কাপড় কাটার পর পড়ে থাকা টুকরা কিংবা উৎপাদনের সময় অব্যবহৃত থেকে যাওয়া কাপড় দিয়ে কি তৈরি করা সম্ভব নতুন পোশাক? সেই সম্ভাবনা খুঁজতেই সম্প্রতি জায়ান্ট গ্রুপের নিটওয়্যার ফ্যাক্টরি কারখানা ঘুরে দেখেন বিজিএমইএ ইউনিভার্সিটি অব ফ্যাশন অ্যান্ড টেকনোলজির (বিইউএফটি) শিক্ষার্থীরা। কারখানার কাজ কাছ থেকে দেখে তাঁরা জানার সুযোগ পান, উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপে কীভাবে বস্ত্রবর্জ্য তৈরি হয় এবং সেগুলো নতুনভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ কোথায়।
শ্রেণিকক্ষে কাপড়, নকশা ও উৎপাদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে শেখার সুযোগ থাকে। তবে কারখানায় গিয়ে পুরো প্রক্রিয়াটি সামনে থেকে দেখার অভিজ্ঞতা আলাদা। জায়ান্ট গ্রুপের কারখানা পরিদর্শনে শিক্ষার্থীরা নিটিং থেকে পোশাক তৈরি পর্যন্ত বিভিন্ন ধাপ পর্যবেক্ষণ করেন। কোন পর্যায়ে কাপড়ের টুকরা ও কাটিংয়ের বর্জ্য তৈরি হচ্ছে, অবশিষ্ট কাপড় কীভাবে ব্যবস্থাপনা করা হচ্ছে—এসব বিষয়ও দেখেন তাঁরা।
পাশাপাশি শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে বস্ত্রবর্জ্য পুনর্ব্যবহারের সম্ভাবনা ও বাস্তব চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে জানেন। এই পরিদর্শনের আয়োজন করা হয় বিইউএফটির সার্কুলার টেক্সটাইল লিভিং ল্যাব প্রকল্পের আওতায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্র্যাডিশনাল ক্রাফটস ইন ফ্যাশন কোর্সের অধীনে ছিল এই পরির্দশন। বিইউএফটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজির ১০ জন শিক্ষার্থীও এতে অংশ নেন।
কারখানা পরিদর্শনের মূল উদ্দেশ্য শুধু উৎপাদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে জানা নয়, বরং উৎপাদনের সময় তৈরি হওয়া বর্জ্যকে কীভাবে নতুন কাজে লাগানো যায়, তা খুঁজে দেখা। পোশাক তৈরির সময় কাপড় কাটার পর অনেক টুকরা অবশিষ্ট থাকে। কিছু কাপড় আবার উৎপাদনের পরও অব্যবহৃত থেকে যায়। উপযুক্ত নকশা ও পরিকল্পনার মাধ্যমে এসব উপকরণ দিয়েও তৈরি করা সম্ভব নতুন ফ্যাশনপণ্য।
তবে কোন কাপড় কীভাবে ব্যবহার করা যাবে, তা বুঝতে প্রয়োজন উপকরণ সম্পর্কে ধারণা ও নকশার পরিকল্পনা। কারখানা ঘুরে দেখা এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা এসব বিষয় জানার সুযোগ পেয়েছেন। কোন ধরনের বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের উপযোগী, সেগুলো কাজে লাগাতে কী কী সমস্যার মুখোমুখি হতে হয় এসব বিষয়ও তাঁদের অভিজ্ঞতার অংশ। আর এই অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বর্জ্য ও অবশিষ্ট কাপড় ব্যবহার করে ৩২টি পোশাক তৈরি করবেন শিক্ষার্থীরা।
নকশা ও নমুনা তৈরির মধ্য দিয়ে তাঁরা দেখাবেন, ফেলে দেওয়ার মতো মনে হওয়া কাপড়ের টুকরাও সৃজনশীল নকশায় নতুন পোশাকের উপকরণ হয়ে উঠতে পারে।
এই উদ্যোগে বস্ত্রবর্জ্য পুনর্ব্যবহারের পাশাপাশি গুরুত্ব পাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্প ও আধুনিক নকশার সমন্বয়। ট্র্যাডিশনাল ক্রাফটস ইন ফ্যাশন কোর্সের সঙ্গে যুক্ত এই প্রকল্পে শিক্ষার্থীরা কারুশিল্পের কৌশল কাজে লাগিয়ে অব্যবহৃত উপকরণকে নতুনভাবে ব্যবহারের সুযোগ পাবেন। ফ্যাশন ডিজাইনে নতুনত্ব আনতে সব সময় নতুন কাপড় বা উপকরণের প্রয়োজন হয় না। হাতে থাকা উপকরণকে নতুনভাবে কাজে লাগানো, তার উপযোগিতা বুঝে নকশা তৈরি করা এবং সৃজনশীল প্রয়োগের মাধ্যমে তার ব্যবহার বাড়ানোও নকশার গুরুত্বপূর্ণ দিক। এই প্রকল্পে শিক্ষার্থীরা সেই ধারণা বাস্তবে প্রয়োগ করবেন।
কারখানার উৎপাদনপ্রক্রিয়া সম্পর্কে সরাসরি ধারণা থাকলে নকশা তৈরির সময় উপকরণের প্রাপ্যতা ও ব্যবহারিক দিকগুলো বিবেচনায় নেওয়া সহজ হয়। এতে সৃজনশীল নকশার সঙ্গে বাস্তব উৎপাদনব্যবস্থার সংযোগও তৈরি হয়।
‘সার্কুলার বাই ডিজাইন: আ সার্কুলার টেক্সটাইল লিভিং ল্যাব—বাংলাদেশ অ্যান্ড দ্য নেদারল্যান্ডস’ প্রকল্পটি বিইউএফটি ও নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ ইউনিভার্সিটি অব অ্যাপ্লায়েড সায়েন্সেসের (টিএইচইউএএস) যৌথ উদ্যোগ। এতে সহায়তা দিচ্ছে নেদারল্যান্ডস এন্টারপ্রাইজ এজেন্সি (আরভিও)। প্রকল্পটির নেতৃত্ব দিচ্ছেন বিইউএফটির ফ্যাশন স্টাডিজ বিভাগের সহকারী অধ্যাপক শর্মিলী সরকার। নেদারল্যান্ডসের পক্ষ থেকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন টাইটাস ভ্যান ডার স্পেক। দুই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের পাশাপাশি শিল্পকারখানার বাস্তব সমস্যাগুলোকে শিক্ষার্থীদের নকশা ও গবেষণার সঙ্গে যুক্ত করাও এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা শ্রেণিকক্ষের পাঠের সঙ্গে শিল্পের বাস্তব অভিজ্ঞতা মিলিয়ে কাজ করার সুযোগ পাচ্ছেন।
পরিদর্শনের সময় শিক্ষার্থীদের অভিজ্ঞতা এবং টেকসই উৎপাদন, সার্কুলারিটি ও বস্ত্রবর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে শিল্পসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতামতও নথিবদ্ধ করা হয়।
এসব অভিজ্ঞতা ও মতামতের মাধ্যমে বস্ত্রবর্জ্য পুনর্ব্যবহার এবং টেকসই ফ্যাশন সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। জায়ান্ট গ্রুপের কারখানা পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা দেখেছেন, পোশাক তৈরির প্রতিটি ধাপের সঙ্গে উপকরণের ব্যবহার ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিষয়টি জড়িয়ে আছে। এখন সেই অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে ৩২টি পোশাক তৈরির পরিকল্পনা তাঁদের। অব্যবহৃত কাপড়কে নতুনভাবে কাজে লাগানো এবং ঐতিহ্যবাহী কারুশিল্পের সঙ্গে আধুনিক নকশার সমন্বয় ঘটানোর এই উদ্যোগ শিক্ষার্থীদের টেকসই ফ্যাশন নিয়ে হাতে-কলমে কাজ করার সুযোগ করে দিচ্ছে।
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: [email protected] মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com