বরিশাল অফিস : বরিশালে নির্মাণাধীন একমাত্র ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ হাসপাতাল নিয়ে নতুন করে ষড়যন্ত্র শুরু হয়েছে। প্রকল্পের প্রায় ৫০ লাখ টাকার অক্সিজেন পাইপ চুরির ঘটনার পর এবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে হাসপাতালটির নির্মাণকাজ, ব্যয় এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নিয়ে বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানোর অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পসংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারের দাবি, একটি স্বার্থান্বেষী মহল পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালিয়ে বৃহৎ এই স্বাস্থ্য অবকাঠামো প্রকল্পের বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করছে।
তাঁদের অভিযোগ, হাসপাতালটির নির্মাণকাজ নিয়ে ৭০ কোটি টাকা আত্মসাতের যে দাবি প্রচার করা হচ্ছে, তা প্রকল্পের আর্থিক হিসাব ও বাস্তব নির্মাণকাজের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। একই সঙ্গে চাঁদা না পেয়ে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলেও দাবি করেছেন তাঁরা। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে বরিশালের এই বৃহৎ হাসপাতাল প্রকল্পের নির্মাণকাজ যৌথভাবে বাস্তবায়ন করছে বঙ্গ বিল্ডার্স লিমিটেড ও মেসার্স খান বিল্ডার্স। প্রকল্পটির নকশা অনুযায়ী, নিচে দ্বিতল এবং ওপরে ১৫ তলা—সব মিলিয়ে ১৭ তলা ভবন নির্মাণ করা হচ্ছে।
প্রকল্পের প্রাক্কলিত মূল্য ৯৯ কোটি ৫১ লাখ ৪৫ হাজার ৬১১ টাকা ৯৭৩ পয়সা। দরপত্রে গৃহীত মূল্য ৯৪ কোটি ১ লাখ ৮০ হাজার ৮১০ টাকা ৮৬৪ পয়সা। প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, ভ্যাট ও জামানতের অর্থ বাদ দিলে কাজের মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৭৪ কোটি টাকা।
অথচ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হচ্ছে, প্রায় ১০০ কোটি টাকার প্রকল্প থেকে ৭০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে।
এই দাবির পরিপ্রেক্ষিতে প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, তাঁদের হিসাব অনুযায়ী প্রকৃত কাজের মূল্য যদি প্রায় ৭৪ কোটি টাকা হয়, তাহলে ৭০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করে অবশিষ্ট মাত্র ৪ কোটি টাকা দিয়ে কীভাবে ১৭ তলা ভবনের নির্মাণকাজ সম্পন্ন করা সম্ভব? তাঁদের মতে, প্রকল্পের প্রকৃত ব্যয়, দরপত্রের মূল্য ও বাস্তব অগ্রগতি যাচাই না করে এমন অভিযোগ প্রচার করা বিভ্রান্তিকর।
প্রকল্পটির বাস্তবায়ন নিয়ে নানা বাধা ও ষড়যন্ত্রের অভিযোগ করেছেন গণপূর্ত অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী ফয়সাল আলম।
তিনি বলেন, “আমি শত বাধা-বিপত্তির মধ্যেও বরিশাল অঞ্চলের মানুষ হিসেবে আন্তরিকভাবে চেষ্টা করেছি বরিশালের একমাত্র ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ হাসপাতালটি শতভাগ বাস্তবায়ন করতে। একটি মহল চায় না এই বৃহৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হোক। সব বাধা ও ষড়যন্ত্র উপেক্ষা করে হাসপাতালটির নির্মাণকাজ শতভাগ নিশ্চিত করেছি।”
অক্সিজেন পাইপ চুরির ঘটনার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, যারা হাসপাতাল নিয়ে অপপ্রচার করছে, তাদের কেউ কেউ ওই চুরির ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে বলে তাঁর সন্দেহ। তবে এ বিষয়ে তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন হওয়া প্রয়োজন।
তাঁর দাবি, একটি স্বার্থান্বেষী মহল হাসপাতালটির কাজ যথাসময়ে বাস্তবায়ন হোক, তা চায় না। এ কারণে নির্মাণকাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
প্রকল্পের ঠিকাদার মিজানুর রহমান বলেন, দরপত্রে গৃহীত মূল্য ৯৪ কোটি ১ লাখ ৮০ হাজার ৮১০ টাকা। ভ্যাট ও জামানতের অর্থ বাদ দিলে কাজের মূল্য প্রায় ৭৪ কোটি টাকা। তাছাড়া তাঁরা ২০১৮ সালের রেট অনুযায়ী নির্মাণকাজ করছেন।
তিনি বলেন, “যদি ৭০ কোটি টাকা লুট করা হয়, তাহলে মাত্র ৪ কোটি টাকা দিয়ে ১৭ তলা ভবন নির্মাণ করা সম্ভব? এটি সম্পূর্ণ অবাস্তব কথা।”
মিজানুর রহমানের অভিযোগ, একটি চাঁদাবাজ চক্র চাঁদা না পেয়ে নির্মাণাধীন হাসপাতাল, গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী এবং তাঁর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে অপপ্রচার চালাচ্ছে।
ঠিকাদার আরও বলেন, বৃহৎ এই প্রকল্পের নির্মাণকাজ বাস্তবায়নের দায়িত্ব তাঁর প্রতিষ্ঠানের। সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগের কর্মকর্তারা প্রকল্প পরিদর্শনে এলে তাঁদের সঙ্গে থেকে কাজের অগ্রগতি ও নির্মাণের বিভিন্ন বিষয় বুঝিয়ে দিতে হয়। এটি ঠিকাদারি কাজের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
নিজের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও অপপ্রচার চালানো হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন ঠিকাদার মিজানুর রহমান।
তিনি বলেন, “আমি একজন প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদার ও ব্যবসায়ী। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আমাকে দুটি মামলা দিয়ে হয়রানি করা হয়েছে। অথচ এখন একটি মহল আমাকে আওয়ামী লীগের লোক বানানোর জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে।”
তিনি আরও দাবি করেন, গত ৩ বছরে গণপূর্ত অধিদপ্তর থেকে টেন্ডারের মাধ্যমে তিনি মাত্র দুটি কাজ পেয়েছেন। অথচ তাঁকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন মাধ্যমে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করা হচ্ছে।
এসব প্রচারণার মাধ্যমে একজন পেশাদার ঠিকাদার ও ব্যবসায়ীর সামাজিক ও ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন করা হচ্ছে বলে দাবি করেন তিনি।
মিজানুর রহমান বলেন, কোনো প্রকল্প নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তার সঠিক তথ্য, নথিপত্র ও বাস্তব অগ্রগতি যাচাই করে সমালোচনা করা যেতে পারে। কিন্তু মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত তথ্য প্রচার করে কারও ব্যক্তিগত ও পেশাগত সুনাম নষ্ট করা গ্রহণযোগ্য নয়।
তিনি জানান, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন মাধ্যমে যারা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মিথ্যা তথ্য প্রচার করে তাঁর সুনামহানির চেষ্টা করছেন, তাঁদের বিরুদ্ধে প্রচলিত সাইবার সুরক্ষা আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা, নিজ অঞ্চলে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা। ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগের মতো জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য এ অঞ্চলের বহু মানুষকে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ছুটতে হয়। এতে রোগীদের পাশাপাশি তাঁদের পরিবারের সদস্যদেরও অর্থনৈতিক ও মানসিক চাপের মুখে পড়তে হয়।
এ বাস্তবতায় বরিশালের ক্যান্সার, কিডনি ও হৃদরোগ হাসপাতালটি শুধু একটি ভবন নয়; দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের বিশেষায়িত চিকিৎসাসেবার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনা।
বরিশালবাসীর প্রত্যাশা,ষড়যন্ত্রকারীদের মুখোশ উম্মোচন করতে হবে। তাতের মুখোশ উম্মোচিত হলেই দ্রুত প্রকল্পটির বাস্তবায়ন সম্পন্ন হবে এবং দক্ষিণাঞ্চলের মানুষ এর সুফল পাবেন।
সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী ।
যোগাযোগ: ইমেইল: [email protected] মোবাইল: 01713799669 / 01712596354
কপিরাইট © সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত Bd24news.com