
চোতরাপাতা বা বিছুটিপাতার নাম অনেক শুনেছি। কিন্তু গাছটি কখনো দেখলেও ভালোভাবে খেয়াল করিনি। ২০১৯ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোটানিক্যাল গার্ডেনে সযত্নেœরাখা গাছটি চোখে পড়ল মূলত দীর্ঘ ছড়ার মতো একগুচ্ছ ফুল দেখে। গাছের ওপরের দিকে থাকা পাতগুলো দেখে প্রথমে ভেবেছিলাম কদমগাছ! অধ্যাপক আশরাফুজ্জামান বললেন, এটা বিছুটি বা চোতরাপাতা। তাই তো, কদমগাছে দীর্ঘ ছড়ার মতো এমন গুচ্ছবদ্ধ ফুল থাকবে কেন? গাছটির সুনামের চেয়ে দুর্নামের কথাই বেশি প্রচলিত!
বাকৃবি বোটানিক্যাল গার্ডেনে গাছ দেখে গেলাম কৃষি জাদুঘরে। জাদুঘরের চারপাশে অনেক দুর্লভ গাছ রোপণ করা হয়েছে। জাদুঘর–লাগোয়া পেছনের পুকুরে বিচিত্র জলজ ফুলের সমাবেশ। তার মধ্যে একটি ফুল অপেক্ষাকৃত কম চেনা। আমাদের শখের লিলি পুলে এখনো ততটা ছড়িয়ে পড়েনি। এ দুই উদ্ভিদের সংক্ষিপ্ত পরিচয় জানা যাক।
বিছুটিগাছের ইংরেজি নাম ‘স্টিংগিং ট্রি’ বা ডেভিলস নেটল। বড় আকারের গুল্ম বা ছোট বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদ। বাকল সাদা ও মসৃণ। ছোট ডালপালাগুলো গোলাকার, সাদাটে, নরম এবং হুলযুক্ত রোমে আবৃত। এই হুল ত্বকের সংস্পর্শে এলে তীব্র চুলকানি, ত্বকে চাকা চাকা দাগ, জ্বর ও কাঁপুনি এবং ত্বকে আঠালো অনুভূতির সৃষ্টি করে। এই উপসর্গগুলো ১০ দিন থেকে ৬ মাস পর্যন্ত বারবার দেখা দিতে পারে। আক্রান্ত স্থানে প্রতিষেধক হিসেবে লেবুর রস বা হলুদ লাগালে উপসর্গগুলো তাৎক্ষণিকভাবে কমে যায়। পাতা ২০ সেন্টিমিটার লম্বা হতে পারে। ফুল ফোটার সময় নভেম্বর থেকে ডিসেম্বর। বিছুটিগাছ ৩০০ থেকে ১ হাজার ২০০ মিটার পর্যন্ত উচ্চতায় ক্রান্তীয় চিরহরিৎ বনাঞ্চলের প্রধান গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। সাধারণত বনাঞ্চলের ঝরনা বা জলধারার পাশে এবং বনের নিচের স্তরের গাছপালার ভেতর জন্মে।
দীর্ঘস্থায়ী জ্বরের চিকিৎসায় গাছটির মূলের রস ব্যবহারের কথা জানা যায়। এ ছাড়া জন্ডিস নিরাময়ে গাছের মূল পানিতে ফুটিয়ে ক্বাথ তৈরি করে খাওয়া হয়। ফোড়া, ক্ষত, পোড়া স্থান এবং র্যাশ বা ত্বকের ফুসকুড়ি সারাতে এর মূল ও পাতা দিয়ে প্রলেপ তৈরি করে ব্যবহার করা হয়। উত্তর-পূর্ব ভারতের অধিকাংশ জাতিগোষ্ঠী দীর্ঘস্থায়ী জ্বর, ম্যালেরিয়া, আমাশয়, মূত্রনালির সমস্যা, অনিয়মিত ঋতুস্রাব, শরীরের কোনো অংশ ফুলে যাওয়া, ফোড়া এবং অতি সংবেদনশীলতাসহ বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় উদ্ভিদটি ব্যবহৃত হয়ে আসছে।
বিছুটিগাছের (Dendrocnide sinuata) কাণ্ডের ছাল থেকে দড়ি তৈরির উপযোগী শক্তিশালী আঁশ পাওয়া যায়। এই আঁশ দিয়ে মোটা কাপড়ও তৈরি করা হয়। আসামের উত্তর লখিমপুরে এ গাছের ফুল সবজি রান্নায় ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। মুখের দুর্গন্ধ দূর করতে বা সতেজ ভাব আনতেও এর বীজ চিবিয়ে খাওয়া হয়।
এই জলসুন্দরীর নাম আমাদের উদ্ভিদতাত্ত্বিক কোনো বইয়ে পেলাম না। গুগলকে জিজ্ঞেস করে ‘জল নীলাম্বরী’ নামটি পাওয়া গেল। কিন্তু জলজ ফুল বড়নুখা কোথাও কোথাও একই নামে পরিচিত। তবে পুষ্পপ্রেমীরা চাইলে নামটি গ্রহণ করতে পারেন। প্রচলিত ইংরেজি নাম পিকেরেলউইড, যার অর্থ হতে পারে জলজ আগাছা। ফুলটি প্রথম দেখি গাজীপুরের ‘আরণ্যক’ বাগানবাড়িতে ২০১৩ সালে। পরে ২০২৪ সালে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের জাদুঘরের পুকুরে বেশ কটি দেখি।
এই উদ্ভিদ আংশিক প্লাবিত বা জলমগ্ন অবস্থায় জন্মে। তবে এর বিপাকীয় প্রক্রিয়া মাটির স্বল্প অক্সিজেন মাত্রায়ও টিকে থাকতে সক্ষম। প্রাকৃতিকভাবে পানির স্তর ওঠানামা করেÑযেমন বর্ষায় প্লাবন এবং শীতের দিকে পানির স্তর নেমে স্থলভাগ উন্মুক্ত হয়ে ওঠে—এমন এলাকায় এই জলজ ফুল স্বাভাবিকভাবে বেঁচে থাকতে পারে।
জন্মস্থানে উদ্ভিদটির (Pontederia cordata) প্রস্ফুটন মৌসুম গ্রীষ্মের শেষ দিকে হলেও আমাদের দেশে প্রায় বর্ষব্যাপ্ত। নীল রঙের ফুলগুলোয় হলুদ চিহ্ন থাকে, যা পরাগায়নের জন্য মৌমাছিকে আকর্ষণ করে। গাছে যখন বীজ পরিপক্ব হয়, তখন ফল এবং বীজ ডুবিয়ে দেওয়ার জন্য মঞ্জরিদণ্ড বেঁকে যায়। বীজ ছড়ানোর সময় সুপ্ত থাকে এবং ছয় থেকে আট সপ্তাহের মধ্যে অঙ্কুরিত হয়।
মোকারম হোসেন, প্রকৃতি ও পরিবেশবিষয়ক লেখক