
মো. বোরহান উদ্দিন জিহাদ: ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচন ঘিরে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-এআইয়ের অপব্যবহার যে ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে, তা বৃহস্পতিবার প্রকাশিত সমকালের একটি প্রতিবেদনে বিস্তারিত এসেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনারের বক্তব্যেও তা উঠে এসেছে, ‘আগামী নির্বাচনে এআইয়ের অপব্যবহার একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এটি মোকাবিলা করা আমাদের জন্য বড় সমস্যা হতে পারে।’ নির্বাচন কমিশনের এই উৎকণ্ঠা অমূলক নয়। বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলো প্রমাণ করেছে, এআই একদিকে যেমন প্রশাসনিক দক্ষতা বাড়াতে পারে, অন্যদিকে অপব্যবহৃত হলে গণতন্ত্রের ভিত নীরবে দুর্বল করে দেয়। প্রযুক্তির এই দ্বিমুখী চরিত্র এখন রাষ্ট্র ও নাগরিক সমাজের জন্য এক নতুন নৈতিক পরীক্ষার জন্ম দিয়েছে।
বাংলাদেশে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের বিস্তার ঘটলেও ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি। অনেক ক্ষেত্রে ভাইরাল কনটেন্টকেই সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। রাজনৈতিক মেরূকরণ, আবেগনির্ভর মতাদর্শ এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়ার সংস্কৃতি এআই-নির্ভর বিভ্রান্তির জন্য উর্বর ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
এআই প্রযুক্তির সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো ডিপফেক। উন্নত সফটওয়্যার ব্যবহার করে যে কাউকে দিয়ে এমন কথা বলানো সম্ভব, যা তিনি কখনও বলেননি। মুখভঙ্গি, কণ্ঠস্বর, আবেগ–সবই নিখুঁতভাবে নকল করা যায়। নির্বাচনের ঠিক আগে এমন ভিডিও বা অডিও ছড়িয়ে পড়লে সত্য যাচাইয়ের আগেই ভোটার মানসিকভাবে প্রভাবিত হয়ে পড়েন।
দীর্ঘ বক্তব্যের নির্দিষ্ট কয়েক সেকেন্ড কেটে তা সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে উপস্থাপন করা এখন অত্যন্ত সহজ। এআইয়ের মাধ্যমে কণ্ঠের স্বর জোরালো করা, মুখভঙ্গি পাল্টে দেওয়া কিংবা উত্তেজনাকর ব্যাকগ্রাউন্ড যোগ করে বক্তব্যকে উস্কানিমূলক বানানো যায়। এআই অ্যালগরিদম ব্যবহার করে ভোটারদের ধর্ম, এলাকা, বয়স, পেশা বা মানসিক দুর্বলতার ভিত্তিতে আলাদা আলাদা বার্তা পাঠানো যায়। একেক গোষ্ঠীর কাছে একেক ধরনের ভয়, গুজব বা অবাস্তব প্রতিশ্রুতি পৌঁছে দিয়ে সামগ্রিক রাজনৈতিক স্বচ্ছতা ভেঙে ফেলা হয়। এআই দিয়ে তৈরি তথাকথিত জরিপ, গ্রাফ ও বিশ্লেষণ দেখতে এতটাই পেশাদার হয় যে সাধারণ মানুষ সহজেই বিশ্বাস করে ফেলে। এসব ভুয়া তথ্য ভোটের ফল নিয়ে আগাম ধারণা তৈরি করে জনমতকে প্রভাবিত করতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার অপব্যবহার রোধে প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব পড়ে সাধারণ নাগরিকের ওপর। কারণ ডিজিটাল যুগে বিভ্রান্তি ছড়ায় মূলত মানুষের হাত ধরেই। কোনো ভিডিও বা অডিও ভাইরাল হলেই সেটিকে সত্য ধরে নেওয়ার প্রবণতা, আবেগতাড়িত প্রতিক্রিয়া এবং যাচাই ছাড়াই শেয়ার করার সংস্কৃতি এআই অপব্যবহারের সবচেয়ে বড় শক্তি হয়ে উঠেছে। একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে তাই প্রত্যেকের দায়িত্ব হচ্ছে–কোনো কনটেন্ট দেখামাত্র বিশ্বাস না করা, সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট যাচাই করা এবং উৎস সম্পর্কে নিশ্চিত না হয়ে তা ছড়িয়ে না দেওয়া।
নির্বাচন কমিশনের দায়িত্ব কেবল ভোটকেন্দ্র পরিচালনায় সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। রাজনৈতিক প্রচারণায় এআই ব্যবহারের স্পষ্ট নীতিমালা, এআই-নির্মিত কনটেন্টে বাধ্যতামূলক লেবেলিং এবং দ্রুত ফ্যাক্ট-চেক ব্যবস্থাই পারে তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা রক্ষা করতে। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত নিজেদের মধ্যে একটি নৈতিক ঐকমত্য গড়ে তোলা; যেখানে এআই দিয়ে প্রতারণা নয়, বরং নীতি, কর্মসূচি ও যুক্তির ভিত্তিতে প্রতিযোগিতা হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়ায় সংবাদমাধ্যমের ভূমিকা হয়ে ওঠে সমাজের বিবেকের মতো। যাচাই ছাড়া অডিও-ভিডিও প্রচার না করা, দ্রুত ফ্যাক্ট-চেকিং ইউনিট সক্রিয় রাখা এবং মিথ্যা তথ্যের বিপরীতে সত্যকে দৃশ্যমান করা সংবাদমাধ্যমের নৈতিক দায়িত্ব।
সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে শিক্ষিত তরুণ সমাজ। প্রযুক্তিকে যারা সবচেয়ে ভালো বোঝে, তারাই যদি নীরব থাকে, তবে অপব্যবহার অনিবার্য হয়ে ওঠে। আবেগ নয়, বিশ্লেষণ; গুজব নয়, প্রমাণ–এই চর্চাই পারে ডিজিটাল রাজনীতিকে সুস্থ পথে ফিরিয়ে আনতে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কোনো শত্রু নয়। শত্রু হলো দায়িত্বহীন ব্যবহার ও নৈতিক শূন্যতা।
মো. বোরহান উদ্দিন জিহাদ: গবেষক