● ●


ঢাকার গৃহহীন মানুষের আবাসন নিয়ে কেন আমরা ভাবব না
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৪৪ পূর্বাহ্ণ |
অনলাইন সংস্করণ

ঢাকার গৃহহীন মানুষের আবাসন নিয়ে কেন আমরা ভাবব না

মানুষের বেঁচে থাকার জন্য যেমন খাদ্য গ্রহণ ও পানি পান করা অপরিহার্য, তেমনি মলমূত্র ত্যাগ করাও একটি স্বাভাবিক শারীরবৃত্তীয় প্রয়োজন। আমরা যাঁরা বাড়িতে, ফ্ল্যাটে কিংবা ভাড়া বাসায় থাকি, প্রয়োজন হলেই বাথরুমে যেতে পারি। সেখানে পানি, হাত ধোয়ার ব্যবস্থা ও ব্যক্তিগত গোপনীয়তা থাকে। কিন্তু যাঁদের মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, যাঁরা ফুটপাত কিংবা খোলা আকাশের নিচে রাত কাটান, তাঁদের প্রয়োজন হলে কোথাও যাওয়ার উপায় আছে? বিশেষ করে একজন গৃহহীন নারী বা কিশোরী কীভাবে জনাকীর্ণ শহরে নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে এই প্রয়োজন মেটাবেন? আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি, ঢাকা শহরের গৃহহীন মানুষগুলো কোথায় মলমূত্র ত্যাগ করেন?

প্রশ্নটি শুনতে অস্বস্তিকর। কিন্তু এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের নগর-পরিকল্পনা, মানবিকতা ও জনস্বাস্থ্যের গভীর সংকট। ফুটপাত, রেলস্টেশন, পার্ক, বাজার, রেললাইনের আশপাশ এবং বিভিন্ন স্থাপনার নিচে অসংখ্য মানুষ রাত কাটান। অনেক শিশুর জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই রাস্তাতেই। অথচ তাঁদের জন্য নিরাপদ আশ্রয় ও পরিচ্ছন্ন শৌচাগারের ব্যবস্থা কোথায়?

.

একটু ভাবুন তো, যে শিশুটি ফুটপাতে কিংবা পার্কের কোনো কোণে জন্মগ্রহণ করছে এবং সেখানেই বেড়ে উঠছে, তার ভবিষ্যৎ কতটা নিরাপদ? নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা ও পরিচর্যার অভাব একজন শিশুকে ঝুঁকির মুখে ঠেলে দিতে পারে। অপরাধে জড়িয়ে পড়ার পর শাস্তি দেওয়ার পাশাপাশি তার আগেই নিরাপদ আশ্রয়, পুষ্টি, শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ তৈরি করা কি অধিক দূরদর্শী পদক্ষেপ নয়?

একটি নিরাপদ শহর গড়তে হলে শহরের সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলোর নিরাপত্তাও নিশ্চিত করতে হবে। তাই গৃহহীন মানুষের জন্য প্রয়োজন নিরাপদ আবাসন, স্যানিটেশন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা ও জীবিকার সুযোগ নিশ্চিত করে একটি সমন্বিত উদ্যোগ।

যে দেশ ১০ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় ও মানবিক সহায়তা দেওয়ার সক্ষমতা দেখিয়েছে, সেই দেশে লাখখানেক গৃহহীন মানুষের জন্য পরিকল্পিত আবাসন ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা কি অসম্ভব? দুটি পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট অবশ্যই ভিন্ন। তবু এই অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, পরিকল্পনা ও সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের মাধ্যমে বড় মানবিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করা সম্ভব। যেখানে হাজার হাজার কোটি টাকার মেগা প্রকল্প গ্রহণ করা হয়, সেখানে গৃহহীন মানুষের জন্য কয়েক হাজার কোটি টাকার একটি সমন্বিত প্রকল্পের সম্ভাব্যতা যাচাই করা যাবে না কেন?

.নদীভাঙনে দিশাহারা মানুষের খবর কি রাখে সরকার.

সারা দেশ থেকে বিপুল মানুষ ঢাকায় আসেন। সেখানে গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষেরাও থাকেন। নগরে জনসংখ্যার চাপ এড়াতে জনকল্যাণমুখী গ্রামে বা মফস্সলে উন্নয়নের দিকে মনোযোগ বাড়াতে হবে। এরপরও অনেক গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষ ঢাকায় আসবেন, থেকেও যাবেন, তাঁদের কথা ভেবেই এই লেখাটি লেখা।

ঢাকার আশপাশে উপযুক্ত জমি চিহ্নিত করে জনস্বার্থে আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় জমি অধিগ্রহণের মাধ্যমে গৃহহীন ও চরম আবাসন-সংকটে থাকা মানুষের জন্য স্বল্প মূল্যের আবাসন গড়ে তোলা যেতে পারে। তবে জমি নির্বাচন করতে হবে পরিবেশগত প্রভাব, যোগাযোগব্যবস্থা, কর্মসংস্থান কেন্দ্রের দূরত্ব, নির্মাণব্যয় ও দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনব্যয় বিবেচনায় নিয়ে।

এই আবাসন শুধু মাথা গোঁজার ঠাঁই হবে না; সেখানে থাকতে হবে নিরাপদ পানি, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, পয়োনিষ্কাশন, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বিদ্যুৎ, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা ও শিশুদের শিক্ষার ব্যবস্থা। নারী, শিশু, প্রবীণ ও প্রতিবন্ধী মানুষের বিশেষ প্রয়োজনও বিবেচনায় নিতে হবে। পরিবারগুলো যেন নিরাপদে বসবাস করতে পারে এবং শিশুরা যেন স্বাভাবিকভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ পায়, সেটিই হতে হবে মূল লক্ষ্য।

.

তবে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে গেলে চলবে না। ঢাকা শহরের অনেক গৃহহীন ও নিম্ন আয়ের মানুষ জীবিকার জন্য শহরের ওপর নির্ভরশীল। কেউ রিকশা চালান, কেউ হকারি করেন, কেউ নির্মাণশ্রমিক কিংবা পরিচ্ছন্নতাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। এ কারণে আবাসন প্রকল্পের সঙ্গে সাশ্রয়ী পরিবহনব্যবস্থা যুক্ত করা অপরিহার্য। শ্রমজীবী মানুষের কাজের সময় অনুযায়ী রুট ও সময়সূচি নির্ধারণে সেখানে গণপরিবহন চালু করতে হবে। প্রয়োজনে সরকার ভর্তুকি দিতে পারে।

পুনর্বাসন মানে এক জায়গা থেকে মানুষকে উচ্ছেদ করে অন্য জায়গায় সরিয়ে দেওয়া নয়; বরং তাঁদের জীবনে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। তাই প্রকৃত গৃহহীন মানুষের সংখ্যা, পারিবারিক অবস্থা, জীবিকা ও আবাসনের চাহিদা নিরূপণ করে স্বচ্ছ নীতিমালার ভিত্তিতে সুবিধাভোগী নির্বাচন করতে হবে। তাঁদের মতামতও গুরুত্ব পেতে হবে। একই সঙ্গে বস্তিতে বসবাসকারী নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও নাগরিক সুবিধা উন্নত করতে হবে। যেখানে বিদ্যমান বসতি নিরাপদ করা সম্ভব নয়, সেখানে জীবিকা ও সামাজিক যোগাযোগের বিষয়টি বিবেচনায় রেখে বিকল্প আবাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।

.ঘর বাঁচলে জীবন বাঁচে, দারিদ্র্য কমে, মর্যাদাও বাড়ে.

সরকার প্রথমে একটি পূর্ণাঙ্গ জরিপের মাধ্যমে গৃহহীন মানুষের সংখ্যা, অবস্থান ও প্রয়োজন নিরূপণ করতে পারে। এরপর জমি নির্বাচন, ব্যয় ও সম্ভাব্য সুফল মূল্যায়ন করে পরীক্ষামূলকভাবে এক বা একাধিক এলাকায় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তা সম্প্রসারণ করা সম্ভব। প্রকল্পের সাফল্য শুধু কতটি ঘর তৈরি হলো, তা দিয়ে বিচার করা উচিত নয়। কতটি পরিবার স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারছে, শিশুদের শিক্ষার সুযোগ বাড়ছে কি না, মানুষ সহজে কর্মস্থলে যেতে পারছে কি না এবং স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত হচ্ছে কি না—এসবও মূল্যায়ন করতে হবে। নির্মাণের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও পরিচালন ব্যয়ের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা উন্নয়নের জন্য সড়ক, সেতু, মেট্রোরেল ও অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে বড় প্রকল্প গ্রহণ করি। এসব অবকাঠামো প্রয়োজনীয়। কিন্তু উন্নয়নের সুফল যদি শহরের সবচেয়ে অসহায় মানুষগুলোর কাছে না পৌঁছায়, তাহলে সেই উন্নয়ন কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক?

.

নীতিনির্ধারণী মহলের কাছে প্রত্যাশা, ঢাকার গৃহহীন মানুষের সমস্যাকে বিচ্ছিন্ন কোনো সামাজিক সমস্যা হিসেবে না দেখে নগর-উন্নয়ন, জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হোক। আবাসন, স্যানিটেশন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, জীবিকা ও সাশ্রয়ী পরিবহনকে একই পরিকল্পনার আওতায় এনে পর্যায়ক্রমে একটি সমন্বিত মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হোক।

একটি শহর কতটা উন্নত, তা শুধু তার উঁচু ভবন, প্রশস্ত রাস্তা কিংবা আধুনিক পরিবহনব্যবস্থা দিয়ে বিচার করা যায় না। সেই শহরের সবচেয়ে অসহায় মানুষটি কতটা নিরাপদে ও মর্যাদার সঙ্গে বেঁচে থাকতে পারছেন, সেটিও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ মাপকাঠি। শহর সবার।

তাই সবার জন্য নিরাপদে বেঁচে থাকার সুযোগ নিশ্চিত করাও রাষ্ট্রের দায়িত্ব। গৃহহীন মানুষকে শুধু ফুটপাত থেকে সরিয়ে দেওয়ার কথা নয়, তাঁদের জীবনে একটি নিরাপদ আশ্রয় ফিরিয়ে দেওয়ার কথা ভাবতে হবে। তাঁদের সন্তানদের জন্য এমন ভবিষ্যৎ গড়তে হবে, যেখানে জন্মপরিস্থিতি তাদের সম্ভাবনাকে আটকে রাখবে না।

  • ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ অধ্যাপক, স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং আহ্বায়ক, ওয়েলবিইং ফার্স্ট ইনিশিয়েটিভ

    মতামত লেখকের নিজস্ব




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি।

© বিডি ২৪ নিউজ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

  বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা,আটকের দাবি : এ্যাংকর সিমেন্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ : তদন্তে দুদক ও ভ্যাট গোয়েন্দা   বরিশাল স্বাস্থ্যখাতে শত কোটি টাকার দুর্নীতি: পিপলাই পরিবারের টেন্ডার সিন্ডিকেট উন্মোচন   ইফতারে বৈষম্যের অভিযোগ: ভিআইপি ও সাধারণ কর্মচারীদের আলাদা মেন্যু, সমালোচনায় বরিশাল সিটি করপোরেশন   বরিশালের হলিমা খাতুন স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা   পটুয়াখালী মেডিকেলে ৭৬ কোটি টাকার টেন্ডার বাতিল হলেও জড়িতরা বহাল তবিয়তে   রাজাপুর এলজিইডির প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ   বরিশালে বদলি ঠেকাতে ৩ শিক্ষকের গ্রেফতার নাটক   বরিশালের সেই বিতর্কিত এডলিন বিশ্বাষ পুলিশের হাতে আটক   না ফেরার দেশে বেগম খালেদা জিয়া   রাজশাহী গণপূর্তে টেন্ডারের আগেই ভাগ হচ্ছে কাজ : প্রশ্নের মুখে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম   বরিশালের রুপাতলী ‘খাবার বাড়ি’ রেস্তোরাঁকে ১ লাখ টাকা জরিমানা   বাকেরগঞ্জে যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে গরু চুরির অভিযোগ   নলছিটিতে বৈদ্যুতিক ফাঁদে প্রাণ হারালেন কৃষক বাচ্চু মল্লিক   বদলি-নিয়োগ-দুর্নীতি, সিন্ডিকেটের দখলে প্রাথমিক শিক্ষাঅধিদপ্তর   উজিরপুরে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে বলৎকারের অভিযোগ,জুতা পেটা   বদলি-বাণিজ্য, ঘুষ নিয়ন্ত্রণ করতেন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে, ছয় বছরের সাম্রাজ্য শাহজাহান আলীর   বরিশালে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের জায়গা দখল চেষ্টার অভিযোগ   বরিশালে বিসিক উদ্যোক্তা মেলায় স্টল বরাদ্দে অনিয়ম   বরিশাল কর অফিসের রতন মোল্লার হাতে আলাদিনের চেরাগ,একই কর্মস্থলে ১০ বছর   বরিশালের ১৬টি আসনে বিএনপির প্রার্থী যারা
Translate »