অর্থনীতিতে পরিবেশবান্ধব রূপান্তরের মাধ্যমে আগামী ২০৩৫ সাল নাগাদ বাংলাদেশের মোট বিনিয়োগ ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং রপ্তানি ২ দশমিক ৪ শতাংশ বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে দেশে প্রকৃত মজুরি, ব্যক্তিগত ভোগ এবং কর্মসংস্থানও বাড়তে পারে।
তবে এসব লক্ষ্য অর্জনে অর্থনীতিকে জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর উন্নয়নের পথ থেকে সরিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগের মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দিকে নিয়ে যেতে হবে।
রাজধানীর একটি হোটেলে আজ মঙ্গলবার ‘সবুজ প্রবৃদ্ধি কি বাংলাদেশের উন্নয়নের পরবর্তী ধাপকে এগিয়ে নিতে পারবে?’ শীর্ষক এক নীতিসংলাপে এমন অভিমত উঠে আসে। সংলাপটির আয়োজন করে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং (সানেম)। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সেলিম রায়হান।
প্যানেল আলোচক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) সদস্য মনজুর হোসেন, সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন এবং শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফবিসিসিআই) প্রশাসক মো. ফজলুল হক।
সংলাপে ‘বাংলাদেশে পরিবেশবান্ধব প্রবৃদ্ধি অর্জন: উন্নয়ন বিকল্প, নীতিসামঞ্জস্য এবং উত্তরণের চ্যালেঞ্জসমূহ’ শীর্ষক মূল প্রবন্ধে ২০২৬ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত দেশের অর্থনীতির সম্ভাব্য গতিপথ বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে প্রচলিত উন্নয়নধারা, মাঝারি মাত্রার জ্বালানি রূপান্তর এবং অতিমাত্রায় জ্বালানি রূপান্তর ও পরিবেশবান্ধব বিনিয়োগ—তিনটি পরিস্থিতি বিবেচনায় নেওয়া হয়। মডেলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, অতিমাত্রায় জ্বালানি রূপান্তরের পরিস্থিতিতে প্রচলিত উন্নয়নধারার তুলনায় বিনিয়োগ ও রপ্তানি বেশি বাড়তে পারে।
প্রবন্ধের প্রাক্কলন অনুযায়ী, আগামী ২০৩৫ সাল নাগাদ ব্যাপক জ্বালানি রূপান্তর করা গেলে বিনিয়োগ সাড়ে ৪ শতাংশ বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি মানুষের প্রকৃত মজুরি ১ দশমিক ৫ শতাংশ, ব্যক্তিগত ভোগ ১ দশমিক ৩ শতাংশ ও মোট কর্মসংস্থান ১ দশমিক ১ শতাংশ বাড়বে। বিশেষ করে বিদ্যুৎ, বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, পরিবহন ও নির্মাণ খাতে উৎপাদন ও কর্মসংস্থান উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য, প্রাকৃতিক গ্যাস ও কয়লাসংশ্লিষ্ট খাতের প্রবৃদ্ধি কমতে পারে।
প্রবন্ধে বলা হয়েছে, পরিবেশদূষণের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত ও জনকল্যাণমূলক ক্ষতির মুখে পড়তে হচ্ছে। বায়ুদূষণ, অনিরাপদ পানি, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন ও সিসাদূষণের কারণে ২০১৯ সালে ক্ষতির পরিমাণ ছিল জিডিপির ১৭ দশমিক ৬ শতাংশের সমপরিমাণ। অর্থাৎ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির হিসাবের বাইরে পরিবেশদূষণের কারণে মানুষের স্বাস্থ্য, শ্রমের উৎপাদনশীলতা ও সামগ্রিক কল্যাণে প্রভাব পড়ে।
মূল প্রবন্ধে আরও বলা হয়, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে ২০৫০ সাল নাগাদ আনুমানিক ২৩০ বিলিয়ন বা ২৩ হাজার কোটি মার্কিন ডলার প্রয়োজন হবে। এই অর্থের সংস্থান নিশ্চিত করতে সরকারি অর্থায়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, বাণিজ্যিক ব্যাংক, গ্রিন বন্ড এবং বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ফাহমিদা খাতুন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় অর্থায়নের বৈশ্বিক প্রতিশ্রুতির প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ শতাংশ প্রশমনসংক্রান্ত বিভিন্ন খাতে রাখা হয়, আর আমাদের মতো দেশগুলোর জন্য মাত্র ৩৫ শতাংশ অভিযোজন কর্মসূচিতে বরাদ্দ রাখা হয়। কিন্তু এসব অর্থও যথাযথভাবে পাওয়া যায় না।’
ফাহমিদা খাতুনের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি রূপান্তরের ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জ তৈরি হবে। তৈরি পোশাকসহ রপ্তানি খাতগুলোকেও নানা শর্তের মুখে পড়তে হবে।
জিইডির সদস্য (সচিব) মনজুর হোসেন বলেন, যুদ্ধের প্রভাবে জীবাশ্ম জ্বালানি খাতে বিপুল ভর্তুকি দিতে হচ্ছে। তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সরকার এটাকে খুব প্রাধান্য দিচ্ছে। আর অর্থায়নের জন্য সবুজ বা নীল বন্ড এবং সুকুকের চিন্তা করা হচ্ছে। আর সৌরবিদ্যুতের জন্য স্থানের অভাব হবে না। নদীর পাড়ে, গ্রামে টিনের চালে স্থাপন করা যাবে। এটি সব সময়ই ব্যয়বহুল। তাই বলে পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই। এটা ভবিষ্যৎ অস্তিস্তের লড়াই।
এফবিসিসিআইয়ের প্রশাসক মো. ফজলুল হক বলেন, ‘সৌরবিদ্যুতের সম্ভাবনা আরেকটু গভীরে গিয়ে দেখা দরকার। আমাদের জনবহুল দেশে জায়গার সমস্যা আছে। আর সরকারি নীতির মধ্যেও সমন্বয়ের অভাব রয়েছে। হাইড্রোপাওয়ারের সম্ভাবনাও পর্যালোচনা করে দেখা দরকার।’
সমাপনী বক্তব্যে সানেমের নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর অতিনির্ভরতা একধরনের সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে জ্বালানি রূপান্তরে বিপুল বিনিয়োগ প্রয়োজন হবে। সেখানে আন্তর্জাতিক তহবিলের পাশাপাশি দেশীয় এবং বেসরকারি খাতকে এগিয়ে আসতে হবে।
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: nomanibsl@gmail.com মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com