
পরিবর্তন কখনো কেবল বাহ্যিক রূপ বদলের বিষয় নয়; এর সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে থাকে আত্মপরিচয়, বিচ্ছিন্নতাবোধ, পারিবারিক সমীকরণ, দায়িত্ববোধ এবং মানুষের প্রতি মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি। প্রখ্যাত অস্ট্রিয়ান-জার্মান কথাসাহিত্যিক ফ্রানৎস কাফকার অমর সৃষ্টি ‘দ্য মেটামরফোসিস’ উপন্যাসে কেন্দ্রীয় চরিত্র গ্রেগর সামসার অদ্ভুত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে আধুনিক মানবসমাজের তীব্র বিচ্ছিন্নতা, একাকিত্ব ও স্বার্থপর সম্পর্কের নির্মম রূপটি অসাধারণ শৈল্পিক দক্ষতায় ফুটে উঠেছে।
গত ২৭ সেপ্টেম্বর বিকেলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের (টিএসসি) মুক্ত ছাদে জাবি বন্ধুসভার সাপ্তাহিক পাঠচক্র অনুষ্ঠিত হয়। এই আসরে কাফকার কালজয়ী সাহিত্যকর্মটি নিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রাণবন্ত উপস্থিতি ও সাহিত্যিক বিচার-বিশ্লেষণ এক বিশেষ মাত্রা যোগ করে।
মূল আলোচক বন্ধু দীপ তৈমুর ‘দ্য মেটামরফোসিস’ বইয়ের মূল ভাব ও চরিত্রের গভীর মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষণ করে বলেন, ‘উপন্যাসের মূল চরিত্র গ্রেগর সামসা পেশায় একজন ভ্রাম্যমাণ বিক্রয়কর্মী। পরিবারের সমস্ত দেনা শোধ ও সংসার চালানোর গুরুদায়িত্ব কাঁধে নিয়ে সে দিনরাত যন্ত্রের মতো কাজ করত। কিন্তু এক সকালে ঘুম থেকে জেগে সে নিজেকে একটি বিশালাকার অদ্ভুত ও ঘৃণ্য পোকায় রূপান্তরিত অবস্থায় আবিষ্কার করে। শারীরিক এই রূপান্তরের চেয়েও বিস্ময়কর ছিল পরিবারের প্রতিক্রিয়া। একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটির এই অপ্রত্যাশিত পরিবর্তনের পর তাকে সহানুভূতির বদলে বরণ করতে হয় অবহেলা ও বন্দিদশা। পরিবার তাকে নিজের ঘরের ভেতরেই একঘরে করে রাখে এবং ধীরে ধীরে প্রিয় ঘরটি থেকে আসবাব ও স্মৃতিচিহ্ন সরিয়ে ফেলে। নিজের ফেলে আসা মানবিক সত্তা ও পছন্দের একটি ছবি আঁকড়ে ধরতে পোকারূপী গ্রেগর যে মরিয়া লড়াই চালায়, তা মানুষের ভেতরে বেঁচে থাকার শেষ আকুতিকেই প্রকাশ করে।’
দীপ তৈমুর বলেন, ‘গ্রেগর কাজ করার ক্ষমতা হারানোর সঙ্গে সঙ্গেই পরিবারের কাছে তার উপযোগিতা ও গুরুত্ব ফুরিয়ে যায়। যে ছোট বোন গ্রেট শুরুতে সহানুভূতির হাত বাড়িয়েছিল, একপর্যায়ে পরিস্থিতি অসহনীয় হয়ে উঠলে সে-ও বাবাকে স্পষ্ট জানায় যে এই বোঝা থেকে তাদের নিষ্কৃতি পাওয়া প্রয়োজন। তীব্র শারীরিক ক্ষত, মানসিক যন্ত্রণা, ক্ষুধা ও পরিবারের চূড়ান্ত অবহেলায় ভুগে গ্রেগর একসময় নিজের ঘরে নিঃসঙ্গভাবে শেষনিশ্বাস ত্যাগ করে। চরম ট্র্যাজেডি হলো, গ্রেগরের মৃত্যুর পর পরিবার কোনো শোক পালন না করে বরং দীর্ঘদিনের বোঝা নেমে যাওয়ার মতো গভীর স্বস্তি প্রকাশ এবং নতুন দিনের সোনালি স্বপ্ন দেখতে শুরু করে।’
মুক্ত আলোচনা পর্বে উপস্থিত বন্ধুরা কাফকার অস্তিত্ববাদী ও পরাবাস্তববাদী এই আখ্যানের গভীর দর্শন নিয়ে আলোচনা করেন। তাঁরা উল্লেখ করেন, কাফকা এখানে কেবল শারীরিক রূপান্তরের গল্প বলেননি; বরং পুঁজিবাদী সমাজে শ্রমিকের যন্ত্রে রূপান্তর এবং নিঃশর্ত প্রেমের নামে চলমান স্বার্থপর সামাজিক সম্পর্কের ফাঁকফোকর উন্মোচন করেছেন। উপযোগিতা ফুরিয়ে গেলে সমাজে ব্যক্তির অস্তিত্ব যে মূল্যহীন হয়ে পড়ে, গ্রেগর সামসা তারই চিরন্তন প্রতীক। জীবনের চরম সংকটে বা অক্ষমতার সময়ে মানুষের কেবল বস্তুগত আশ্রয় নয়, দরকার পারস্পরিক মমতা ও মানবিক সহমর্মিতা।
পাঠচক্রে উপস্থিত ছিলেন সভাপতি সৈয়দ সালমান হাসান, সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, সাংগঠনিক সম্পাদক সিফাত আরেফিন, প্রচার সম্পাদক অরুণিমা পাল, সাবেক সাধারণ সম্পাদক অনুপ সরকার, বন্ধু তিথি চৌধুরীসহ সংগঠনের বিভিন্ন বিভাগের সদস্য ও সাহিত্যপ্রেমী শিক্ষার্থীরা।
পাঠচক্র ও পাঠাগার সম্পাদক, জাবি বন্ধুসভা