কেন্দ্রীয় সরকার ও দিল্লি পুলিশকে তিষ্টোতে দিচ্ছে না বিরোধী জোট ‘ইন্ডিয়া’। প্রথম দিন নির্বাচন কমিশন অভিযান ও আকাশবাণী ভবনে রাহুল–প্রিয়াঙ্কাদের অবস্থান, দ্বিতীয় দিন মধ্যাহ্নভোজ শেষে আচমকাই যন্তর মন্তরের পথে বিরোধী নেতাদের গ্রেপ্তার বরণ, আজ বৃহস্পতিবার তৃতীয় দিনেও কনট প্লেসে মধ্যাহ্নভোজ শেষে সদলে বাসে চেপে রাজঘাটে অবস্থান। তিন দিনেই ইন্ডিয়া জোটের নেতৃত্ব দিলেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী। সঙ্গে তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কাসহ দলের সব শীর্ষ নেতা এবং জোট শরিকদের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।
শুধু বিরোধী জোট নয়, সরকারের চিন্তা বাড়িয়ে জ্ঞানেশ হটাও আন্দোলন তীব্রতর করে তুলেছে ককরোচ জনতা পার্টিও (সিজেপি)। ১০ অক্টোবর তাদের ‘যন্তর মন্তর ২.০’ আন্দোলন শুরুর আগে বৃহস্পতিবার কর্ণাটকের রাজধানী বেঙ্গালুরুতে তারা এক জনসমাবেশের আয়োজন করেছে। সেখানে সিজেপি নেতাদের সঙ্গে যোগ দেন অতি পরিচিত ইউপিউবার ধ্রুব রাঠি। তাঁর সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জনপ্রিয় অভিনেতা প্রকাশ রাজ। সিজেপির সঙ্গে যৌথভাবে এই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কথা আগেই ঘোষণা করেছেন বামপন্থী ছাত্রসংগঠনের নেতা–নেত্রীরা।
অন্যান্য দিনের সঙ্গে আজকের আন্দোলনের পার্থক্য ছিল একটাই, বিরোধী নেতাদের পুলিশ ও নিরাপত্তারক্ষীদের বাধা না দেওয়া।
গতকাল বুধবার কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে কনট প্লেসের ‘সাগর রত্ন’ রেস্তোরাঁয় ইন্ডিয়া জোটের নেতাদের মধ্যাহ্নভোজে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। দক্ষিণি খাবারের জন্য জনপ্রিয় ওই রেস্তোরাঁয় খাওয়াদাওয়া সেরে নেতারা আচমকাই বাসে চেপে যন্তর মন্তরের দিকে এগোতে থাকেন। গেরিলা কায়দার ওই অভিযানের কোনো আঁচ দিল্লি পুলিশ পায়নি।
আজও সেই কায়দা ছিল জোট নেতাদের আচরণে। এদিনও বিরোধী নেতাদের মধ্যাহ্নভোজের দাওয়াত দেন খাড়গে। সাগর রত্ন রেস্তোরাঁর ঠিক পাশের ‘মোয়েটস’–এ। বৃহস্পতিবারের মধ্যাহ্নভোজ অবশ্য আগের দিনের মতো নিরামিষ ছিল না। যদিও আগের দুদিনের তুলনায় বৃহস্পতিবার বিরোধীদের পাশাপাশি পুলিশের আচরণ ছিল সংযত।
এদিনও পুলিশকে বুঝতে দেওয়া হয়নি, ভোজ শেষে বিরোধী নেতারা ঠিক কী করবেন। ফলে কনট প্লেস, যন্তর মন্তর, জনপথ, অশোকা রোড, ফিরোজ শাহ রোডসহ গোটা এলাকায় পুলিশ বাহিনী তৎপরতা তুঙ্গে ওঠে। কাজের দিন হওয়ায় লুটেন্স দিল্লির এই তল্লাট প্রায় স্তব্ধ হয়ে যায়। কয়েক হাজার পুলিশ ও র্যাফ চারদিকে মোতায়েন করা হয়।
কংগ্রেসের বিভিন্ন সংগঠনের নেতা–কর্মীরা পতাকা হাতে সেখানে অংশ নেন। স্লোগানে স্লোগানে গমগম করে ওঠে জনপথ। গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের কাছে পুলিশ জানতে চায়, ভোজের পর বিরোধীরা ঠিক কী করতে চলেছেন। কিন্তু কারও কাছে কোনো উত্তর ছিল না।
বেলা তিনটা নাগাদ মোয়েটস থেকে বেরিয়ে গণমাধ্যমকে রাহুল বলেন, ‘লোকসভা ও রাজ্যসভার প্রায় ৩০০ সদস্য শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ দেখাতে চাইছিলেন। অথচ দুদিন ধরে আমাদের বিক্ষোভ দেখাতে দেওয়া হচ্ছে না। প্রথম দিন নির্বাচন কমিশনে যেতে দেওয়া হয়নি। বুধবার যন্তর মন্তরে যেতে বাধা দেওয়া হলো। জবরদস্তি প্রতিরোধ করা হলো। বলপ্রয়োগ করা হলো। এই আচরণের বিচার ঠিকই করা হবে। এটা আমাদের অঙ্গীকার। জনগণ দেখবে, নরেন্দ্র মোদি, অমিত শাহ, জ্ঞানেশ কুমার ও মোহন ভাগবত তাঁদের কৃতকর্মের ফল পাচ্ছেন।’
ইন্ডিয়া জোটের নেতারা তিনটি বাসে চেপে বিকেল চারটা নাগাদ রওনা হন রাজঘাটে জাতির জনক মহাত্মা গান্ধীর সমাধিস্থলে অবস্থানের উদ্দেশ্যে। কয়েক হাজার দলীয় কর্মী ও নেতা তাঁদের সঙ্গী হন। বাসের পাশে হেঁটে তাঁরা বিকেল সাড়ে পাঁচটা নাগাদ রাজঘাট পৌঁছান। নেতাদের বাসগুলো যাতে বাধাহীন পৌঁছাতে পারে, সে জন্য দিল্লি পুলিশ রাস্তা ঠিক করে দেয়। পরপর দুই দিন নেতা–পুলিশ সংঘাত দেখা গিয়েছিল, বৃহস্পতিবার দেখা গেল সহযোগিতার ছবি।
রাজঘাটে গিয়ে গান্ধীজির সমাধির সামনে নেতারা বসে পড়েন। সমাধিস্থলের বাইরে প্রতিটি দলের নেতারা গণমাধ্যমকে বলেন, দেশের স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে, মানুষের ভোটাধিকারের স্বার্থে এ লড়াই তাঁরা চালিয়ে যাবেন। এটা দেশের অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই।
‘ভোট চুরি’ নিয়ে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুকে জানাতে রাষ্ট্রপতি ভবনে যাবেন ইন্ডিয়া নেতারা। আগামীকাল সেই সাক্ষাৎ হতে পারে। বিরোধী নেতাদের মধ্যে উপস্থিত থাকবেন অখিলেশ যাদব, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, তেজস্বী যাদবসহ অন্যরাও। বিরোধী নেতারা ১৫ জনের সাক্ষাতের অনুমতি চেয়েছিলেন, শোনা যাচ্ছে রাষ্ট্রপতি ১০ জনকে যেতে বলেছেন। ফলে দেখার বিষয় কোন দলের প্রতিনিধিরা সুযোগ পান।
বৃহস্পতিবার পাঁচ হাজার পুলিশ মোতায়েন করা হয় রাজধানী দিল্লিতে। শনিবার ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) আন্দোলন মোকাবিলায় সতর্ক রাখা হয়েছে ২০ হাজার পুলিশ ও ২৩ হাজার আধা সামরিক বাহিনীর জওয়ানকে। গোটা লুটেন্স দিল্লিতে জারি করা হয়েছে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ১৬৩ (আগের ১৪৪) ধারা। জায়গায় জায়গায় লাগানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা। ফেশিয়াল রিকগনিশন ব্যবস্থায় দুষ্কৃতকারীদের চিহ্নিত করা হবে।
পুলিশ কর্মীদের শরীরে বসানো হয়েছে ‘বডি ক্যাম’। লাগোয়া রাজ্যগুলোর সীমান্তে নজরদারি ও কড়াকড়ি জোরালো করা হয়েছে। বলা হয়েছে, সিজেপির আন্দোলনে অন্য রাজ্যের পড়ুয়ারা যাতে যোগ দিতে না পারেন, তা নিশ্চিত করতে হবে। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে বিজেপিশাসিত হরিয়ানা, রাজস্থান ও উত্তর প্রদেশ সরকারকে নির্দেশ পাঠানো হয়েছে।
এসআইআর বাতিল ও সিইসির পদত্যাগের দাবি জোরাল হয়ে ওঠায় কেন্দ্রীয় সরকার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের নিরাপত্তা আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। এমনিতেই সিইসি জেড প্লাস নিরাপত্তা পান। তিনি ছাড়াও তাঁর পরিবারের সদস্যদেরও ওই নিরাপত্তার আওতায় আনা হয়েছে।
জ্ঞানেশকে এখন সর্বোচ্চ পর্যায়ের জেড প্লাস নিরাপত্তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। তিনি দিল্লির বাইরে কোথাও যাচ্ছেন না। আন্দোলন জোরদার হওয়ার পর থেকে তিনি বেরিলি, বারানসি, লাদাখ, উত্তরাখন্ড, হিমাচল প্রদেশ ও ছত্তিশগড়ের কর্মসূচি বাতিল করেছেন।
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: nomanibsl@gmail.com মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com