত নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে না। তবে ২০২৮ সালের নির্বাচনে আসনটি ধরে রাখতে হলে তাঁকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে হবে।
ব্ল্যাকবার্নের আসনে হেগসেথকে দেখতে চান কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প বলেন, ‘আমার মনে হয়, তিনি খুব ভালো কাজ করছেন। আমার ধারণা, তিনি ওই পদে গেলে বেশ জনপ্রিয় হবেন।’
.
ইউক্রেন নীতি ও লাতিন আমেরিকার জলসীমায় মাদক পাচারের সন্দেহে নৌযানের ওপর মার্কিন সামরিক হামলার বিষয়েও হেগসেথকে তদন্তের মুখে পড়তে হতে পারে। কিছু ডেমোক্র্যাটের মতে, এসব হামলা ‘যুদ্ধাপরাধের শামিল’ বলে গণ্য হতে পারে।
.
তবে ট্রাম্প সাংবাদিকদের বলেন, ‘এ বিষয়ে আমি কিছুই শুনিনি।’
ট্রাম্প নিয়মিতই প্রকাশ্যে হেগসেথের প্রশংসা করেছেন। পেন্টাগনকে নতুনভাবে সাজানোর প্রচেষ্টায় সাবেক এই ন্যাশনাল গার্ড সদস্যকে যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছেন ট্রাম্প।
তবে গত মাসে হেগসেথের সঙ্গে প্রকাশ্যে মতবিরোধে জড়ান ট্রাম্প। ফোর্ট হুডে হামলাকারী নাসির হাসানের ফায়ারিং স্কোয়াডে মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের কথা ঘোষণা করেছিলেন হেগসেথ। কিন্তু ট্রাম্প তা বাতিল করেন।
অনেক রিপাবলিকান, ধর্মীয় নেতা ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক এ পরিকল্পনার বিরোধিতা করেছিলেন।
নাসির হাসানের মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের দৃশ্য সরাসরি সম্প্রচারের পরিকল্পনা বাতিল করায় প্রতিরক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে স্বস্তি প্রকাশ করেছিলেন।
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: [email protected] মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com