
*ঘুষ ছাড়া ফাইল নড়ে না
মামুনুর রশীদ নোমানী :
ঝালকাঠির রাজাপুর উপজেলায় স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদফতর (এলজিইডি) বাস্তবায়নাধীন উন্নয়ন প্রকল্পগুলো যেন দুর্নীতি ও অব্যবস্থাপনার জিম্মিতে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, উপজেলা এলজিইডির প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের কাছে ঘুষ ছাড়া কোনো ফাইলই নড়ে না। ঠিকাদাররা কাজ শেষ করলেও অর্থ না দিলে বিল ছাড় হয় না, এমনকি জামানতের টাকাও ফেরত পান না।
স্থানীয় ঠিকাদারদের দাবি, জামানতের টাকা ফেরত পেতেও দিতে হয় অন্তত ১৫ শতাংশ। অভিযোগ রয়েছে, অভিজিৎ মজুমদার পতিত আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতাদের পরামর্শ ছাড়া কোনো কাজের সিদ্ধান্ত নেন না।
কোটি টাকার বরাদ্দ, দেড় বছরেও কাজ শুরু হয়নি
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে রাজাপুরের মডেল মসজিদ থেকে ভায়া মঠবাড়ি ইউপি অফিস হয়ে নাপিতেরহাট পর্যন্ত ৩১ মিটার দৈর্ঘ্যের দুটি আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণে ৪ কোটি ২৬ লাখ ১৪ হাজার ১৬৪ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। কিন্তু দেড় বছর পার হলেও কাজ শুরু হয়নি। একইভাবে উপজেলার আরও একাধিক প্রকল্প পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
এলাকাবাসীর দাবি, প্রকৌশলীর গাফিলতি ও অনিয়মের কারণেই এসব প্রকল্প বাস্তবায়ন থমকে রয়েছে।
আয়রন ব্রিজ ঝুঁকিপূর্ণ, সংস্কারের কোনো খবর নেই
আক্কেল মিয়ার বাজারসংলগ্ন একটি আয়রন ব্রিজ থেকে চোরচক্র লোহার পাত ও নাট-বল্টু খুলে নিয়ে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও ওই সড়ক দিয়ে ভারী যানবাহন চলাচল করে না, তবে অটোরিকশা ও মালবাহী ট্রলি নিয়মিত চলাচল করে। তিন বছর আগে মাটি পরীক্ষা হলেও ব্রিজ সংস্কার বা নতুন নির্মাণ বিষয়ে এলাকাবাসী কিছুই জানেন না।
ভালো অবস্থার ব্রিজ ভাঙার প্রশ্ন
‘হাশেমের পুল’ নামে পরিচিত একটি কালভার্ট নিয়ে স্থানীয়দের প্রশ্ন—২০ বছরও হয়নি নির্মাণের, মানও ভালো। তবু কেন এটি ভেঙে নতুন ব্রিজ নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, সে বিষয়ে কেউ অবগত নন। এলাকাবাসীর মতে, প্রয়োজন হলে সামান্য সংস্কারই যথেষ্ট ছিল।
এপ্রোচ ছাড়াই ব্রিজ, জনদুর্ভোগ চরমে
মোল্লারহাট–শ্রীমন্তকাঠি ও পিংড়ি ভায়া বলারজোড় হাঁট জিসি সড়কের ৯ মিটার আরসিসি গার্ডার ব্রিজ নির্মাণ শেষ হলেও দুই পাশের এপ্রোচ সড়ক নির্মাণ না করায় এক বছর ধরে ব্রিজটি কার্যত অচল। ১ কোটি ৪০ লাখ ৩০ হাজার ৫৯১ টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ব্রিজে যান চলাচল বন্ধ থাকায় জনদুর্ভোগ কয়েকগুণ বেড়েছে।
ভেঙে ফেলা পুরোনো ব্রিজ, নতুন কাজ ১০ শতাংশও হয়নি
২০২৪-২৫ অর্থবছরে কাটাখালি হাটসহ বিভিন্ন এলাকায় আয়রন ও পাকা ব্রিজ নির্মাণে ২ কোটি ১ লাখ ৮৬ হাজার ৪২৪ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, দেড় বছরে তিনটি ব্রিজের কাজ হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ। পুরোনো ব্রিজগুলো ভেঙে ফেলে নতুন কাজ ফেলে রাখায় এলাকাবাসী চরম দুর্ভোগে পড়েছেন, যা বর্ষা মৌসুমে আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
‘ঘুষের হার নির্ধারিত’—ঠিকাদারদের অভিযোগ
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ঠিকাদার জানান,
এ ছাড়া নিম্নমানের কাজ অনুমোদন দিয়ে বিপুল অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে।

অভিজিৎ মজুমদার এখনো রাজাপুর এলজিইডির ওয়েবসাইট থেকে ভারতে পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিস্ট হাসিনার ছবি রেখে দিয়েছেন।ওয়েব সাইট থেকে স্কিনশর্টের মাধ্যমে নেয়া চিত্র।
অফিসে অনুপস্থিত, প্রভাবশালীদের ছত্রচ্ছায়া
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদার প্রায়ই অফিসে অনুপস্থিত থাকেন। সকাল ১২টার আগে অফিসে আসেন না। অফিসে না পেলে বলা হয় ‘সাইটে আছেন’, কিন্তু খোঁজ নিয়ে জানা যায় তিনি রাজাপুরের বাইরেই অবস্থান করছেন। এখনো আওয়ামী লীগের নেতাদের পরামর্শে চলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
দুদকের গণশুনানীতে অভিযোগ, ফল নেই
২০২৫ সালের ১৩ অক্টোবর ঝালকাঠিতে দুদকের গণশুনানীতে রাজাপুরের মৃত মোকলেস হাওলাদারের পুত্র আব্দুল হাকিম হাওলাদার অভিযোগ করেন, এলজিইডি নির্মিত একটি ব্রিজের কারণে তার বাড়ির যাতায়াতের রাস্তা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। ইস্টিমেটের সময় আশ্বাস দিলেও বাস্তবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
অভিযোগের প্রেক্ষিতে প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারকে দুদকে ডাকা হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বরং অভিযোগকারীর বিরুদ্ধে হয়রানির অভিযোগ রয়েছে।
কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টিএ বিল আত্মসাতের অভিযোগ
রাজাপুর উপজেলা হিসাবরক্ষণ অফিসের সঙ্গে যোগসাজশে এলজিইডি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের টিএ বিল নিজের ব্যাংক হিসাবে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে। বিল অনুমোদন হলেও দীর্ঘদিন তা পরিশোধ করা হয়নি। সংবাদ প্রকাশের পর বিলের অর্থ ফেরত দেওয়া হয়।
প্রকৌশলীর বক্তব্য
এসব অভিযোগ প্রসঙ্গে অভিজিৎ মজুমদার বলেন,
“আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো সত্য নয়। তবে দুদকের গণশুনানীতে আমাকে ডাকা হয়েছিল—এটা ঠিক।”
উল্লেখ্য, তিনি ২০২২ সালের ৫ সেপ্টেম্বর রাজাপুর এলজিইডিতে যোগদান করেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন উপজেলায় বদলি হলেও তিনি এখনো রাজাপুরে বহাল রয়েছেন—যা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
(অনুসন্ধান চলমান…)