গাছটিতে ডালে ডালে হালকা গোলাপি-সাদা রঙের ফুল ফুটে আছে। গাছের কোনো ডালে ফুলের পাশেই মাত্র কুঁড়ি বের হয়েছে। আবার কোনো ডালে লালচে রঙের ফল ধরেছে। নরম কাঁটাযুক্ত ফলগুলো দেখতে বেশ সুন্দর। দূর থেকে এই কাঁটাগুলোর জন্য ফলগুলোকে লোমশ মনে হয়। দুপুরবেলার উজ্জ্বল রোদে ঝলমল করছিল ওই ফুল ও ফল।
১৫ অক্টোবর মৌলভীবাজার শহরতলির বর্ষিজোড়া ইকোপার্ক–সংলগ্ন বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের সিলেট বিভাগীয় কার্যালয় প্রাঙ্গণের দৃশ্য এটি।
গাছটির গোড়ার দিকে একটি নেমপ্লেট সাঁটানো। তাতে গাছটির পরিচয় লেখা আছে ‘বিরল প্রজাতি। সিন্দুর/লটকা গাছ’। ইংরেজিতে লেখা বৈজ্ঞানিক নাম Bixa orellana.
বেশ কয়েক বছর আগে ওই কার্যালয় প্রাঙ্গণে গাছটির দেখা পান এই প্রতিবেদক। তখন গাছভর্তি শুধু ফল ছিল। কিছুদিন আগে বন্য প্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের ওই কার্যালয়ের বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মির্জা মেহেদী সরোয়ারের সঙ্গে গাছটি নিয়ে কথা হয়। তখন তিনি জানিয়েছিলেন, গাছটিতে ফুল-ফল কিছুই আসেনি। কয়েক দিন আগে তিনি জানালেন, গাছটিতে ফুল এসেছে। পরে এই প্রতিবেদক ওই কার্যালয়ে যান।
.
উদ্ভিদটি আমেরিকা অঞ্চলের ছোট গুল্মজাতীয় গাছ। সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে স্প্যানিশদের মাধ্যমে এটি দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে। নেমপ্লেটে লেখা নাম ছাড়াও এই গাছের বিভিন্ন ধরনের নাম আছে। একেকজনের কাছে একেক রকম পরিচয় গাছটির। এটি দইগোটা, লটকনগোটা, রংগোটা, সিঁদুরি বা সিন্দুরে ফুল, জাফরান ফুল—এসব নামে পরিচিত। ইংরেজিতে বলে লিপস্টিক ট্রি। তবে এটি জাফরান নয়, ভুলবশত অনেকে এটিকে জাফরান ফুল বলেন।
এটার ফল থেকে পাওয়া নির্যাস রং হিসেবে দইকে রাঙাতে ব্যবহৃত হয়ে থাকে বলে এটির নাম দইগোটা—দইগোটা নামেও এর পরিচিতি অনেক। দইগোটার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর বীজ থেকে চমৎকার প্রাকৃতিক রং পাওয়া যায়। এর ফলগুলো লালচে বাদামি এবং ফলের শরীর নরম কাঁটায় ভরা। ফলের ভেতরের বীজগুলো লাল শাঁসে জড়ানো। এই বীজ থেকে পাওয়া উৎকৃষ্টমানের রঞ্জক বিভিন্ন ধরনের রং তৈরির কাজে ব্যবহৃত হয়।
.
গাছটি ছোট, ঝোপাল, চার থেকে পাঁচ মিটার উঁচু ও চিরসবুজ প্রকৃতির একটি গাছ। ফুল ফোটার প্রধান সময় শরৎকাল থেকে শীতের প্রথম ভাগ পর্যন্ত। এর ফুল দেখতে অনেক সুন্দর হলেও সম্ভবত রঙের কারণে ফুলের চেয়ে ফলের পরিচিতিটাই বেশি ছড়িয়ে আছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বন্য প্রাণী ও জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা মির্জা মেহেদী সরোয়ার গতকাল বৃহস্পতিবার বলেন, ‘এটি সিঁদুরগাছ। ফ্রুট কালার হিসেবে দইয়ে ব্যবহার করা হয়, এ জন্য এটিকে দইগোটা বলে। আমাদের কার্যালয়ে প্রায় ১০–১২ বছর ধরে গাছটি আছে। প্রায় প্রতিবছরই ফুল-ফল আসে।’
.
গাছটি নিয়ে গতকাল কথা হয় হবিগঞ্জ বৃন্দাবন সরকারি কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান সুভাষ চন্দ্র দেবের সঙ্গে। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এটি একটি বহুবর্ষজীবী চিরসবুজ গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এর বীজ থেকে লালচে কমলা রঙের একধরনের প্রাকৃতিক খাদ্য রং ও মসলা পাওয়া যায়। নানাবিধ আঞ্চলিক নামের মধ্যে লিপস্টিক ট্রি নামেও এর বৈশ্বিক পরিচিতি আছে। আমাদের দেশে আঞ্চলিকভাবে একে অনেকে দইগোটা বলে থাকেন। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ধর্মীয় আচার, প্রসাধনী, সানস্ক্রিন, কীটপতঙ্গ প্রতিরোধক এবং চিকিৎসায় ঐতিহ্যগতভাবে এটি ব্যবহৃত হতো। বাণিজ্যিক খাদ্যশিল্পে কৃত্রিম রাসায়নিক রঙের একটি নিরাপদ ও চমৎকার প্রাকৃতিক বিকল্প হিসেবে দই, পনির, মাখন, মার্জারিন, আইসক্রিম, বেকারি পণ্য ও নানা প্রক্রিয়াজাত খাবারে বৈশ্বিক মানদণ্ডে এই রং ব্যবহৃত হয়।’
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: [email protected] মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com