● ●


সৌদি শ্রমবাজারে সংকট: সামনে বিকল্প কী
প্রকাশ: ১৫ অক্টোবর, ২০২৬, ২:৩৮ অপরাহ্ণ |
অনলাইন সংস্করণ

সৌদি শ্রমবাজারে সংকট: সামনে বিকল্প কী

মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাসংকট বাংলাদেশের অভিবাসন অর্থনীতির গভীর দুর্বলতা উন্মোচন করেছে। এখন প্রশ্ন শুধু কতজন কর্মী বিদেশে পাঠানো যাবে তা নয়; প্রশ্ন হলো, তাঁদের জীবন, বিনিয়োগ ও ভবিষ্যৎ কতটা সুরক্ষিত।

সৌদি আরবের বিমানবন্দরে হামলা, ফ্লাইট বাতিল, শ্রমিকদের আটকে পড়া কিংবা ভিসার অনিশ্চয়তা—এসব শুধু সাময়িক ভ্রমণ বিঘ্ন নয়; বাংলাদেশের অভিবাসন অর্থনীতির জন্য সতর্কসংকেত। সৌদি আরব লাখ লাখ বাংলাদেশির কর্মস্থল, বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস। সেখানকার অস্থিরতার অভিঘাত এসে পড়ে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান, গ্রামীণ অর্থনীতি ও জাতীয় আয়ে।

প্রথম আলোর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১২ অক্টোবর পর্যন্ত বিদেশে কর্মসংস্থানের ছাড়পত্র গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ৩২ শতাংশ কমেছে; সৌদি আরবে কমেছে প্রায় ৪৬ শতাংশ। একই সময়ে দেশটির বিভিন্ন বিমানবন্দরে নিরাপত্তার কারণে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক যাত্রীর যাত্রা ব্যাহত হয়েছে।

এ সংকটের জন্য সৌদি আরবের বর্তমান নিরাপত্তা পরিস্থিতিকেই একমাত্র দায়ী করা যাবে না। বরং এই পরিস্থিতি আমাদের এমন কিছু দীর্ঘদিনের নীতিগত ব্যর্থতা দেখিয়ে দিচ্ছে, যেগুলো স্বাভাবিক সময়ে সংখ্যার আড়ালে ঢাকা পড়ে থাকে। বাংলাদেশের অভিবাসন অর্থনীতি বড় হয়েছে, কিন্তু তার ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কি একইভাবে পরিপক্ব হয়েছে?

বাংলাদেশের বিদেশে কর্মসংস্থানের সাফল্য সাধারণত কতজন কর্মী বিদেশে গেলেন এবং কত রেমিট্যান্স এল—এই দুই সূচকে বিচার করা হয়। এই হিসাবের আড়ালে একটি মৌলিক প্রশ্ন উপেক্ষিত থাকে, কর্মসংস্থানের এত বড় অংশ যদি শুধু কয়েকটি দেশ ও একটি অঞ্চলের ওপর নির্ভরশীল হয়, তবে সেই সাফল্য কতটা টেকসই?

প্রথম আলোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১১ মাসে সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য, সংযুক্ত আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে এসেছে মোট রেমিট্যান্সের প্রায় ৬২ শতাংশ। এ তালিকায় সৌদি আরবের গুরুত্ব বিশেষ। দেশটির নিরাপত্তা, নিয়োগনীতি বা শ্রমবাজারে পরিবর্তন ঘটলে তার অভিঘাত পড়বে বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে।

এই নির্ভরতা এক দিনে তৈরি হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে শ্রমিক পাঠানো সহজতর হয়েছে; অন্যদিকে ইউরোপ, পূর্ব এশিয়া ও অন্যান্য সম্ভাবনাময় বাজারে প্রবেশের জন্য প্রয়োজনীয় ভাষা শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন, সনদের স্বীকৃতি এবং নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তোলার কাজ তুলনামূলকভাবে ধীরগতিতে এগিয়েছে। ফলে সৌদি আরবে নিয়োগের সুযোগ বাড়লে আমরা স্বস্তি পেয়েছি আর সেখানে সংকট দেখা দিলে বিকল্প খুঁজতে ব্যস্ত হয়েছি।

এটি কেবল বাজারের ব্যর্থতা নয়; এটি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনারও দুর্বলতা।

কোনো দেশের শ্রমবাজারে প্রবেশাধিকার কখনো স্থায়ী অধিকার নয়। সৌদি আরবও তার অর্থনৈতিক রূপান্তর, শ্রমনীতি, জাতীয় কর্মসংস্থান কর্মসূচি এবং বেসরকারি খাতের চাহিদা অনুযায়ী বিদেশি কর্মী নিয়োগের ধরন বদলাবে। বাংলাদেশের জন্য সেই পরিবর্তন অনুমান করা এবং তার সঙ্গে তাল মেলানো জরুরি। তবে একটি বিষয় স্পষ্ট রাখা দরকার, বর্তমান নিরাপত্তাসংকটের অর্থ এই নয় যে সৌদি আরবের শ্রমবাজার স্থায়ীভাবে বন্ধ হয়ে যাবে। দেশটির অর্থনৈতিক রূপান্তর ও উন্নয়ন প্রকল্পে বিদেশি শ্রমের চাহিদা থাকতে পারে। কিন্তু চাহিদা থাকলেই বাংলাদেশের কর্মীরা আগের মতো কাজ পাবেন—এমন নিশ্চয়তা নেই।

এ কারণে বাংলাদেশের কৌশল হওয়া উচিত সৌদি আরবের বাজারের সুযোগ ধরে রেখে একক বাজারের ওপর নির্ভরতা কমানো।

বাংলাদেশের অভিবাসন সাফল্য মাপা হয় কত শ্রমিক বিদেশে গেলেন, কত রেমিট্যান্স এল, তা দিয়ে। কিন্তু বেতন, চুক্তি, নিরাপত্তা ও আইনি সুরক্ষার হিসাব কোথায়?

ফ্লাইট বাতিল হলে কর্মস্থলে ফিরতে না পারা শ্রমিকের চাকরি ও ভিসা ঝুঁকিতে পড়ে; নতুন কর্মীর যাত্রা আটকে গেলে বাড়ে ঋণের বোঝা। সংঘাতের কারণে কর্মসংস্থান ব্যাহত হলেও ক্ষতির ভার পড়ে শ্রমিক ও তাঁদের পরিবারের ওপর। প্রতারণা, অতিরিক্ত নিয়োগ ব্যয় ও বেতনবঞ্চনার প্রতিকারও জটিল।

সৌদি আরবের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় তাই শুধু নিয়োগ বাড়ানো নয়, বকেয়া বেতন আদায়, চুক্তি বাস্তবায়ন, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, আইনি সহায়তা ও সংকটে প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের লক্ষ্য হওয়া উচিত শুধু শ্রমিক রপ্তানি নয়, তাঁদের অধিকার রক্ষায় কার্যকর রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিত্ব প্রতিষ্ঠা। অভিবাসনের সাফল্য শ্রমিকের সংখ্যায় নয়, তাঁদের সুরক্ষা ও মর্যাদায়।

সৌদি আরবের শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য বন্ধ হয়ে যাবে—এমন ধারণা ঠিক নয়। তবে ‘সৌদি ভিশন ২০৩০’ নীতির ফলে অর্থনৈতিক রূপান্তরে সুযোগের ধরন বদলাতে পারে। নির্মাণ, পর্যটন, স্বাস্থ্যসেবা ও লজিস্টিকসে চাহিদা বাড়লেও নিয়োগে দক্ষতা, অভিজ্ঞতা, ভাষাজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত যোগ্যতার গুরুত্ব বাড়বে।

একই সঙ্গে সৌদিকরণ নীতি, নিয়োগ ব্যয়, বেতন ও কর্মপরিবেশ বিদেশি শ্রমিকদের সম্ভাবনাকে প্রভাবিত করবে। তাই বিপুলসংখ্যক সাধারণ শ্রমিক পাঠানোর পুরোনো কৌশল যথেষ্ট নয়। ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হবে কোন পেশায় কত কর্মী, কী যোগ্যতায়, কত বেতনে নিয়োগ পাবেন—তা দিয়ে। বাংলাদেশের প্রস্তুতিই হবে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার মূল শর্ত।

বাংলাদেশের সামনে দুটি পথ। পুরোনো নিয়োগনির্ভরতা ও দক্ষতাভিত্তিক রূপান্তর। প্রথম পথে শ্রমিক পাঠানোর সংখ্যা বাড়বে, কিন্তু সংকট ও অনিশ্চয়তা থেকেই যাবে। দ্বিতীয় পথে সৌদি আরবের চাহিদা অনুযায়ী স্বাস্থ্যসেবা, কারিগরি কাজ, পর্যটন, রক্ষণাবেক্ষণ ও প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় দক্ষ কর্মী গড়ে তুলতে হবে। এ জন্য প্রয়োজন মানসম্মত প্রশিক্ষণ, ভাষাশিক্ষা, স্বীকৃত সনদ ও নিয়োগকর্তার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ।

পাশাপাশি জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, ইউরোপসহ বিকল্প শ্রমবাজারে প্রবেশের বাস্তব বাধা দূর করতে হবে। শ্রমবাজার বৈচিত্র্য ও দক্ষতা উন্নয়নই বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অভিবাসন কৌশলের ভিত্তি হওয়া উচিত।

সংকট সামলাতে এখনই সরকারের কী করা উচিত? সৌদি আরবের বর্তমান সংকটকে সরকারকে একই সঙ্গে জরুরি মানবিক পরিস্থিতি এবং দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক সতর্কসংকেত হিসেবে দেখতে হবে।

প্রথমত, সৌদি আরবে আটকে পড়া, দেশে ফিরে কর্মস্থলে ফিরতে না পারা এবং যাত্রার অপেক্ষায় থাকা শ্রমিকদের তালিকা করে ভিসা, চাকরি, বকেয়া বেতন ও আর্থিক ক্ষতির সমাধানে জরুরি উদ্যোগ নিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, সৌদি আরবের সঙ্গে আলোচনায় শুধু ফ্লাইট ও নিয়োগ নয়; চাকরির বৈধতা, বেতন, ক্ষতিপূরণ, আইনি সহায়তা এবং নিরাপদ প্রত্যাবর্তন নিশ্চিত করতে হবে।

তৃতীয়ত, বিকল্প শ্রমবাজার, দক্ষতা প্রশিক্ষণ ও ভাষাশিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সংকটের পরীক্ষা শুধু শ্রমিক ফিরিয়ে আনা নয়; এমন ব্যবস্থা গড়া, যাতে পরবর্তী সংকটে তাঁদের ভাগ্য অনিশ্চয়তার হাতে ছেড়ে দিতে না হয়।

সবশেষে সরকারকে একটি অস্বস্তিকর সত্য স্বীকার করতে হবে: বিদেশে কর্মী পাঠানো বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু বিদেশে পাঠানোর ওপর নির্ভর করে কর্মসংস্থানের সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। দেশে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান বাড়ানো, কারিগরি শিক্ষা শক্তিশালী করা এবং তরুণদের এমন দক্ষতা দেওয়া জরুরি, যা দেশেও কাজে লাগবে, বিদেশেও কাজে লাগবে।

সৌদি আরবের বর্তমান সংকট কবে পুরোপুরি কাটবে, তা নিশ্চিত করে বলা যায় না। দেশটির শ্রমবাজার আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে; নতুন খাতেও সুযোগ তৈরি হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের সামনে আসল প্রশ্নটি হলো, আমরা কি সংকট দেখা দিলে সাময়িক ব্যবস্থা নেব, নাকি সংকটের আগেই নিজেদের প্রস্তুত করব?

এখন সরকারের সামনে তাই দুটি দায়িত্ব—আজ যাঁরা বিপদে পড়েছেন, তাঁদের সুরক্ষা দেওয়া; আর আগামী দিনের কর্মীরা যেন একই অনিশ্চয়তা ও অসহায়তার মুখে না পড়েন, সেই ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

● ড. সেলিম রেজা সহযোগী অধ্যাপক ও সমন্বয়ক, সেন্টার ফর মাইগ্রেশন স্টাডিজ (সিএমএস), নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি।




এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি।

© বিডি ২৪ নিউজ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

  বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা,আটকের দাবি : এ্যাংকর সিমেন্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ : তদন্তে দুদক ও ভ্যাট গোয়েন্দা   বরিশাল স্বাস্থ্যখাতে শত কোটি টাকার দুর্নীতি: পিপলাই পরিবারের টেন্ডার সিন্ডিকেট উন্মোচন   ইফতারে বৈষম্যের অভিযোগ: ভিআইপি ও সাধারণ কর্মচারীদের আলাদা মেন্যু, সমালোচনায় বরিশাল সিটি করপোরেশন   বরিশালের হলিমা খাতুন স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা   পটুয়াখালী মেডিকেলে ৭৬ কোটি টাকার টেন্ডার বাতিল হলেও জড়িতরা বহাল তবিয়তে   রাজাপুর এলজিইডির প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ   বরিশালে বদলি ঠেকাতে ৩ শিক্ষকের গ্রেফতার নাটক   বরিশালের সেই বিতর্কিত এডলিন বিশ্বাষ পুলিশের হাতে আটক   না ফেরার দেশে বেগম খালেদা জিয়া   রাজশাহী গণপূর্তে টেন্ডারের আগেই ভাগ হচ্ছে কাজ : প্রশ্নের মুখে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম   বরিশালের রুপাতলী ‘খাবার বাড়ি’ রেস্তোরাঁকে ১ লাখ টাকা জরিমানা   বাকেরগঞ্জে যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে গরু চুরির অভিযোগ   নলছিটিতে বৈদ্যুতিক ফাঁদে প্রাণ হারালেন কৃষক বাচ্চু মল্লিক   বদলি-নিয়োগ-দুর্নীতি, সিন্ডিকেটের দখলে প্রাথমিক শিক্ষাঅধিদপ্তর   উজিরপুরে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে বলৎকারের অভিযোগ,জুতা পেটা   বদলি-বাণিজ্য, ঘুষ নিয়ন্ত্রণ করতেন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে, ছয় বছরের সাম্রাজ্য শাহজাহান আলীর   বরিশালে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের জায়গা দখল চেষ্টার অভিযোগ   বরিশালে বিসিক উদ্যোক্তা মেলায় স্টল বরাদ্দে অনিয়ম   বরিশাল কর অফিসের রতন মোল্লার হাতে আলাদিনের চেরাগ,একই কর্মস্থলে ১০ বছর   বরিশালের ১৬টি আসনে বিএনপির প্রার্থী যারা
Translate »