শুক্রবার ২রা জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ ১৮ই পৌষ, ১৪৩২ বঙ্গাব্দ
ই-পেপার   শুক্রবার ২রা জানুয়ারি, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ


প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শামসুজ্জামানকে নিয়ে বিতর্ক
প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর, ২০২৫, ৩:১৭ পূর্বাহ্ণ |
অনলাইন সংস্করণ

প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক শামসুজ্জামানকে নিয়ে বিতর্ক

বিডি ২৪ নিউজ অনলাইন: প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তর দেশের সবচেয়ে বড় ও সংবেদনশীল প্রশাসনিক কাঠামোগুলোর একটি। দেশের প্রায় দেড় কোটি শিক্ষার্থী, কয়েক লক্ষ শিক্ষক এবং হাজার হাজার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম এই অধিদপ্তরের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এ দপ্তরের মহাপরিচালকের ভূমিকা শুধু প্রশাসনিক নয়, বরং রাষ্ট্রীয় নীতি, সামাজিক স্থিতি ও রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। এমন প্রেক্ষাপটে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামানকে নিয়ে সম্প্রতি যে অভিযোগ, প্রশ্ন ও সমালোচনা প্রকাশ্যে আসছে, তা জনস্বার্থের বিবেচনায় অনুসন্ধান দাবি করে।

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সাবেক সংসদ সদস্য ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক গোলাম মাওলা রনির দেওয়া একটি ফেসবুক স্ট্যাটাস নতুন করে আলোচনার সূত্রপাত করে। সেখানে তিনি মহাপরিচালকের আচরণ, প্রশাসনিক পদ্ধতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ এবং একটি নির্দিষ্ট সিন্ডিকেটের মাধ্যমে দপ্তর পরিচালনার অভিযোগ তোলেন। যদিও এটি একটি ব্যক্তিগত স্ট্যাটাস, তবে এর বিষয়বস্তু যেহেতু একটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় দপ্তরের প্রধানকে ঘিরে এবং সেখানে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সঙ্গে মাঠপর্যায়ের শিক্ষক আন্দোলন, বদলি-বাণিজ্য ও প্রশাসনিক অচলাবস্থার প্রসঙ্গ যুক্ত, তাই বিষয়টি কেবল ব্যক্তিগত মতামতের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।

অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হিসেবে আবু নূর মো. শামসুজ্জামানের দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকেই দপ্তরের ভেতরে ও বাইরে এক ধরনের অদৃশ্য ক্ষমতাকেন্দ্র গড়ে উঠেছে—এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। মাঠপর্যায়ের একাধিক শিক্ষক, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা এবং দপ্তরের অভ্যন্তরীণ সূত্রের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অনেক সিদ্ধান্ত সরাসরি লিখিত নথির মাধ্যমে নয়, বরং মৌখিক নির্দেশনা ও নির্দিষ্ট ব্যক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি প্রশ্নের মুখে পড়ছে।

একাধিক প্রাথমিক শিক্ষক নেতা অভিযোগ করেন, বদলি, পদায়ন, প্রশিক্ষণ মনোনয়ন কিংবা প্রশাসনিক সুবিধা পেতে হলে একটি নির্দিষ্ট বলয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হয়। সরাসরি মহাপরিচালকের সঙ্গে দেখা করা বা কথা বলা প্রায় অসম্ভব বলেই তারা দাবি করেন। অনেকের মতে, মহাপরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী বা তার ঘনিষ্ঠ কয়েকজন কর্মকর্তা দপ্তরের বাস্তব ক্ষমতার নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছেন। এসব অভিযোগ যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত নয়, তবে মাঠপর্যায়ের ক্ষোভ ও আন্দোলনের ভাষায় সেগুলোর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে।

গত কয়েক মাসে রাজধানীসহ বিভিন্ন জেলায় প্রাথমিক শিক্ষকদের একাধিক কর্মসূচি ও আন্দোলন হয়েছে। এসব আন্দোলনে প্রধান যে অভিযোগগুলো উঠে এসেছে, তার মধ্যে রয়েছে অন্যায্য বদলি, পদোন্নতিতে অনিয়ম, প্রশাসনিক হয়রানি এবং নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণে মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা উপেক্ষা করা। আন্দোলনরত শিক্ষকদের একটি অংশ সরাসরি মহাপরিচালকের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যদিও সরকারি কর্মচারী বিধির কারণে অনেকেই প্রকাশ্যে কথা বলতে চাননি।

অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার অভিযোগ। দপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, জরুরি প্রশাসনিক বিষয়েও মহাপরিচালকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করা কঠিন। ফোন কল, দাপ্তরিক চিঠি কিংবা অফিসিয়াল চ্যানেল ব্যবহার করেও অনেক সময় সাড়া পাওয়া যায় না বলে তারা দাবি করেন। এর ফলে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত আটকে থাকে বা মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরশীলতা বাড়ে, যা প্রশাসনিক শৃঙ্খলার জন্য ইতিবাচক নয়।

গোলাম মাওলা রনির স্ট্যাটাসে উল্লিখিত ফোন নম্বরগুলোতে যোগাযোগের বিষয়টি অনুসন্ধান করে দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট নম্বরগুলো সত্যিই বিভিন্ন সময় দপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগে ব্যবহৃত হয়েছে বলে একাধিক সূত্র নিশ্চিত করেছে। তবে মহাপরিচালকের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে তার দপ্তরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও নির্দিষ্ট কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

দুর্নীতির অভিযোগ অনুসন্ধানের ক্ষেত্রে সবচেয়ে সংবেদনশীল বিষয় হয়ে ওঠে বদলি ও পদায়ন। প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা বিশাল হওয়ায় এখানে বদলির সংখ্যা স্বাভাবিকভাবেই অনেক। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এই বদলিকে কেন্দ্র করে আর্থিক লেনদেনের একটি অঘোষিত বাজার তৈরি হয়েছে। একাধিক শিক্ষক ও মধ্যস্ততাকারীর বক্তব্য অনুযায়ী, পছন্দের জায়গায় বদলি, শাস্তিমূলক বদলি বাতিল কিংবা প্রশাসনিক সুবিধা পেতে অর্থ লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে সরাসরি কোনো লিখিত প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে অভিযোগের ব্যাপকতা ও ধারাবাহিকতা প্রশ্ন তৈরি করে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মতো বড় দপ্তরে যদি ক্ষমতা এককভাবে কেন্দ্রীভূত হয় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতা না থাকে, তাহলে দুর্নীতির ঝুঁকি বহুগুণে বেড়ে যায়। বিশেষ করে যেখানে কয়েক হাজার বদলি আদেশ একসঙ্গে জারি করা সম্ভব, সেখানে একটি কলমের খোঁচায় বিপুল সংখ্যক মানুষ লাভবান বা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। এই বাস্তবতায় মহাপরিচালকের ভূমিকা আরও বেশি জবাবদিহির আওতায় থাকা প্রয়োজন।

এদিকে প্রশাসনের ভেতরের একটি অংশ মনে করে, আবু নূর মো. শামসুজ্জামান একজন শক্ত হাতে দপ্তর পরিচালনা করছেন এবং শৃঙ্খলা আনতেই তিনি কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাদের মতে, যারা দীর্ঘদিন অনিয়মের সুবিধা ভোগ করতেন, তারাই এখন অসন্তুষ্ট হয়ে অভিযোগ তুলছেন। এই পক্ষের বক্তব্য অনুযায়ী, কঠোর প্রশাসনিক সিদ্ধান্তকে অনেক সময় ব্যক্তিগত আক্রমণ হিসেবে উপস্থাপন করা হয়।

তবে অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের দৃষ্টিতে মূল প্রশ্ন থেকে যায়—এই অভিযোগগুলো তদন্ত হচ্ছে কি না, এবং হলে কীভাবে। এখন পর্যন্ত প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় কিংবা সংশ্লিষ্ট কোনো সংস্থা থেকে আনুষ্ঠানিক তদন্তের ঘোষণা পাওয়া যায়নি। দুদক বা অন্য কোনো নজরদারি সংস্থার প্রকাশ্য পদক্ষেপও চোখে পড়েনি। ফলে অভিযোগ, পাল্টা যুক্তি ও নীরবতার মধ্যে সত্যটি অস্পষ্টই থেকে যাচ্ছে।

একজন সাবেক শিক্ষা সচিব নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “এ ধরনের অভিযোগ যদি প্রকাশ্যে আসে, তবে সরকারের উচিত স্বচ্ছ তদন্ত করা। এতে যদি অভিযোগ মিথ্যা হয়, তাতেও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার সম্মান রক্ষা পাবে। আর যদি সত্য হয়, তাহলে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।” তার মতে, নীরবতা সবসময় সন্দেহ বাড়ায়।

এই অনুসন্ধানের শেষ পর্যায়ে এসে যে চিত্রটি স্পষ্ট হয়, তা হলো—প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামানকে ঘিরে অভিযোগ, অসন্তোষ ও প্রশ্নের একটি বড় বলয় তৈরি হয়েছে। এসব অভিযোগের সবকটি যে সত্য, তা নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। আবার সবকটি যে ভিত্তিহীন, তাও জোর দিয়ে বলা কঠিন। কিন্তু একটি রাষ্ট্রীয় দপ্তরের প্রধানকে ঘিরে যদি দীর্ঘদিন ধরে যোগাযোগহীনতা, ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ, সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও সম্ভাব্য দুর্নীতির অভিযোগ ঘুরে ফিরে আসে, তাহলে সেটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

জনস্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে এখন সবচেয়ে প্রয়োজন একটি স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও বিশ্বাসযোগ্য তদন্ত। প্রাথমিক শিক্ষা দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ভিত্তি। সেই ভিত্তির ওপর যদি আস্থার সংকট তৈরি হয়, তাহলে তার প্রভাব কেবল প্রশাসনে নয়, পুরো সমাজে ছড়িয়ে পড়ে। তাই ব্যক্তিবিশেষ নয়, বরং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিই হওয়া উচিত এই আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু।




এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

সম্পাদক ও সিইও: মামুনুর রশীদ নোমানী

ইমেইল: nomanibsl@gmail.com

মোবাইল: 01713799669 / 01712596354

 

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি।

© বিডি ২৪ নিউজ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

  বরিশালে বদলি ঠেকাতে ৩ শিক্ষকের গ্রেফতার নাটক   বরিশালের সেই বিতর্কিত এডলিন বিশ্বাষ পুলিশের হাতে আটক   না ফেরার দেশে বেগম খালেদা জিয়া   রাজশাহী গণপূর্তে টেন্ডারের আগেই ভাগ হচ্ছে কাজ : প্রশ্নের মুখে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম   বরিশালের রুপাতলী ‘খাবার বাড়ি’ রেস্তোরাঁকে ১ লাখ টাকা জরিমানা   বাকেরগঞ্জে যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে গরু চুরির অভিযোগ   নলছিটিতে বৈদ্যুতিক ফাঁদে প্রাণ হারালেন কৃষক বাচ্চু মল্লিক   বদলি-নিয়োগ-দুর্নীতি, সিন্ডিকেটের দখলে প্রাথমিক শিক্ষাঅধিদপ্তর   উজিরপুরে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে বলৎকারের অভিযোগ,জুতা পেটা   বদলি-বাণিজ্য, ঘুষ নিয়ন্ত্রণ করতেন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে, ছয় বছরের সাম্রাজ্য শাহজাহান আলীর   বরিশালে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের জায়গা দখল চেষ্টার অভিযোগ   বরিশালে বিসিক উদ্যোক্তা মেলায় স্টল বরাদ্দে অনিয়ম   বরিশাল কর অফিসের রতন মোল্লার হাতে আলাদিনের চেরাগ,একই কর্মস্থলে ১০ বছর   বরিশালের ১৬টি আসনে বিএনপির প্রার্থী যারা   বরিশালে অপসাংবাদিকতা বন্ধে ঐক্যবদ্ধ ৩৫ সংগঠন   আটকে আছে ১৭শ কিলোমিটার সড়ক মেরামত ও উন্নয়ন কাজ   বরিশালের রাঙামাটি নদী থেকে হাত-পা বাঁধা যুবকের লাশ উদ্ধার   সারদা পুলিশ একাডেমি থেকে লাপাত্তা ডিআইজি এহসানউল্লাহ   বরিশালের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রকের বিরুদ্ধে ২০ লাখ টাকা ঘুস নিয়ে বদলীর অভিযোগ   বরিশালে ফরচুন মিজানের ভাই রবিউল আটক
Translate »