
বিডি ২৪ নিউজ অনলাইন: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্পোরেশন (বিআরটিসি)—রাষ্ট্রীয় এই পরিবহন সংস্থাটি দীর্ঘদিন লোকসানের অভিযোগ থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর দাবি করা হলেও ভেতরের চিত্র ভিন্ন বলে উঠে এসেছে অনুসন্ধানে। বিভিন্ন ডিপো, ওয়ার্কশপ, ট্রাক ডিপো ও প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট থেকে নিয়মিত মাসোয়ারা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে সংস্থাটির বর্তমান চেয়ারম্যান, অতিরিক্ত সচিব আব্দুল লতিফ মোল্লার বিরুদ্ধে।
এই অনুসন্ধানে প্রাপ্ত নথি, একাধিক দায়িত্বশীল সূত্র ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে কয়েক কোটি টাকা অবৈধভাবে সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডিপো-কেন্দ্রিক মাসোয়ারা ব্যবস্থা
অনুসন্ধানে জানা যায়, বিআরটিসির অধীনে থাকা দেশের ২৪টি বাস ডিপো থেকে নিয়মিত অর্থ আদায়ের একটি কাঠামো গড়ে উঠেছে। প্রতিটি ডিপো থেকে সমপরিমাণ অর্থ না নেওয়া হলেও গড়ে মাসে ১১ থেকে ১৬ লাখ টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ।
সূত্রগুলো বলছে,
এই অর্থ কোনো ভাউচার বা অফিসিয়াল রেকর্ড ছাড়াই
সরাসরি নগদে (হ্যান্ড ক্যাশ) সংগ্রহ করা হয়
অর্থ পৌঁছে দেওয়া হয় হেড অফিসে
এভাবে শুধুমাত্র বাস ডিপো থেকেই মাসে প্রায় ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
প্রভাব পড়ছে কর্মচারীদের বেতনে
ডিপোগুলোতে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপকরা জানান, মাসোয়ারা দেওয়ার চাপের কারণে অনেক ক্ষেত্রে চালক ও কর্মচারীদের বেতন সময়মতো দেওয়া যাচ্ছে না। আগে যেখানে মাসের শেষ নাগাদ বেতন পরিশোধ হতো, এখন তা গড়াচ্ছে ১০ তারিখের পর।
প্রতিটি বাস ও কাউন্টার থেকেও অর্থ আদায়
অনুসন্ধানে আরও উঠে আসে, বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী প্রতিটি বাস থেকে দৈনিক এক হাজার টাকা
প্রতিটি কাউন্টার থেকে মাসে ৪০ থেকে ৫৫ হাজার টাকা
এই অর্থও নিয়মিত আদায় করা হচ্ছে। ব্যবস্থাপকরা সরাসরি চেয়ারম্যানের জন্য এই অর্থ সংগ্রহ করেন বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
ওয়ার্কশপ ও ট্রাক ডিপোর অর্থনীতি
শুধু বাস ডিপো নয়, বিআরটিসির ওয়ার্কশপ ও ট্রাক ডিপোতেও রয়েছে একই চিত্র।
ওয়ার্কশপ:
আইসিডব্লিউএস
কেন্দ্রীয় মেরামত কারখানা (সিডব্লিউএস)
এই দুটি ইউনিট থেকে প্রতি মাসে প্রায় ১০ লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
ট্রাক ডিপো:
ঢাকা ট্রাক ডিপো (তেজগাঁও): মাসে প্রায় ১১ লাখ টাকা
চট্টগ্রাম ট্রাক ডিপো: মাসে প্রায় ৯ লাখ ৫০ হাজার টাকা
তেজগাঁও ট্রাক ডিপোতে এই অনিয়মের প্রতিবাদে চালকদের বিক্ষোভ ও অবস্থান কর্মসূচির ঘটনাও ঘটেছে বলে অনুসন্ধানে জানা গেছে।
প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউটেও মাসিক চাঁদা
অনুসন্ধানে দেখা যায়, দেশের ৯টি ট্রেনিং ইনস্টিটিউট থেকে প্রতি মাসে মোট প্রায় ৪ লাখ ৭০ হাজার টাকা সংগ্রহ করা হয়। এসব ইনস্টিটিউটের বাজেট ও প্রশিক্ষণ ব্যয়ের মধ্যেই এই অর্থ সমন্বয় করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ব্যয় বাড়িয়ে দেখানোর অভিযোগ
অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে বিভিন্ন প্রকল্প ও খরচের ক্ষেত্রেও।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা
পূর্বে যেখানে বিআরটিসির অপারেটিং ব্যয় ধরা হতো প্রায় ১৫ লাখ টাকা, সেখানে বর্তমানে তা নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ৫৭ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকৃত ব্যয় ৬ লাখ টাকার বেশি হওয়ার কথা নয়।
অফিস সাজসজ্জা
চেয়ারম্যানের কক্ষ সাজসজ্জার জন্য ৪৫ লাখ টাকার বরাদ্দ দেখানো হলেও বড় অংশ ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে।
বদলি-বাণিজ্য ও আনুগত্যের রাজনীতি
অনুসন্ধানে পাওয়া গেছে,
যারা মাসিক মাসোয়ারা দিতে সক্ষম, তারাই ভালো ডিপো বা সুবিধাজনক স্থানে বদলি হন
সততার সঙ্গে কাজ করতে চাওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নানা চাপ ও হয়রানির শিকার হন
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যবস্থাপক বলেন,
“টাকা দিতে পারলেই পদ ও পোস্টিং নিশ্চিত। না পারলে আপনি শত্রু।”
দুর্নীতি নিয়ে সংস্থাগুলোর বক্তব্য
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন,
“সরকারি দপ্তরে বসে অবৈধ অর্থ উত্তোলন গুরুতর অপরাধ। দুর্নীতির কোনো ছোট-বড় নেই। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।”
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) জানায়, অভিযোগ পেলে তা যাচাই করে প্রমাণের ভিত্তিতে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানার জন্য একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও বিআরটিসির চেয়ারম্যান আব্দুল লতিফ মোল্লার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
যে বিআরটিসিকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তরের দাবি করা হচ্ছে, অনুসন্ধানে উঠে আসা এসব অভিযোগ সেই দাবিকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। মাসোয়ারা, বদলি-বাণিজ্য ও ব্যয় বাড়িয়ে দেখানোর মতো অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যাবে।