ঢাকা : সরকারের তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের অধীন স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)। দেশের সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ ও গবেষণার জন্য প্রতিষ্ঠিত এই সংস্থাটিই এখন বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে প্রশ্নের মুখে।
একটি অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে মাত্র দুই দিনে চারটি অনুষ্ঠানের নামে প্রায় ২৪ লাখ টাকা খরচ দেখানো হয়েছে।
কিন্তু নথিপত্র, ভাউচার, অংশগ্রহণকারীর তালিকা এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সরেজমিনে কথা বলে যে তথ্য পাওয়া গেছে, তা সরকারি হিসাবের সঙ্গে গুরুতর অসঙ্গতি নির্দেশ করছে।
কিছু ক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত ব্যক্তিরা বলছেন—
তারা সেই অনুষ্ঠানে কখনোই অংশ নেননি।
ঘটনার সূত্রপাত একটি অস্বাভাবিক তথ্য থেকে।
পিআইবির একটি সেমিনারের অংশগ্রহণকারী তালিকায় দেখা যায়, এস এম আজাদ নামে এক সাংবাদিক ভাতা গ্রহণ করেছেন।
কিন্তু অনুসন্ধানে জানা যায়—
তিনি ২০২২ সালে চাকরি ছেড়ে বিদেশে চলে যান
সেমিনারের সময় তিনি বাংলাদেশে ছিলেন না
তালিকায় থাকা স্বাক্ষরটি ভুয়া
এই একটি অসঙ্গতিই পুরো ঘটনার গভীরে অনুসন্ধানের পথ খুলে দেয়।
পিআইবির নথি অনুযায়ী ‘তারুণ্যের উৎসব ২০২৫’ উপলক্ষে আয়োজন করা হয় চারটি অনুষ্ঠান।
১. সংগীতসন্ধ্যা
ব্যয়: ৫,৭৩,০০০ টাকা
২. চলচ্চিত্র, আলোকচিত্র ও ভিডিও প্রদর্শনী
ব্যয়: ৪,৬৭,৫০০ টাকা
৩. সেমিনার — জুলাই গণঅভ্যুত্থান: সংহতি ও প্রত্যাশা
ব্যয়: ৬,৯১,৫০০ টাকা
৪. সেমিনার — গণঅভ্যুত্থানের দিশা ও দর্শন
ব্যয়: ৬,৬৫,৫০০ টাকা
মোট ব্যয় দেখানো হয়েছে প্রায় ২৩ লাখ ৯৭ হাজার ৫০০ টাকা।

দুটি সেমিনারে ২০০ জন করে অংশগ্রহণকারী দেখানো হয়েছে।
তাদের প্রত্যেককে দেওয়া হয়েছে—
১,০০০ টাকা ভাতা
প্রশিক্ষণ সামগ্রী
রাজস্ব স্ট্যাম্পসহ স্বাক্ষর
কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়—
তালিকায় থাকা অন্তত ৭০ জন সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তারা জানান:
তারা ওই সেমিনারে অংশ নেননি
কোনো ভাতাও নেননি
নথিতে থাকা স্বাক্ষর তাদের নয়
সেমিনারে আলোচক হিসেবে যাদের নাম দেওয়া হয়েছে—
কেউ ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেননি
কেউ আমন্ত্রণই পাননি
কেউ বলেছেন, তিন-চার বছর ধরে পিআইবিতে যাননি
একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বলেন,
“আমার নাম ব্যবহার করা হয়েছে জেনে আমি বিস্মিত। এই সেমিনারের বিষয়ে আমার কোনো ধারণাই নেই।”
অনুষ্ঠানের ব্যয়ের বড় অংশ দেখানো হয়েছে বিভিন্ন দোকানের ভাউচার দিয়ে।
তদন্তকারীরা সরেজমিনে গিয়ে সেই প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে কথা বলেন।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা যায়—
ভাউচারের হাতের লেখা দোকানের নয়
স্বাক্ষর মিলছে না
দোকানের হিসাবখাতায় কোনো লেনদেন নেই
এক দোকানকর্মী বলেন,
“এত বড় অর্ডার হলে আমাদের মনে থাকার কথা। কিন্তু আমরা এমন কোনো কাজ করিনি।”
এক রেস্তোরাঁর নামে দেখানো হয়েছে—
২৫০ প্যাকেট লাঞ্চ
প্রতিটির দাম ৫০০ টাকা
কিন্তু দোকান কর্তৃপক্ষ জানান—
তাদের সাধারণ প্যাকেট খাবারের দাম ১৫০ থেকে ৩০০ টাকার মধ্যে।
পিআইবির অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে সাধারণত সব কর্মসূচির ছবি ও তথ্য প্রকাশ করা হয়।
কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়—
ওই দুই সেমিনারের কোনো ছবি নেই
কোনো প্রেস রিলিজ নেই
ওয়েবসাইটেও উল্লেখ নেই
পিআইবির অবকাঠামো অনুযায়ী—
অডিটোরিয়াম: ২৩৮ আসন
সেমিনার কক্ষ: ৬০ আসন
অর্থাৎ ২০০ জনের সেমিনার আয়োজন করা বাস্তবে কঠিন।
এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“তারুণ্যের উৎসবের সময় অন্য কোনো বড় সেমিনার হয়নি।”
অনুসন্ধানের সময় পিআইবির একজন কর্মকর্তা স্বীকার করেন—
বিল তৈরির কাজটি উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে করা হয়েছিল।
তবে এই দাবি আনুষ্ঠানিকভাবে যাচাই করা যায়নি।
পিআইবির মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন—
একটি অভ্যন্তরীণ চক্র ভুয়া বিল তৈরি করেছিল এবং তিনি সেটি অনুমোদন দেননি।
তবে নথিতে তার স্বাক্ষর রয়েছে।
তদন্তে পাওয়া ব্যাংক নথি অনুযায়ী—
২০২৫ সালের জুন মাসে সোনালী ব্যাংক থেকে চারটি চেকের মাধ্যমে উত্তোলন করা হয়—
২৩,৯৭,৫০০ টাকা।
এই অঙ্কটি পিআইবির অনুষ্ঠানের বিলের সঙ্গে হুবহু মিলে যায়।
এই অনুসন্ধান কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে এনে দিয়েছে—
সরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক তদারকি কতটা কার্যকর?
ভুয়া বিলের মাধ্যমে অর্থ উত্তোলন কীভাবে সম্ভব হলো?
জাল স্বাক্ষর ব্যবহারের দায় কার?
পিআইবি দেশের সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণের অন্যতম প্রধান প্রতিষ্ঠান।
সেখানে যদি—
ভুয়া সেমিনার
জাল স্বাক্ষর
ভুয়া ভাউচার
ব্যবহার করে অর্থ উত্তোলনের অভিযোগ ওঠে, তাহলে তা শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের নয়, পুরো গণমাধ্যম প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে ফেলে।
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: nomanibsl@gmail.com মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com