ভোট চুরি রুখতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি আদায় করে দেশ ও সংবিধান বাঁচানোর শপথ নিলেন ভারতের মোদিবিরোধী ‘ইন্ডিয়া’ জোটের নেতারা। আজ রোববার রামলীলা ময়দানের ‘ভোট বাঁচাও দেশ বাঁচাও’ বিক্ষোভ সমাবেশে প্রত্যেকেই বললেন, এটা কোনো একটি দলের লড়াই নয়; কোনো বিশেষ মতাবলম্বীদের লড়াই নয়; এটা গণতন্ত্রপ্রিয় প্রত্যেক ভারতীয়র সংগ্রাম। জ্ঞানেশ কুমারকে সরানোর পর সেই সংগ্রামের লক্ষ্য নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহদের ক্ষমতাচ্যুত করে দেশের গণতন্ত্র রক্ষা করা।
কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী বলেন, জ্ঞানেশদের দৌলতেই নরেন্দ্র মোদি-অমিত শাহরা রাজত্ব করতে পারছেন। সেই রাজত্ব করা সম্ভব হয়েছে ভোট চুরির জন্য। ১৫ শতাংশ ভোটারের নাম তাঁরা বাদ দিয়েছেন। এর শাস্তি তাঁদের পেতেই হবে। রাহুল বলেন, জ্ঞানেশকে কারাগারে যেতেই হবে। তিনি যা করেছেন, তা রাষ্ট্রদ্রোহ। মোদি-শাহকেও শাস্তির মুখোমুখি হতে হবেই। তাঁদের জেনে রাখা ভালো, যে যতই শক্তিশালী ও সম্পদশালী হোন, সংবিধানের চেয়ে কেউ বড় নন।
.
ইন্ডিয়া জোটের রামলীলা ময়দানের জনসভা ছিল ভোট চুরির বিরুদ্ধে আন্দোলনের আরেক অধ্যায়। ভোট চুরির বিরুদ্ধে জনমত গঠন ও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের পাশাপাশি ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া বাতিলের দাবিতে বিভিন্ন রাজ্যের রাজধানীতে ইন্ডিয়া জোটের জনসভা আয়োজনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। দিল্লির জনসভা ছিল সেই কর্মসূচির প্রথম। দিল্লি পুলিশ শর্তাধীন সেই জনসভার অনুমতি দিয়েছিল। সেসব শর্ত মেনেই বিরোধী নেতারা এই আয়োজন করেন। সেদিক থেকে বলা যায়, ইন্ডিয়া জোট সফল। নানা ধরনের নিষেধাজ্ঞা সত্ত্বেও রামলীলা ময়দানে ভিড় উপচে পড়েছিল। যত মানুষ ময়দানের ভেতরে ছিলেন, তার চেয়েও বেশি মানুষ ছিলেন বাইরে। বলা যায়, এই সভা থেকে আগামী বছরের গোড়ায় পাঞ্জাব, উত্তরাখন্ড ও উত্তর প্রদেশ বিধানসভার ভোটের প্রচারও বিরোধীরা শুরু করে দিল।
.
আজ বিকেল পাঁচটার মধ্যে রামলীলা ময়দানের সভা শেষ করার নির্দেশ দিয়েছিল দিল্লি পুলিশ। ফলে ইন্ডিয়া জোটের নেতাদের পাঁচ মিনিটের বেশি ভাষণ দেওয়ার সুযোগ ছিল না। শুধু জোটের নেতারাই নন, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও মঞ্চে ছিলেন। তাঁরাও ভাষণ দিয়েছেন। প্রত্যেকেই বলেছেন, ঐক্যবদ্ধ হয়ে এই লড়াইয়ের লক্ষ্যে পৌঁছাতে হবে। জ্ঞানেশ ও তাঁর রাজনৈতিক চালকদের সরিয়ে গণতন্ত্র ও সংবিধান রক্ষা করতে হবে।
.
আজ দুপুর ১২টায় হুড খোলা গাড়িতে চেপে মল্লিকার্জুন খাড়গে, রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, অখিলেশ যাদব, তেজস্বী যাদব, ফারুক আবদুল্লাহ, মেহবুবা মুফতি, সুপ্রিয়া সুলে, কল্পনা সোরেন, সঞ্জয় রাউত, দীপংকর ভট্টাচার্য, এম এ বেবিদের মতো ইন্ডিয়া জোটের নেতা–নেত্রীরা কনট প্লেস-মিন্টো রোড ক্রসিং থেকে রামলীলা ময়দান অভিমুখে রওনা দেন। তাঁদের সঙ্গে হাঁটতে থাকেন হাজারো কর্মী-সমর্থক। অন্য নেতারাও একই রকম গাড়িতে চেপে এগোতে থাকেন।
.
মিছিল করে রামলীলা ময়দানে যাওয়ার জন্য ইন্ডিয়া জোট পুলিশের অনুমতি চায়নি। কাজেই পুলিশের মধ্যে একটা দোলাচল ছিল। কিন্তু নেতারা হুড খোলা গাড়িতে থাকায় পুলিশ আপত্তি জানায়নি। মিছিলের পাশাপাশি চলতে থাকেন পুলিশের সদস্যরাও। সোয়া এক কিলোমিটার রাস্তা পেরোতে সময় লাগে দুই ঘণ্টার বেশি। যদিও এর আগেই ময়দান ভর্তি হয়ে যায় লাখো মানুষে। তাই রাহুলদের পৌঁছানোর আগেই কর্মী-সমর্থকদের ঢোকার দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। হাজার হাজার মানুষ ছড়িয়ে–ছিটিয়ে পড়েন ময়দানের আশপাশে।
.ভারতে সাড়া ফেলা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’র প্রতিষ্ঠাতা কে এই অভিজিৎ.
রাহুলসহ ইন্ডিয়া জোটের নেতারা পৌঁছানোর আগেই রামলীলায় পৌঁছান সোনিয়া গান্ধী। শারীরিক কারণে অন্যদের মতো তিনি মিছিলে অংশ নেননি। কংগ্রেস নেতৃত্বের সুরে কথা না বলে মাঝেমধ্যেই বিতর্কে জড়ান যিনি, সেই শশী থারুর এই সমাবেশে সবাইকে যোগ দেওয়ার জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বার্তা দিয়েছিলেন। জনসভায় তিনি বলেন, জ্ঞানেশের বিরুদ্ধে জনতা আওয়াজ তুলেছে। সেই আওয়াজ শুনে তাঁর সরে যাওয়া উচিত। জ্ঞানেশের বোঝা উচিত, দেশের মানুষের বিন্দুমাত্র আস্থা তাঁর প্রতি নেই।
.
সভা সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিলেন দিল্লি কংগ্রেসের নেতা অজয় মাকেন। বিকেল পাঁচটার মধ্যে জনসভা শেষ করতে হবে বলে ঘড়ি ধরে প্রত্যেক নেতা পাঁচ মিনিট ভাষণ দেন।
জম্মু ও কাশ্মীরের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ফারুক আবদুল্লাহ বলেন, ‘এসআইআরে মুসলমান ভোটারদের নাম বেছে বেছে বাদ দেওয়া হয়েছে, কেননা মুসলমান মানেই নাকি পাকিস্তানপন্থী। উত্তর প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী যোগী আদিত্যনাথ অভিযোগ করেছেন, তাঁর রাজ্যে দেড় কোটি হিন্দুর নাম কাটা গেছে। তাঁদের নাম তোলার দাবি জানিয়েছেন তিনি। তা হলে হিন্দুরাও কি পাকিস্তানপন্থী?’
.
জম্মু ও কাশ্মীরের আরেক সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মেহবুবা মুফতি বলেন, জ্ঞানেশ ইস্তফা না দিলে ভারত অটুট থাকবে না। বিহারের আরজেডি নেতা তেজস্বী যাদব বলেন, মহাভারতে শকুনি মামার মতো ভোট চুরির পাশার চাল দিয়েছে বর্তমান শাসক। এদের উৎখাত করাই প্রত্যেকের লক্ষ্য।
.পুলিশকে ফাঁকি দিয়েছেন ঠিকই, মোদির জন্য কি চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারবেন নেহা বোরা.
উত্তর প্রদেশের সমাজবাদী পার্টির নেতা অখিলেশ যাদব বলেন, দেশবাসী পশ্চিমবঙ্গে ভোট লুট হতে দেখেছে। বিজেপি চায় তাদের সমর্থকেরাই শুধু ভোট দিন। সে জন্যই জ্ঞানেশকে দিয়ে ভোট চুরির চক্রান্ত হয়েছে। তিনি বলেন, বিজেপির উত্থান হয়েছিল উত্তর প্রদেশ থেকে। বিসর্জনও সেখান থেকেই শুরু হবে। ওদের বিদায়ের ঘণ্টা বেজে গেছে। বারানসির ভোটের ফল তার প্রমাণ।
.
পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ও তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের ভোটে আমরা হারিনি। আমাদের হারানো হয়েছে।’ জ্ঞানেশ কুমারকে ‘ভ্যানিশ কুমার’ অভিহিত করে তিনি বলেন, ‘উনি যাবেন, বিজেপিকেও যেতে হবে।’
সমাবেশে সোনিয়া গান্ধী ভাষণ দেননি। সংক্ষিপ্ত ভাষণ দেন মল্লিকার্জুন খাড়গে, সিপিএম নেতা এম এ বেবি, সিপিআই (এমএল) লিবারেশন নেতা দীপংকর ভট্টাচার্য ও ওই দলের ছাত্রসংগঠন ‘আইসা’ নেত্রী নেহা বোরা। সবার শেষে ভাষণ দেন রাহুল গান্ধী। তিনি বলেন, ‘জ্ঞানেশ কুমার ছাড়া মোদি প্রধানমন্ত্রী হতে পারবেন না, অমিত শাহও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হতে পারবেন না। জেনে রাখুন, জ্ঞানেশকে জেলে যেতে হবেই।’ রাহুল বলেন, ‘কদিন আগে অমিত শাহ বলেছিলেন, মোদি কোথাও যাবেন না। আমি বলছি, আমরা ওঁকে কোথাও যেতে দেব না। জ্ঞানেশের ইস্তফার পর ওঁদের অপরাধের বিচার হবে।’
.মোদিবিরোধী জোটের বিক্ষোভে লাখো মানুষ, রামলীলা ময়দানের ভেতরে যত জন, বাইরে তার দ্বিগুণ
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: [email protected] মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com