
বিডি ২৪ নিউজ অনলাইন: ১০ কোটি টাকার টেন্ডার বিতর্ক, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ক্যাডার-ছায়া, পরিবারকেন্দ্রিক ঠিকাদারি সিন্ডিকেট—এসবের মাঝেই হঠাৎ আবির্ভাব এক আশ্চর্য চরিত্রের।
নাম—হারুন অর রশিদ। পদ—নারায়ণগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী। পরিচয়—নিজেকে দাবি করছেন ‘নিষ্কলুষ’, আর এক গৃহপালিত গণমাধ্যম তাঁকে বানাতে ব্যস্ত গণপূর্তের যুধিষ্ঠির।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—এটি কি সত্যের উন্মোচন, নাকি দুর্নীতির শেষ যবনিকা টানার মরিয়া চেষ্টা?
আত্মপক্ষ সমর্থন নাকি কপি-পেস্ট সাফাই? হারুন অর রশিদের পক্ষে প্রকাশিত তথাকথিত “প্রতিবাদী প্রতিবেদন”-এ একই সুর বারবার ঘুরে ফিরে এসেছে— “কোনো সরকারি নথিতে অভিযোগ নেই” “কোনো তদন্ত হয়নি ” “ সব টেন্ডার পিপিআর মেনে হয়েছে ? কিন্তু অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার মৌলিক প্রশ্ন একটাই—দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেই কি আগে মামলা থাকতে হয় ? তদন্ত ছাড়া কি অভিযোগ তোলা নিষিদ্ধ ? এই আত্মপক্ষ সমর্থন আসলে অভিযোগের জবাব নয়—এটি আইনি শব্দচয়ন দিয়ে সময় কেনার কৌশল। সংবাদ যদি শুধু অভিযুক্তের ভাষ্য হয়, তাহলে সেটি সংবাদ নয়—আইনি নোটিশের খসড়া।
এদিকে ৬ টেন্ডার, ১ দিন, ১ পরিবার—এটা কি কাকতাল ? প্রতিবাদী প্রতিবেদনে সবচেয়ে কৌশলে যেটি এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে, সেটিই সবচেয়ে বিস্ফোরক তথ্য। ১০ মার্চ ২০২৫, ৬টি বড় সরকারি প্রকল্পের টেন্ডার, ছয়টির ছয়টিই পেল ‘অ্যাডরয়েড কনসাল্ট্যান্টস’ ? , প্রতিষ্ঠানটির মালিক—আতিকুল ইসলামের স্ত্রীর এটা ধ্রুব সত্য।
প্রশ্ন উঠছেই— e-GP থাকলেই কি সিন্ডিকেট অসম্ভব হয়ে যায়? একই পরিবার বারবার ‘সর্বনিম্ন দরদাতা’ হওয়াই কি স্বচ্ছতার প্রমাণ? তাহলে অন্য ঠিকাদাররা গেল কোথায়—হাওয়ায় উড়ে? তবে এই প্রশ্নগুলোর একটিরও জবাব নেই গৃহপালিত প্রতিবেদনে।
‘AI ছবি’ অজুহাত: অতীত মুছতে নতুন প্রযুক্তি? হারুন অর রশিদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে বলা হয়েছে— “সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কিছু AI ছবি ও পোস্ট” কিন্তু বাস্তবতা বলছে ভিন্ন কথা— আওয়ামী লীগের বিজয় মিছিলে সরাসরি উপস্থিতি, ছাত্রলীগ নেতাদের ফুলেল সংবর্ধনা, দলীয় কর্মসূচিতে প্রকাশ্য অংশগ্রহণ
এসব কি AI দিয়ে বানানো? নাকি এখন নিষিদ্ধ অতীত মুছতে AI-কে ঢাল বানানো হচ্ছে? ফেসবুক পোস্ট শুধু ছবি নয়—ওগুলো রাজনৈতিক অবস্থানের দলিল।
গৃহপালিত গণমাধ্যম? সাংবাদিকতা না সাফাই কারখানা? প্রতিবাদী প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়— নেই কোনো স্বাধীন সূত্র, নেই অভিযোগকারীদের বক্তব্য, নেই পাল্টা প্রশ্ন, শুধু অভিযুক্তের বয়ান—হুবহু, এটা কি সাংবাদিকতা?
নাকি ক্ষমতাবানদের জন্য কলমভিত্তিক লিগ্যাল শিল্ড?
একটি গণমাধ্যম যখন একজন বিতর্কিত কর্মকর্তাকে “যুধিষ্ঠির” বানাতে ব্যস্ত, তখন সেটি আর গণমাধ্যম থাকে না— তা হয়ে ওঠে দালালি প্ল্যাটফর্ম। “তদন্ত হয়নি” — এটাই কি নির্দোষতার সার্টিফিকেট?
হারুন অর রশিদের পক্ষে বলা হচ্ছে : “কোনো তদন্ত হয়নি, তাই অভিযোগ মিথ্যা।” কিন্তু বাস্তবতা হলো— তদন্ত না হওয়াই তো অভিযোগের মূল সংকট। সিন্ডিকেট থাকলেই তদন্ত থেমে যায়, ক্ষমতাবানদের বিরুদ্ধে নথি তৈরি হতে সময় লাগে। তাই প্রশ্ন— তদন্ত না হওয়াই কি নির্দোষতার প্রমাণ? নাকি তদন্ত আটকে রাখাটাই সিন্ডিকেটের সবচেয়ে বড় সাফল্য?
শেষ কথা: প্রশ্নের কাঠগড়ায় হারুন, কলম ও ব্যবস্থা, এই প্রতিবেদন কোনো রায় নয়। এটি প্রশ্নের তালিকা। ১০ কোটি টাকার হিসাব, একদিনে ৬ টেন্ডার, পরিবারকেন্দ্রিক কাজ বণ্টন, নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের অতীত এবং গৃহপালিত গণমাধ্যমের সাফাই, সব মিলিয়ে প্রশ্ন একটাই— জুলাইয়ের রক্ত কি কেবল শাসক বদলের জন্য, নাকি ব্যবস্থার বদলের জন্যও ? ব্যবস্থা যদি না বদলায়, তাহলে হারুনরা বদলাবে কেন?
এখন দায়িত্ব— দুদক, প্রধান প্রকৌশলী, অন্তর্বর্তী সরকার এবং প্রকৃত সাংবাদিকদের। এই নিষিদ্ধ সিন্ডিকেটের ‘বিষবৃক্ষ’ উপড়ে ফেলা হবে, নাকি গৃহপালিত কলম দিয়েই ঢেকে রাখা হবে— সেটাই এখন দেখার বিষয়।
গৃহপালিত প্রতিবেদনের বিষয় জানতে চাওয়া হলে হারুন অর রশিদ এর মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও সম্ভব হয়নি।