বাজারে এক পণ্যের দাম কমছে, আবার আরেক পণ্যের বাড়ছে। বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, সবজির দামে স্বস্তি ফিরলেও অন্যান্য পণ্যের দাম বেড়েছে। ডিম ও আলুর দাম বেড়েছে। সবজির মধ্যে পেঁয়াজ ও কাঁচা মরিচের দাম বাড়তি। নিত্যপণ্যের বাজারে এমন বিপরীতমুখী প্রবণতার মধ্যে কমেছে খাদ্য মূল্যস্ফীতি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতির ধরন: জুলাই–সেপ্টেম্বর ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকের গড় খাদ্য মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ১৩ শতাংশে নেমেছে। আগের প্রান্তিকে এই হার ছিল ৮ দশমিক ৬৮ শতাংশ। সবজির দাম কমার পাশাপাশি চাল ও গমের দাম কমে যাওয়ায় খাদ্য মূল্যস্ফীতি কমেছে। তবে মাছ, মাংস, ডিম, দুধ ও ডালের মতো প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের মূল্য বাড়তির দিকে আছে। খাদ্য মূল্যস্ফীতিতে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবারের অবদান ৫১ শতাংশের বেশি।
চলতি অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) দেশে সার্বিক মূল্যস্ফীতি কমে হয়েছে গড়ে ৮ দশমিক ৩১ শতাংশ। আগের প্রান্তিকে (এপ্রিল–জুন) এই হার ছিল ৯ দশমিক ২১ শতাংশ।
.
খাদ্যের দাম কিছুটা কমলেও জ্বালানির দাম বেড়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে প্রথম প্রান্তিকে জ্বালানি খাতে মূল্যস্ফীতি গড়ে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশে উঠেছে। আগের প্রান্তিকে এই হার ছিল ১৭ শতাংশ।
জ্বালানি খাতের মূল্যস্ফীতির প্রধান উৎস হলো কাঠ, কৃষিজাত বর্জ্য, গোবর ও পাটকাঠির মতো জ্বালানি পণ্য। এ খাতে মূল্যস্ফীতি বেড়ে ২২ দশমিক ১ শতাংশ হয়েছে, আগের প্রান্তিকে যা ছিল ২১ দশমিক ৮ শতাংশ। জ্বালানি তেল ও লুব্রিকেন্টের মতো তরল জ্বালানি খাতের মূল্যস্ফীতিও ১৩ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ১৪ দশমিক ৭ শতাংশ হয়েছে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে দেশে জ্বালানির দাম বাড়ানো হলেও বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর প্রকাশিত ভোক্তা মূল্যসূচকে সেই বৃদ্ধির প্রভাব প্রতিফলিত হয়নি। ফলে পরবর্তী মাসে জ্বালানি খাতে মূল্যস্ফীতির চাপ আরও বাড়ে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
জ্বালানির দাম বাড়লে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয়ের ওপরও চাপ তৈরি হতে পারে। তবে এই প্রতিবেদনে জ্বালানির দাম বৃদ্ধির কারণে পরিবহন বা উৎপাদন ব্যয় কতটা বেড়েছে, তার আলাদা হিসাব দেওয়া হয়নি। সাধারণত জ্বালানির দাম বাড়লে সবকিছুর দামই বাড়ে। বিবিএসের অক্টোবর মাসের মূল্যস্ফীতির পরিসংখ্যানে তার প্রতিফলন দেখা যাবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
.
মূল্যস্ফীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো আমদানিনির্ভর পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাবে প্রথম প্রান্তিকে সার্বিক মূল্যস্ফীতির ২৭ শতাংশ এসেছে আমদানিনির্ভর খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্য। আগের প্রান্তিকে এই হার ছিল ২৪ দশমিক ৯ শতাংশ।
অন্যদিকে দেশীয় পণ্যের অবদান ৭৫ দশমিক ১ শতাংশ থেকে কমে ৭৩ শতাংশ হয়েছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতিতে দেশীয় খাদ্যপণ্যের ভূমিকা কমলেও আমদানিনির্ভর খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত পণ্যের বেড়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থা বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) প্রতিবেদন বলছে, মাল্টা, আপেল, নাশপাতি ও আঙুরের ওপর বছর বছর শুল্ক–কর বাড়িয়েছে সরকার। বাজারে ফলের দাম বেড়েছে। খাদ্যবহির্ভূত বিভিন্ন পণ্যের শুল্কও বাড়ানো হয়েছে। অবশ্য বিশ্ববাজারে বিভিন্ন পণ্যের দামও বেড়েছে।
এ প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক সায়েমা হক বলেন, দেশে চার বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি আছে। তাই মূল্যস্ফীতি বেশি হারে না কমলে মানুষের জীবনে তার প্রভাব সেভাবে অনুভূত হয় না। তিনি আরও বলেন, দরিদ্র মানুষের খাদ্য ব্যয় অন্যদের তুলনায় বেশি। খাদ্যের দাম বেড়ে গেলে খাবারের তালিকা কাটছাঁট করা ছাড়া তাঁদের উপায় থাকে না। ফলে দীর্ঘ সময় খাদ্য মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে তাঁদের জীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
প্রোটিন–জাতীয় খাদ্যের দাম বৃদ্ধির প্রসঙ্গে সায়েমা হক বলেন, এতে মানুষের পুষ্টি চাহিদায় প্রভাব পড়বে। বিশেষ করে দুধের দাম বেড়ে গেলে শিশুদের পুষ্টিতে প্রভাব পড়ে। ডিমের দাম বেড়ে গেলে প্রাপ্তবয়স্ক, বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের পুষ্টির ঘাটতি হয়। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে খাদ্যনিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি না হলেও পুষ্টির ঘাটতি হচ্ছে।
.
বাস্তবতা হলো বাজারে খাবার, বাসাভাড়া, যাতায়াত ও চিকিৎসার খরচ মেটানোর পর হাতে খুব বেশি টাকা থাকে না মানুষের। সম্প্রতি প্রকাশিত বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) জরিপে দেখা গেছে, ৪৭ শতাংশ পরিবারকে সংসার চালাতে ঋণ করতে হয়। মূল্যস্ফীতির চাপে গত দুই বছর ধরে এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হচ্ছেন সাধারণ মানুষ। এই সময়ে পণ্যের দাম যে হারে বেড়েছে, মজুরি বেড়েছে তার চেয়ে ধীরগতিতে। ফলে আয় বাড়লেও সেই বাড়তি আয় দিয়ে আগের মতো পণ্য ও সেবা কেনা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত দুই বছর ধরে মূল্যস্ফীতির হার ধারাবাহিকভাবে মজুরি বৃদ্ধির হার ছাড়িয়ে গেছে। এতে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কমেছে। ২০২৬–২৭ অর্থবছরের প্রথম প্রান্তিকে (জুলাই–সেপ্টেম্বর) মজুরি ও মূল্যস্ফীতির ব্যবধান আগের প্রান্তিকের তুলনায় কমলেও সেপ্টেম্বরের দিকে তা আবার বাড়তে শুরু করে। এর কারণ মূল্যস্ফীতির উল্লেখযোগ্য উন্নতি না হলেও মজুরি বৃদ্ধির গতি কমে যাওয়া। ফলে মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ আবার বেড়েছে।
কিছু পণ্যের দাম কমেছে, আবার কিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। এর সঙ্গে মজুরি বৃদ্ধির ধীরগতি মানুষের প্রকৃত আয় ও ক্রয়ক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে। এই পরিস্থিতিতে খাদ্য মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমলেও নিত্যপণ্যের বাজারে পুরোপুরি স্বস্তি ফেরেনি বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: [email protected] মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com