বিএনপির সংসদ সদস্য প্রার্থীর নির্বাচনী গণসংযোগ চলছিল। কেউ স্লোগান দিচ্ছিলেন, কেউ বিলি করছিলেন প্রচারপত্র। নেতা-কর্মী ও সাধারণ মানুষের ভিড়ের মধ্যেই হঠাৎ গুলির শব্দ। মুহূর্তে ছত্রভঙ্গ হয়ে যান সবাই। এর মধ্যেই এক যুবক পেছন থেকে গণসংযোগে থাকা এক ব্যক্তির ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে পরপর তিনটি গুলি করেন। এ সময় মাটিতে লুটিয়ে পড়েন ওই ব্যক্তি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে মৃত্যু হয় তাঁর।
গত বছরের ৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় চট্টগ্রাম নগরের বায়েজিদ বোস্তামী থানার খন্দকারপাড়া এলাকায় ঘটে এ ঘটনা। এক বছর পার হতে চললেও গুলি করা সেই শুটার কে তা শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ।
.
সরোয়ারকে হত্যার তিন দিন আগে তাঁকে হুমকি দিয়েছিলেন ‘সন্ত্রাসী’ মো. রায়হান। সরোয়ারকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছিল, তাঁর সময় শেষ। যা খাওয়ার, যেন খেয়ে নেন। নিহত সরোয়ারের বাবা আবদুল কাদের প্রথম আলোকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
.
ওই দিন গুলিতে নিহত ব্যক্তির নাম সরোয়ার হোসেন ওরফে বাবলা। তিনি চট্টগ্রাম নগরে পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী ছিলেন। চট্টগ্রাম-৮ আসনে বিএনপির মনোনীত প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর নির্বাচনী গণসংযোগে তাঁকে গুলি করা হয়। এরশাদ উল্লাহ পাঁচজন গুলিতে আহত হন। বর্তমানে এরশাদ উল্লাহ ওই আসনের সংসদ সদস্য ও নগর বিএনপির আহ্বায়ক।
আলোচিত এ ঘটনার এক বছরে বাঁহাতি সেই শুটারকে যেমন গ্রেপ্তার করা যায়নি, তেমনি উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত অস্ত্রটিও। যদিও এ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার হয়েছেন ৩৯ জন। পুলিশের তদন্তে উঠে এসেছে, সরোয়ারকে হত্যার পেছনে ছিল এলাকায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে বিস্তার ও পূর্ববিরোধ। যদিও নেপথ্যে রাজনৈতিক বিরোধও থাকতে পারে বলে ধারণা পরিবারের।
.
আমার ভাই বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন। বিভিন্ন মিছিল-সমাবেশেও অংশ নিতেন। বিষয়টি বিএনপির কিছু নেতা ভালোভাবে নেননি। বড় সাজ্জাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, বিএনপির এমন এক নেতা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন।
আজিজ উদ্দিন, নিহত সরোয়ারের ভাই।
.
প্রত্যক্ষদর্শী, পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঘটনার দিন সন্ধ্যায় খন্দকারপাড়া এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছিলেন বিএনপি প্রার্থী এরশাদ উল্লাহ। তাঁর সঙ্গে ছিলেন দলীয় নেতা-কর্মীরা। স্লোগান ও প্রচারপত্র বিতরণের মধ্যে সরোয়ারও প্রার্থী এরশাদ উল্লাহর পাশে ছিলেন। তিনি নিজেও প্রচারপত্র বিলি করছিলেন।
বিএনপি নেতা-কর্মীদের এই ভিড়ের মধ্যে ঘাড়ে পিস্তল ঠেকিয়ে সরোয়ার হোসেনকে খুন করা হয়। নিহত সরোয়ারের বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজিসহ বিভিন্ন অভিযোগে ১৫টি মামলা ছিল।
গুলি করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এতে দেখা যায়, ভিড়ের মধ্যে বাঁ হাতে পিস্তল ধরে সরোয়ারের ঘাড়ে ঠেকিয়ে গুলি করছেন এক যুবক। ভিডিওতে ওই যুবকের মুখ দেখা যায়নি।
পুলিশের ধারণা, ওই শুটারের বয়স ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। ভালোভাবে প্রশিক্ষিত কেউ এ হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছেন বলে মনে করছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল ও আশপাশে কোনো সিসিটিভি ক্যামেরা ছিল না। পরিকল্পিতভাবে এমন জায়গা বেছে নেওয়া হয়েছিল, যাতে শুটারের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন হয়। ফলে তাঁকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার করা কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
.‘তোর সময় শেষ, যা খাওয়ার খেয়ে নে’—তিন দিন আগে হুমকি পেয়েছিলেন সরোয়ার.
সরোয়ারকে হত্যার তিন দিন আগে তাঁকে হুমকি দিয়েছিলেন ‘সন্ত্রাসী’ মো. রায়হান। সরোয়ারকে উদ্দেশ্য করে বলা হয়েছিল, তাঁর সময় শেষ। যা খাওয়ার, যেন খেয়ে নেন। নিহত সরোয়ারের বাবা আবদুল কাদের প্রথম আলোকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
আবদুল কাদের বলেন, বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলী, তাঁর সহযোগী সাজ্জাদ হোসেন ওরফে ছোট সাজ্জাদ এবং মো. রায়হান প্রায়ই তাঁর ছেলেকে হুমকি দিতেন। এ কারণে সরোয়ার সতর্কভাবে চলাফেরা করতেন। সঙ্গে লোকজনও রাখতেন।
আবদুল কাদের আরও বলেন, ঘটনার দিন নিজের বাড়ি থেকে দুই-তিন শ গজ দূরে একটি দোকানের সামনে নির্বাচনী জনসংযোগ করছিলেন বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহ। পাশে সরোয়ার ছিলেন। নিজের এলাকায় এমন হামলার আশঙ্কা করেননি সরোয়ার।
.
সরোয়ার হত্যার পরদিন তাঁর বাবা আবদুল কাদের বাদী হয়ে বায়েজিদ বোস্তামী থানায় হত্যা মামলা করেন। মামলায় বিদেশে পলাতক সন্ত্রাসী সাজ্জাদ আলীসহ সাতজনের নাম উল্লেখ করে অজ্ঞাতপরিচয় আরও ১৫ জনকে আসামি করা হয়।
মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের মধ্যে সাজ্জাদ, তাঁর সহযোগী মো. রায়হান ও বোরহানকে এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। গত ২৯ আগস্ট যশোর হয়ে ভারতে পালানোর চেষ্টাকালে মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সরোয়ার হত্যা মামলায় গত ২৮ অক্টোবর আদালত তাঁর দুই দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, সরোয়ার একসময় বড় সাজ্জাদের অনুসারী ছিলেন। পরে গুরু-শিষ্যের মধ্যে বিরোধ তৈরি হয়। ২০১৬ সালের দিকে সরোয়ার নিজস্ব বলয় গড়ে তোলেন। এর পর থেকে এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে দুজনের বিরোধ চলছিল।
.
সরোয়ার হত্যা মামলায় এ পর্যন্ত ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে ১০ জন কারাগারে রয়েছেন। অন্যরা জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়েছে। কিন্তু হত্যাকাণ্ডে সরাসরি অংশ নেওয়া বাঁহাতি শুটারের পরিচয় জানা যায়নি।
জানতে চাইলে বায়েজিদ বোস্তামী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ইখতিয়ার উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, মামলায় ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাঁহাতি শুটারকে শনাক্ত করার জন্য তদন্ত অব্যাহত রয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্র জানায়, বড় সাজ্জাদের সঙ্গে পূর্ববিরোধ ও এলাকায় আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করেই সরোয়ারকে হত্যা করা হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এ জন্য নির্বাচনী জনসংযোগের মতো জনসমাগমপূর্ণ স্থানকে বেছে নেওয়া হয়। তবে এর পেছনে রাজনৈতিক কোনো বিরোধ ছিল কি না, সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
এর আগে গত বছরের ৩০ মার্চ নগরের বাকলিয়া এক্সেস রোড এলাকায় সরোয়ারের একটি ব্যক্তিগত গাড়ি লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়েছিল। ওই ঘটনায় অল্পের জন্য বেঁচে যান তিনি। তবে গুলিতে দুজন নিহত হন।
.সন্ত্রাসীদের দলে প্রশিক্ষিত শুটার, দুশ্চিন্তায় পুলিশ.
সরোয়ারের ছোট ভাই আজিজ উদ্দিন বায়েজিদ থানা শ্রমিক দলের সাবেক সাধারণ সম্পাদক। তাঁর অভিযোগ, রাজনৈতিক বিরোধের জেরেই তাঁর ভাইকে হত্যা করা হয়েছে। তাঁর ভাষায়, ‘এক ঢিলে দুই পাখি’ মারার মতো ঘটনা ঘটেছে।
আজিজ উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার ভাই বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর অনুসারী ছিলেন। বিভিন্ন মিছিল-সমাবেশেও অংশ নিতেন। বিষয়টি বিএনপির কিছু নেতা ভালোভাবে নেননি। বড় সাজ্জাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা রয়েছে, বিএনপির এমন এক নেতা হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকতে পারেন।’
তবে ঘটনার পর দায়ের করা মামলায় ওই নেতার নাম কেন উল্লেখ করা হয়নি, জানতে চাইলে আজিজ উদ্দিন বলেন, ‘বিষয়টি পরে জানতে পারি। সুষ্ঠু তদন্ত করে পুলিশ বের করুক।’
পুলিশের ভূমিকা নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, ৩৯ জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও প্রকৃত অপরাধীদের অনেকে ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। নিরীহ ব্যক্তিদেরও গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আবার গ্রেপ্তার হওয়া কয়েকজন প্রকৃত আসামি জামিনে বেরিয়ে এসেছেন।
তবে নিরীহ কাউকে গ্রেপ্তারের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওসি ইখতিয়ার উদ্দিন। তিনি বলেন, নির্বাচনী জনসংযোগে সরোয়ারকে হত্যার পেছনে রাজনৈতিক বিরোধ ছিল কি না, তা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্ত চলছে।
.
সেদিন গুলিতে আহত হয়েছিলেন বিএনপি নেতা এরশাদ উল্লাহ। বর্তমানে তিনি সংসদ সদস্য। প্রথম আলোকে তিনি বলেন, ঘটনায় জড়িত অস্ত্রধারী সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনা উচিত।
এদিকে ছেলের হত্যাকারীরা গ্রেপ্তার না হওয়ায় হতাশ মামলার বাদী আবদুল কাদের। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘নিজের চোখের সামনে লোকজনের ভিড়ে যেভাবে ছেলেকে গুলি করে মেরেছে, তা কিছুতেই ভুলতে পারছি না। ছেলের হত্যাকারীদের বিচার দূরে থাক, যে বাঁহাতি গুলি করেছে, তাকে এখনো ধরতেই পারেনি পুলিশ।’
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: [email protected] মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com