আধুনিক প্রতিযোগিতামূলক করপোরেট বিশ্বে প্রথাগত চাকরির গণ্ডি পেরিয়ে ক্যারিয়ারে নতুন ও গতিশীল মোড় আনতে পেশাজীবীদের কাছে ‘প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট প্রফেশনাল’ বা পিএমপি সার্টিফিকেশন বর্তমানে একটি অবিকল্প পাসপোর্টে পরিণত হয়েছে। বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট ইনস্টিটিউট বা পিএমআই কর্তৃক প্রদত্ত এই আন্তর্জাতিক সনদ কেবল একটি কাগজের টুকরা নয়, বরং এটি প্রমাণ করে যে সংশ্লিষ্ট পেশাজীবী যেকোনো জটিল প্রকল্প সফলভাবে পরিকল্পনা, পরিচালনা এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে বাস্তবায়ন করার তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক দক্ষতায় পরিপূর্ণ। বিশ্বজুড়ে বহুজাতিক কোম্পানি, আইটি ফার্ম, ইঞ্জিনিয়ারিং কনস্ট্রাকশন এবং উন্নয়ন সংস্থায় প্রজেক্ট ম্যানেজারের চাহিদা আকাশচুম্বী।
আনন্দের বিষয় হলো, দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বর্তমানে বাংলাদেশেও পিএমপি সার্টিফিকেটধারীদের জন্য তৈরি হয়েছে এক বিশাল চাকরির বাজার। তথ্যপ্রযুক্তি, টেলিকম, আবাসন খাত ও বৃহৎ অবকাঠামো খাতের দ্রুত প্রসারের ফলে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন সার্টিফায়েড প্রজেক্ট ম্যানেজারদের আকর্ষণীয় বেতনে নিয়োগ দিচ্ছে। যাঁরা নিজেদের প্রথাগত পেশাগত অবস্থান থেকে বেরিয়ে ক্যারিয়ারে বড় কোনো পরিবর্তন আনতে চান কিংবা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নিজেদের দক্ষতাকে প্রমাণ করতে চান, তাঁদের জন্য পিএমপি সার্টিফিকেশন হতে পারে সবচেয়ে কার্যকর চাবিকাঠি।
পিএমপি সার্টিফিকেশন আসলে কী এবং এর নেপথ্য প্রক্রিয়া বা পরীক্ষাপদ্ধতি কেমন, সেটি পরিষ্কার হওয়া জরুরি। পিএমআইয়ের গাইডলাইন অনুযায়ী, প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট বডি অব নলেজ বা পিএমবিওকে গাইডের ওপর ভিত্তি করে এই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রণয়ন করা হয়, যা মূলত প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের পাঁচটি মৌলিক পর্যায়—সূচনা, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন, তদারক ও নিয়ন্ত্রণ এবং সমাপ্তি—নিয়ে কাজ করে।
এই পরীক্ষায় অংশ নিতে হলে আবেদনকারীকে নির্দিষ্ট কিছু পূর্বশর্ত পূরণ করতে হয়। যেমন যদি প্রার্থীর চার বছরের ব্যাচেলর ডিগ্রি থাকে, তবে ন্যূনতম ৩৬ মাস বা তিন বছর প্রজেক্ট পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এ ছাড়া পিএমপি অনুমোদিত প্রতিষ্ঠান থেকে প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টের ওপর অন্তত ৩৫ ঘণ্টার ফরমাল ট্রেনিং বা কন্ট্যাক্ট আওয়ার থাকতে হবে। অন্যদিকে উচ্চমাধ্যমিক বা সমমানের ডিগ্রিধারীদের ক্ষেত্রে ৬০ মাস বা পাঁচ বছরের অভিজ্ঞতা এবং ওই একই ৩৫ ঘণ্টার ট্রেনিং বাধ্যতামূলক। আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর পিএমআই থেকে অনুমতি মিললে অনলাইনে প্রোক্টরড সিস্টেমে কিংবা বিশ্বব্যাপী অনুমোদিত পিয়ারসন ভিইউই টেস্ট সেন্টারে গিয়ে এই পরীক্ষা দেওয়া যায়। ১৮০টি মাল্টিপল চয়েস প্রশ্নের এই পরীক্ষা সম্পন্ন করার জন্য ২৪০ মিনিট বা প্রায় চার ঘণ্টা সময় বরাদ্দ থাকে, যেখানে প্রজেক্টের রিয়েল-জীবনভিত্তিক কেস স্টাডি ও দৃশ্যপটভিত্তিক সমস্যার সমাধান করতে হয়।
করপোরেট দুনিয়ায় পিএমপি সার্টিফিকেটের উপযোগিতা ও বহুমুখী ব্যবহারিক গুরুত্ব অপরিসীম। একটি প্রজেক্টের বাজেট ঠিক রাখা, সময়মতো কাজ শেষ করা, রিসোর্স বা জনবল সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা এবং ক্লায়েন্টের প্রত্যাশা শতভাগ পূরণ করার ক্ষেত্রে এই সনদের কোনো বিকল্প নেই। আইটি সেক্টর থেকে শুরু করে সাপ্লাই চেইন, ফিন্যান্স, মার্কেটিং, কনস্ট্রাকশন এবং এনজিও সেক্টর—সব জায়গাতেই প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট স্কিল সমানভাবে সমাদৃত। পিএমপি সার্টিফায়েড পেশাজীবীরা যেকোনো প্রতিষ্ঠানের রিস্ক ম্যানেজমেন্ট বা ঝুঁকি মূল্যায়ন খুব নিখুঁতভাবে করতে পারেন, যা কোম্পানির অপচয় কমিয়ে মুনাফা বাড়াতে সরাসরি ভূমিকা রাখে। আন্তর্জাতিক বাজারে দেশি প্রকৌশলী, গবেষক বা আইটি এক্সপার্টদের কাজ পাওয়ার ক্ষেত্রে এই সার্টিফিকেশন একটি শক্তিশালী রেফারেন্স হিসেবে কাজ করে। এ ছাড়া বহুজাতিক কোম্পানিগুলোতে বড় কোনো প্রজেক্টের টিম লিড বা ডিরেক্টর পদে পদোন্নতি কিংবা গ্লোবাল রিমোট জবের ক্ষেত্রে পিএমপি ডিগ্রিধারীরা অন্যদের তুলনায় সব সময় একধাপ এগিয়ে থাকেন, যা দেশে বসেই আন্তর্জাতিক আয়ের সুযোগ তৈরি করে দেয়।
বাংলাদেশে যাঁরা এই কঠিন অথচ সম্ভাবনাময় পিএমপি পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাঁদের জন্য সুনির্দিষ্ট কিছু কৌশল মেনে চলা অত্যন্ত জরুরি। পিএমআইয়ের সর্বশেষ পিএমবোক গাইড ও প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্ট প্র্যাকটিস গাইডগুলো গভীরভাবে অধ্যয়ন করতে হবে। কারণ, বর্তমানে প্রথাগত মুখস্থ বিদ্যার চেয়ে সিচুয়েশনাল বা পরিস্থিতিভিত্তিক প্রশ্নের ওপর জোর দেওয়া হয় বেশি। বাজারে অনেক অথরাইজড ট্রেনিং পার্টনার বা স্বনামধন্য প্রিপারেশন সেন্টার রয়েছে, যেখান থেকে ৩৫ ঘণ্টার ম্যান্ডেটরি ট্রেনিং এবং সঠিক গাইডলাইন নেওয়া যেতে পারে। পড়াশোনার পাশাপাশি মক টেস্ট বা প্র্যাকটিস এক্সামে নিয়মিত অংশ নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ চার ঘণ্টার দীর্ঘ এই পরীক্ষায় সময়ের সঠিক ব্যবস্থাপনা বা টাইম ম্যানেজমেন্ট অনেক বড় একটি চ্যালেঞ্জ। প্রতিদিন অন্তত দুই থেকে তিন ঘণ্টা সময় নির্দিষ্ট করে পড়াশোনা, কনসেপ্ট ক্লিয়ার করা এবং জটিল কেস স্টাডিগুলো নিয়ে গ্রুপের সঙ্গে আলোচনা করলে পরীক্ষার ভীতি কাটিয়ে ওঠা সহজ হয়। প্রজেক্ট ম্যানেজমেন্টসহ আরও কিছু প্রফেশনাল ডিগ্রি দিয়ে থাকে পিএমআই। প্রতিনিয়ত আপডেট, ম্যাটেরিয়াল, লোকাল চ্যাপটার, সিমুলেশন ও কোর্স রিলেটেড সবকিছু পাওয়া যায় ওয়েবসাইটে। তা ছাড়া আপনি যদি পিএমপি কোর্স রিলেটেড আপডেট ও অনলাইনে ঘরে বসে প্রস্তুতি নিতে চান তাহলে www.youtube.com/@AmerAlipmp নামে ইউটিউব চ্যানেল ফলো করতে পারেন। বাংলাদেশে পিএমাই চ্যাপটারে যুক্ত হতে চাইলে ফেসবুকে ও লিংকডইনেও যুক্ত হতে পারেন।
মনের ভেতর এই আত্মবিশ্বাস রাখতে হবে যে সঠিক কৌশল, কঠোর পরিশ্রম ও অধ্যবসায়ের মাধ্যমেই কেবল এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অর্জন সম্ভব, যা আপনার ক্যারিয়ারের সব দরজাকে একনিমেষে খুলে দিতে প্রস্তুত।
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: nomanibsl@gmail.com মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com