দুধ আর আনারস একসঙ্গে খেলে নাকি বিষ হয়ে যায়! ফল খাওয়ার পর পানি খেলেই নাকি ‘যম বলে আয় আয়’! আবার চা খাওয়ার পর পানি খেলে নাকি দাঁত পড়ে যায়!—ছোটবেলা থেকেই বড়দের মুখে এমন কত কথাই না শুনে আসছি। সত্য–মিথ্যা না জেনে মেনেছিও সে সময়।
আসলে এসব কথা কি সত্যি নাকি স্রেফ প্রবাদ বা প্রচলিত কথার কথা? চলো, বিজ্ঞানের চোখে দেখে নেওয়া যাক এমন ১০টি কথার সত্য–মিথ্যা।
বিজ্ঞান বলছে, এই তথ্যটি সঠিক নয়। দুধ আর আনারস একসঙ্গে খেলে শরীরে বিষ তৈরি হয়—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই। বরং দুধ ও আনারস দিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে মিল্কশেকসহ নানা খাবার তৈরি করা হয়।
তবে আনারসে ব্রোমেলিন নামের একটি এনজাইম আছে। এটি দুধের প্রোটিন ভেঙে দিতে পারে। ফলে দুধ কিছুটা জমাট বেঁধে দইয়ের মতো হয়ে যেতে পারে। কিন্তু তাতে দুধ বিষাক্ত হয়ে যায় না।
তাই দুধ আর আনারস একসঙ্গে বা পরপর খেলে বিষক্রিয়া হবে—এমন ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।
২. ফল খেয়ে জল খায়, ‘যম বলে আয় আয়’
প্রবাদটা শুনতে বেশ ভয়ংকর! কিন্তু ফল খাওয়ার পর পানি পান করলে যম এসে হাজির হবে—এমন কোনো ব্যাপার নেই।
কিছু ফল খাওয়ার পর পানি পান করলে অবশ্য মুখে একটু অদ্ভুত বা কটু স্বাদ লাগতে পারে। যেমন পেয়ারা খাওয়ার পর পানি পান করলে কারও কারও মুখে আয়রনের মতো কটু স্বাদ লাগে। কিন্তু এতে শরীরের কোনো ক্ষতি হয় না। তাই ফল খাওয়ার পর পানি খেতে পারো নিশ্চিন্তে।
৩. ভাত খাওয়ার আগে পানি খেতে নেই
মা–খালাসহ অনেকের ধারণা, ভাত খাওয়ার আগে পানি খেলে পেট ভরে যাবে। ফলে ভাত কম খাওয়া হবে। কথাটার এই অংশ সত্যি হতে পারে যে পানি পান করলে কিছু সময়ের জন্য পেট ভরা লাগতে পারে।
কিন্তু যাঁদের ওজন বেশি, যাঁদের একটু কম খাওয়া প্রয়োজন, চিকিৎসক তাঁদের উপদেশ দেন—খাওয়ার আগে এক গেলাস পানি খেয়ে নিতে হবে। তাতে খাওয়ার পরিমাণ একটু কমে যাবে। ফলে ওজন কমাতে তা সাহায্য করবে।
তবে কারও যদি অম্বল বা টক ঢেকুরের সমস্যা থাকে, তাহলে খাবারের সময় বা পরপর বেশি পানি পান করলে অস্বস্তি হতে পারে। তাই নিজের শরীর কী বলছে, সেটাও খেয়াল রাখতে হবে।
শাক দিনে খেলে হজম হবে, কিন্তু রাতে খেলেই হজম হবে না—এমন কোনো নিয়ম নেই।
তবে সব কিছুরই ব্যতিক্রম থাকে। কারও যদি রাতে শাক বা অন্য কোনো খাবার খেলে পেটে অস্বস্তি হয়, তিনি সেটি এড়িয়ে চলতেই পারেন। কারণ, সবার শরীর তো আর এক রকম নয়!
কিন্তু সবার জন্য ‘রাতে শাক খাওয়া নিষেধ’—এমন কোনো বৈজ্ঞানিক নিয়ম নেই।
এই নিয়ম আগে প্রচলিত ছিল। এখন অবশ্য উল্টোটা বলে। কারণ, জ্বর হলেই গোসল বন্ধ—এমন নিয়ম নেই। বরং কুসুম গরম পানিতে গোসল করলে অনেকের শরীর আরাম পেতে পারে। শরীরও পরিষ্কার থাকে।
তবে জ্বরের সময় খুব ঠান্ডা পানি দিয়ে গোসল করা ঠিক নয়। এতে শরীর কাঁপতে পারে এবং অস্বস্তি বাড়তে পারে।
তাই জ্বর হলে গোসল করা যাবে না—এই ধারণা ঠিক নয়। শরীরের অবস্থা বুঝে আরামদায়কভাবে গোসল করা যায়।
শরীরের কোথাও কেটে গেলে লেবু, জলপাই বা অন্য টক খাবার খাওয়া যাবে না, এমন কথা অনেকেই বলেন। কিন্তু সাধারণ কাটা-ছেঁড়ার সঙ্গে টক খাবার না খাওয়ার কোনো বৈজ্ঞানিক সম্পর্ক নেই।
বরং লেবু, আমলকী, পেয়ারা, কমলালেবুর মতো ফলে ভিটামিন সি থাকে। শরীরের স্বাভাবিক সুস্থতার জন্য এই ভিটামিন দরকার।
তবে ক্ষতস্থানে সরাসরি লেবুর রস বা অন্য কোনো টক জিনিস লাগাবে না। খাবার হিসেবে খাওয়া আর ক্ষতের ওপর লাগানো এক কথা নয়।
৭. জ্বর হলে কম খেতে হবে, ভাত খাওয়া যাবে না
জ্বর হলে শুধু শুয়ে থাকলেই হবে না, শরীরকে পুষ্টিকর খাবারও দিতে হবে। কারণ, তখন শরীর অসুস্থতার সঙ্গে লড়াই করে। তাই শরীরে শক্তি ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি দরকার।
সহজে হজম হয় এমন খাবার খাওয়া ভালো। ভাত, খিচুড়ি, ডাল, ডিম, মাছ, সবজি বা ফল—শরীরের অবস্থা অনুযায়ী এসব খাবার খাওয়া যেতে পারে।
জ্বর হয়েছে বলে ভাত বা অন্য খাবার একেবারে বন্ধ করে দেওয়ার কোনো কারণ নেই।
৮. ঠান্ডা লাগলে কলা খাওয়া যাবে না
কলা খেলেই ঠান্ডা লাগে কিংবা ঠান্ডা লাগলে কলা খাওয়া যাবে না—ঠান্ডার সঙ্গে কলার এমন কোনো সম্পর্ক নেই।
কলা পুষ্টিকর একটি ফল। এতে শরীরের প্রয়োজনীয় নানা পুষ্টি উপাদান থাকে। তাই শুধু ঠান্ডা লেগেছে বলে কলা বাদ দেওয়ার দরকার নেই।
অবশ্য কারও যদি কলায় অ্যালার্জি থাকে বা কলা খেলে ব্যক্তিগতভাবে সমস্যা হয়, তাহলে সেটি আলাদা বিষয়।
৯. চা খাওয়ার পর পানি খাওয়া যাবে না
চা খাওয়ার পর পানি পান করলে দাঁত পড়ে যায়—এমন কথা অনেকেই শুনেছ। কিন্তু এর পক্ষে শক্তপোক্ত কোনো প্রমাণ নেই।
খুব গরম চা খাওয়ার পর সঙ্গে সঙ্গে বরফঠান্ডা পানি পান করলে দাঁতে সাময়িক শিরশির বা অস্বস্তি হতে পারে। তবে চা অতিরিক্ত গরম না হলে এবং এরপর স্বাভাবিক তাপমাত্রার পানি পান করলে সাধারণত সমস্যা নেই।
তাই চা খাওয়ার পর পানি পান করতে ভয় পাওয়ার দরকার নেই।
১০. ফুটবল মাঠে ঘর্মাক্ত শরীরে পানি খেতে নেই
‘খেলতে গিয়ে শরীর ঘেমে গেছে, এখনই পানি খেয়ো না। একটু জিরিয়ে নিয়ে খাও’—এমন কথা হয়তো তোমরাও শুনেছে। কিন্তু এই ধারণা ঠিক নয়।
খেলাধুলার সময় শরীর থেকে ঘামের মাধ্যমে পানি বেরিয়ে যায়। তাই সেই পানির ঘাটতি পূরণ করা দরকার। খেলার ফাঁকে বা ব্যায়ামের সময় অল্প অল্প করে পানি পান করা বরং জরুরি।
তবে একবারে ঢকঢক করে অনেকটা পানি পান করা ঠিক নয়। এতে পেটে অস্বস্তি বা বমি বমি ভাব হতে পারে। তাই খেলার ফাঁকে ফাঁকে অল্প অল্প করে পানি বা স্যালাইন পান করাই ভালো।
বড়দের মুখে শোনা সব কথা যে ভুল, তা কিন্তু নয়। আবার কোনো কথা অনেক দিন ধরে প্রচলিত হলেই সেটি সত্যিও হয়ে যায় না। তাই খাবার নিয়ে কোনো ভয়ংকর কথা শুনলে সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বাস করার দরকার নেই। একটু খোঁজ নাও, নির্ভরযোগ্য তথ্য দেখো। আর শরীর খারাপ হলে গুজব বা প্রচলিত কথার বদলে চিকিৎসক বা নির্ভরযোগ্য স্বাস্থ্যতথ্যের ওপর ভরসা করো।
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: nomanibsl@gmail.com মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com