শনিবার ১০ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ২৬শে পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ই-পেপার   শনিবার ১০ই জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ


অপরূপ সৌন্দর্যের লাল শাপলা বিল ও অতিথি পাখিতে মুগ্ধ পর্যটক
প্রকাশ: ১০ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৩:২৫ পূর্বাহ্ণ |
অনলাইন সংস্করণ

অপরূপ সৌন্দর্যের লাল শাপলা বিল ও অতিথি পাখিতে মুগ্ধ পর্যটক

বিডি ২৪ নিউজ অনলাইন: অপরূপ সৌন্দর্যম-িত সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার লাল শাপলা বিল হিসেবে খ্যাত ডিবির হাওড়ে পর্যটকদের ভিড় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বিলের পানিতে ঘুরে বেড়িয়ে মুগ্ধ হচ্ছেন পর্যটকরা। তবে এখানে যে শুধু লাল শাপলা বা প্রকৃতির সবুজ রংয়ের সমারোহই ঘটেছে এমনটাও নয়, এখানে লাল শাপলার মাঝেই দেখা মিলছে বেশ কয়েক জাতের পাখি। চারপাশ তাদের কলরবে মুখর। শীতে এত এত অতিথি পাখি দেখে মুগ্ধ পর্যটকরা। পান, পানি, নারী এই তিনে জৈন্তাপুরী। ঐতিহ্য আর সৌন্দর্যের গভীরতা বোঝাতে এই উপকথা প্রচলিত আছে সিলেটের জৈন্তাপুরে। পান-সুপারিতে আতিথেয়তা সিলেটের সংস্কৃতিরই একটি অংশ।
পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে জৈন্তা রাজ্য শাসন করেছেন খাসিয়া রানী জৈন্তেশ্বরী দেবী। আর স্বচ্ছ জলের সারি নদীর মোহনীয় নীলের কথা কে না জানে। এই তিন উপকথার ফাঁকে নিজের উপস্থিতি জানান দেয় মেঘালয়ের পাহাড়ের কোলে থাকা জৈন্তার লাল শাপলার বিল।
বিলে ফুটে থাকা অজস্র লাল শাপলার রূপে মজে থাকার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার মতো নয়। আর নৌকা দিয়ে বিলের মাঝখানে গেলে তো কথাই নেই। লতাপাতা-গুল্মে ভরা বিলের পানিতে ভেসে থাকা হাজার হাজার লাল শাপলার মাঝে নিজেকে স্বর্গরাজ্যের বাসিন্দা মনে হবে। প্রকৃতির আপন খেয়ালে গড়ে ওঠা সৌন্দর্য বুঝি এমনই হয়।
ওপারে ভারতের মেঘালয়। আকাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। সামনে ঠিক সমতলে বাংলাদেশের ডিবির হাওড়। দেশি মাছের অভয়াশ্রম। এমনিতেই নেশালাগা পরিবেশ ওখানে। প্রকৃতির মাখামাখি গোটা এলাকাজুড়ে। চোখ জুড়ায়, মনও জুড়ায়। তার ওপর গত কয়বছরে বাড়তি সৌন্দর্য এনে দিয়েছে লাল শাপলা। সকাল কিংবা বিকেলে সোনা রোদে লাল শাপলার ঝিলিক নজর কাড়ে পর্যটকদের। আর এই দৃশ্য অবলোকন করতে শুধু সিলেটই নয়, গোটা দেশের পর্যটকরা ছুটে যাচ্ছেন জৈন্তাপুরের ডিবির হাওড়ের লাল শাপলার বিলে।
কথিত আছে, জৈন্তিয়া রাজা বিজয় সিংহের সমাধিস্থল রয়েছে লাল শাপলার বিলে। মুক্তিযুদ্ধের ৪ নম্বর সাব-সেক্টর মেঘালয়ের মুক্তাপুর। কেবল সৌন্দর্য নয়, সিলেটের জৈন্তাপুরের লাল শাপলার বিল প্রাগৈতিহাসিক ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। স্থানীয়দের মতে জৈন্তা রাজ্যের রাজা রাম সিংহের মামা বিজয় সিংহকে এই হাওড়ে প্রাসাদসম ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নৌকা ডুবিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। সেই স্মৃতিতেই নির্মিত দুইশ’ বছরের পুরাতন একটি মন্দিরও রয়েছে লাল শাপলার বিলে। লাল শাপলা বিলের অবস্থান বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী মেঘালয়ের সবুজ পাহাড়ের পাদদেশে। স্থানীয় ভাষায় প্রাকৃতিকভাবেই ৪টি বিল- ডিবি বিল, ইয়াম বিল, হরফকাট বিল ও কেন্দ্রী বিলসহ ৯০০ একর এলাকাজুড়ে লাল শাপলার ‘রাজ্য’।
ডিবির হাওড় মাছের অভয়াশ্রম। এক সময় এই হাওড়ে সারা বছরই পানি থাকত। এখন শুষ্ক মৌসুম শুরু হলেই শুকিয়ে যায়। ফলে লাল শাপলার স্থায়ীত্বও থাকে মাসখানেক। পানি না থাকার কারণে শাপলাও থাকে না। বর্ষায় ফের পানি বৃদ্ধি পেলে শাপলা আচ্ছাদিত হয়ে ওঠে গোটা হাওড়। কয়েকদিন ধরে লাল শাপলার এই অপরূপ দৃশ্য ভেসে উঠছে মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশের জনপদে। ছুটে যাচ্ছে পর্যটকরা। বিশেষ করে নতুন প্রজন্মকে নিয়ে শহরের মানুষ ছুটে যান বিলে শাপলা দেখতে। নৌকা নিয়ে ঘুরে প্রশান্তির ছোঁয়া পান ওখানে।
পরিবেশকর্মী আব্দুল হাইয়ের মতে লাল শাপলার বিল কেবল সৌন্দর্যের পরিচয়ই বহন করে না, জৈন্তিয়ার ইতিহাসের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেয়। পৌরাণিক আমলে নারীশাসিত রাজ্য ছিল এই জৈন্তাপুর। সৌন্দর্যের সঙ্গে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের সম্মিলন এই ৪টি বিল গুরুত্ব বাড়িয়ে দিয়েছে। লাল শাপলার বিলে আসা পর্যটকরা ঐতিহ্যের সঙ্গেও পরিচিত হতে পারছেন। লাল শাপলার বিল সংরক্ষণে উপজেলা প্রশাসন কমিটি করে দিয়েছে। পর্যটন কর্পোরেশনেরও উচিত বিলের অবশিষ্ট জায়গায় কিভাবে নজর দেওয়া যায়।
স্থানীয় বাসিন্দা সুরক্ষা কমিটির সদস্য মো. আব্দুস শুকুর, সাধারণ সম্পাদক মাসুক আহমদ, ইউপি সদস্য মো. মনসুর আহমদ, ফরিদ উদ্দিন, নূর আহমদ, সাব্বির আহমদ জানিয়েছেন, জৈন্তাপুর হয়ে জাফলং ঘুরতে যাওয়ার সময় পর্যটকরা লাল শাপলার বিল ঘুরে যান। অনেকে কেবল লাল শাপলার বিলের সৌন্দর্য দেখতে আসেন। দিন কাটিয়ে দেন এখানেই। প্রতিবছর অসংখ্য পরিযায়ী পাখি আসে এই হাওড়ে। তার মধ্যে বালিহাঁস, পাতিসরালি, পানকৌড়ি, নীলকণ্ঠী, সাদা বক, জলময়ূরসহ অসংখ্য প্রজাতির পাখি দেখা যায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, ভোরের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে লাল শাপলা বিলের ‘শাপলা রাজ্যে’ মিষ্টি রোদে ফুলগুলো প্রস্ফুটিত হয়ে ওঠে। এ সময় বিলে সবচেয়ে বেশি সৌন্দর্য ফুটে ওঠে। জাফলং ও বিছানাকান্দি গমনকারী বেশিরভাগ পর্যটক সকালের এই অপরূপ দৃশ্য দেখতে ভিড় করেন ডিবির হাওড়ে। আর পর্যটক ও দর্শনার্থীদের ভোরে উপস্থিতির কথা চিন্তা করে কনকনে শীতের মধ্যে প্রস্তুতি নিয়ে তৈরি থাকেন বিলের নৌকার মাঝিরা।
ডিবির হাওড়ের মূল সৌন্দর্য ঘাট থেকে রাজা বিজয় সিংহের সমাধি পর্যন্ত নৌযাত্রা। এক্ষেত্রে নৌযাত্রায় প্রতি ট্রিপে পর্যটকদের গুনতে হয় ৫০০ টাকা। রাজা বিজয় সিংহের সমাধিস্তম্ভ মেঘালিথ পাথরের তৈরি প্রাচীন এক স্থাপত্যশৈলী, যা পর্যটকদের ফটোসেশনের অন্যতম জনপ্রিয় একটি স্পট। পেছনে মেঘালয়ের সবুজে ঘেরা পাহাড় দেখে বাড়তি সৌন্দর্য উপভোগ করেন দর্শনার্থীরা।
সাপ্তাহিক ছুটির দুইদিন শুক্রবার ও শনিবার দিনভর পর্যটকের ভিড় লেগে থাকে। এই দুইদিন ডিবির হাওড় এলাকার রাস্তায় সৃষ্টি হয় যানজট। হকার থেকে শুরু করে ক্যামেরাম্যান- সবাইকে ব্যস্ত সময় পার করতে দেখা যায়।
চট্টগ্রাম ডিবির হাওড় এলাকায় বেড়াতে আসা সালাম তানভীর বলেন, শীতের সকালের এই হিমেল হাওয়ায় এক প্রান্তে সবুজ পাহাড় আর সমতলে পানির ওপর লাল শাপলা- এমন অপরূপ দৃশ্যের সত্যিই জুড়ি নেই। এমন জায়গায় বারবার আসার ইচ্ছা হয়। ঢাকার বাসিন্দা নাজমুল আলম বলেন, শীতের সকালে মিষ্টি রোদে নৌকায় চড়ে শাপলা বিলে বিচরণ- এটা অন্যরকম একটা অনুভূতি। তিনি আরও বলেন, যে হারে শাপলা বিল গোটা দেশের মানুষের নিকট পরিচিতি লাভ করছে অদূর ভবিষ্যতে আরও মানুষের চাপ এখানে বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু সেই অপেক্ষা পর্যটকদের জন্য সেবামূলক অবকাঠামো অনেক কম। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানাচ্ছি।
লাল শাপলা বিল সুরক্ষা কমিটির সভাপতি সাইফুল আহমেদ জানান, গাড়ি পার্কিং থেকে শুরু করে যানজট নিয়ন্ত্রণসহ পর্যটকদের যাবতীয় সেবা প্রদানে ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ১৯ সদস্যের স্বেচ্ছাসেবী টিম নিয়মিত কাজ করছে। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনে সেবার পরিধি আরও বৃদ্ধি করা হয়।
লাল শাপলা বিলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন বিষয়ে জৈন্তাপুর উপজেলা প্রকৌশলী এ কে এম রিয়াজ মাহমুদ বলেন, দিন দিন ডিবির হাওড়ের লাল শাপলা বিলে পর্যটকদের আগমন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইতোমধ্যে তামাবিল মহাসড়ক থেকে ডিবির হাওড় পর্যন্ত এক কিলোমিটার অংশজুড়ে ৮০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে রাস্তা পাকাকরণের কাজ সম্পন্ন হয়েছে। তাছাড়া লাল শাপলা বিল এলাকায় আগামী অর্থবছরের মধ্যে নতুন ওয়াশব্লক, ক্যাফেটেরিয়া ও রেস্টরুম নির্মাণের কাজ শুরু হবে।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী

ইমেইল: nomanibsl@gmail.com

মোবাইল: 01713799669 / 01712596354

 

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি।

© বিডি ২৪ নিউজ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

  বরিশালে বদলি ঠেকাতে ৩ শিক্ষকের গ্রেফতার নাটক   বরিশালের সেই বিতর্কিত এডলিন বিশ্বাষ পুলিশের হাতে আটক   না ফেরার দেশে বেগম খালেদা জিয়া   রাজশাহী গণপূর্তে টেন্ডারের আগেই ভাগ হচ্ছে কাজ : প্রশ্নের মুখে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম   বরিশালের রুপাতলী ‘খাবার বাড়ি’ রেস্তোরাঁকে ১ লাখ টাকা জরিমানা   বাকেরগঞ্জে যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে গরু চুরির অভিযোগ   নলছিটিতে বৈদ্যুতিক ফাঁদে প্রাণ হারালেন কৃষক বাচ্চু মল্লিক   বদলি-নিয়োগ-দুর্নীতি, সিন্ডিকেটের দখলে প্রাথমিক শিক্ষাঅধিদপ্তর   উজিরপুরে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে বলৎকারের অভিযোগ,জুতা পেটা   বদলি-বাণিজ্য, ঘুষ নিয়ন্ত্রণ করতেন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে, ছয় বছরের সাম্রাজ্য শাহজাহান আলীর   বরিশালে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের জায়গা দখল চেষ্টার অভিযোগ   বরিশালে বিসিক উদ্যোক্তা মেলায় স্টল বরাদ্দে অনিয়ম   বরিশাল কর অফিসের রতন মোল্লার হাতে আলাদিনের চেরাগ,একই কর্মস্থলে ১০ বছর   বরিশালের ১৬টি আসনে বিএনপির প্রার্থী যারা   বরিশালে অপসাংবাদিকতা বন্ধে ঐক্যবদ্ধ ৩৫ সংগঠন   আটকে আছে ১৭শ কিলোমিটার সড়ক মেরামত ও উন্নয়ন কাজ   বরিশালের রাঙামাটি নদী থেকে হাত-পা বাঁধা যুবকের লাশ উদ্ধার   সারদা পুলিশ একাডেমি থেকে লাপাত্তা ডিআইজি এহসানউল্লাহ   বরিশালের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা ঘুস নিয়ে বদলীর অভিযোগ   বরিশালে ফরচুন মিজানের ভাই রবিউল আটক
Translate »