
হিজরি ১৯ সাল। তখন খলিফা ওমর ইবনুল খাত্তাবের শাসনামল। রোমানদের বিরুদ্ধে অভিযানে প্রেরিত মুসলিম বাহিনীর অংশ হিসেবে রোমানদের হাতে বন্দী হন বিশিষ্ট সাহাবি আবদুল্লাহ ইবনে হুজাফা আস-সাহমি (রা.)। (ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, ২৭/১২, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৫)
রোমান সম্রাটের কাছে খবর পৌঁছাল, মুসলমানদের ইমান পাহাড়ের চেয়েও দৃঢ়; তাঁরা মৃত্যুকে ভয় পান না এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য অকাতরে জীবন বিলিয়ে দিতে প্রস্তুত।
সম্রাট বিষয়টি নিজের চোখে পরীক্ষা করতে চাইলে তাঁর নির্দেশে বন্দী আবদুল্লাহ ইবনে হুজাফাকে রাজদরবারে হাজির করা হয়। (আল-আসকালানি, আল-ইসাবাহ ফি তামিয়িজিস সাহাবাহ, ৪/৫৬, দারুল কুতুব আল-ইলমিয়া, বৈরুত, ১৯৯৫)
সম্রাট তাঁর দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘আমি তোমার কাছে একটি প্রস্তাব পেশ করতে চাই। খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করো, তাহলে তোমাকে মুক্ত করে দেব।’
তিনি দৃঢ়কণ্ঠে জবাব দিলেন, ‘এটা অসম্ভব।’
সম্রাট বললেন, ‘তুমি একজন বুদ্ধিমান যুবক। প্রস্তাব মেনে খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণ করলে আমার রাজ্যের অর্ধেক তোমাকে দিয়ে দেব।’
তিনি এক কথায় বললেন, ‘এটাও সম্ভব না।’
এবার আরও বড় প্রলোভন দেখিয়ে সম্রাট বললেন, ‘আমার রাজ্যের অর্ধেকের পাশাপাশি আমার ক্ষমতায় তোমাকেও অংশীদার বানাব।’
তিনি বললেন, ‘ইমানের সঙ্গে সওদা হয় না। এর দামাদামি করা যায় না। পুরো রাজত্ব তো দূরের কথা, আপনার বা আমার বাপ-দাদার রাজত্ব এবং আরব-আজমের রাজত্বও যদি আমাকে দেন—আর তার বিনিময়ে যদি বলেন যে এক মুহূর্তের জন্য আমি নবীজির ধর্ম ত্যাগ করি, তবু আমি চুল পরিমাণও নড়ব না।’। (আবদুর রহমান রাফাত পাশা, সুওয়ারুম মিন হায়াতিস সাহাবাহ, পৃষ্ঠা ৮৫, দারুল ফিকর, দামেস্ক, ২০০৪)
সম্রাট অবাক হয়ে গেলেন যে এত বড় প্রলোভনের সামনেও একজন মানুষ অটল রয়েছে।
সম্রাট এবার কঠোর হয়ে নির্দেশ দিলেন আবদুল্লাহর দিকে তির তাক করার জন্য। চারদিক থেকে সৈন্যরা তির তাক করে পুনরায় খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের প্রস্তাব দিল। আবদুল্লাহ (রা.) বললেন, ‘আপনারা যা খুশি করতে পারেন, কিন্তু এক মুহূর্তের জন্যও আমি ধর্ম ত্যাগ করব না।’
বাধ্য হয়ে সম্রাট তাঁকে কারাগারে বন্দী রাখার নির্দেশ দিলেন। (ইবনে আবদুল বারর, আল-ইসতিয়াব ফি মারিফাতিল আসহাব, ২/৩১৩, দারুল জিল, বৈরুত, ১৯৯২)
কারাগারে তাঁর পানাহার বন্ধ করে দেওয়া হলো। কয়েক দিন পর তিনি দুর্বল হয়ে পড়লেন। কারারক্ষীরা খাবার নিয়ে এসে বলল, ‘মদ ও শূকরের মাংস খেয়ে জীবন বাঁচাও।’
আবদুল্লাহ (রা.) ভাবলেন, জীবন বাঁচানোর তাগিদে চরম সংকটে হারাম খাবার খাওয়ার অনুমতি ইসলামে রয়েছে, কিন্তু শত্রুরা ইসলাম নিয়ে উপহাস করে বলতে না পারে, তাই তিনি তা প্রত্যাখ্যান করলেন। (ইউসুফ কান্ধলভি, হায়াতুস সাহাবা, ২/৪১০, মাকতাবা দারুল উলুম, করাচি, ২০০৮)
অবশেষে তাঁর সামনে হালাল খাবার পরিবেশন করা হলো।
এরপর সম্রাট বিশাল এক কড়াইয়ে তেল ফুটিয়ে দুজন মুসলমান বন্দীকে একে একে তাঁর চোখের সামনে নিক্ষেপ করলেন এবং খ্রিষ্টধর্ম গ্রহণের প্রস্তাব দিলেন। আবদুল্লাহ (রা.) আগের মতোই দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, ‘অসম্ভব।’
মৃত্যুর ভয় দেখাতে ব্যর্থ হয়ে সম্রাট তাঁকে নারীর মাধ্যমে প্রলুব্ধ করার সিদ্ধান্ত নেন। রাজ্যের সবচেয়ে সুন্দরী তরুণীকে তাঁর কাছে পাঠানো হলেও তিনি তাঁর দিকে চোখ তুলে তাকালেন না। তরুণী ক্ষিপ্ত হয়ে বলল, ‘তোমরা আমাকে কার কাছে পাঠিয়েছ? সে মানুষ নাকি পাথর!’। (ইবনে আসাকির, তারিখু দিমাশক, ২৭/১৪)
কোনো প্রলোভনেই তাঁকে টলানো গেল না দেখে তাঁকে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত করা হলো। কড়াইয়ের সামনে দাঁড়ানোর পর তাঁর চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
সম্রাট ভেবেছিলেন তিনি ভয় পেয়েছেন। ডেকে পাঠালে আবদুল্লাহ (রা.) স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, ‘মৃত্যুর ভয়ে আমি কাঁদছি না। আমি এই চিন্তায় কাঁদছি যে এখনই আমাকে এই কড়াইয়ের মধ্যে ফেলা হবে এবং আমি শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করব। আমার আফসোস, আমার দেহে যতগুলো পশম আছে, যদি ঠিক ততগুলো জীবন আমার থাকত এবং আল্লাহর পথে একের পর এক সবগুলো কড়াইয়ে বিলিয়ে দিতে পারতাম!’ (ইউসুফ কান্ধলভি, হায়াতুস সাহাবা, ২/৪১১)
সম্রাট বুঝতে পারলেন তাঁকে ইমান থেকে সরানো অসম্ভব। তখন তিনি বললেন, ‘যদি আমার মাথায় একটি চুমু দাও, তবে তোমাকে ও তোমার সব সঙ্গীকে মুক্তি দেব।’
আবদুল্লাহ (রা.) সামান্য এক চুম্বনের বিনিময়ে এতগুলো প্রাণ বেঁচে যাওয়ার সুযোগ হাতছাড়া করলেন না। তিনি সম্রাটের কপাল স্পর্শ করলেন এবং সম্রাটও প্রতিশ্রুতি রক্ষা করে সব মুসলিম বন্দীকে মুক্ত করে দিলেন।
মদিনায় ফেরার পর খলিফা ওমর (রা.) এই আত্মত্যাগের কথা শুনে দারুণ আপ্লুত হন। তিনি উপস্থিত সাহাবিদের উদ্দেশে বললেন, ‘প্রত্যেক মুমিনের উচিত আবদুল্লাহ ইবনে হুজাফার মাথায় চুমু খাওয়া।’
এরপর খলিফা নিজেই তাঁর মাথায় চুমু খান এবং উপস্থিত সাহাবিরাও একে একে তা অনুসরণ করেন। (আল-আসকালানি, আল-ইসাবাহ, ৪/৫৭)
মাহমুদ হাসান ফাহিম: শিক্ষক, বাইতুল আকরাম মসজিদ ও মাদ্রাসা কমপ্লেক্স, গাজীপুর