তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি আমরা পড়ব বাংলা ভাষ্য থেকে। মূল ইংরেজি থেকে ডায়েরির অনুবাদ করেছেন প্রধানত কবি বেলাল চৌধুরী। তাঁর সঙ্গে কখনো কখনো যোগ দিয়েছেন লেখকের কন্যা সিমিন হোসেন রিমি। এ অনুবাদ প্রশংসনীয়। মূলের সঙ্গে মিলিয়ে অনুবাদের ন্যায্যতা পরীক্ষা করার সুযোগ আমাদের হয়নি। তবে বাংলা ভাষ্য পড়ে অনুবাদের প্রাঞ্জলতার সঙ্গে সঙ্গে মূলের প্রতি নিষ্ঠারও জোরালো আন্দাজ পাওয়া যায়। এ অনুবাদের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো, বাংলায় লেখা হলে ঠিক যে রকম ভঙ্গিতে লেখা হতো বলে অনুমান করা যায়, অনুবাদে সে রকম একটা গতিপ্রকৃতি অত্যন্ত সাফল্যের সঙ্গে রক্ষিত হয়েছে। যত দূর জানতে পেরেছি, ডায়েরিগুলোর পাঠক-বিশ্লেষকেরা এখন পর্যন্ত অনুবাদের যথার্থতা বিষয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেননি। আমরা আমাদের আলোচনায় এ বাংলা ভাষ্যের ওপরই নির্ভর করব।
ডায়েরিগুলোর পরিমিতিবোধ, নিয়মানুবর্তিতা ও বস্তুনিষ্ঠতা যেকোনো পাঠকের নজরে পড়বে। আবেগের প্রকাশ, মূল্যায়ন বা বাড়তি মন্তব্য নেই বললেই চলে। এমনকি বন্ধুবান্ধব বা পরিবারের সদস্যদের প্রসঙ্গেও লেখক বাড়তি শব্দ ব্যয় করেননি। ৭ অক্টোবর ১৯৫৪ তারিখের বিবরণীতে লেখা হয়েছে, ‘বাড়িতে মা ডোবা পিঠা বানাচ্ছিলেন। আমি রাত প্রায় একটা পর্যন্ত সেখানে বসে থাকলাম।’ এ পর্যায়ের তথ্যও অত্যন্ত বিরল। ডায়েরির এ বৈশিষ্ট্যকে আমরা জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে পাঠ করতে চাই। অন্তত দুই দিক থেকে এটা আমাদের কাজে লাগবে। একদিকে কেউ একজন কোন বিষয়কে উল্লেখ্য মনে করছেন, আর কোনটিকে করছেন না, তা থেকে তাঁর ব্যক্তিত্বের একটা আন্দাজ পাওয়া যায়। অন্যদিকে মন্তব্য-মূল্যায়নহীন বিবরণী লেখকমনের অচেতনকে যতটা নিগূঢ়ভাবে চিহ্নিত করতে পারে, সচেতন মন্তব্য-বিশ্লেষণ থেকে তা কখনোই পাওয়া যাবে না। এদিক থেকে বর্তমান ডায়েরির ক্ষেত্রে একটা বাড়তি সুবিধা এই যে এগুলো লেখা হয়েছিল এমন এক বয়সে, যখন এগুলো প্রকাশিত হবে বা গণপরিসরে কখনো ব্যবহৃত হবে—লেখকের দিক থেকে এমন ভাবনার সম্ভাবনা খুবই কম। বর্তমান আলোচনায় আমরা যেভাবে ডায়েরিটি পড়তে চাই, তার জন্য এ বৈশিষ্ট্যও খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
.
শিরোনামের ‘ঐতিহাসিকতা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ইতিহাসবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিশেষভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসের কতগুলো জটিল প্রশ্নে একধরনের বিতর্কমূলক পরিসর হিসেবে। সেদিক থেকে ধারণাটা ইতিহাসের তুলনায় বিমূর্ত এবং ইতিহাস-নিয়ন্ত্রণকারী। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি উপকরণ হিসেবে এ বিষয়ে আমাদের সাহায্য করে—এ অনুমান এখানে মূল ভূমিকা পালন করেছে। ‘রাজনৈতিকতা’ কথাটা ‘রাজনীতি’ বা ‘রাজনীতি করা’র তুলনায় আলাদা প্রত্যয় হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে, যেখানে দেশের সামগ্রিক রাজনৈতিক পরিসরের বৈশিষ্ট্য এবং সম্ভাব্য রাজনীতির ভিত্তি খোঁজাই মূল কথা। এ অর্থে তাজউদ্দীন আহমদ নিজে যে রাজনীতি করেছেন, তা গুরুত্বপূর্ণ বটে, তবে তাঁর তত্পরতা বা আকাঙ্ক্ষার মধ্যে রাজনীতির যে বার্তা ঘোষিত হয়েছে, তা অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ।
জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে ডায়েরি থেকে আমরা ‘ঐতিহাসিকতা’ ও ‘রাজনৈতিকতা’ কীভাবে তালাশ করব, তার নমুনা হিসেবে ডায়েরিতে প্রাপ্ত আবহাওয়া-সংবাদ পাঠ করা যাক।
.
২.
ডায়েরিজুড়ে ব্যতিক্রমহীনভাবে আবহাওয়ার সংবাদ লিপিবদ্ধকরণ এ বিবরণীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। তাজউদ্দীন আহমদ প্রধানত প্রাকৃতিক উপকরণের প্রাত্যহিক ক্রিয়াকলাপের প্রত্যক্ষ বিবরণ দিয়েছেন। যেমন বৃষ্টি, রোদ, ঠান্ডা, চাঁদ বা সূর্যের অবস্থা এবং ফলে প্রতিদিনকার জীবনে কী প্রভাব পড়ছে ইত্যাদি। এর ফলে কখনো কখনো মনে হতে পারে, প্রকৃতিকে তিনি ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুতে সীমিত করে ফেলেছেন। তা কিন্তু নয়। মাঝেমধ্যেই তিনি অনুভব-অনুভূতির দিকে গেছেন। প্রকৃতির বিশেষ অবস্থায় বস্তু-অতিরিক্ত সৌন্দর্য বা সুখানুভূতি যেভাবে ক্রিয়া করে, তার উল্লেখও ডায়েরিতে আছে। বৃষ্টির প্রতি বা শীতের প্রতি তাতে কোনো বিশেষ আকর্ষণ প্রকাশিত না হলেও রাতের সৌন্দর্য বিশেষত চাঁদ বা পূর্ণিমার প্রতি মনোযোগের যথেষ্ট পরিচয় পাওয়া যায়। বেশ অনেকবার তিনি অনুযোগ করেছেন, মেঘের প্রতাপের কারণে চাঁদের দেখা মেলেনি। এর বাইরেও প্রকৃতির নানা উপাদান বা ক্রিয়ার ব্যাপারে তিনি মাঝেমধ্যেই এমন সব মন্তব্য করেছেন, যেগুলো প্রকৃতির বস্তু-স্বভাবের বাইরে গিয়ে প্রকৃতির প্রতি তাঁর নিজের অনুভূতি বা দৃষ্টিভঙ্গি প্রকাশ করে। তবে এ ধরনের উপাদান তুলনামূলক অনেক কম। নিরেট বর্ণনাই প্রধানত তিনি দিয়ে গেছেন।
কয়েক বছরের আবহাওয়ার বাস্তব পরিচয়ের একটা ঐতিহাসিক মূল্য আছে। ১৯৫০-এর দশকে ঢাকার আবহাওয়া অফিস প্রকৃতির তথ্য-উপাত্ত কতটা রক্ষা করত বলা মুশকিল। তাজউদ্দীন আহমদের বিবরণী যথেষ্ট বিজ্ঞানসম্মত কেতা রক্ষা করেছে, তা ভাবার কোনো কারণ নেই। কিন্তু অন্তত বৃহত্তর ঢাকা জেলার আবহাওয়ার সাধারণ বিবরণী এ ডায়েরিমালায় যেভাবে সংরক্ষিত হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট গবেষকদের জন্য অতি দুর্লভ ও মূল্যবান প্রাথমিক উত্স হিসেবে গণ্য হতে পারে। যদি তিনি আবহাওয়া বা প্রকৃতির সঙ্গে নিজের সম্পর্ক কিংবা এ সম্পর্কে নিজের অনুভূতির বিবরণকে প্রাধান্য দিতেন, তাহলে এ কথা এতটা জোরের সঙ্গে বলা যেত না।
.
শিরোনামের ‘ঐতিহাসিকতা’ শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে ইতিহাসবিষয়ক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিশেষভাবে বাংলাদেশের ইতিহাসের কতগুলো জটিল প্রশ্নে একধরনের বিতর্কমূলক পরিসর হিসেবে। সেদিক থেকে ধারণাটা ইতিহাসের তুলনায় বিমূর্ত এবং ইতিহাস-নিয়ন্ত্রণকারী। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি উপকরণ হিসেবে এ বিষয়ে আমাদের সাহায্য করে—এ অনুমান এখানে মূল ভূমিকা পালন করেছে।
.
তবে এ ডায়েরিগুলোর অন্তর্নিহিত বিশিষ্টতা পর্যবেক্ষণ করে আমাদের কাঙ্ক্ষিত পাঠ-ফলে পৌঁছাতে হলে আবহাওয়া-বিবরণীগুলো অন্য দুই দিক থেকে বিশেষভাবে পাঠ করতে হবে।
প্রথমত, প্রাকৃতিক অবস্থার সঙ্গে মানুষের প্রাত্যহিক আরাম ও ব্যারামের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক আছে। এ ডায়েরিগুলো যখন লেখা হচ্ছিল, তখন এমনকি নাগরিক পরিসরেও প্রকৃতির স্বাভাবিক অবস্থাকে রদ করার বা রূপান্তর করার সক্ষমতা এ অঞ্চলের মানুষের অনেক কম ছিল। বিদ্যুতের সরবরাহ কম থাকায় বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবহারও নিশ্চিতভাবে ছিল অনেক কম। এমতাবস্থায় গরম বা শীত মানুষকে অনেক বেশি প্রভাবিত করতে পারত। ধরা যাক, আকাশে মেঘ, আর বাতাসের প্রবাহও অনুপস্থিত। এ রকম কোনো রাতে আবহাওয়া সরাসরি ঘুমের মাত্রা নিয়ন্ত্রণ করত। যানবাহন বা বৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার অন্য উপায়গুলো তুলনামূলক অনেক কম থাকায় বৃষ্টি মানুষের প্রাত্যহিক গতিবিধিকে অনেক বেশি নিয়ন্ত্রণ করতে পারত। তা ছাড়া নানা ধরনের রোগবালাইয়ের ব্যাপার তো ছিলই।
.
তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরিতে ঠিক এ দৃষ্টিকোণ থেকেই প্রকৃতির বিবরণটা আছে। সরাসরি বলা না থাকলেও বর্ণনার দৃষ্টিকোণ ও ভঙ্গি থেকে পরিষ্কার বুঝে নেওয়া যায়, প্রকৃতির বিরূপতার কারণে আজ কথক ঘুমের সমস্যায় ভুগেছেন, কিংবা বৃষ্টি তাঁর সেদিনকার গতিবিধি মারাত্মকভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। অন্যদিকে মনোরম প্রকৃতির বর্ণনা যেখানে আছে, সেখানেও বস্তুনিরপেক্ষ সৌন্দর্যের তুলনায় যাপিত জীবনের স্বাভাবিক সহজতার কথাটা বলার দিকেই তাঁর ঝোঁক ছিল প্রবল। এর একটা বড় প্রমাণ ১৯৫৪ সালের জুলাই-আগস্টের বন্যার বিবরণ। তিনি বন্যার বস্তুনিষ্ঠ বর্ণনা দিয়েছেন। সংবাদমাধ্যমের বরাতে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করেছেন। কিন্তু তথ্য-উপাত্তের সহায়তায় বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ তৈরি করা তাঁর লক্ষ্য ছিল না। তিনি প্রধানত বন্যার ফলে মানুষের যে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘমেয়াদি সংকট তৈরি হচ্ছে, সেদিকে নজর রাখছিলেন। এটা সত্য, নিজের ক্ষেত্রে হোক, কিংবা দেশের বা দেশের মানুষের—কোনো ক্ষেত্রেই তিনি বিমর্ষকাতরতা প্রকাশ করেননি। কিন্তু মানুষের—এবং নিজেরও—প্রাত্যহিক দুর্দশার দিকে তাঁর কড়া নজর ছিল।
দ্বিতীয়ত, প্রকৃতির গতিপ্রকৃতির সঙ্গে ব্যষ্টিক ও সামষ্টিক অর্থনীতির গভীর যোগ আছে। যদি মনে রাখা যায়, আমরা আলাপ করছি ১৯৫০-এর দশকের বাস্তবতায়, তাহলে প্রকৃতি হয়ে উঠবে প্রধান নিয়ামক। কৃষিপণ্য এবং পণ্যের মূল্য—এ দুটিই তখন বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের আর্থিক অবস্থার প্রধান বিবেচ্য। রাষ্ট্র কিংবা রাষ্ট্রীয় উত্পাদন বা নগরকেন্দ্রিক শিল্পোত্পাদনের ক্ষেত্রে এ কথা হয়তো আংশিক সত্য। কিন্তু বিবেচনাটা যদি হয় গণমানুষ, তাহলে বাংলাদেশের সেকালের পটভূমিতে এটাই হবে প্রধান সত্য। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরির প্রতিটি পাতা সাক্ষ্য দিচ্ছে, তিনি তাঁর আবহাওয়া-বিবরণী প্রস্তুত করেছেন এ গভীর সত্যে নিষ্ঠ থেকে।
তিনি অনবরত বৃষ্টি, অতিবৃষ্টি এবং অনাবৃষ্টির সংবাদ দিয়েছেন আবশ্যিকভাবে এ কথা বলার জন্য যে বৃষ্টির বিদ্যমান অবস্থা চাষের কতটা ভালো বা খারাপ করবে। খরার কথা যখন বলেছেন তখন মানুষের শারীরিক ভোগান্তির প্রসঙ্গ উল্লেখ করেছেন, কিন্তু প্রধান লক্ষ্য ছিল ফসলের ক্ষতির জন্য উদ্বেগ। মাঝেমধ্যেই সারা দেশের খবর দিয়েছেন—অন্যদের অভিজ্ঞতা এবং পত্রিকার বরাতে; তবে বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন তাঁর নিজের এলাকার কথা। উদ্বেগটা পরিমাণগতভাবে কাপাসিয়ার জন্য হয়তো বেশিই ছিল, কিন্তু গুণগত দিক থেকে ‘পূর্ববঙ্গ’ই ছিল তাঁর এলাকা।
.
তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরিতে ঠিক এ দৃষ্টিকোণ থেকেই প্রকৃতির বিবরণটা আছে। সরাসরি বলা না থাকলেও বর্ণনার দৃষ্টিকোণ ও ভঙ্গি থেকে পরিষ্কার বুঝে নেওয়া যায়, প্রকৃতির বিরূপতার কারণে আজ কথক ঘুমের সমস্যায় ভুগেছেন, কিংবা বৃষ্টি তাঁর সেদিনকার গতিবিধি মারাত্মকভাবে নিয়ন্ত্রণ করেছে। অন্যদিকে মনোরম প্রকৃতির বর্ণনা যেখানে আছে, সেখানেও বস্তুনিরপেক্ষ সৌন্দর্যের তুলনায় যাপিত জীবনের স্বাভাবিক সহজতার কথাটা বলার দিকেই তাঁর ঝোঁক ছিল প্রবল। এর একটা বড় প্রমাণ ১৯৫৪ সালের জুলাই-আগস্টের বন্যার বিবরণ।
.
তাজউদ্দীন আহমদ অর্থনীতির ছাত্র ছিলেন—এ তথ্য সম্ভবত আর্থিক বিষয়াদিতে তাঁর তুলনামূলক অধিক মনোযোগের একটা ব্যাখ্যা দেবে। কিন্তু তথ্য উপস্থাপনের ভঙ্গি থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, এ ধরনের পুনরাবৃত্ত উল্লেখ যতটা আর্থিক বা অর্থনৈতিক, তার চেয়ে অনেক বেশি রাজনৈতিক। এখানেই আমরা ‘রাজনৈতিক’ কিংবা ‘রাজনৈতিকতা’র ধারণা থেকে ‘রাজনীতি করা’ বা বিশেষভাবে ‘পার্টি-রাজনীতি’র ধারণাকে আলাদা করছি। ‘রাজনৈতিকতা’ বলতে বুঝব এমন সব ব্যাপার ও বিবেচনা, যেগুলো একদিকে ক্ষমতা-সম্পর্ক বিষয়ে নিগূঢ়ভাবে সচেতন, অন্যদিকে সাধারণভাবে মানুষের কিন্তু বিশেষভাবে রাষ্ট্রভুক্ত মানুষের জীবনমানের উন্নতির জন্য পদ্ধতিগত প্রস্তাব। সেদিক থেকে বলা যায়, ‘রাজনৈতিকতা’ পরবর্তীকালের রাজনীতির ভিত্তি হয়ে উঠতে পারে।
তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরিতে শ্রেণি-সচেতনতার বিশেষ কোনো পরিচয় নেই। লক্ষণ দেখে মনে হয়, তিনি আসলে শ্রেণি-শোষণ বা অসম ক্ষমতা-সম্পর্ককে মানুষের সার্বিক অবস্থা বিবেচনার জন্য খুব একটা জরুরি মনে করতেন না। তবে সাধারণভাবে কৃষকের জীবন সম্পর্কে তাঁর যথেষ্ট উদ্বেগ ছিল। ফলে ব্যতিক্রমহীনভাবে তিনি প্রধান ফসল ও অর্থকরী ফসলের দামের খোঁজখবর রেখেছেন। একদিকে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির ফলে জনজীবনে যে বিপর্যয় অবশ্যম্ভাবী, সে সম্পর্কে তিনি সচেতন ছিলেন। অন্যদিকে কৃষকের উত্পাদিত পণ্যের মূল্যহ্রাস তাঁকে প্রতিনিয়ত উদ্বিগ্ন করেছে। বাংলাদেশের তখনকার জনমিতি অনুযায়ী, এ সচেতনতা ও উদ্বেগ আসলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কল্যাণের পক্ষে তাঁর নিশ্চিত অবস্থানের পরিচয় দেয়।
.
৩.
আবহাওয়ার বিবরণী তাজউদ্দীন আহমদ যেভাবে দিয়েছেন, আর যেভাবে প্রকৃতির খেয়ালখুশিকে উত্পাদন ও বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত করে ব্যাখ্যা করেছেন, তার জ্ঞানতাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত তাত্পর্য অতি গভীর। এখান থেকে আমরা একজন বাস্তববাদী, অভিজ্ঞতাবাদী ও উপযোগবাদী মানুষ আবিষ্কার করি। বাংলাদেশের নাগরিক মধ্যবিত্ত পরিসরে এ ধরনের মানুষের প্রধান গুরুত্ব এই যে সাধারণভাবে আরোপণমূলকতা এবং আদর্শবাদিতা প্রাত্যহিক বাস্তবতাকে আমলে না এনে যেভাবে বাস্তবের ওপর চড়াও হয়, এ দৃষ্টিভঙ্গির দৌলতে তা থেকে অনেক দূর পর্যন্ত মুক্ত থাকা সম্ভব। কলোনিয়াল অভিজ্ঞতার কারণে আমাদের শিক্ষিত-সমাজে আরোপণমূলকতার হার অনেক বেশি। প্রায়ই ভিনদেশ থেকে ভেসে আসা দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের চালিত করে। প্রায়ই নানা ধরনের আদর্শবাদিতা সম্ভাব্য আদর্শ-ভবিষ্যকে এমনভাবে মুড়িয়ে রাখে যে বর্তমানের সাতিশয় বাস্তব চোখেই পড়ে না অথবা যথাযথ গুরুত্ব পায় না। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরিতে মতাদর্শিক আরোপণ এবং আদর্শবাদিতা গরহাজির দেখে একে তাঁর জীবনের খুব গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য না ভেবে পারা যায় না।
‘আদর্শবাদিতা গরহাজির’ কথাটা সাবধানতার সঙ্গে বিবেচ্য। এটা মোটেই আদর্শহীনতা নয়। বরং লক্ষণ দেখে মনে হয়, তিনি যাঁকে আদর্শ মনে করতেন, তা নিম্নকণ্ঠে কিন্তু দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করতে কখনো পিছপা হননি। জীবনীকার ও বিশ্লেষকেরা ব্যতিক্রমহীনভাবে আদর্শের ব্যাপারে তাঁর দৃঢ়চিত্ততার কথা বলেছেন। ডায়েরিগুলোও পরিষ্কারভাবে সে সাক্ষ্য দেয়। তাহলে ‘আদর্শবাদিতা গরহাজির’ বলতে আমরা কী বুঝিয়েছি? আদর্শবাদিতা বলতে বুঝিয়েছি একধরনের মর্মবাদী (এসেন্সিয়ালাইজড) অবস্থান, যেখানে নির্দিষ্ট এক বা একাধিক দৃষ্টিভঙ্গি বা মূল্যবোধ বা সিদ্ধান্তের বরাতে বাস্তবের চাহিদা বা অবস্থাকে অস্বীকার করা হয়। তাজউদ্দীন আহমদের আদর্শ কী ছিল? ডায়েরি থেকে দেখা যাচ্ছে, তিনি ‘আধুনিক’ জীবনযাপনের যে দিকগুলো দৈনন্দিনতার মধ্যে পরীক্ষিত হয়ে কাঙ্ক্ষিত বলে সাব্যস্ত হয়েছে, সেগুলোর ব্যাপারে বিরাগ বা বিতৃষ্ণা দেখাননি। তিনি গণতান্ত্রিক মেজাজ কেবল কেন্দ্রীয় বা আঞ্চলিক রাজনীতির ক্ষেত্রে নয়, সামাজিক সম্পর্ক বা বিরোধ-মীমাংসার ক্ষেত্রেও অনবরত চর্চা করেছেন। বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো বা রাষ্ট্রকাঠামোর যেদিকগুলো কলোনিয়াল সরকারের উত্তরাধিকার হিসেবে আমরা পেয়েছি, সেগুলোতে বিরাগ দেখানোর কোনো উদাহরণ তাঁর ডায়েরিতে নেই। তিনি বরং চেয়েছেন, এগুলোর কাঠামোগত পরিপক্বতা এবং সচলতা অর্জিত হোক, আর আর্থিক হিসাব এবং কর্তব্যনিষ্ঠার ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বজায় থাকুক। এদিক থেকে তাঁকে শিথিল অর্থে পশ্চিমা ধাঁচের আধুনিক বলা যাবে। লিবারালও বলা যাবে। পার্থক্য শুধু এই যে প্রকৃত জীবনযাপনের মধ্য দিয়ে এর যে রূপগুলো আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তিনি সেগুলোই বাস্তবের নিরিখে চর্চাযোগ্য ভেবেছেন; পশ্চিমা জ্ঞানের আলোকে প্রাপ্ত কোনো ‘আদর্শ’ এখানে আরোপ করতে চাননি। অর্থাৎ তাঁকে আদর্শের দিক থেকে পশ্চিমা অর্থে লিবারাল হিউম্যানিস্ট বলা যাবে না।
একটা উদাহরণ দিয়ে কথাটা বিশদ করা যাক। অলি আহাদ সম্পর্কে তিনি ডায়েরির নানা জায়গায় মন্তব্য করেছেন। ২৯ মার্চ, ১৯৫৪ সালে লিখেছেন, পার্লামেন্ট সদস্য না হওয়ার কারণে অলি আহাদের মনে অন্যদের প্রতি ঈর্ষা জন্মেছে। তাজউদ্দীন লিখেছেন, যদি অলি আহাদের মনে ক্ষমতার প্রতি বিশেষ মোহ জন্মে থাকে, তবে তাঁর উচিত এখনি তা পরিহার করা। কারণ, তা বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে। এ অংশ উদ্ধৃত করে সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী ডায়েরির পঞ্চম খণ্ডের ভূমিকায় লিখেছেন, তাজউদ্দীন আহমদের মন্তব্যটি ‘বিদ্বেষপূর্ণ উক্তি নয়, বন্ধুকে নিয়ে আশঙ্কা।’ এর পরেই তাঁর মন্তব্য: ‘অলি আহাদ মূলধারায় থাকতে পারলেন না, বামপন্থাতেও নয়। পরবর্তী সময়ে তিনি কিছুটা দক্ষিণ দিকেই ঝুঁকে পড়েছিলেন।’ অলি আহাদ সম্পর্কে দুজনের বক্তব্য কতটা সত্য বা মিথ্যা, তা আমাদের বিবেচ্য নয়। আমরা বরং দেখি, সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ‘মতাদর্শ-শাসিত’ বক্তব্যের বিপরীতে তাজউদ্দীন আহমদের প্রতিটি উল্লেখ খুবই বাস্তবলিপ্ত। মোটামুটি কয়েক অনুচ্ছেদের বর্ণনা ও মূল্যায়ন পাওয়া যায় ৪ মে, ১৯৫১ তারিখের লেখায়। এ মূল্যায়নমূলক বিবৃতিতেও কোনো মতাদর্শিক উল্লেখ নেই। দশের সঙ্গে গণতান্ত্রিক কায়দায় কাজ করতে গেলে অলি আহাদের চরিত্রের এসব বৈশিষ্ট্য যে খানিকটা শমিত করে আনা দরকার, তা নাহলে সামষ্টিক কাজের সংকট হতে পারে, সে কথাটাই তিনি লিখেছেন। দৃষ্টিভঙ্গির এ বিশিষ্টতা তিনি কোথাও লঙ্ঘন করেননি।
.
আবহাওয়ার বিবরণী তাজউদ্দীন আহমদ যেভাবে দিয়েছেন, আর যেভাবে প্রকৃতির খেয়ালখুশিকে উত্পাদন ও বাজারের সঙ্গে সম্পর্কিত করে ব্যাখ্যা করেছেন, তার জ্ঞানতাত্ত্বিক ও পদ্ধতিগত তাত্পর্য অতি গভীর। এখান থেকে আমরা একজন বাস্তববাদী, অভিজ্ঞতাবাদী ও উপযোগবাদী মানুষ আবিষ্কার করি। বাংলাদেশের নাগরিক মধ্যবিত্ত পরিসরে এ ধরনের মানুষের প্রধান গুরুত্ব এই যে সাধারণভাবে আরোপণমূলকতা এবং আদর্শবাদিতা প্রাত্যহিক বাস্তবতাকে আমলে না এনে যেভাবে বাস্তবের ওপর চড়াও হয়, এ দৃষ্টিভঙ্গির দৌলতে তা থেকে অনেক দূর পর্যন্ত মুক্ত থাকা সম্ভব।
.
৪.
ডায়েরির দ্বিতীয় খণ্ডের (১৯৪৯-১৯৫০) ‘ভূমিকা’য় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন, ‘পূর্ব বাংলার স্বার্থরক্ষার বিষয়টা বড় তাঁর কাছে; একটা অসাম্প্রদায়িক, মানবিক, দুর্নীতিমুক্ত দেশের স্বপ্ন তাঁর চোখে।’ এর মধ্যে ‘মানবিক’ শব্দটি হয়তো ব্যবহার করা যাবে জনমানুষের কল্যাণের নিমিত্তে তিনি যেসব কাজ করতেন বা সাধারণ মানুষ যেসব বিচিত্র কারণে তাঁর কাছে আসত, সেগুলোর বরাতে। এমনিতে মানবিক গুণের কোনো তালিকা ধরে মানুষকে বিচার করতে বা কোনো মহাবয়ানের অনুকূলে তত্পর হতে তাঁকে—অন্তত ডায়েরি লেখার কাল-পরিসরে—দেখা যায়নি। তবে ‘অসাম্প্রদায়িক’ কথাটা যদি হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি তখনকার পাকিস্তান রাষ্ট্রের মুসলমান নাগরিকদের প্রীতি ও দায়িত্ববোধ বোঝায়, তাহলে অভিধাটা তাঁর ক্ষেত্রে পুরোপুরি প্রযোজ্য। ১৯৫০ সালের ডায়েরিতে সীমানার দুই দিকেই সংঘটিত দাঙ্গার খবর পাচ্ছি। দাঙ্গা নিরসনে এবং সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় তাঁর উদ্যোগ-আয়োজনই কেবল উল্লেখযোগ্য তা নয়, পুরো ব্যাপারটা যে সমাজের খুব কম মানুষকে ভাবিয়েছে, তা–ও তাঁর মর্মপীড়ার কারণ হয়েছে। এমনকি এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের উদাসীনতা এবং পরিকল্পিত ও কার্যকর উদ্যোগ-আয়োজনের অভাবও তাঁকে পীড়িত করেছে। নিজে সাধ্যমতো কাজ করেছেন মানুষের দুর্গতি লাঘবের জন্য। এ বোধগুলোই তিনি তাঁর তত্পরতায় মূলত করে তুলতে চাইতেন। বাস্তব অভিজ্ঞতাই তাঁর রাজনৈতিক তত্পরতাকে ক্রমেই রূপ দিয়েছে।
২৫ মে ১৯৫০, বৃহস্পতিবার তিনি ডায়েরিতে একটা আলাদা নোট লিখেছেন, যেখানে রাজনৈতিকতা ও রাজনৈতিক কর্মসূচি সম্পর্কে তাঁর বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গির প্রকাশ ঘটেছে। নোটটা নিম্নরূপ:
বিচ্ছিন্নভাবে কোন আন্দোলন সম্ভব নয়। এতে ঘটনার পর ঘটনা জড়িয়ে আন্দোলন নিস্তেজ হয়ে যায়। সমাজের কাঠামো এবং ব্যবস্থার যে কোন নির্দিষ্ট অংশ থেকে অন্যায় নির্মূল করার চেষ্টা সমস্যাটিকে আরো জটিলতার দিকে নিয়ে যায়। এতে সংস্কারকরা কয়েকজনের দ্বারা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত হন। তাই একই সাথে জোরালো আঘাত এবং আমূল পরিবর্তন এই অবস্থার সমাধান বলে মনে হয়।
এ মন্তব্য তিনি করেছেন সম্ভবত বন বিভাগের দুর্নীতি রোধ করতে গিয়ে তিনি যেভাবে মোকদ্দমায় ফেঁসে গেছেন, তার অভিজ্ঞতা থেকে। কিন্তু এর মধ্যে তাঁর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিরও গভীর প্রতিফলন আছে। গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির সামগ্রিক বিকাশই সে দৃষ্টিভঙ্গির মূল কথা। আর তারও গোড়ায় আছে জনগণের নিত্য ও নৈমিত্তিক সমস্যার সুরাহা করা। অন্যত্রও একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় পাওয়া যায়। যেমন ২১ জুন ১৯৫০, বুধবার লিখেছেন, ‘অলি আহাদ, সাদেক ও মুস্তফা এলেন। তাদের সাথে নাগরিক স্বাধীনতা বা মৌলিক অধিকার বিষয়ে আন্দোলন গড়ে তোলার ব্যাপারে কথা হল।’
.
তাঁর চিন্তাভাবনা ও রাজনৈতিকতার কেন্দ্র ছিল পূর্ব বাংলা। তিনি চেয়েছেন গণতান্ত্রিক বিকাশ, যেখানে একদিকে জনগণের প্রকৃত অভিজ্ঞতা ও চাহিদার নিরিখে কর্মসূচি সাব্যস্ত হবে, অন্যদিকে যথাসম্ভব বৃহত্তর ঐক্যের মধ্য দিয়ে কর্মসূচি পালিত হবে। সাধারণভাবে বিদ্যমান আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর আমূল পরিবর্তনের কোনো ভাবনা তাঁর মধ্যে দেখা যায়নি। চাহিদা ও বাস্তব অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে নতুন ধাপে উত্তরণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হবে এবং নাগরিকের সামষ্টিক বিরোধ-কর্মসূচির মধ্য দিয়ে তা ত্বরান্বিত হবে— এটাই, বলা যায়, তাঁর রাজনীতির মডেল। আনিসুজ্জামান লক্ষ করেছেন, তিনি তখনো কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের আওতাভুক্ত হননি। আমরা দেখব, এ কারণে রাজনৈতিক থাকতে তাঁর কোনো সমস্যা হয়নি, রাজনৈতিক কর্মসূচিতে নিত্য তত্পর থাকতেও বাধেনি।
পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার সেই প্রাথমিক বছরগুলোতে রাজনৈতিক তত্পরতার ধরন ব্রিটিশ আমলের রাজনৈতিক সংস্কৃতির ধারাবাহিকতাই আসলে বহন করছিল। কথাটা একটু সতর্কতার সঙ্গে পর্যালোচনা করা দরকার। সাধারণভাবে স্বাধীনতা বা আজাদি লাভের মতো একটা বড় ঘটনা, ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার মতো বৈপ্লবিক পরিবর্তন আর সম্পূর্ণ নতুন বাস্তবতায় নতুন রাষ্ট্রের কাঠামো আমাদের এ রকম ভাবতে উত্সাহিত করে যে তখন মানুষের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতেও রাতারাতি বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছিল। সাধারণত আমাদের সংশ্লিষ্ট বয়ানগুলো কঠোরভাবে এ দৃষ্টিভঙ্গি মান্য করে। তবে প্রকৃত বাস্তবতা হলো, কেবল রাষ্ট্রকাঠামো, প্রশাসনিক কাঠামো আর অফিস-আদালত নয়, খোদ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং রাজনৈতিক কর্মসূচির ধরনেও একটা প্রায়-মসৃণ ধারাবাহিকতা চলছিল। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরির অন্তত ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা এ ব্যাপারে আমাদের নিশ্চিত সাক্ষ্য দেয়।
তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক তত্পরতার মডেল কী? তিনি রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় ব্যক্তিবর্গের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ করতেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধানত হলকেন্দ্রিক রাজনীতিতে এবং হল-পরিচালনায় নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য ভীষণ তত্পর থেকেছেন (উল্লেখ্য, তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলো কেন্দ্রীয় রাজনীতির সঙ্গে এবং প্রভাবশালীদের সাংস্কৃতিক-রাজনৈতিক জীবনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে সংশ্লিষ্ট ছিল), অনবরত কাজ করেছেন প্রেশার গ্রুপ তৈরির জন্য। নিজ এলাকা কাপাসিয়ার ক্ষেত্রে দেখি, তিনি বিরামহীন সমিতি তৈরি করছেন, সালিস-বিচার পন্থায় সামাজিক সুস্থিতি প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করছেন, প্রতিষ্ঠানগুলো যেন নিয়মতান্ত্রিকভাবে সচল থাকে, সে জন্য কঠোর পরিশ্রম করছেন, আর প্রচুর জনসভায় বক্তৃতা করছেন। জনসভায় লম্বা বক্তৃতা করা তাঁর রাজনৈতিক সক্রিয়তার অন্যতম প্রধান ফর্ম। এক-দেড় ঘণ্টা থেকে শুরু করে কখনো কখনো তিন ঘণ্টা পর্যন্ত কথা বলেছেন তিনি। ঢাকায় এবং এলাকায় যেসব রাজনৈতিক তত্পরতার মধ্য দিয়ে তিনি গেছেন, সেগুলো নির্ভেজালভাবে ব্রিটিশ আমলে বিকশিত রাজনৈতিক সংস্কৃতির কথা মনে করিয়ে দেয়। এতে অবশ্য বিস্মিত হওয়ার কারণ নেই। ফর্মগুলো বিকশিত হয়েছিল একেবারেই তখনকার জনমিতি, যোগাযোগব্যবস্থা, রাজনীতির সঙ্গে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পর্ক ইত্যাদি মান্য করে।
.
বিচ্ছিন্নভাবে কোন আন্দোলন সম্ভব নয়। এতে ঘটনার পর ঘটনা জড়িয়ে আন্দোলন নিস্তেজ হয়ে যায়। সমাজের কাঠামো এবং ব্যবস্থার যে কোন নির্দিষ্ট অংশ থেকে অন্যায় নির্মূল করার চেষ্টা সমস্যাটিকে আরো জটিলতার দিকে নিয়ে যায়। এতে সংস্কারকরা কয়েকজনের দ্বারা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের শিকারে পরিণত হন। তাই একই সাথে জোরালো আঘাত এবং আমূল পরিবর্তন এই অবস্থার সমাধান বলে মনে হয়।
.
তবে ব্রিটিশ আমলের রাজনীতি ও রাজনৈতিকতার সঙ্গে পাকিস্তান আমলের রাজনীতির একটা ক্ষেত্রে মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছিল। রাতারাতিই ঘটেছিল। একেবারে ১৪ আগস্ট থেকেই। পূর্ববর্তী রাজনীতির প্রধান প্রতিপতা একেবারে বাস্তবের সূত্র মেনেই সম্প্রদায়ের ভিত্তিতে গড়ে উঠেছিল। ঐতিহাসিক কার্যকারণে সংখ্যাগুরু হিন্দু সম্প্রদায় কংগ্রেসের সঙ্গে আর সংখ্যালঘু মুসলমান সম্প্রদায় মুসলিম লীগের আওতায় একীভূত হয়েছিল। আমাদের অঞ্চলের রাজনৈতিক অনুধ্যানের একটা গোড়ার ফ্যালাসি এই যে কংগ্রেসের সম্প্রদায়গত এবং সংখ্যাগুরুর রাজনীতি—দুটিই নামের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’র আড়ালে লুকিয়ে বেশ সেক্যুলার ভঙ্গিতে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। লক্ষণ দেখে মনে হয়, বাংলাদেশের বিদ্বত্সমাজও এ দাবি সাধারণভাবে মান্য করে থাকে। অথচ ১৮৮৫ সাল থেকে কংগ্রেসের রাজনৈতিক কর্মসূচি খুব সাদা চোখে পর্যবেক্ষণ করলেও এ ব্যাপারে কোনো সন্দেহ থাকে না যে কংগ্রেস সংখ্যাগুরুর রাজনীতিই করেছে, আর হিন্দু-স্বার্থই সংরক্ষণ করেছে। অন্যদিকে মুসলিম লীগের রাজনীতির সম্প্রদায়কেন্দ্রিকতা বিবেচিত হয়েছে সাম্প্রদায়িকতা হিসেবে; একেবারেই অনুল্লেখিত থেকে গেছে যে মুসলিম লীগ ব্রিটিশ-ভারতে সংখ্যালঘুর রাজনীতি করত। সংখ্যালঘুর রাজনীতিতে নানামাত্রিক সীমাবদ্ধতা খুবই বিশ্বজনীন বাস্তবতা।
ব্যাপারটা মোটেই এমন নয় যে বাস্তবে কোনো এক পক্ষ বিশেষভাবে অন্যায্যতার আমদানি করেছে, এবং অন্য পক্ষ নির্দোষ থেকেছে। সমস্যা হয় তখনই যখন মতাদর্শিক আরোপণ কারও প্রতি দীর্ঘমেয়াদি অন্যায্যতার দায় আরোপ করে। বিশেষত ঘটনাটা যদি ঘটে সংখ্যাগুরুর পক্ষ থেকে এবং তাদের পক্ষ থেকে যারা প্রভাবশালী ভাবনা-চিন্তার আকার-প্রকার নির্ধারণের মতো সামর্থ্যবান।
পূর্বতন এ রাজনীতিই ১৪ আগস্টের পরে রাতারাতি বদলে গেল। সংখ্যাগুরু হিন্দু-সম্প্রদায়ের বিপরীতে তার যাবতীয় কর্মসূচি দাঁড়িয়েছিল—সে বাস্তবতা চোখের পলকে উধাও হয়ে গেল। ফলে ১৯৪৭-এর পরে পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগের রাজনীতির কোনো কর্মসূচি আর থাকল না। যারা শেষ পর্যন্ত এ রাজনীতিতে থেকে গেল, তাদের রাজনৈতিক ভাষায় ভারত বা হিন্দু-বিরোধিতার প্রবলতা অভ্যন্তর-কর্মসূচির অভাবের কারণেই এতটা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
.
ঠিক এখানেই তাজউদ্দীন আহমদদের পূর্ববঙ্গকেন্দ্রিক ও মুসলিম লীগবিরোধী রাজনীতির ‘প্রগতিশীলতা’। তাঁর ডায়েরি ব্যতিক্রমহীনভাবে সাক্ষ্য দেয়, এ পূর্ববঙ্গের কল্পনায় পশ্চিমবঙ্গের কোনো উল্লেখযোগ্য স্থান ছিল না। ‘বাঙালি’ জনগোষ্ঠীর একটা বৃহত্তর পরিমণ্ডল আদর্শগতভাবে কিংবা কল্পনার ভিত্তি হিসেবে ক্রিয়াশীল ছিল না। বরং পাকিস্তান রাষ্ট্রের আওতার মধ্যে পূর্ববঙ্গ যে পাকিস্তানের অন্য অংশগুলোর তুলনায় ভৌগোলিকভাবে আলাদা, তার যাপিত জীবনের কার্যকারণ, উত্পাদন ও আর্থিক নানা ব্যবস্থাপনা খুবই আলাদা—সে স্বীকৃতির ভিত্তিতে গড়ে উঠেছে নতুন রাজনীতি। তাজউদ্দীন আহমদ সে রাজনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি।
আমাদের জাতীয়তাবাদী ঐতিহাসিক বয়ানে যেভাবে মুসলিম লীগের পতনকে আদর্শিক বা মতাদর্শিকভাবে দেখা হয়, আর এর মধ্য দিয়ে সাতচল্লিশের ‘পাকিস্তান’ রাষ্ট্রটির অন্যায্যতা উত্পাদিত হয়, তার কোনো সমর্থন তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরিতে পাওয়া যায় না। রাষ্ট্রের বা সরকারের ব্যর্থতা বা অব্যবস্থাপনার যথেষ্ট উল্লেখ আছে; পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ববঙ্গের নানামাত্রিক ফারাকও প্রতিফলিত হয়েছে; এবং এর মধ্য দিয়ে এমন রাজনীতির পরিষ্কার ছায়া পড়েছে, যা গড়ে উঠবে পশ্চিম পাকিস্তানকে ‘অপর’ না হোক অন্তত বিরোধী অস্তিত্ত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। কিন্তু সে বিরোধ ১৯৪৭-এর সিদ্ধান্ত বা রাজনীতিকে কোনোভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করে না। বরং গড়ে ওঠে বাস্তব জরুরতের বনিয়াদের ওপর, যা প্রাথমিক কিন্তু শক্ত ভিত্তি পায় ভৌগোলিক দূরত্ব, উত্পাদন ও বণ্টনের স্বাতন্ত্র্য এবং যাপিত জীবনের প্রত্যক্ষ উপাদানগুলোর ওপর ভিত্তি করে। এটাও পশ্চিম পাকিস্তানবিরোধী এবং শেষ পর্যন্ত পাকিস্তানবিরোধী রাজনীতিই বটে, তবে আমাদের বাঙালি জাতীয়তাবাদী বয়ানে ভাবাদর্শিক বিরোধকে যেভাবে মূল বনিয়াদ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়, তা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি তাঁর বা তাঁদের নতুন রাজনীতিকে ভাবাদর্শিক পাটাতনে স্থাপন করে না; বরং বাস্তবলিপ্ত যাপনের ভিত্তিতে দাঁড় করায়।
এখানে উল্লেখ করা প্রাসঙ্গিক হবে যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ বইতে আবেগের অন্য রকম উত্সারণ সত্ত্বেও মোটামুটি একই ধরনের দৃষ্টিভঙ্গির পরিচয় আছে। গত কয়েক বছরে এ বইয়ের যে বিপুল পাঠ উত্পাদিত হয়েছে, তার বেশির ভাগ এতটাই আরোপণমূলক মতাদর্শতাড়িত যে সেগুলো প্রায়ই মিথ্যাচার ও প্রতারণার দিকে গেছে। প্রকৃতপক্ষে শেখ মুজিব ওই বইতে পাকিস্তান আন্দোলন এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রকে একটা ন্যায্য ও অনিবার্য রাজনীতি ও রাজনৈতিকতা হিসেবে উত্পাদন করেছেন, এবং একেবারেই বাস্তব পারিপার্শ্বিকতায় নতুন রাজনীতি গড়ে ওঠার পটভূমি ব্যাখ্যা করেছেন।
তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরিসহ ওইকালে লিখিত এসব আকরগ্রন্থের একটা তাত্পর্যপূর্ণ কৃতিত্ব হতে পারে এই যে আমাদের দেশে আশির দশকে বিকশিত ‘উগ্র’ বাঙালি জাতীয়তাবাদী অবস্থান সাতচল্লিশ-পূর্ব মুসলিম-রাজনীতি নিয়ে যে রকম শরমিন্দা থাকে এবং সাতচল্লিশ ও একাত্তরকে জনমানুষের মুক্তি-অভীপ্সার ধারাবাহিকতা হিসেবে না দেখে একটা মতাদর্শিক বিরোধ হিসেবে উত্পাদন করে, এ বইগুলো তার নিরসন করতে পারে, অথবা বিরোধ কমিয়ে আনতে পারে। এটা জরুরি। কারণ, বাংলাদেশে বিরোধমূলকতা কমিয়ে সহাবস্থানমূলক রাজনৈতিক সমাজ গঠনের এটা অন্যতম পূর্বশর্ত।
.
পূর্বতন এ রাজনীতিই ১৪ আগস্টের পরে রাতারাতি বদলে গেল। সংখ্যাগুরু হিন্দু-সম্প্রদায়ের বিপরীতে তার যাবতীয় কর্মসূচি দাঁড়িয়েছিল—সে বাস্তবতা চোখের পলকে উধাও হয়ে গেল। ফলে ১৯৪৭-এর পরে পূর্ব বাংলায় মুসলিম লীগের রাজনীতির কোনো কর্মসূচি আর থাকল না। যারা শেষ পর্যন্ত এ রাজনীতিতে থেকে গেল, তাদের রাজনৈতিক ভাষায় ভারত বা হিন্দু-বিরোধিতার প্রবলতা অভ্যন্তর-কর্মসূচির অভাবের কারণেই এতটা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
.
৫
ডায়েরির চতুর্থ খণ্ডের (১৯৫২) ভূমিকায় আতিউর রহমান লিখেছেন, ‘আত্মশক্তিতে বলীয়ান তরুণ তাজউদ্দীনের মধ্যে সুপ্ত ছিল ভাষা আন্দোলন, ’৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, সর্বোপরি ’৭১-এর মুক্তিসংগ্রামের নেতৃত্ব, যা তাঁর দিনপঞ্জিকার সুবিন্যস্ত ও সময়নিষ্ঠ ধারাবর্ণনায় প্রকাশ পেয়েছে।’ এ মন্তব্য নিঃসন্দেহে মতাদর্শিক চাপে আক্রান্ত। এখানে তাজউদ্দীনকে একজন জাতীয়তাবাদী আইকন হিসেবে উপস্থাপনের অভীপ্সা আছে। মন্তব্যটি সরল এবং ইতিহাস ও ব্যক্তির সম্পর্কের যে বিচিত্র জটিলতা, সে বিষয়ে অসচেতন। তবে এ রকম একটা কার্যকারণসূত্র আঁকতে চাওয়া মোটেও অভাবনীয় নয়। সাধারণত আমরা ব্যক্তির মধ্যে ইতিহাসের প্রতিফলন দেখতে চাই; আর তার মধ্যে একটি ধারাবাহিকতা আবিষ্কার করতে চাই। যদি জাতীয়তাবাদী মতাদর্শিক আরোপণ অগ্রাহ্য করে কেবলই সময়ের এতগুলো বড় পরিসরে ভূমিকা পালনের কথা মনে রেখে আমরা ব্যক্তি তাজউদ্দীনের বৈশিষ্ট্য ও প্রস্তুতি সম্পর্কে আন্দাজ করতে চাই, তাহলে ডায়েরিগুলো আমাদের কীভাবে সাহায্য করে?
আগেই বলেছি, ডায়েরির তাজউদ্দীন মূল্যায়ন, বিশ্লেষণ কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির সুস্পষ্ট উল্লেখ থেকে নিজেকে এতটাই মুক্ত রেখেছেন যে এ ব্যাপারে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্তে আসা বেশ কঠিন। তবে নিজেকে মন্তব্য বা মতামতের ভিত্তিতে প্রকাশ না করে কাজের ভেতর দিয়ে প্রকাশ করায়, আমাদের জন্য নির্ভরযোগ্য সিদ্ধান্ত নেওয়ার পথ অন্যদিক থেকে সুগম হয়েছে। আজ সময়ের বেশ খানিকটা উজানে দাঁড়িয়ে বলা যায়, নিছক ‘ক্রিয়া’র পরিচয় দেওয়া এ ডায়েরি একজন ‘ক্রিয়াশীল’ মানুষ হিসেবে ডায়েরি লেখককে নির্ভুলভাবে প্রতিষ্ঠিত করে। সারা দিন ‘অন্যে’র জন্য কাজ করার এক দুর্দান্ত প্রাণশক্তি তাঁর ছিল। সে কাজের মোটামুটি দুইটি ধরন। একদিকে তিনি মানুষের নিত্য ও নৈমিত্তিক লঘু-গুরু বিষয়গুলো আমলে আনতে পারতেন। অন্যদিকে জাতীয় রাজনীতির নীতিনির্ধারণী বিষয়গুলোতে কার্যকর মতামত দিতেন। যখন পার্টিভুক্ত ছিলেন না, তখনো নিয়মিত ড্রাফট তৈরি করেছেন, পালন করেছেন সচিবের ভূমিকা। আবার বুদ্ধিবৃত্তিক ও রাজনৈতিক ভাবনাকে ভাষা দেওয়ার কাজও করেছেন অনবরত। একাত্তরের তাজউদ্দীনের সঙ্গে এসব বৈশিষ্ট্য বেশ মিলে যায়। বক্তা হিসেবে তাঁর বৈশিষ্ট্য এবং সাফল্যও তাঁর পরবর্তী ভূমিকাকে বেশ কতকটা ব্যাখ্যা করে। ডায়েরি পর্যাপ্ত সাক্ষ্য দিচ্ছে, তিনি দীর্ঘ বক্তৃতায় মূলত রাজনৈতিক পটভূমি ও অবস্থান ব্যাখ্যা করতেন। জনগণের সঙ্গে রাজনৈতিক কিংবা ধারণাগত যোগাযোগের কাজটাও করতেন।
.
তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি নিয়ে সবচেয়ে ভালো আলোচনাটি করেছেন সম্ভবত অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী। ডায়েরির পঞ্চম খণ্ড অর্থাৎ ১৯৫৪ সালের ভূমিকা লিখেছেন তিনি। খুব যত্নে ডায়েরি লেখার সম্ভাব্য কারণ, এর বিভিন্ন পাঠ, সংশ্লিষ্ট মানুষ, রাজনীতি ও সমাজ, ব্যক্তি তাজউদ্দীন এবং জাতীয় নেতা তাজউদ্দীন ইত্যাদি ছাড়াও বাংলার ইতিহাসের ওই গুরুত্বপূর্ণ পর্ব সম্পর্কে চমত্কার বিশ্লেষণ করেছেন; কিন্তু যেমনটা আগেই ইঙ্গিত দিয়েছি—আলোচনাটা অতিমাত্রায় মতাদর্শনিয়ন্ত্রিত। সে হতেই পারে। দুনিয়ার বহু বড় লেখক মতাদর্শিক ছকে গুরুত্বপূর্ণ লেখালেখি করেছেন। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীও এ ধরনের লেখালেখি করেই খ্যাতি অর্জন করেছেন। আমরা তাজউদ্দীনের ডায়েরি অবলম্বন করে বাংলাদেশের পাকিস্তান পর্বের গোড়ার দিকের যে ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক প্রসঙ্গগুলো বোঝার চেষ্টা করছি, সেখানে এ কথাটা বিশেষভাবে উত্থাপনের কারণ হলো তাঁর লেখার বামপন্থী ঝোঁক এবং দৃষ্টিভঙ্গির গভীর ব্যক্তিত্ব থাকলেও তা বাংলাদেশের পাকিস্তান পর্ব সম্পর্কে প্রভাবশালী কিছু ধারণাই পুনরুত্পাদন করে। এবং আমাদের বিবেচনায় শেষ পর্যন্ত তাজউদ্দীন আহমদ কিংবা বাংলাদেশের ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক পাটাতনে গলদপূর্ণ কিছু সিদ্ধান্ত হাজির করে।
অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বহু ছোট-বড় তথ্য চমত্কারভাবে উদ্ধৃত করে যুবক তাজউদ্দীনকে বুঝতে চেয়েছেন। তবে তিনি যে নিয়মিত নামাজ-রোজা করতেন, সে তথ্যকে গুরুত্ব দিতে পারেননি। যেখানে আলাপটা সামগ্রিক; আর বিশেষভাবে মতাদর্শিক, সেখানে এ তথ্য ভীষণভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে তখনকার আর দশজন সপ্রতিভ তরুণের মতো তাজউদ্দীনও যে আন্তরিকভাবে মুসলিম লিগের রাজনীতি করতেন, তার কার্যকারণও অধ্যাপক চৌধুরীর বিশ্লেষণে উল্লেখযোগ্য মনে হয়নি। আদতে উল্লেখটা খুব জরুরি; আর বাংলাদেশের ইতিহাসের একটি জরুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ পাঠ হাজির করতে হলে এ বিষয়ের একটি সন্তোষজনক মীমাংসা করতেই হবে।
.
ডায়েরির তাজউদ্দীন আহমদ যে পূর্ববঙ্গকেই তাঁর রাজনৈতিকতার কেন্দ্র করেছেন, তা–ও তাঁর অনড় বাস্তববাদিতার ফল। এ অবস্থানের অনিবার্য পরিণতি পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের রাজনীতি; এবং পরিণতিতে স্বাধীনতা। আমাদের জন্য এ আলোচনায় জরুরি প্রশ্ন হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদী ‘চেতনা’র বরাতেই কি এ স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার পথ-পরিক্রমা তৈরি হয়েছে, নাকি বাস্তবের চাপে গৃহীত স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার পথপরিক্রমায় বাস্তবের বর্গ হিসেবে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী’ চেতনা বিকশিত হয়েছে। আমাদের দাবি, তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি, শেখ মুজিবর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’সহ সেকালের প্রায় প্রতিটি বিবরণী অভ্রান্তভাবে দ্বিতীয়টির পক্ষে সাক্ষ্য দেয়।
.
বাংলাদেশের ১৯৪০-এর দশকের শিক্ষিত মধ্যবিত্ত মুসলমানসমাজের এমন সদস্য বিরল, যিনি পাকিস্তান আন্দোলন সমর্থন করেননি। তাঁদেরই একটি বড় অংশ পাকিস্তান হওয়ার পরে ক্রমে মুসলিম লিগ তো বটেই পাকিস্তানবিরোধীও হয়েছিল। জরুরি প্রশ্ন হলো—এই দুই অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত, নাকি এরা সহাবস্থান করতে পারে। বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার মূলধারায় ব্যাপকভাবে প্রচারিত আছে যে এরা পরস্পর বিপরীত; কিন্তু তাজউদ্দীন আহমদ, শেখ মুজিবর রহমানসহ ওইকালের কুশীলবদের লিখিত বিবরণী থেকে ধারণা হয়—এই দুই মত সহাবস্থান করতে পারে। তার সবচেয়ে বড় কারণের কথা আমরা আগেই বলেছি, পাকিস্তান হওয়ার পর সংখ্যালঘু হিসেবে সংখ্যাগুরুর বিপরীতে মুসলিম লীগ যে রাজনীতি সাজিয়েছিল, তার বাস্তবতা তিরোহিত হয়েছিল। কাজেই কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষেরা নতুন বাস্তবতায় নতুন কর্মসূচির ভিত্তিতে নতুন দলের সন্ধান করছিল। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি সে সন্ধানের বাস্তবতা এবং প্রক্রিয়া সম্পর্কে বেশ নির্ভরযোগ্য ধারণা দেয়। দ্বিতীয়ত, পাকিস্তান আন্দোলনকারীদের একটি তাত্পর্যপূর্ণ অংশ পূর্ব বাংলাকেই তাঁদের পাকিস্তানবাদের কেন্দ্র ঠাওর করেছিল। আবুল মনসুর আহমদ এ দলের সর্বশ্রেষ্ঠ উদাহরণ হলেও একমাত্র নন। কাজেই তাঁদের ক্ষেত্রে পাকিস্তান-পরবর্তী পূর্ব বাংলার সাথে পূর্ববর্তী পাকিস্তানবাদের ফারাক ছিল তুলনামূলক অনেক কম। খুব সহজেই তাঁদের পাকিস্তান পূর্ব বাংলা হয়ে বাংলাদেশে পৌঁছাতে পেরেছে। আবুল মনসুর আহমদের ‘পাক বাংলার কালচার’ যে কোনোরূপ পরিবর্তন ছাড়াই ‘বাংলাদেশের কালচার’ হতে পেরেছে, এটা অতি উল্লেখযোগ্য ঘটনা। বহু মানুষের উপলব্ধিটাই ছিল এ রকম। কোথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ না থাকলেও ডায়েরির পাতাগুলো প্রমাণ করে, তাজউদ্দীন আহমদ নিজেও খানিকটা এ গোত্রের মানুষ ছিলেন। তাঁর ডায়েরির পূর্ববঙ্গ বা পূর্ববাংলাকেন্দ্রিকতা সে সাক্ষ৵ই দেয়।
এবার আলাপটাকে একটু অন্য দিক থেকে তোলা যাক। যদি পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর পূর্ব বাংলার ‘প্রগতিশীল’ সমাজ ‘প্রতারিত’ বোধ করেই থাকে, যেমনটা ব্যাপকভাবে বলা হয়ে থাকে, তাহলে পাকিস্তান আন্দোলনের জন্য এ অঞ্চলের মানুষের তুরীয় সক্রিয়তার মূল্য কি কমে যায়? তার কি শরমিন্দা হওয়ার প্রয়োজন দেখা দেয়? তাজউদ্দীন আহমদসহ ওই সময়ের রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীদের সাক্ষ্য থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে তাঁরা এ ব্যাপারে মোটেও শরমিন্দা ছিলেন না। এ শরমটা আরোপিত হয়েছে পরের জমানায়—খানিকটা ষাটের দশকের জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকালে; আর অনেকটাই ১৯৮০-এর দশকে বিকশিত ‘উগ্র’ ও ‘মতাদর্শপীড়িত’ বাঙালি জাতীয়তাবাদের বিকাশ-প্রক্রিয়ায়। পূর্ববর্তী প্রজন্মের মুক্তির দীর্ঘমেয়াদি লড়াই-সংগ্রামকে এক কথায় খারিজ করে দেওয়া এ দৃষ্টিভঙ্গি শুধু অন্যায্যই নয়, রাজনৈতিকভাবেও ক্ষতিকর, যে ক্ষতি আমরা বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিভাজনের মধ্যে নিত্য উপলব্ধি করছি। তা ছাড়া এ দৃষ্টিভঙ্গি ও সিদ্ধান্ত ব্যাপকভাবে কালাতিক্রমী দোষে আক্রান্ত। পরের জমানার মতাদর্শিক অবস্থান সুবিধাবাদী কায়দায় আগের জমানায় আরোপের কারণেই এ সংকটটা ঘটে।
.
এই পুরো নির্মাণ-পুনর্নির্মাণের অন্য আরেকটি তাত্ত্বিক-প্রায়োগিক দিক আছে। যদি বিপ্লবী রাজনীতিকেই কেবল ন্যায্য না ধরি, তাহলে রাজনৈতিক অবস্থানগুলোর মধ্যে সমঝোতার বা সহাবস্থানের পথ সব সময়ই উন্মুক্ত থাকে। পাকিস্তান আমলের বাংলাদেশের রাজনীতিকে ‘বিপ্লবী’ ভাবার কোনো কারণ নেই। এটা প্রধানত জাতীয়তাবাদী গণতান্ত্রিক রাজনীতি এবং রাষ্ট্রদেহে নিজেদের কর্মসূচি ও অবস্থান মুদ্রিত করতে পারার বুর্জোয়া রাজনীতি। এমনকি আমাদের বাম রাজনীতির যে অংশ ‘মূলধারা’য় ব্যাপকভাবে প্রভাব রেখেছে, তা–ও কাজ করেছে এ পাটাতনের সূত্র মেনেই। এমতাবস্থায় ‘অন্য’ রাজনীতিকে সম্পূর্ণ বাতিল করা বা অস্বীকার করা বা সমূলে বিনষ্ট করা রাজনীতির প্রধান প্রবণতা হতেই পারে না। বিরোধিতা থাকতে পারে এবং সেটা তীব্রও হতে পারে—যেমনটা গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক চর্চায় খুবই সুলভ।
ঠিক এখানেই আমরা তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরির মর্মগত বৈশিষ্ট্য হিসেবে ‘বাস্তববাদিতা’র দিকটাকে এত মূল্যবান গণ্য করছি। তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের এবং কর্মপন্থার অন্বেষণ ছিল— ডায়েরিভুক্ত সময়কালে সেটা খুব স্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে; কিন্তু ‘বাস্তব’ পরিস্থিতিকে ‘আদর্শবাদিতা’র মাপে দেখার সম্ভবত একটা লক্ষণও এখানে প্রকাশিত হয়নি। ডায়েরিতে আদর্শের দিক থেকে এবং কর্মপন্থার দিক থেকে ব্যতিক্রমহীনভাবে তাঁর গণতান্ত্রিকতা প্রকাশিত হয়েছে; আর বিদ্যমান রাষ্ট্রকাঠামো এবং প্রতিষ্ঠানের গণমুখী অর্থাৎ জনকল্যাণমূলক রূপান্তরের জন্যই তিনি কাজ করছিলেন। এ কল্যাণমূলকের জন্য বামপন্থার বরাত দেওয়ার কোনো দরকার নেই। বুর্জোয়া রাজনীতিতেই এ দৃষ্টিভঙ্গির বিস্তর উদাহরণ দুনিয়াজুড়ে আছে এবং আমাদের দেশেও আছে। তদুপরি বামপন্থীদের সঙ্গে বন্ধুত্বের বরাতও এর জন্য প্রয়োজনীয় নয়। কারণ, অন্তত ডায়েরিভুক্ত দিনগুলোতে কোথাও বন্ধুত্ব ও যোগাযোগকে তিনি আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গিতে ব্যাখ্যা করেননি।
ডায়েরির তাজউদ্দীন আহমদ যে পূর্ববঙ্গকেই তাঁর রাজনৈতিকতার কেন্দ্র করেছেন, তা–ও তাঁর অনড় বাস্তববাদিতার ফল। এ অবস্থানের অনিবার্য পরিণতি পূর্ব বাংলার স্বায়ত্তশাসনের রাজনীতি; এবং পরিণতিতে স্বাধীনতা। আমাদের জন্য এ আলোচনায় জরুরি প্রশ্ন হলো বাঙালি জাতীয়তাবাদী ‘চেতনা’র বরাতেই কি এ স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার পথ-পরিক্রমা তৈরি হয়েছে, নাকি বাস্তবের চাপে গৃহীত স্বায়ত্তশাসন ও স্বাধীনতার পথপরিক্রমায় বাস্তবের বর্গ হিসেবে ‘বাঙালি জাতীয়তাবাদী’ চেতনা বিকশিত হয়েছে। আমাদের দাবি, তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি, শেখ মুজিবর রহমানের ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’সহ সেকালের প্রায় প্রতিটি বিবরণী অভ্রান্তভাবে দ্বিতীয়টির পক্ষে সাক্ষ্য দেয়। এ দুই সিদ্ধান্তের মধ্যে যে মেরুদূর ফারাক, তার ঐতিহাসিক-রাজনৈতিক তাত্পর্য অপরিসীম। এখানে আমরা সে বিশ্লেষণে যাব না। কেবল প্রশ্ন তুলব, বাংলাদেশের প্রভাবশালী বয়ানে দ্বিতীয়টির তুলনায় প্রথমটির প্রবল প্রতাপ কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হলো।
.
এর একটি ব্যাখ্যা হতে পারে এই যে আমাদের ইতিহাসপাঠের বিশেষ সুবিধাবাদী দৃষ্টিভঙ্গি এর জন্য দায়ী। ইংরেজিতে যাকে বলা যায় ‘টেলিওলজিক্যাল’, বর্তমান ক্ষেত্রে বাংলাদেশে তার একটা পরম প্রতিষ্ঠা আছে। এখানে সাধারণত একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সাফল্যের প্রেক্ষাপটে পূর্ববর্তী ঘটনাপ্রবাহে সাজিয়ে ব্যাখ্যা করা হয়। এ দৃষ্টিভঙ্গি যে কতটা প্রভাবশালী, তার প্রমাণ পাওয়া যাবে তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরির পাঠ ও বিশ্লেষণগুলো মনোযোগ দিয়ে পড়লে। প্রায় সবাই তাজউদ্দীনের যৌবনকালের এ ডায়েরি পাঠ করেছেন একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধে তাঁর অনন্য ভূমিকার নিরিখে। এমনকি অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর চমত্কার পাঠও এ দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা আমূল চালিত হয়েছে। এ পাঠ নিশ্চয়ই খুব লোভনীয়। কোনো কোনো ক্ষেত্রে জরুরিও বটে; কিন্তু ওই নিরিখই যদি নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়, যদি পরবর্তী ‘সাফল্যে’র অনুরোধে পূর্ববর্তী ইতিহাসের সব বাঁক, খানাখন্দ আর অনিশ্চয়তাকে মসৃণ ধারাবাহিকায় রূপান্তর করা হয়, তাহলে বলতেই হবে—ইতিহাসপাঠের এটা খুব খারাপ পদ্ধতি। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরির ভাষ্য এ পাঠকে মোটেও সমর্থন করে না।
সে ক্ষেত্রে প্রশ্ন জাগে, পাকিস্তান পর্বের ওই প্রাথমিক বছরগুলোতে কি বাঙালি জাতীয়তাবাদী উপাদান সম্পূর্ণ গরহাজির ছিল? মোটেও না। বাংলা ভাষা ও সাহিত্য এবং বাঙালি সংস্কৃতির নানামাত্রিক চর্চায় ওই উপাদান খুব ভালোভাবেই উপস্থিত ছিল। বিশেষত, ভাষা আন্দোলনের বছরগুলোতে এ চেতনা এবং দৃষ্টিভঙ্গির রাজনৈতিক প্রকাশও খুব সুলভ। বায়ান্নর ভাষা-আন্দোলনকেন্দ্রিক রচনা এবং অন্য তত্পরতায় সেগুলো খুব ভালোভাবেই শনাক্ত করা যায়। বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই ‘কবর’ (১৯৫৩) নাটকের কথা, যেখানে পাকিস্তান রাষ্ট্রের মতাদর্শিক সমালোচনা খুব তীক্ষ্ণ� রূপ পেয়েছিল। এই সচেতনতা তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরিতে কীভাবে ছিল এবং কীভাবে তা অন্য দৃষ্টিভঙ্গিগুলোর সঙ্গে সহাবস্থান করছিল, তার উদাহরণ হিসেবে দুটি উদ্ধৃতি নিচে দেওয়া হলো।
.
এক. ১৯৫১ সালের ডায়েরির ২৬ মে ১৯৫১, শনিবারের ভুক্তিতে তিনি আলাদা করে লিখেছেন:
সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় এ বছর ইকবাল দিবসে নিঃসন্দেহে বিপুল উত্সাহ-উদ্দীপনার সাড়া পাওয়া গেছে; কিন্তু জনগণের বিরাট অংশ স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে রবীন্দ্রজয়ন্তী ও নজরুলের জন্মদিন পালন করল। খবর পাওয়া গেছে, সমাজের প্রতিটি স্তরের মানুষ, এমনকি প্রত্যন্ত এলাকার মানুষও নতুন লক্ষে৵ দিবস দুটিতে অংশগ্রহণ করেছে। জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত জাগরণ।
দুই. ১৯৫৪ সালের ডায়েরির এপ্রিল ২১, বুধবার ভুক্তিতে লিখেছেন:
সন্ধ্যা সাতটায় বার লাইব্রেরি হলে ‘ইকবালের’ মৃত্যুবার্ষিকীর অনুষ্ঠানে যোগ দিলাম। আবু হোসেন সরকার অনুষ্ঠানের সূচনা করলেন। এ কে ফজলুল হক বাণী পাঠিয়েছেন। ড. শহীদুল্লাহ সভাপতিত্ব করলেন। ইকবালের ওপর আলোচনায় অংশগ্রহণ করলেন আবুল হাশিম, বি এম ওমর, সাহেদ আলী এমএলএ, অধ্যাপক হাসান জামান, এ কাইয়ুম প্রমুখ। সভাপতির ভাষণের পর রাত সাড়ে নয়টায় অনুষ্ঠান শেষ হলো। রাত ১০টা পর্যন্ত ঢাকা রেডিওর শিল্পীরা ইকবালের বিভিন্ন দিক নিয়ে সুন্দর একটি অনুষ্ঠান উপস্থাপন করেছে। এতে অংশ নিয়েছেন বেদারুদ্দিন, আবদুল লতিফ, লুত্ফর রহমান প্রমুখ।
এ বিবরণ এতই স্বতঃপ্রকাশ যে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করারও প্রয়োজন পড়ে না। শুধু সাল-তারিখগুলো বিশেষ মনোযোগ দাবি করে। উল্লেখ্য, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় ইকবাল দিবস পালনের বাড়াবাড়ি, আনুষ্ঠানিকতা ও প্রাণহীনতা সম্পর্কে তিনি অন্যত্রও মন্তব্য করেছেন; কিন্তু দেখা যাচ্ছে, ১৯৫৪ সালেও ইকবালকে নিয়ে ‘সফল’ অনুষ্ঠান হতে পারে এবং যুক্তফ্রন্টের এমএলএ তাজউদ্দীন আহমদ সে অনুষ্ঠান আন্তরিকভাবে উপভোগও করতে পারেন; যেখানে ১৯৫১ সালেই তিনি ওই ইকবালের বিপরীতে রবীন্দ্র-নজরুলের রাজনৈতিক সম্ভাবনা বিষয়ে তুখোড় সিদ্ধান্তে পৌঁছেছেন। তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি এ রকমই বহুস্বরতায় ভরপুর, যার মধ্যে মিলবে রাজনৈতিকতা ও ঐতিহাসিকতার বিচিত্র পরিসর।
.
৬
তাজউদ্দীন আহমদের ডায়েরি অবলম্বনে বাংলাদেশের ঐতিহাসিকতা ও রাজনৈতিকতার ব্যাপারে সমস্যা-উত্থাপনমূলক বর্তমান আলোচনার ভিত্তি এক জোরালো অনুমান। অনুমানটি অনেকটা এ রকম—তুলনাম–লক সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়—ইতিহাস ও রাজনীতির এমন অনেক ইস্যুতে বাংলাদেশের জনগোষ্ঠী জল-অচল বৈপরীত্যে আক্রান্ত। এর কারণ হলো বাস্তবের তথ্য-উপাত্ত সম্পর্কে বাস্তবকে তোয়াক্কা না করে মতাদর্শিক বিভাজনের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রবণতা এখানে অতি প্রবল। আরোপণমূলকতা তার ভিত্তি; মতাদর্শিক ছাঁচে বাস্তবকে গড়েপিটে নেওয়া তার প্রধান কর্মপদ্ধতি। যদি বর্তমানের জনপরিসরে এ প্রবণতার কোনো কুফল না ফলত, তাহলে মতাদর্শিক কল্পনায় রঞ্জিত এসব সিদ্ধান্তকে আমলে না আনলেও চলত; কিন্তু বাস্তবতা হলো আমাদের রাজনৈতিক সমাজ গড়ে ওঠার পথে এসব ধারণা নিরাময়-অযোগ্য বাধা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ইতিহাসের চেয়ে বড় এই ঐতিহাসিকতা; রাজনীতির চেয়ে বড় রাজনৈতিকতা।
সাতচল্লিশ, সাতচল্লিশের আগে-পরের রাজনীতি ও ইতিহাস এবং বিশেষত সেক্যুলার বনাম সাম্প্রদায়িক রাজনীতির বিভাজন আমাদের অমীমাংসিত প্রশ্নগুলোর মধ্যে অগ্রগণ্য। এ প্রশ্নগুলোর সমঝোতামূলক পর্যালোচনার অন্যতম উপায় ওই সময়ের যাঁরা কুশীলব, যাঁরা পাকিস্তান আন্দোলন করেছেন এবং পাকিস্তন আমলে বাংলাদেশের রাজনীতি প্রত্যক্ষভাবে গড়েছেন, তাঁদের ওই সময়ে লেখা বিবরণী পর্যালোচনা করা।
এদিক থেকে তাজউদ্দীন আহমদের পাঁচ খণ্ড ডায়েরি আদর্শ উত্স হিসেবে গণ্য হতে পারে। একদিকে অনুবাদজনিত সংকট বাদ দিলে ডায়েরিগুলোতে পরবর্তীকালীন বিচ্যুতির আশঙ্কা খুবই কম; অন্যদিকে নিরাসক্ত ক্রিয়ামূলকতার ভিত্তিতে বিবরণগুলো রচিত হওয়ায় পাঠ-উন্মুক্ততার সম্ভাবনাও বেশি। ডায়েরিগুলোর ‘বর্তমানময়তা’ও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, এ অর্থে যে, আমাদের বিরোধমূলক সংস্কৃতির সবচেয়ে বিরোধপূর্ণ কিছু সময় এতে ধরা পড়েছে। অন্য অনেক বড় কৃতিত্বের মতো তাজউদ্দীন আহমদের এ অবদানও কম গৌরবের নয়।
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: [email protected] মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com