
বিডি ২৪ নিউজ অনলাইন: যেসব কাজ করতে গিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এমনকি দিনের পর দিন লেগে যেত, সেগুলো এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা এআই) সাহায্যে করা যাচ্ছে কয়েক মিনিটেই। স্ক্রিপ্ট রাইটিং, ছবি ও ভিডিও তৈরি, তথ্য অনুসন্ধান-বিশ্লেষণ, অডিও ট্রান্সক্রিপশন, গাণিতিক জটিলতা সমাধান, ফ্যাক্ট-চেকিং, খবরের খসড়া লেখা ও ভাষান্তরসহ বহু কাজ জাদুর কাঠির মতো মুহূর্তেই করে দিতে পারে এআই। এর জন্য শুধু দরকার কয়েকটি শব্দের প্রম্পট লেখা অর্থাৎ নির্দিষ্ট কাজের নির্দেশ। নির্ভুল প্রম্পট পাওয়ামাত্রই সেই লোককথার বশীভূত দৈত্যের মতো একসঙ্গে প্রায় অসম্ভব অনেক কাজ চোখের পলকেই করে দিতে পারে এআই।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এখন মানুষের দৈনন্দিন জীবন ও কর্মক্ষেত্রের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে। অফিস থেকে শুরু করে হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং শিল্প-কারখানায়ও এর ব্যবহার ক্রমশ বাড়ছে। অফিসে বারবার করতে হয় এমন কাজ যেমন, ডেটা এন্ট্রি, ইনভয়েস প্রসেসিং বা শিডিউল তৈরি— এগুলো এআই সফটওয়্যার ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে করা যাচ্ছে।
এআইয়ের দ্রুত উত্থানে প্রভাব পড়তে শুরু করেছে সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও। এখন ছোট-বড় অনেক গণমাধ্যম হাউসে এআই ব্যবহার করা হচ্ছে। নিউজরুমে সাংবাদিকদের কিছু কাজ যেমন, অডিও ফাইলের প্রতিলিপি তৈরি, অনুবাদ করা বা কোনো লেখাকে ছোট করে সারসংক্ষেপ করা, সংবাদ সম্পাদনা বা পুনর্লিখন—- এসব কাজ এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে খুব সহজেই করা যাচ্ছে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, এআই এখন মানুষের চেহারা বা কণ্ঠস্বর নকল করতে সক্ষম। এই ক্ষমতা ব্যবহার করে পডকাস্ট তৈরি করা বা টেলিভিশনে খবর পড়ানোও সম্ভব হচ্ছে।
সাংবাদিকতায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ভূমিকা ও এটিকে কীভাবে আরও কাজে লাগানো যায় তা নিয়ে বর্তমানে বেশ কিছু গবেষণা হচ্ছে। এসব গবেষণায় দেখা গেছে, এআই সাংবাদিকতাকে আরও কার্যকর করে তুলতে পারে। যেমন—কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের ওপর পাঠকের চাহিদা অনুযায়ী সংবাদ তৈরি করা, পাঠকের সুন্দরভাবে উপস্থাপনা, খবরের আকর্ষণীয় শিরোনাম দেওয়া ও চোখ ধাঁধানো ছবি তৈরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে এআই বেশ দক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে।
যেভাবে সাংবাদিকতায় ভূমিকা রাখছে এআই
এআই পাঠকের আগ্রহ অনুযায়ী সংবাদ বা লেখার বিষয়বস্তু কেমন হতে পারে, তা বিশ্লেষণ করে সাংবাদিকদের সাহায্য করতে পারে। এটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমের ডেটা বিশ্লেষণ করে বিভিন্ন সংবাদকে একসঙ্গে যুক্ত করতে পারে এবং প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে বের করতে পারে। পাঠক কোন ধরনের সংবাদ বা ভিডিও দেখতে পছন্দ করেন এবং কোন সময়ে তা দেখালে সবচেয়ে ভালো হয়, এআই সে বিষয়ে পরামর্শ দিতে পারে। এছাড়াও বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমের ডেটা বিশ্লেষণ করে সম্পাদনা প্রক্রিয়াকে আরও সহজ ও কার্যকর করতে সাহায্য করে এআই।
সাংবাদিকতায় এআইয়ের অবদান শুধু এটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়, বর্তমানে সাংবাদিকতার কাজে এটি আরও অনেক ভূমিকা রাখছে। এর মধ্যে রয়েছে— এআই অল্প সময়ে বিশাল ডেটা থেকে নির্দিষ্ট তথ্য বা প্যাটার্ন বের করতে পারে এবং কোনো ঘটনার পূর্বাভাস দিতে পারে। ডেটা বা তথ্য থেকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবাদ তৈরি করতে পারে। কোনো ছবিতে থাকা মানুষ বা বস্তুকে খুব সহজেই শনাক্ত করতে পারে। এআই মানবীয় হস্তক্ষেপের মাধ্যমে সত্যতা যাচাইয়ের কাজকে আরও সহজ করে তোলে। ভিডিও থেকে টেক্সট অর্থাৎ এআই ভিডিওর কথোপকথন বা অডিও থেকে লিখিত রূপ তৈরি করতে পারে অতি দ্রুত। পাঠকের আগ্রহ অনুযায়ী এআই স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংবাদ বা লেখার বিষয়বস্তু বাছাই করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এখন কেবল সংবাদ সংগ্রহ বা সম্পাদনার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ডিপফেক প্রযুক্তির মাধ্যমে তৈরি করা হচ্ছে এআই-চালিত সংবাদ উপস্থাপক, যা টেলিভিশন থেকে শুরু করে পডকাস্ট—সবকিছুতেই ব্যবহৃত হতে পারে। এআই উপস্থাপকরা ২৪ ঘণ্টাই নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করতে পারে। একই সঙ্গে, ভুয়া খবর বা ‘ফেক নিউজ’ শনাক্ত করার ক্ষেত্রেও এআই এখন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সহজ ভাষায় বলতে গেলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই বর্তমানে একজন সহ-সম্পাদক হিসেবে কাজ করছে, যা একজন সাংবাদিককে ‘প্রযুক্তিগত সাংবাদিক’ হিসেবে কাজ করতে সাহায্য করছে। এই নতুন ধারার সাংবাদিকতাকে বলা হয় স্বয়ংক্রিয় সাংবাদিকতা। এটির কাজই হচ্ছে মানুষের হস্তক্ষেপ ছাড়াই কেবল ডেটার ওপর ভিত্তি করে সংবাদ বা গল্প তৈরি করা।
সাংবাদিকতায় এআই ব্যবহারে কিছু চ্যালেঞ্জ
এ পেশায় দ্রুত ছড়িয়ে পড়া এই প্রযুক্তি একই সঙ্গে বিপ্লব ও চ্যালেঞ্জ। প্রথমেই বলে রাখি এআই কোনো মানুষের মতো অনুভূতি, বুদ্ধি বা হাস্যরস বুঝতে পারে না। এআই শুধু তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে সংবাদ তৈরি করতে পারে, এটি দিয়ে কোনো তদন্তমূলক সাংবাদিকতা সম্ভব নয়। এটি কেবল সাংবাদিকতার জন্য একটি শক্তিশালী টুল হতে পারে কিন্তু কখনোই একজন সাংবাদিকের বিকল্প হতে পারে না। এছাড়া আকস্মিক বা ব্রেকিং নিউজের ক্ষেত্রে দ্রুত প্রতিক্রিয়া জানাতে পারে না কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। প্রম্পট বা কাজের নির্দেশ সঠিক না হলে বা সিস্টেমে ত্রুটিজনিত কারণে অনেক সময়ই ভুল তথ্য দিতে পারে এআই।
তাই এটি ব্যবহারে খুব সতর্ক থাকতে বলেছেন প্রযুক্তিবিদরা। যেকোনো তথ্যের ক্ষেত্রে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ওপর অতিনির্ভর না হয়ে যাচাইবাছাই করার পরামর্শ দিয়েছেন তারা।
ইতোমধ্যে বিশ্বের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম যেমন—ওয়াশিংটন পোস্ট, অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস ও দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস অনেক আগে থেকেই এআইয়ের ব্যবহার শুরু করেছে। ২০২৪ সালে চ্যানেল নামের একটি স্টার্ট-আপ এআই-চালিত সংবাদ নিয়ে আসার ঘোষণা দেয়। তাদের প্রকাশ করা একটি ২২ মিনিটের ভিডিওতে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন এআই উপস্থাপক বিভিন্ন বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন করছেন।
তবে বাংলাদেশে কোনো গণমাধ্যম হাউসে আনুষ্ঠানিকভাবে এআই ব্যবহারের ঘোষণার খবর পাওয়া না গেলেও অনেক গণমাধ্যমকর্মীর সঙ্গে কথা বলে তাদের এটি ব্যবহারের কথা জানা গেছে।
দেশের জনপ্রিয় একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে সহ-সম্পাদনার কাজ করেন আরিফুল ইসলাম। তার এআই ব্যবহারের কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, নিউজরুমে এআই খুবই উপকারী টুলস হিসেবে কাজ করে। ঝটপট কোনো বিষয়ের ওপর ইন্ট্রো বানানো বা তথ্য খুঁজে বের করতে এটি জাদুকারী কাজ করে। তবে অনেক সময়ই ভুল করে বসে এআই। বিশেষ করে কারও নাম ও পদবির ক্ষেত্রে। এক্ষেত্রে এআই দিয়ে তৈরি সংবাদ ভালো করে পড়তে হবে। তা না করলে ভুল তথ্য ছড়াতে পারে। এতে করে চাকরি হুমকির মুখে পড়তে পারে।