
মূক ও বধির এক তরুণী। পেশাদার খুনি হিসেবে যার নিশানা অব্যর্থ। এই নির্মম খুনির বুকেই জমে আছে শৈশবের গভীর ক্ষত, একাকিত্ব আর ভালোবাসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। এই বৈপরীত্যকে কেন্দ্র করেই এগিয়েছে নাচিকেত সামন্ত পরিচালিত হুমা কুরেশি অভিনীত হিন্দি সিনেমা ‘বেবি ডু ডাই ডু’। গত জুলাইয়ে প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পাওয়া সিনেমাটি সম্প্রতি এসেছে নেটফ্লিক্সে। মুক্তির পর থেকেই বাংলাদেশে প্ল্যাটফর্মটির জনপ্রিয় সিনেমার তালিকায় শীর্ষে রয়েছে এটি।
.
একনজরে
সিনেমা : ‘বেবি ডু ডাই ডু’
ধরন : ক্রাইম–থ্রিলার
পরিচালনা: নচিকেত সামন্ত
অভিনয় : হুমা কুরেশি, চাঙ্কি পান্ডে, সিকান্দার খের
স্ট্রিমিং: নেটফ্লিক্স
দৈর্ঘ্য : ২ ঘণ্টা ৩ মিনিট
.
আততায়ীকে ঘিরে নির্মিত থ্রিলার হিসেবে ‘বেবি ডু ডাই ডু’ খুব একটা নতুন কিছু দেখায় না। দুনিয়াজুড়ে এমন এন্তার কাজ হয়েছে। অভিনবত্ব বলতে, রহস্যময় খুনি একজন নারী, যে কথা বলতে ও শুনতে পারে না। বাকি উপাদানগুলো বেশ পরিচিত। শৈশবের এক মর্মান্তিক ঘটনা বেবি কারমারকরকে (হুমা কুরেশি) পরিণত করেছে নির্মম এক ভাড়াটে খুনিতে। পাপা (চাঙ্কি পান্ডে) নামের এক পিতৃস্থানীয় ব্যক্তির হয়ে কাজ করে সে। নিজের পেশায় বেবি অত্যন্ত দক্ষ। তার অস্ত্র একটি ছাতা, যার আড়াল থেকে অব্যর্থ নিশানায় গুলি চালাতে পারে সে।
একসময় বেবির জীবনে আসে প্রেম। রচিত সিং অভিনীত এই মানুষটির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে ওঠার পর নিজের গোপন পরিচয় আড়াল করে রাখা তার জন্য কঠিন হয়ে পড়ে। বেবি এই পেশা ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়। কিন্তু যে অপরাধজগতে সে এত গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছে, সেখান থেকে বেরিয়ে আসা সহজ নয়। সামনে অপেক্ষা করে অবধারিত রক্তাক্ত পরিস্থিতি।
.
এমন পরিচিত গল্পকে আকর্ষণীয় করে তুলতে নির্মাতা ভরসা রেখেছেন দৃশ্যায়ন ও উপস্থাপনায়। সেই চেষ্টা বোঝা যায় সিনেমার নামেই। মহারাষ্ট্রীয় নাম ‘বেবি কারমারকর’-এর ইংরেজি অনুবাদ ‘বেবি ডু ডাই ডু’। ‘কার-মার-কার’ আর ‘ডু-ডাই-ডু’—শব্দ দুটির ধ্বনিগত মিল নামটিকে আলাদা মাত্রা দিয়েছে।
বেবি কথা বলতে ও শুনতে পারে না। তাই তার চারপাশের দৃশ্য ও শব্দের জগৎকে অনুমিতভাবেই বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে। সাদা-কালো ফ্ল্যাশব্যাক, নির্বাক চলচ্চিত্রের কৌশল, অদ্ভুত সংগীত আর বৃষ্টিভেজা নিয়ন আলোয় ঝলমলে ছাদ—সব মিলিয়ে তৈরি হয়েছে এক অস্বস্তিকর, রহস্যময় আবহ। লাল রঙের ব্যবহারও চোখে পড়ে। কোনো কোনো দৃশ্যে রংটি যেন আলাদা একটি চরিত্র হয়ে ওঠে।
.
গল্প বলার ধরনেও রয়েছে কিছু অভিনবত্ব। সিসিটিভি ফুটেজ পেছনের দিকে চালিয়ে হত্যাকাণ্ড দেখানো, মুঠোফোনের বার্তা, বিভক্ত পর্দা, ভয়েস নোট ও সাবটাইটেল—এসবের ব্যবহার সিনেমাটিকে গতানুগতিক উপস্থাপনা থেকে কিছুটা আলাদা করেছে। নির্মাতার রসবোধও মাঝেমধ্যে বেশ ভালো কাজ করে।
গানের ব্যবহারেও সেই রসবোধের পরিচয় দিয়েছেন নির্মাতা। সমকামীদের নাইট ক্লাবে বাজতে থাকা ‘আলফা কিউ’ থেকে শুরু করে বিয়ের দৃশ্যের সঙ্গে মিউচুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগের ঝুঁকি নিয়ে গানের ব্যবহার—গল্পের আবহের সঙ্গে মানিয়ে গেছে।
.আশির দশকের সেই সব দিনে ফিরিয়ে নিয়ে গেল যে সিনেমা.
তবে নির্মাণের এই চমক সব সময় গল্পকে এগিয়ে নিতে পারেনি। বরং সিনেমাটির বড় দুর্বলতা, এটি অনেক সময়ই অগোছালো। একসঙ্গে অনেক চরিত্রকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে নির্মাতা বেবির গল্পের মূল সুর থেকে সরে গেছেন। বেবির প্রেমিক, রহস্যময় আইনজীবী, কাজে ভুল করা পুরুষ সহকর্মী, দুর্নীতিগ্রস্ত পুলিশ কর্মকর্তা, পরামর্শদাতা, বস্তির তরুণ প্রতিবেশী, এক খলনায়ক ও তার দুর্ভাগা ভাই, অসৎ ধনকুবের—এমন অনেক চরিত্রের আনাগোনায় গল্পের মনোযোগ বারবার ছড়িয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ার্ধে এসে সমস্যাটি আরও স্পষ্ট হয়। একের পর এক কাকতালীয় ঘটনা ঘটতে থাকে। বেবি যাদের খুন করতে যায়, তাদের ঘিরে নানা ঘটনা কোনো না কোনোভাবে তার নিজের জীবনেও এসে পড়ে। চরিত্রগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক, তাদের উদ্দেশ্য এবং কে কার প্রতি অনুগত—এসবের হিসাব রাখাও কঠিন হয়ে যায়। শেষদিকে এসে অনেকগুলো সূত্র একসঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করা হয়েছে। তাতে কিছু প্রশ্নের উত্তর মিললেও কয়েকটি চরিত্রের পরিণতি নিয়ে নির্মাতার পরিকল্পনা কতটা পরিষ্কার ছিল, তা নিয়ে সংশয় থেকে যায়।
শেষ দিকে এসে রয়েছে বড় চমক। সেটি শুধু কাহিনির মোড় ঘুরিয়ে দেয় না, সিনেমার নামের তাৎপর্যও নতুনভাবে সামনে আনে। শুরুতে শিশুর অস্বস্তিকর কণ্ঠে যে বর্ণনা শোনা যায়, শেষের ঘটনা সেই উপস্থাপনাকেও অর্থবহ করে তোলে। যদিও এই চমক গল্পের আগের সব দুর্বলতা ঢেকে দিতে পারে না, তবু শেষ পর্যন্ত দর্শকের কৌতূহল ধরে রাখে।
.
অভিনয়ে হুমা কুরেশি সিনেমাটির সবচেয়ে বড় শক্তি। বেবিকে তিনি এমন এক নির্বিকার খুনি হিসেবে তুলে ধরেছেন, যাকে প্রচলিত অর্থে অ্যাকশন তারকা বলা যায় না। তার সবচেয়ে বড় সুবিধা, চেহারা বা আচরণে তাকে দেখে সহজে খুনি বলে সন্দেহ করার উপায় নেই। নারী পরিচয় এবং কথা বলতে ও শুনতে না পারার বিষয়টি তার জন্য একধরনের আড়াল হয়ে কাজ করে। চরিত্রটির আবেগ প্রকাশের সুযোগ সীমিত হলেও হুমা নিজের উপস্থিতি দিয়ে বেবির একাকিত্ব ও ভেতরের দ্বন্দ্ব ফুটিয়ে তুলেছেন।
রচিত সিংও বেবির প্রেমিকের চরিত্রে ভালো। তাঁর চরিত্রটি নিয়ন্ত্রণপ্রবণ বা কর্তৃত্বপরায়ণ নয়। কিন্তু প্রেমিকার প্রকৃত পরিচয়ের মুখোমুখি হওয়ার মতো মানসিক প্রস্তুতিও তার নেই। চাঙ্কি পান্ডে বেবির নিয়োগকর্তা পাপার চরিত্রে মানানসই। সিকান্দার খেরকে এমন খলনায়কের চরিত্রে বারবার দেখা গেছে কিন্তু প্রতিবারই তিনি নতুন কিছু করে চমকে দেন। তিনি পর্দায় হাজির হওয়ার পরেই কৌতূহল তৈরি হয়, এবারও সিকান্দর নিরাশ করেননি।
.
কিছু দুর্বলতার পরও ‘বেবি ডু ডাই ডু’ উপভোগ্য। কারণ, এটা স্রেফ আততায়ীর গল্প বা থ্রিলার হিসেবে নিজেকে আটকে রাখেনি। মুম্বাই শহরকে শুধু পটভূমি হিসেবে ব্যবহার করেননি নির্মাতা; বরং সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মুম্বাই নিজেই হয়ে উঠেছে সিনেমার অন্যতম প্রধান চরিত্র।
যমজ ভাই–বোন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলা প্রতিশোধ, ভয়ংকর আবাসন ব্যবসায়ী, লোকাল ট্রেন, বিশাল বিজ্ঞাপনী হোর্ডিং, বৈচিত্র্যে ভরা বস্তির ঘিঞ্জি জীবন কিংবা মালিকানা নিয়ে বিরোধে পরিত্যক্ত হোটেল—মুম্বাইকে ঘিরে বলিউডের পরিচিত অনেক অনুষঙ্গই এখানে রয়েছে। তবে সেগুলো নিছক চেনা দৃশ্য হয়ে থাকেনি; শহরের বদলে যাওয়া চরিত্রের সঙ্গে মিশে গেছে।
.
ফ্ল্যাশব্যাকে মুম্বাইকে দেখা যায় সাদা-কালো ছবির মতো। পরে সেই শহর বদলে যায় বৃষ্টিভেজা, ডিস্টোপিয়ান এক দৃশ্যপটে। চারপাশে নির্মাণকাজ চলছে, নতুন নতুন ভবন উঠছে, অথচ সেই উন্নয়নের আড়ালে বাড়ছে নৈতিক অবক্ষয়। সবকিছু যেন নির্মাণাধীন, শহরটি কখনোই পুরোপুরি তৈরি হয়ে উঠতে পারছে না।
বেবি কাজ করে এমন এক অন্ধকার আবাসন ব্যবসার হয়ে, যে ব্যবসা মুম্বাইয়ের পুরোনো চেহারা ও ঐতিহ্যকে ধ্বংস করে এগিয়ে চলেছে। ফলে সিনেমাটি একসময় হয়ে ওঠে শহরের দুটি পরিচয়ের মধ্যে সংঘাতের গল্প। একদিকে বহুত্ববাদী সংস্কৃতি, ইতিহাস ও পুরোনো মুম্বাই; অন্যদিকে নতুন নির্মাণের নামে গড়ে ওঠা এক নিষ্ঠুর, অনুভূতিহীন নগরজগৎ। উন্নয়নের এই দৌড়ে মানুষের স্মৃতি, সম্পর্ক ও মানবিকতার জায়গা ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসে।
অনুরাগ কশ্যপের ‘কেনেডি’ সিনেমার সঙ্গে ‘বেবি ডু ডাই ডু’র কিছু মিল পাওয়া যায়। দুই ছবিতেই অন্ধকারাচ্ছন্ন শহর, অপরাধজগৎ ও মানুষের বিচ্ছিন্নতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তবে ‘কেনেডি’র মতো অতটা বিক্ষিপ্ত বা ব্যঙ্গাত্মক হয়ে ওঠেনি ‘বেবি ডু ডাই ডু’। বরং পরিচিত থ্রিলারের কাঠামোর মধ্যেই শহরের বদলে যাওয়া চেহারা তুলে ধরার চেষ্টা করেছে।
বেবি এমন এক শহরে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকা শেষ মানুষ—যেখানে স্বাভাবিক বিবর্তনের বদলে কৃত্রিম প্রবৃদ্ধিকে বেছে নেওয়া হয়েছে। যে শহর কংক্রিটের জঙ্গল আত্মার আবরণে নিজেই এক প্রেতাত্মায় পরিণত হয়েছে।