
ম্যাট রেনশর ১৯০ রানের ইনিংসটাও এমনই। ৩৯৭ বলের ইনিংস, ২১টি চার, একটা ছক্কা। তাতে হলো অনেক কিছুই। প্রথম ইনিংসে অস্ট্রেলিয়ার ৩৯০ রান। যার জবাব দিতে নেমে দ্বিতীয় দিন শেষে দক্ষিণ আফ্রিকা করেছে ১ উইকেটে ২৭।আবার হলো না যেটা, তার আক্ষেপও কম নয়। রেনশর ডাবল সেঞ্চুরি!
ডারবানে সিরিজের প্রথম টেস্টের দ্বিতীয় দিনে অস্ট্রেলিয়া খেলতে নেমেছিল ৬ উইকেটে ১৮৭ রান নিয়ে। প্রথম দিন খারাপ আলোর কারণে খেলা হয়েছিল মাত্র ৬৫.২ ওভার। রেনশর সঙ্গে ক্রিজে ছিলেন অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। দুজনের অপরাজিত জুটিতে তখন ৬৩ রান।
কিন্তু ইনিংসের আসল গল্প শুরু আসলে গতকালই। অস্ট্রেলিয়া এক সময় ছিল ৬ উইকেটে ১২৪ রানে। ব্যাটিংয়ের পুরোনো রোগ আবার মাথাচাড়া দিয়েছিল। ডারবানের উইকেটে প্রথম দিনে ছিল বাড়তি বাউন্স আর সিমের নড়াচড়া। সেই রোগ সারাতে রেনশকে ডাক্তারের ভূমিকায় নামতে হলো।
ভূমিকাটা রেনশর জন্য নতুন নয়। এর আগে টেস্টে তাঁর একমাত্র সেঞ্চুরি ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে, সিডনিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে। সেদিন করেছিলেন ১৮৪। তারপর অনেক জল গড়িয়েছে। টেস্ট ক্রিকেট তাঁকে একবার কাছে টেনেছে, একবার ঠেলে সরিয়েছে। সাড়ে তিন বছর পর গত আগস্টে বাংলাদেশের বিপক্ষে ওপেনার হিসেবে ফিরেছিলেন। এবার সেই ওপেনারের জায়গা নিলেন নিক ম্যাডিনসন। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া দলের ওই চমক এখন পর্যন্ত বুমেরাং হয়েছে।
এদিকে চোটের কারণে ম্যাচটা খেলছেন না ক্যামেরন গ্রিন। সেই জায়গা পূরণে রেনশ নেমে এসেছেন পাঁচে। ২০২৩ সালের ভারত সফরে এই জায়গায় ব্যাট করেছিলেন চারবার। খুব একটা রান পাননি। কুইন্সল্যান্ডের হয়ে অবশ্য এই পজিশনে রান পেয়েছেন নিয়মিত। সেই আত্মবিশ্বাসই হয়তো কাজে লাগল।
প্রথম দিনের নায়ক আনরিখ নরকিয়া। সাড়ে তিন বছরের নির্বাসন কাটিয়ে ফিরেছেন, আর ফিরেই আগুন ঝরিয়েছেন। আজ ভয়ংকর সব শর্ট বল করে গেলেন। কখনো কখনো কামিন্সকে বোকা বানাতে ফুল লেংথও। কামিন্স তাতে বিচলিত হননি। একটা ওভারপিচড বল পেয়ে স্কয়ার ড্রাইভে বাউন্ডারি মেরে দিলেন। ২০২৪ সালের জানুয়ারির পর টেস্টে প্রথম ফিফটির হাতছানি। কিন্তু ৪৩ রানে উইয়ান মুল্ডারের বল ব্যাটের কানায় লেগে বল গেল দ্বিতীয় স্লিপে।
কামিন্স ফিরলেন, রেনশ থাকলেন। রিভার্স সুইপ হয়ে উঠল তাঁর ব্যক্তিগত ভাষা। স্পিনের বিপক্ষে একসময় যাঁর দুর্বলতা নিয়ে কথা হতো, তিনি কেশব মহারাজকে বারবার এই শটে খেলে স্কোরবোর্ড সচল রাখলেন। মিচেল স্টার্ক ব্যাট করলেন কামিন্সের মতো ডিফেন্সিভ মেজাজে। সাইমন হার্মারের বলে তাঁর ব্যাটের কানা লেগে এইডেন মার্করামের হাত গলে বল চলে গেল সীমানায়। ভাগ্যের এই ছোট্ট উপহার বেশিক্ষণ টেকেনি। দ্বিতীয় নতুন বল নিতে দক্ষিণ আফ্রিকা দেরি করেনি। মুল্ডারের একটা অসাধারণ ডেলিভারি মিডল স্টাম্পে পড়ে ঢুকে গেল অফ স্টাম্পে। স্টার্ক বোল্ড।
লাঞ্চের ঠিক আগে এল রেনশর সেঞ্চুরি। লেগ সাইড দিয়ে বাউন্ডারি, দুই হাত আকাশে, হেলমেট খুলে ফেলা মুখে চওড়া হাসি। ওই হাসিতে ছিল সাড়ে নয় বছরের জমে থাকা কিছু একটা।
লাঞ্চের পর নরকিয়ার ১৪৩ কিলোমিটার গতির একটা বল লাগল রেনশর হেলমেটের গ্রিলে। মাঠে নেমে এল নিস্তব্ধতা। চিকিৎসা নিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে রেনশ থাম্পস আপ দিয়ে জানিয়ে দিলেন, তিনি ঠিক আছেন। তারপর আবার ব্যাটিং। ১৫০ রান পূর্ণ করলেন সেই রিভার্স সুইপেই, মহারাজকে।;
শেষ বিকেলে অস্ট্রেলিয়ার ইনিংসকে আরেক দফা টেনে নিলেন নাথান লায়ন। রেনশর সঙ্গে নবম উইকেটে তাঁর ১৩৪ রানের জুটি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অস্ট্রেলিয়ার নবম উইকেটের রেকর্ড। লায়ন ফিরলেন মার্কো ইয়ানসেনের ফুল ডেলিভারিতে এলবিডব্লু হয়ে। কামিন্স আর লায়ন মিলে খেলেছেন ১৯০ বল, যা অস্ট্রেলিয়ার শীর্ষ চার ব্যাটসম্যানের মোট খেলা বলের চেয়ে ২৭ বেশি। শীর্ষ চারজন যা পারেননি, লেজের দুজন তা করে দেখিয়েছেন। এরপর জশ হ্যাজলউড টিকে থেকে দক্ষিণ আফ্রিকার হতাশা আরও বাড়ালেন।
রেনশর ডাবল সেঞ্চুরি যখন প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে হচ্ছিল, তখন আউট হয়ে গেলেন বাঁহাতি স্পিনার সাইমন হার্মারের বলে স্লিপে মার্করামের হাতে ক্যাচ দিয়ে। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া ততক্ষণে দক্ষিণ আফ্রিকাকে চাপে রাখার মতো রান পেয়ে গেছে।
অস্ট্রেলিয়া ১ম ইনিংস: ১৩৭.২ ওভারে ৩৯০ (রেনশ ১৯০, কামিন্স ৩৩, লাবুশেন ৩৭; মুল্ডার ৪/৬৮, নরকিয়া ৩/৬৮, নরকিয়া ২/৮৮)
দক্ষিণ আফ্রিকা ১ম ইনংস: ৮.৪ ওভারে ২৭/১ (মার্করাম ১৫*. বেডিংহাম ১২; হ্যাজলউড ১/৯)