ডেটিং অ্যাপ টিন্ডারে পরিচয়। এরপর একের পর এক ডেটে যাওয়া। কিন্তু দ্বিতীয় ডেটের পর আর বাড়ি ফেরা হয়নি ২৪ বছর বয়সী সিডনি লুফের। ২০১৭ সালের এই হত্যাকাণ্ডের পেছনে পরে সামনে আসে কথিত জাদুবিদ্যা, ভ্যাম্পায়ার পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি, যৌন নির্যাতন ও হত্যার পরিকল্পনার ভয়ংকর এক কাহিনি। সেই ঘটনার অজানা দিক নিয়ে তৈরি হয়েছে তিন পর্বের তথ্যচিত্র সিরিজ ‘সোয়াইপ রাইট অন দ্য ডেভিল’।
ওটিটি প্ল্যাটফর্ম হুলুর এই ট্রু ক্রাইম সিরিজে উঠে এসেছে, কীভাবে অনলাইন ডেটিংয়ের সূত্র ধরে সিডনিকে একটি কথিত কাল্ট বা গোপন গোষ্ঠীর ফাঁদে টেনে নেওয়া হয়েছিল। শুধু হত্যাকাণ্ড নয়, এর মাধ্যমে সামনে এসেছে বছরের পর বছর ধরে দুই ব্যক্তির চালানো প্রতারণা ও নিয়ন্ত্রণের কৌশলও। সিরিজটিতে কথা বলেছেন ওই গোষ্ঠী থেকে পালিয়ে আসা তিন নারী, তদন্তে যুক্ত আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য এবং সিডনির পরিবারের লোকজন।
টিন্ডারে পরিচয়, তারপর নিখোঁজ
যুক্তরাষ্ট্রের নেব্রাস্কার বাসিন্দা সিডনি লুফে লিংকনের একটি হার্ডওয়্যারের দোকানে কাজ করতেন। ২০১৭ সালে টিন্ডারে ‘অড্রে’ নামের এক নারীর সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। দুবার দেখা করার পর ১৫ নভেম্বর দ্বিতীয় ডেটে যান সিডনি। কিন্তু সেদিন আর বাড়ি ফেরেননি তিনি।
পরদিন কাজে না যাওয়ায় সহকর্মীদের সন্দেহ হয়। তাঁরা পুলিশকে খবর দেন। সিডনির বাড়িতে গিয়ে পুলিশ তাঁর গাড়ি ও পার্স খুঁজে পেলেও তাঁকে পায়নি। এরপর নিখোঁজের খবর ছড়িয়ে পড়ে।
.
সিডনির এক বন্ধু নিজেই অড্রেকে খুঁজতে টিন্ডারে ভুয়া অ্যাকাউন্ট খোলেন। সেই অ্যাকাউন্টের সূত্র ধরে তদন্তকারীরা জানতে পারেন, অড্রে আসলে বেইলি বসওয়েল নামের ২৩ বছর বয়সী এক নারী। কিন্তু সিডনির খোঁজ তখনো চলছিল।
৪ ডিসেম্বর গ্রামীণ ক্লে কাউন্টির একটি মহাসড়কের পাশ থেকে ময়লার ব্যাগে সিডনির দেহাবশেষ উদ্ধার করা হয়। তাঁর দেহ ১৪ টুকরা করা হয়েছিল। একটি বাহুর ওপরের অংশ ও অভ্যন্তরীণ কিছু অঙ্গও পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি তদন্ত করতে গিয়ে পুলিশ জানতে পারে, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আরও কয়েকজন নারীর ভয়ংকর অভিজ্ঞতা।
নিজেকে ভ্যাম্পায়ার বলতেন অউব্রে ট্রেইল
তদন্তে উঠে আসে বেইলি বসওয়েলের সঙ্গী অউব্রে ট্রেইলের নাম। ৫১ বছর বয়সী ট্রেইল নিজেকে ভ্যাম্পায়ার বলে পরিচয় দিতেন। দুজনের বিরুদ্ধেই বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে চুরি ও আর্থিক প্রতারণার ইতিহাস ছিল।
তদন্তকারীরা জানতে পারেন, টিন্ডারের মাধ্যমে পরিচিত হওয়া নারীদের তাঁরা নিজেদের গোষ্ঠীতে টানতেন। কথিত সেই গোষ্ঠীকে তাঁরা ‘কোভেন’ বলতেন—যা সাধারণত জাদুবিদ্যার চর্চাকারীদের সমষ্টি বোঝাতে ব্যবহৃত হয়।
বিশের কোঠায় থাকা তিন নারী আদালতে সাক্ষ্য দেন। পরে তথ্যচিত্রেও নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা বলেন তাঁরা। তাঁদের ভাষ্য অনুযায়ী, বসওয়েলের সঙ্গে পরিচয়ের পর ট্রেইলের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ হয়। দামি পোশাক, স্পা চিকিৎসা, মাদক ও সপ্তাহে ১৫০ থেকে ২০০ ডলার দেওয়ার মতো নানা প্রলোভন দেখানো হতো। বিনিময়ে তাঁদের ট্রেইল ও বসওয়েলের সঙ্গে যৌন সম্পর্কে অংশ নিতে এবং চুরি করা জিনিস বিক্রিতে সহায়তা করতে হতো।
ট্রেইল নিজেকে অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী বলে দাবি করতেন। তিনি নাকি উড়তে ও মানুষের মনের কথা পড়তে পারেন—এমন কথাও বলতেন। ওই নারীদের ‘ডাইনি’ হিসেবে পরিচয় দিয়ে গোষ্ঠীর নিয়ম মানতে বাধ্য করা হতো।
সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয় ছিল হত্যার পরিকল্পনা। নারীদের দাবি, ট্রেইল বলেছিলেন, তাঁর আরও ক্ষমতা অর্জনের জন্য কাউকে নির্যাতন করে হত্যা করতে হবে। হত্যার দৃশ্য ধারণ করে তা থেকে অর্থ আয়ের পরিকল্পনার কথাও বলা হয়েছিল। তবে সিডনির হত্যাকাণ্ডের আগেই ওই তিন নারী গোষ্ঠীটি ছেড়ে চলে যান।
.
জাদুবিদ্যার আড়ালে নিয়ন্ত্রণ ও প্রতারণা
তদন্তকারীরা ট্রেইল ও বসওয়েলের বাসায় তল্লাশি চালিয়ে বেশ কিছু সন্দেহজনক বস্তু পান। এর মধ্যে ছিল ডাক্ট টেপ, জিপ টাই, কুঠার, রক্তমাখা প্লাস্টিকের চাদর, বিশেষ ধরনের পোশাক ও একটি বই।
তথ্যচিত্রে বেঁচে ফেরা এক নারী জানান, ট্রেইল বলেছিলেন, তাঁদের গোষ্ঠীতে ১২ জন নারী আছেন, আর কথিত আচার সম্পন্ন করতে দরকার ত্রয়োদশ একজন। অন্য এক নারী জানান, গোষ্ঠীতে থাকতে হলে ট্রেইলের সামনে নগ্ন থাকতে হতো এবং অন্য নারীদের যৌন সম্পর্কও দেখতে দিতে হতো।
তথ্যচিত্রটির পরিচালক ও নির্বাহী প্রযোজক ব্রায়ান বিগেলের মতে, ঘটনাটি শুধু সিডনির হত্যাকাণ্ডের গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এমন কিছু তরুণীর অভিজ্ঞতা, যাঁরা ভালোবাসা ও সম্পর্কের খোঁজে গিয়ে প্রতারণার শিকার হয়েছিলেন।
বিগেল বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের রক্ষণশীল মধ্য–পশ্চিমাঞ্চলীয় সমাজে সমকামী সম্পর্কের ক্ষেত্রে একাকিত্ব ও সামাজিক বাধার মুখোমুখি হওয়া নারীদের দুর্বলতার সুযোগ নিয়েছিলেন বসওয়েল। টিন্ডারের মাধ্যমে তাঁদের সঙ্গে পরিচিত হয়ে ধীরে ধীরে নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসেন তিনি ও ট্রেইল।
আদালতে আত্মহত্যার চেষ্টা, বদলেছে বক্তব্য
সিডনির হত্যাকাণ্ডের কথা স্বীকার করলেও ট্রেইল দাবি করেছিলেন, ঘটনাটি ইচ্ছাকৃত ছিল না। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সম্মতিতে হওয়া এক যৌন আচারের সময় এক্সটেনশন কর্ড দিয়ে সিডনির গলায় চাপ পড়েছিল। এরপর ধরা পড়ার ভয়েই তিনি দেহ টুকরা করেন। বসওয়েল এই হত্যাকাণ্ডে জড়িত নন বলেও দাবি করেন তিনি।
.
তবে তদন্তে পাওয়া বার্তায় দেখা যায়, ট্রেইল বসওয়েলকে নিজের ওপর দায় চাপাতে এবং নিজেকে ভুক্তভোগী হিসেবে উপস্থাপন করতে বলেছিলেন বলে অভিযোগ ওঠে।
বিচার চলাকালে আদালতে বসওয়েলকে নির্দোষ ঘোষণা করে চিৎকার করার পর ট্রেইল ধারালো অস্ত্র দিয়ে নিজের গলা কাটার চেষ্টা করেন। তাঁকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। বিচারপ্রক্রিয়ার সময় তিনি হৃদ্রোগে আক্রান্ত হন ও স্ট্রোকেও ভোগেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে নিজের বক্তব্য বদলে তিনি বলেন, তাঁর জীবনযাপন প্রকাশ করে দেওয়ার আশঙ্কায় সিডনিকে হত্যা করেছিলেন।
হত্যা, ষড়যন্ত্র ও মানবদেহের অবশিষ্টাংশ বেআইনিভাবে সরিয়ে ফেলার অভিযোগে ট্রেইল দোষী সাব্যস্ত হন। ২০২১ সালের ৯ জুন তাঁকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। তাঁর আপিল ২০২৫ সালে খারিজ হয় বলে প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
অন্যদিকে ২০২০ সালের সেপ্টেম্বরে বসওয়েলের বিচার শুরু হয়। সিডনির দেহাবশেষ রাখা ব্যাগে পাওয়া একটি ল্যাটেক্স গ্লাভসে তাঁর ডিএনএ পাওয়া গিয়েছিল বলে আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন করা হয়। ওই বছরের অক্টোবরে বসওয়েলও সব অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত হন। ২০২১ সালের নভেম্বরে তাঁকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
কেন তৈরি হলো তিন পর্বের তথ্যচিত্র
বিগেল তিন বছর ধরে সিডনির হত্যাকাণ্ডের ঘটনা নিয়ে গবেষণা করেন। দণ্ডিত ট্রেইলের সঙ্গে এক বছর ধরে যোগাযোগ ও আস্থা তৈরির চেষ্টা করেন তিনি। পাশাপাশি কথা বলেন বেঁচে ফেরা নারীদের সঙ্গে, যাঁরা আগে আদালতে সাক্ষ্য দিলেও নিজেদের অভিজ্ঞতা এভাবে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেননি।
তথ্যচিত্রটির নির্বাহী প্রযোজক ক্রিস্টোফার সেন্ট জন জানান, এত বেশি উপাদান ছিল যে একটি পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রে ঘটনাটির সব দিক তুলে ধরা সম্ভব হতো না। তাই তিন পর্বে গল্পটি সাজানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
.জন্মদিনে ছেলেকে গুলি করে হত্যা করেন মা! সত্য ঘটনা পর্দায়.
পরিচালকের ভাষায়, এটি কে খুনি—সেই রহস্যের গল্প নয়; বরং কেন এমন ঘটনা ঘটল, তার অনুসন্ধান। অনলাইন ডেটিং, মানুষের একাকিত্ব, প্রতারণা এবং অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার নামে অন্যকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা—সব মিলিয়ে ঘটনাটি আরও বড় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করায়।
সিডনির স্মৃতি বাঁচিয়ে রেখেছে পরিবার
সিডনির মৃত্যুর পর ২০১৯ সালে তাঁর পরিবার গঠন করে সিডনি লুফে ফাউন্ডেশন। সংস্থাটি বৃত্তির জন্য ৩০ হাজার ডলারের বেশি এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগে সহায়তার জন্য আরও ২৬ হাজার ডলার সংগ্রহ করেছে।
পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, সিডনি নিজে নানা শারীরিক, আর্থিক ও মানসিক সমস্যার মধ্য দিয়ে গেলেও অন্যদের পাশে দাঁড়াতেন। পরিবার, পোষা প্রাণী বিশেষ করে বিড়াল—মাছ ধরা ও সুন্দর ক্রিস্টালের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। তাঁর হাতে উল্কি করে লেখা ছিল, ‘একদিন সবকিছু সুন্দর হবে।’
‘সোয়াইপ রাইট অন দ্য ডেভিল’ সেই তরুণীর জীবনের শেষ অধ্যায়কে সামনে আনার পাশাপাশি মনে করিয়ে দেয়, ডিজিটাল–দুনিয়ায় অপরিচিত মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরির ক্ষেত্রে বিশ্বাসের সুযোগ নিয়ে কীভাবে ভয়াবহ অপরাধ সংঘটিত হতে পারে।
টাইম অবলম্বনে
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: [email protected] মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com