পবিত্র চন্দ্র টাঙ্গাইলের গোপালপুরের একটি হতদরিদ্র পরিবারের সন্তান। পেশায় ছিলেন কাঠমিস্ত্রি, আয় ছিল সামান্য। স্ত্রীর স্বর্ণালংকার বিক্রির কিছু অর্থ আর একটি বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে সৌভাগ্যের সন্ধানে পাড়ি জমান রাশিয়ায়। কাজ দেওয়ার কথা বলে দেশটিতে নেওয়া হলেও তিনিসহ ৩০ জন বাংলাদেশি নাগরিককে জোর করে পাঠানো হয় রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে। বেঁচে যাওয়া সঙ্গীদের কাছ থেকে পরিবার খবর পেয়েছে, যুদ্ধক্ষেত্রে পবিত্রর মৃত্যু হয়েছে; কিন্তু মৃত্যুশোকের সঙ্গে এখন পরিবারটিকে তাড়া করছে পাওনাদারদের অব্যাহত তাগাদা।
এটি শুধু পবিত্র চন্দ্রর পরিবারের গল্প নয়। কাজের জন্য রাশিয়ায় গিয়ে প্রতারিত ৩০ জন তরুণ–যুবকের পরিবারের অবস্থা কমবেশি একই রকম। এই ৩০ জনের মধ্যে পবিত্রসহ ২০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। দুজন আহত হয়ে রাশিয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। দুজন দেশে ফিরতে পেরেছেন। বাকি ছয়জন এখনো বাধ্য হয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে লড়ছেন।
১৪ অক্টোবর এক সংবাদ সম্মেলনে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) জানিয়েছে, গত ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ৩০ বাংলাদেশি রাশিয়ায় যান। নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে কাজের কথা বলে তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে ১০ লাখ টাকা করে নেওয়া হয়। রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুত চাকরি না দিয়ে পাসপোর্ট ও মুঠোফোন কেড়ে নিয়ে তাঁদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। এরপর ২১ দিনের সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাঁদের নামানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে।
প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ৩০ জনের মধ্যে ১৭ জন মারা যান। পরে বিভিন্ন সময় আরও তিনজনের মৃত্যু হয়।
.
পবিত্রর ভগ্নিপতি তপন চন্দ্র সূত্রধর প্রথম আলোকে বলেন, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পরের কয়েক দিন তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ ছিল। তখন বলেছিলেন, তিনিসহ কয়েকজনকে একটি হোটেলে রাখা হয়েছে, কাগজপত্র ঠিক হওয়ার পর কাজ দেওয়া হবে। বেশ কিছুদিন যোগাযোগ বন্ধ থাকার পর ২৯ মে তিনি ফোন করে পরিবারের সদস্যদের বলেন, ‘আমাদের জোর করে যুদ্ধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, ওখানে মৃত্যুর আশঙ্কা ৯৫ ভাগ।’
.‘দুনিয়ায় দেখা না হলে দেখা হবে হাশরের মাঠে’, রাশিয়ায় নিহত বাংলাদেশিদের লাশও দেশে আসে না.
৩০ বছর বয়সী পবিত্র চন্দ্রর ছয় ও আট বছরের দুটি মেয়ে আছে। মৃত্যুর খবর শোনার পর তাঁর স্ত্রী মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হয়েছেন। কখনো হাসেন, কখনো কাঁদেন। স্ত্রীর গয়না বেচে পাওয়া ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা এবং একটি বেসরকারি সংস্থা ও স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে সাড়ে ৯ লাখ টাকা ঋণ নিয়ে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন পবিত্র।
পবিত্রর ভগ্নিপতি তপন চন্দ্র সূত্রধর প্রথম আলোকে বলেন, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পরের কয়েক দিন তাঁর সঙ্গে পরিবারের যোগাযোগ ছিল। তখন বলেছিলেন, তিনিসহ কয়েকজনকে একটি হোটেলে রাখা হয়েছে, কাগজপত্র ঠিক হওয়ার পর কাজ দেওয়া হবে। বেশ কিছুদিন যোগাযোগ বন্ধ থাকার পর ২৯ মে তিনি ফোন করে পরিবারের সদস্যদের বলেন, ‘আমাদের জোর করে যুদ্ধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, ওখানে মৃত্যুর আশঙ্কা ৯৫ ভাগ।’
এরপর পবিত্র বাংলাদেশ দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করে তাঁকেসহ অন্যদের দেশে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা করতে অনুরোধ করেছিলেন। পাশাপাশি নিজের ভুল–ত্রুটির জন্য বাড়ির সবার কাছে ক্ষমাও চেয়েছিলেন।
.
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অটোরিকশা চালাতেন রবিন মীর। গ্রামের জমি ও গবাদিপশু বিক্রির পাশাপাশি ঋণ করে কাজের উদ্দেশ্যে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন তিনিও। তাঁর সঙ্গে যান নারায়ণগঞ্জের আরও তিনজন। তাঁদের মাধ্যমে রবিনের মৃত্যুর খবর পায় পরিবার।
.চার মাস পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ নেই, এরপর রাশিয়া থেকে এক বন্ধুর বার্তা—‘সাগর আর নেই’.
পরে পবিত্রর সঙ্গীদের মাধ্যমে পরিবার তাঁর মৃত্যুর খবর পায়। তবে দূতাবাস বা সরকারি কোনো মাধ্যমে পরিবার এখনো খবরটি নিশ্চিত হয়নি। ভগ্নিপতি তপন চন্দ্র বলেন, ‘পরিবারটি এমন অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে যে ভাত খেতে বসলে ঋণদাতারা টাকার জন্য পেছনে এসে দাঁড়িয়ে থাকেন। এখন অবশিষ্ট ৩ শতাংশ জমি বিক্রি করার চিন্তা করা হচ্ছে; কিন্তু তাতেও ঋণ শোধ হবে না। তবে পরিবারটির শেষ আশা—পবিত্র বেঁচেও থাকতে পারেন।’
নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে অটোরিকশা চালাতেন রবিন মীর। গ্রামের জমি ও গবাদিপশু বিক্রির পাশাপাশি ঋণ করে কাজের উদ্দেশ্যে রাশিয়ায় গিয়েছিলেন তিনিও। তাঁর সঙ্গে যান নারায়ণগঞ্জের আরও তিনজন। তাঁদের মাধ্যমে রবিনের মৃত্যুর খবর পায় পরিবার।
রবিন মীরের ভাতিজা রাহাত চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, রাশিয়ায় যাওয়ার পর প্রথম তিন-চার দিন চাচাকে ভালো খাবার দেওয়া হয়, ঘোরানোও হয়। এরপর পাঁচ-ছয় দিন কোনো খোঁজখবর পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে ১৫ মে তিনি জানান, তাঁদের কাজে নেওয়া হচ্ছে। এরপর আবার যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। ১৭ মে একটি ভিডিওতে সেনা ক্যাম্পে চাচাকে দেখা যায়। ২৯ মে চাচা ফোন করে কান্নাকাটি করে বলেন, ‘কাজের কথা বলে গভীর জঙ্গলের মধ্য দিয়ে নিয়ে আমাদের বিক্রি করে দিয়েছে।’ এটাই তাঁর সঙ্গে চাচার শেষ কথা।
.
প্রতারিত ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে রাজন হোসেন ও আদনান হোসেন বাংলাদেশে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছেন; আর পলাশ শেখ ও আলী হাসান সোহেল আহত হয়ে রাশিয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
.‘শিকার হিসেবে’ যুদ্ধক্ষেত্রে, প্রথম দিনই ড্রোন হামলায় ১৭ বাংলাদেশির মৃত্যুর কথা জানাল এসআরবি.
রাহাত চৌধুরী জানান, তাঁর চাচার স্ত্রী ও দুই সন্তান এখন করুণ অবস্থায় দিন পার করছে। দুই সন্তানের মধ্যে মেয়ের বয়স ৯ বছর আর ছেলের ৫ বছর। পাওনাদারেরা প্রতিনিয়ত ফোন করেন, নানা কথা শোনান। এক বেলা খেলে পরের বেলায় তাঁদের খাবার জোটে না।
পবিত্র ও রাহাত ছাড়াও রাশিয়ায় যাওয়া ওই ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে ৭ জনের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। প্রায় সব কটি পরিবারই নিম্নবিত্ত।
পরিবারগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত অন্য ১৮ জন হলেন সোহেল, মো. মেহেদী হাসান, মো. আল মামুন, মো. আবদুল্লাহ আল মামুন, মো. নাজমুল আলম, মো. ওয়াসিম আকরাম, মো. আরিফ হোসেন, মো. সাঈদ মোল্লা, তারিকুল ইসলাম মিন্টু, সাব্বির হোসেন, মফিজ, মো. আরমান আলী, মো. নজরুল ইসলাম, মো. আমিনুর ইসলাম, কাজী রেজাউল করিম, মাইন উদ্দিন, রিপন হোসেন ও আরিফ হোসেন পাটোয়ারী।
প্রতারিত ৩০ বাংলাদেশির মধ্যে রাজন হোসেন ও আদনান হোসেন বাংলাদেশে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছেন; আর পলাশ শেখ ও আলী হাসান সোহেল আহত হয়ে রাশিয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
.রাশিয়ায় মানব পাচারের অভিযোগে বাংলাদেশি কোম্পানির ওপর যুক্তরাজ্যের নিষেধাজ্ঞা.
গোপালগঞ্জের রনি শেখ, লালমনিরহাটের আল আমিন ইসলাম, গোপালগঞ্জের সৌরভ মোল্লা, মাদারীপুরের কামাল হোসেন, কিশোরগঞ্জের আবু হানিফ ও মাদারীপুরের হেলাল শেখ—এই ছয়জন এখনো রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে বাধ্য হয়ে লড়ছেন। তাঁদের কেউ কেউ পরিবারের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন।
সৌরভ মোল্লার সঙ্গে মেসেজিং অ্যাপ ইমোর মাধ্যমে নিয়মিত যোগাযোগ হচ্ছে তাঁর ছোট বোনের স্বামী তাসলিম সরদারের। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, সৌরভ এখন যুদ্ধের ফ্রন্টলাইন থেকে তিন-চার কিলোমিটার ভেতরের দিকে আছেন। তাঁকে দিয়ে বাংকারের জন্য মাটি খোঁড়ার কাজ করানো হচ্ছে। যেকোনো সময় অঘটন ঘটে যেতে পারে। তিনি দুইবার পালিয়ে আসার চেষ্টা করলেও সফল হননি।
তাসলিম সরদার ভুক্তভোগী পরিবারগুলোকে নিয়ে সম্প্রতি ঢাকায় মানববন্ধনও করেছেন। তিনি জানান, সৌরভের সঙ্গে বাংকারের মাটি খোঁড়ার কাজ করছেন কামাল। রনি শেখ ও আল আমিন ক্যাম্প থেকে হেঁটে যুদ্ধের ফ্রন্টলাইনে খাবার, পানি ও অস্ত্র সরবরাহের কাজ করছেন; আর হানিফ ও হেলালের নির্দিষ্ট কাজ নেই। তাঁদের দিয়ে কখনো বাংকারের মাটি খোঁড়া, আবার কখনো খাবার সরবরাহের কাজ করানো হচ্ছে।
.রুশ বাহিনী যুদ্ধক্ষেত্রে বাংলাদেশিদের নিয়োগ দিয়েছে, দাবি ইউক্রেনের গোয়েন্দাদের
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: [email protected] মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com