নিরাপত্তা ছাড়পত্র না পেয়ে একের পর এক স্থগিত হচ্ছে কনসার্ট। আবার অনুমতি পাওয়ার পরও দর্শকের চাপ সামলাতে না পেরে অনুষ্ঠান বাতিল হচ্ছে, কখনো অনুমতি ছাড়াই পরিবর্তন হচ্ছে ভেন্যু, আবার কখনো টিকিট ছাড়াই ভেন্যুতে ঢুকে পড়ছেন দর্শক। সব মিলিয়ে দেশে ওপেন এয়ার কনসার্টের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটা শঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিষয়গুলো নজরে এসেছে ব্যান্ড তারকা এবং বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশনের (বামবা) সভাপতি হামিন আহমেদের। এই পরিস্থিতিকে তিনি কীভাবে দেখছেন? এ ধরনের অনিশ্চয়তা দেশের ব্যান্ডসংগীতের চর্চা ও কনসার্ট আয়োজনের ওপর কী প্রভাব ফেলছে? শিল্পী, দর্শক ও আয়োজকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন—সে বিষয়ে তিনি কথা বলেছেন প্রথম আলোর সঙ্গে। হামিন আহমেদের ভাবনা–চিন্তা এখানে তুলে ধরা হলো...
.
ব্যান্ডসংগীতের প্রতি এ দেশের তরুণদের আগ্রহ ও উদ্দীপনা অনেক। কনসার্টগুলোতে দর্শকের ব্যাপক উপস্থিতি তারই প্রমাণ। বাংলাদেশে সমসাময়িক সংগীত, বিশেষ করে ব্যান্ডসংগীতের যে বিস্তার ঘটেছে, তা এখন আর অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু এই বিপুল আগ্রহ ও চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কনসার্ট আয়োজনের উপযুক্ত অবকাঠামো আমরা গড়ে তুলতে পারিনি। সাম্প্রতিক সময়ে কনসার্টের নিরাপত্তা নিয়ে যে অনিশ্চয়তা ও বিশৃঙ্খলা দেখা যাচ্ছে, তার পেছনে উপযুক্ত ভেন্যুর অভাবও একটি বড় কারণ।
আমার মনে হয়, এখনই ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণে দুটি স্থায়ী কনসার্ট ভেন্যু প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সেখানে নিয়মিত, এমনকি প্রতিদিনও কনসার্ট আয়োজনের সুযোগ থাকতে পারে। ভেন্যুগুলো হতে হবে সবার ব্যবহারের উপযোগী উন্মুক্ত জায়গা, যেখানে দর্শকের প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ফটক থাকবে, ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকবে এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। অনেকটা স্টেডিয়ামের আদলে এসব ভেন্যু গড়ে তোলা যেতে পারে।
এখন কনসার্ট আয়োজনের জন্য কখনো মাঠ, কখনো রাস্তার পাশের জায়গা, কখনো অন্য কোনো অস্থায়ী স্থানের অনুমতির ওপর নির্ভর করতে হয়। কোথায় আয়োজন করা যাবে, কোথায় অনুমতি পাওয়া যাবে—এসব অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে যেতে হয় আয়োজকদের। অথচ বড় কনসার্টের জন্য সব জায়গা উপযুক্ত নয়। ক্রিকেট বা ফুটবল আয়োজনের জন্য যেমন নির্দিষ্ট স্টেডিয়াম রয়েছে, কনসার্টের জন্যও তেমন উপযোগী ভেন্যু দরকার। কারণ, হাজার হাজার দর্শকের প্রবেশ, অবস্থান ও বের হওয়ার বিষয়টি পরিকল্পিতভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। রাস্তার পাশে বা সাধারণ কোনো মাঠে বড় আয়োজন করলে অনেক সময় সেই নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করার সুযোগ থাকে না।
.
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ মিউজিক্যাল ব্যান্ডস অ্যাসোসিয়েশন (বামবা) ভূমিকা রাখতে পারে। সরকার বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আমাদের একটি উপযুক্ত জায়গা দিলে আমরা নিজেরাই সেটির ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনার দায়িত্ব নিতে পারি। এমন একটি ব্যবস্থা করা সম্ভব, যাতে দেশের সব ব্যান্ড ও একক সংগীতশিল্পী ভেন্যুটি ব্যবহার করতে পারেন। এটি কোনো নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠান বা গোষ্ঠীর জন্য নয়, সংগীতাঙ্গনের সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত।
ভেন্যুর পাশাপাশি বড় কনসার্টে জননিরাপত্তা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। এ দায়িত্বে পুলিশ প্রশাসনকে আয়োজকদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে কনসার্টের নিরাপত্তার বিষয়টিও সম্পর্কিত—এ কথা আমরা বুঝি। তবে ক্রিকেট, ফুটবল, হকিসহ অন্যান্য বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে যদি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়, তাহলে কনসার্টের ক্ষেত্রেও তা করা সম্ভব হওয়া উচিত।
.
এখনই ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণে দুটি স্থায়ী কনসার্ট ভেন্যু প্রতিষ্ঠা করা জরুরি। সেখানে নিয়মিত, এমনকি প্রতিদিনও কনসার্ট আয়োজনের সুযোগ থাকতে পারে। ভেন্যুগুলো হতে হবে সবার ব্যবহারের উপযোগী উন্মুক্ত জায়গা, যেখানে দর্শকের প্রবেশ ও বের হওয়ার জন্য পর্যাপ্ত ফটক থাকবে, ভিড় নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা থাকবে এবং সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। অনেকটা স্টেডিয়ামের আদলে এসব ভেন্যু গড়ে তোলা যেতে পারে।
হামিন আহমেদ
.
কোনো বড় আয়োজনে হয়তো প্রয়োজনের তুলনায় পুলিশের সদস্যসংখ্যা কম থাকতে পারে। কিন্তু সে ক্ষেত্রে আয়োজকদের সঙ্গে সমন্বয় করে একটি নিরাপত্তাবলয় তৈরি করা যায়। অনুমতি দেওয়ার সময় পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আয়োজকদের স্পষ্ট নির্দেশনা দেওয়া প্রয়োজন—কোথায় কতজন নিরাপত্তাকর্মী থাকবেন, কীভাবে দর্শক প্রবেশ করবেন, কোন পথে বের হবেন, জরুরি পরিস্থিতিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অর্থাৎ নিরাপত্তার দায়িত্ব শুধু আয়োজকদের ওপর ছেড়ে না দিয়ে প্রশাসনকে পরিকল্পনা ও নির্দেশনার মাধ্যমে পাশে থাকতে হবে।
.
এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ আনসার বাহিনীকেও যুক্ত করা যেতে পারে। বাংলাদেশে আনসার একটি বড় বাহিনী, সংবাদ থেকে যতটুকু জানতে পেরেছি, সদস্যসংখ্যা ৬০ লাখের বেশি (বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ওয়েবসাইটে উল্লেখ আছে, এই বাহিনীর সদস্যসংখ্যা ৬১ লাখ)। পুলিশের জনবলের সীমাবদ্ধতা থাকলে পুলিশ ও আনসার যৌথভাবে বড় কনসার্টের নিরাপত্তার দায়িত্ব পালন করতে পারে। বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালনের জন্য পুলিশের সদস্যদের ব্যস্ত থাকতে হয়। তাই আনসার বাহিনীর সদস্যদের যথাযথভাবে কাজে লাগানো গেলে কনসার্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও কার্যকর হতে পারে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কনসার্ট আয়োজনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করা। বিশেষ করে যেসব প্রতিষ্ঠান টিকিট বিক্রি করে বড় পরিসরে কনসার্ট আয়োজন করছে, তাদের সক্ষমতা যাচাই করা প্রয়োজন। আমি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়কে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়ার অনুরোধ জানাব। আয়োজক প্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা, জনবল, ব্যবস্থাপনার সক্ষমতা ও প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করে নিবন্ধনের আওতায় আনা উচিত। এসব প্রতিষ্ঠানকে যৌথ মূলধনি কোম্পানি ও ফার্মগুলোর পরিদপ্তরে (আরজেএসসি) নিবন্ধিত হওয়ার পাশাপাশি সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের কাছেও তালিকাভুক্ত থাকতে হবে।
.
ভেন্যুর পাশাপাশি বড় কনসার্টে জননিরাপত্তা ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি। এ দায়িত্বে পুলিশ প্রশাসনকে আয়োজকদের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করতে হবে। দেশের সামগ্রিক নিরাপত্তা পরিস্থিতির সঙ্গে কনসার্টের নিরাপত্তার বিষয়টিও সম্পর্কিত—এ কথা আমরা বুঝি। তবে ক্রিকেট, ফুটবল, হকিসহ অন্যান্য বড় আয়োজনের ক্ষেত্রে যদি নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়, তাহলে কনসার্টের ক্ষেত্রেও তা করা সম্ভব হওয়া উচিত।
.
কারণ, বড় কনসার্ট আয়োজন কোনো সাধারণ কাজ নয়। এর জন্য পেশাদার ব্যবস্থাপনা, অভিজ্ঞতা, পর্যাপ্ত কর্মী এবং নিরাপত্তা পরিকল্পনা দরকার। কয়েকজন বন্ধু মিলে ইচ্ছা হলো, একটি বড় কনসার্ট আয়োজন করে ফেললাম—এভাবে আর চলতে পারে না। যারা এ ধরনের আয়োজন করবে, তাদের প্রমাণ করতে হবে যে প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও জনবল তাদের রয়েছে এবং তারা দর্শক, শিল্পী ও সংশ্লিষ্ট সবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সক্ষম।
.
বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের জন্য বিষয়টি আরও দুঃখজনক। স্বাধীনতার ৫৪ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দেশে সংগীত পরিবেশনের জন্য একটি নির্দিষ্ট ও স্থায়ী ভেন্যু গড়ে ওঠেনি। ক্রিকেটের জন্য সিলেট, কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় স্টেডিয়াম রয়েছে। অথচ সংগীতের জন্য উপযুক্ত স্থায়ী আয়োজনস্থল নেই।
.
কনসার্টে দর্শকের উপস্থিতি বেশি হলেই সেটিকে বিশৃঙ্খলা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মানুষ যদি কোনো আয়োজন দেখতে ও তাতে অংশ নিতে আগ্রহী হয়, তাহলে সেই চাহিদা পূরণের ব্যবস্থা করতে হবে। দর্শকের আগ্রহ ও উপস্থিতি একটি ইতিবাচক বিষয়। কিন্তু সেই আগ্রহের অনুপাতে ভেন্যু, নিরাপত্তা ও ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে না পারলে সমস্যা তৈরি হবে। দর্শককে জায়গা দিতে হবে, তাদের নিরাপদে অনুষ্ঠান উপভোগের সুযোগ করে দিতে হবে।
বাংলাদেশের সংগীতাঙ্গনের জন্য বিষয়টি আরও দুঃখজনক। স্বাধীনতার ৫৪ বছরের বেশি সময় পেরিয়ে গেলেও দেশে সংগীত পরিবেশনের জন্য একটি নির্দিষ্ট ও স্থায়ী ভেন্যু গড়ে ওঠেনি। ক্রিকেটের জন্য সিলেট, কক্সবাজার, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জায়গায় স্টেডিয়াম রয়েছে। অথচ সংগীতের জন্য উপযুক্ত স্থায়ী আয়োজনস্থল নেই। অথচ ব্যান্ডসংগীতের প্রতি মানুষের আগ্রহ ও চাহিদা এখন অনেক বেশি।
আমরা আশা করি, সরকার বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণে দুটি স্থায়ী কনসার্ট ভেন্যু প্রতিষ্ঠা, বড় আয়োজনের নিরাপত্তায় পুলিশ ও আনসারের সমন্বয় এবং পেশাদার আয়োজক প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হবে। কনসার্ট শুধু বিনোদনের আয়োজন নয়; এটি দেশের সাংস্কৃতিক চর্চারও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই শিল্পী, দর্শক ও আয়োজকদের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি।
অনুলিখন : মনজুর কাদের
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: [email protected] মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com