
কক্সবাজারের টেকনাফ উপজেলার সদর ইউনিয়নের নোয়াখালীপাড়া। বুধবার ভোরের আজানের পর রান্নাঘরে চা বানাতে যান এ গ্রামের ষাটোর্ধ্ব নারী শবে মেরাজ। রান্নাঘরে পা দিতেই শোনেন ফোঁস ফোঁস শব্দ, দেখেন বিশাল সাপ। তাঁর চিৎকারে প্রতিবেশীরা এগিয়ে এসে সাপটি মেরে ফেলতে উদ্যত হন। পরে বন বিভাগের হস্তক্ষেপে প্রাণে বেঁচে যায় পরিবেশবান্ধব বিষধর সাপটি।
সাপটি উদ্ধারে প্রথম এগিয়ে আসেন পাশ্ব৴বর্তী রাজারছড়া গ্রামের নূর মোহাম্মদ। নূর মোহাম্মদ বন সংরক্ষণে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে গঠিত কমিউনিটি প্যাট্রল গ্রুপের (সিপিজি) সদস্য। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, শবে মেরাজের ছেলে ছৈয়দুল আমিন ভোরে তাঁকে খবর দেয় যে তাদের বাড়িতে সাপ ঢুকেছে। তিনি গিয়ে দেখেন, ওখানে প্রায় ১০০ মানুষ জড়ো হয়েছেন সাপটিকে খুঁজে বের করে মেরে ফেলতে।
নূর মোহাম্মদ জড়ো হওয়া লোকজনকে বন্য প্রাণী আইন সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, এই সাপ হত্যা করা আইনে অপরাধ। এর মধ্যে তিনি বন বিভাগকে খবর দেন। বন বিভাগের লোকজন দ্রুততার সঙ্গে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হন।
.
সাপটির দৈর্ঘ্য ২০ ফুট ও ওজন ৭ কেজি বলে জানান নূর মোহাম্মদ। পরে বন বিভাগের উপস্থিতিতে সে সাপটি বস্তায় ভরেন নূর মোহাম্মদ। ঘটনাস্থল থেকে এক কিলোমিটার দূরে শিখলালীর জাহাজপুরা গর্জন বনে সাপটিকে অবমুক্ত করা হয়।
জানতে চাইলে কক্সবাজার দক্ষিণ বন বিভাগের আওতাধীন শিলখালীর রেঞ্জ কর্মকর্তা তৌহিদুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এটি ‘কিং কোবরা’ সাপ। পরিবেশের জন্য এ সাপ খুব উপকারী। খবর পেয়ে তাঁরা নোয়াখালী পাড়ায় গিয়ে দেখেন, অনেক লোক সাপটিকে মেরে ফেলতে জড়ো হয়েছেন লাঠিসোঁটা নিয়ে।
তৌহিদ বলেন, ‘লোকজনকে নিবৃত্ত করতে বেগ পেতে হয়েছে আমাদের। পরে অনেক চেষ্টার পর সাপটিকে উদ্ধার করে দূরে অবমুক্ত করে দিই। সাপটিকে কেন মেরে ফেলিনি, এ জন্য স্থানীয় লোকজন ক্ষুব্ধ।’
.
দীর্ঘদিন ধরে সাপ নিয়ে কাজ করছেন সর্প–বিশেষজ্ঞ মো. আবু সাঈদ। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, বাংলাদেশে সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী ১০৭ প্রজাতির সাপ আছে। এর মধ্যে বিষধর সাপ আছে ৩২ প্রজাতির। বিষধর সাপের মধ্যে কিং কোবরা হচ্ছে সবচেয়ে বড়। এটি ৪৫ ফুট পর্যন্ত লম্বা হতে পারে। এ সাপকে বলা হয় পৃথিবীর সবচেয়ে লম্বা বিষধর সাপ।
আবু সাঈদের ধারণা, কিং কোবরা দাঁড়াশ সাপ খেয়ে থাকে। দাঁড়াশ থাকে বসতবাড়ি ও কৃষিজমিতে। হয়তো দাঁড়াশ সাপকে তাড়া করতে গিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে পড়েছে সাপটি।
বন্য প্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা)–২০২৬ এর ৪১ এর ৩ ধারায় এ সাপ প্রথমবার হত্যায় সর্বোচ্চ তিন বছর জেল অথবা তিন লাখ টাকা জরিমানার বিধান আছে। একই অপরাধ আবার করলে পাঁচ বছর জেল অথবা পাঁচ লাখ টাকা জরিমানা করার কথা বলা আছে।
প্রকৃতি সংরক্ষণের আন্তর্জাতিক জোট আইইউসিএনের তালিকায় কিং কোবরা বা রাজগোখরা সাপটি বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা (ভালনারেবল) ক্যাটাগরিতে অন্তর্ভুক্ত। বন উজাড়ের ফলে আবাস হারিয়ে সাপটি নানামুখী সংকটের মধ্যে রয়েছে।