বিডি ২৪ নিউজ অনলাইন: জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রশাসনে ব্যাপক রদবদল ঘটলেও, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর (ইইডি)-এর কর্মকর্তা প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান এখনো দলীয় আনুগত্যের প্রভাব থেকে মুক্ত হতে পারেননি। আলোচিত তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান। তার বিরুদ্ধে উঠেছে দলীয় ঘনিষ্ঠ ঠিকাদারদের কোটি টাকার কাজ পাইয়ে দেওয়া, পলাতক আওয়ামী নেতা-ঠিকাদারদের বিল আদায়ে সহযোগিতা, এমনকি এসিআর জালিয়াতি করে পদোন্নতি নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ। অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, আসাদুজ্জামান দীর্ঘদিন ধরে আওয়ামী রাজনীতির সঙ্গে নিবিড় যোগাযোগ রাখছেন। দলীয় সরকারের পতনের পরও সেই সম্পর্কের সুবিধা নিচ্ছেন তিনি।
দলীয় দুই নেতার হাতে ৬৫ কোটি টাকার কাজ :
ইইডির সাম্প্রতিক নথিপত্র ঘেঁটে দেখা গেছে, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে প্রায় ৩২ কোটি টাকার কাজ দেওয়া হয় “ইলেকট্রো গ্লোব মিরন এন্টারপ্রাইজ” নামের এক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। প্রতিষ্ঠানের মালিক যুবলীগ নেতা রাকিব হোসেন, যিনি পরবর্তীতে দুর্নীতি ও প্রাক্কলিত ব্যয় কারসাজির অভিযোগে গ্রেপ্তার হন। অভিযোগ অনুযায়ী, কাজটি দেওয়ার সময় প্রাক্কলিত ব্যয় কৃত্রিমভাবে কমিয়ে এবং দরপত্রের শর্ত ‘সমন্বয়’ করে রাকিবের প্রতিষ্ঠানকে উপযুক্ত দেখানো হয়। একইভাবে রূপগঞ্জের পূর্বাচল সরকারি মাধ্যমিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের ৩৫ কোটি টাকার একটি প্রকল্প দেওয়া হয় “নুরানি কনস্ট্রাকশন” নামের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে। ওই প্রতিষ্ঠানের মালিক আওয়ামী লীগের সাবেক কৃষিমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাকের শ্বশুর। দরপত্রের মূল্যায়ন কমিটির সভাপতি ছিলেন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মো. আসাদুজ্জামান। একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেছেন, তিনি “নির্দেশনা অনুযায়ী” দরপত্রের প্রাক্কলন এমনভাবে সাজিয়েছিলেন যাতে এই দুই প্রতিষ্ঠান ছাড়া অন্য কোনো প্রতিযোগী প্রতিষ্ঠান যোগ্যতা অর্জন করতে না পারে। একজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “কমিটি ছিল আসলে আনুষ্ঠানিকতা মাত্র। সব সিদ্ধান্ত আগে থেকেই নির্ধারিত ছিল। কারা কাজ পাবে, কাকে বাদ দেওয়া হবে—এসব আসাদুজ্জামানই ঠিক করতেন। প্রভাবশালী নেতাদের সঙ্গে তার সরাসরি যোগাযোগ ছিল।”
পলাতক ঠিকাদারদের বিল উঠিয়ে দেওয়া :
সরকার পরিবর্তনের পর অনেক আওয়ামী ঘনিষ্ঠ ঠিকাদার আত্মগোপনে চলে গেছেন। তবে ইইডির একাধিক কর্মকর্তার অভিযোগ, আসাদুজ্জামানের ‘নিরাপত্তা আশ্বাসে’ এখনো কিছু পলাতক ঠিকাদার নিয়মিত বিল আদায় করছেন। বিশেষ করে লিয়াকত শিকদার নামের এক ঠিকাদার, যিনি আওয়ামী লীগের বিভিন্ন উপকমিটির সঙ্গে জড়িত ছিলেন, তার নামে প্রায় কোটি টাকার বিল আসাদুজ্জামান অনুমোদন দেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ইইডির এক সিনিয়র কর্মকর্তা বলেন, “প্রধান প্রকৌশলী আলতাফ হোসেনের ঘনিষ্ঠ ক্যাশিয়ার হিসেবে কাজ করতেন আসাদুজ্জামান। সে সম্পর্কের জোরে এখনো বিল আদায়ের সিন্ডিকেট চালাচ্ছেন। সরকারি হিসাব দেখলে দেখা যাবে, অনেক বিল এমন ঠিকাদারদের নামে গেছে যারা দেশে নেই।”
একচেটিয়া সুবিধা পাচ্ছে মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ :
দিনাজপুর পৌর আওয়ামী লীগের সভাপতি শাহ আলমের মালিকানাধীন মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ নামের প্রতিষ্ঠানটি দেশের প্রায় প্রতিটি জেলায় শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের কাজ পেয়েছে। ইইডির নথি অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরেই প্রতিষ্ঠানটি ১৪টি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের স্কুলুকলেজ ভবন নির্মাণের কাজ পেয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আসাদুজ্জামান তার ঘনিষ্ঠ রাজনৈতিক যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে এই প্রতিষ্ঠানকে বারবার অগ্রাধিকার দিয়েছেন। এমনকি দরপত্রে কম দর দেওয়া সত্ত্বেও অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে “প্রযুক্তিগতভাবে অযোগ্য” ঘোষণা করা হয়েছে। ঠিকাদারি মহলের অভিযোগ, শাহ আলমের প্রতিষ্ঠান লাইসেন্স ভাড়া বাবদ দুই শতাংশ কমিশন আদায় করছে, যা রাজনৈতিক তহবিলে ব্যবহৃত হচ্ছে। একজন ঠিকাদার বলেন, “এই দুই শতাংশ কমিশন না দিলে কোনো কাজ পাওয়া যায় না। লাইসেন্সের নামে আসলে সেটাই হচ্ছে দলীয় চাঁদা।”
বঙ্গবন্ধু প্রকৌশল পরিষদের সক্রিয় সদস্য আসাদুজ্জামান আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ছিলেন প্রধান প্রকৌশলী আলতাফ হোসেনের অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী। আলতাফের আমলে নানা বিতর্কিত প্রকল্পের নেপথ্যে তার নাম ঘুরে বেড়িয়েছে। কিন্তু সরকার পতনের পরই তিনি নিজের অবস্থান পাল্টান। নতুন প্রশাসনের সামনে নিজেকে “নিরপেক্ষ কর্মকর্তা” হিসেবে উপস্থাপন করেন। তবে ইইডির ভেতরের অনেকে বলছেন, এটি নিছক মুখোশ। একজন সহকর্মী বলেন, “তিনি এখন নতুন ক্ষমতাধরদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন, কিন্তু বাস্তবে তার পুরনো নেটওয়ার্ক এখনো সক্রিয়। প্রকল্প বণ্টন, বিল আদায়—সবখানেই আগের দলীয় স্বার্থ কাজ করছে।”
এসিআর জালিয়াতি করে পদোন্নতি ইইডির নথি অনুসারে, আসাদুজ্জামান সম্প্রতি তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। কিন্তু অভ্যন্তরীণ সূত্রের দাবি, তার বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর)-এ নেতিবাচক মন্তব্য ছিল। স্বাভাবিক নিয়মে তিনি পদোন্নতির যোগ্য ছিলেন না। একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “তার এসিআরে স্পষ্টভাবে উল্লেখ ছিল—‘কাজের নৈতিকতা প্রশ্নবিদ্ধ’, ‘অফিস আচরণ অসন্তোষজনক’। কিন্তু পরে দেখা গেল মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া এসিআরে এসব মন্তব্য নেই। স্পষ্ট বোঝা যায়, মূল কপি জমা না দিয়ে তিনি এসিআর টেম্পারিং করেছেন।” এ বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, “যদি এসিআর টেম্পারিং হয়ে থাকে, তা ফৌজদারি অপরাধের আওতায় পড়ে। তদন্ত হলে এটি প্রমাণ করা কঠিন হবে না।”
রংপুর থেকে পটুয়াখালী দুর্নীতি :
ইইডির রেকর্ড ঘেঁটে দেখা যায়, আসাদুজ্জামান কর্মজীবনে প্রায় এক দশকের মধ্যে অন্তত ছয়টি জেলায় দায়িত্ব পালন করেছেন। রংপুর, নাটোর, পটুয়াখালী, ঝিনাইদহ, নওগাঁ ও ঢাকা—প্রত্যেক জায়গায় তার বিরুদ্ধে ছোট-বড় দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। রংপুরে দায়িত্ব পালনকালে স্কুল ভবন নির্মাণে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহার, নাটোরে সরকারি অর্থে ফাঁকা বিল, এবং পটুয়াখালীতে ঘুষের টাকায় ঠিকাদার নিয়োগের অভিযোগ উঠে আসে। ২০১৯ সালে এক ঠিকাদার ক্ষুব্ধ হয়ে তাকে সামনাসামনি লাঞ্ছিতও করেন, যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়। তবুও বিভাগীয় শাস্তি হয়নি। কারণ হিসেবে ইইডির কর্মকর্তারা বলেন, তিনি সবসময় “উপরে” সুরক্ষা পেতেন।
ইইডির অভ্যন্তরে একটি “প্রকল্প সিন্ডিকেট” সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ, যার নেতৃত্বে আছেন আসাদুজ্জামান। এই সিন্ডিকেটে রয়েছেন কয়েকজন নির্বাহী প্রকৌশলী, হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তা এবং কিছু প্রভাবশালী ঠিকাদার। তাদের মূল কাজ হলো-দরপত্র আহ্বানের আগেই নির্ধারণ করা, কোন ঠিকাদার কোন কাজ পাবে এবং কত টাকায় পাবে। একজন অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা বলেন, “সিন্ডিকেটের লাভের হার নির্ধারিত—প্রতিটি প্রকল্প থেকে ৮ থেকে ১০ শতাংশ ভাগ যায়। এর মধ্যে প্রকৌশলীদের অংশ, রাজনৈতিক সংযোগের অংশ—সব ভাগ বণ্টন হয়।” এই সিন্ডিকেটের কাজ হলো প্রশাসনিক জটিলতা দূর করার নামে মন্ত্রণালয়ের কাগজপত্র দ্রুত ছাড়ানো, কিন্তু বাস্তবে সেখানে ঘুষ লেনদেনের প্রক্রিয়াই চালু থাকে।
আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে সম্প্রতি তিনটি লিখিত অভিযোগপত্র জমা পড়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে। এর একটি দিয়েছে ঠিকাদার সমিতির একাংশ, আরেকটি দিয়েছেন ইইডির অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা পরিষদের সদস্যরা, এবং তৃতীয়টি এসেছে সাধারণ নাগরিকের পক্ষ থেকে। তবে মন্ত্রণালয়ের তদন্ত শাখা এখনো কোনো পদক্ষেপ নেয়নি। কারণ হিসেবে বলা হচ্ছে, “নথি যাচাই চলছে”। একজন ঠিকাদার হতাশা প্রকাশ করে বলেন, “মন্ত্রণালয়ে অভিযোগ দিলে তা কয়েক মাস ফাইলবন্দি থাকে। এ সুযোগেই আসাদুজ্জামান তার প্রভাব কাজে লাগিয়ে পুরোনো নথি সরিয়ে ফেলেন।”
ইইডির বেশ কয়েকজন কর্মকর্তা স্বীকার করেছেন, অফিসে আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস কেউ পান না। কারণ তিনি প্রকল্প অনুমোদন, স্থানান্তর ও দায়িত্ব বণ্টনের মাধ্যমে ‘নিয়ন্ত্রণ’ বজায় রাখেন। এক কর্মকর্তা বলেন, “তিনি যাকে অপছন্দ করেন, তাকে অবিলম্বে বদলি করে দেন। কারও পদোন্নতির ফাইল আটকে রাখা, বা বিল অনুমোদন না দেওয়া—এসব তার জন্য রুটিন কাজ।”
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর এমন একটি প্রতিষ্ঠান, যার কাজ সরাসরি দেশের শিক্ষা খাতে উন্নয়নের সঙ্গে জড়িত। স্কুল-কলেজ ভবন, ল্যাব, বাউন্ডারি ওয়াল, টয়লেট, ডরমিটরি—সবকিছুতেই ইইডির ভূমিকা অপরিহার্য। কিন্তু আসাদুজ্জামানের মতো কিছু কর্মকর্তা এই প্রতিষ্ঠানকে ‘রাজনৈতিক অর্থ সংগ্রহের কেন্দ্র’ হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ। বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারি প্রকৌশল বিভাগে দুর্নীতি রোধ না হলে শিক্ষা অবকাঠামোর মানে সরাসরি প্রভাব পড়বে। দুর্নীতি দমন কমিশনের এক সাবেক পরিচালক বলেন, “ইইডির মতো প্রতিষ্ঠান যদি রাজনৈতিক ঘুষের উৎসে পরিণত হয়, তবে শিক্ষা খাতের উন্নয়ন প্রকল্পের স্বচ্ছতা ধ্বংস হয়ে যাবে। বিল ফাঁকি, নিম্নমানের কাজ—এসবই শেষ পর্যন্ত জনগণের ক্ষতি।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তর, যেখানে প্রতি বছর শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়, সেখানে রাজনৈতিক প্রভাব ও ব্যক্তিস্বার্থের দাপট দীর্ঘদিন ধরেই চলছে। তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো কেবল ব্যক্তিগত নয়; এটি আসলে একটি ব্যবস্থাগত দুর্নীতির প্রতিচ্ছবি—যেখানে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, ঠিকাদার সিন্ডিকেট এবং দলীয় নেটওয়ার্ক একে অপরের পরিপূরক হয়ে উঠেছে। জনগণের করের টাকায় গড়ে তোলা শিক্ষা অবকাঠামো যদি দুর্নীতির হাতেই পরিচালিত হয়, তবে শিক্ষা নয়, তৈরি হবে আরেকটি অবিচারের স্থাপত্য। সরকারি তদন্ত সংস্থাগুলোর প্রতি তাই এখন প্রশ্ন- একজন প্রকৌশলীর দুর্নীতির পেছনে লুকিয়ে থাকা ক্ষমতার কাঠামো তারা ভাঙতে পারবে কি?






বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা,আটকের দাবি : এ্যাংকর সিমেন্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ : তদন্তে দুদক ও ভ্যাট গোয়েন্দা
বড়ইয়া ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন: চেয়ারম্যান পদে আলোচনার শীর্ষে আবুল বাশার
বরিশাল স্বাস্থ্যখাতে শত কোটি টাকার দুর্নীতি: পিপলাই পরিবারের টেন্ডার সিন্ডিকেট উন্মোচন
ইফতারে বৈষম্যের অভিযোগ: ভিআইপি ও সাধারণ কর্মচারীদের আলাদা মেন্যু, সমালোচনায় বরিশাল সিটি করপোরেশন
পিআইবিতে ভুয়া সেমিনারের নামে লাখো টাকা আত্মসাৎ, অনুসন্ধানে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
পিআইবি: ভুয়া সেমিনার, জাল স্বাক্ষর ও ২৪ লাখ টাকার বিল – অনুসন্ধানে বড় দুর্নীতির ইঙ্গিত
পবিপ্রবির উপ-উপাচার্য ড. এস এম হেমায়েত জাহানের বিরুদ্ধে গুগল স্কলার সাইটেশন জালিয়াতির অভিযোগ