
দিল্লি হাট, সফদারজং বিমানবন্দর ফ্লাইওভার, কন্নট প্লেসের চারপাশে ছড়ানো-ছিটানো কিছু এলাকা আর রাজঘাট।
ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) ঘোষিত কর্মসূচির স্থান যন্তর মন্তরকে নিরাপত্তা বাহিনী রীতিমতো একটি দুর্গে পরিণত করেছে। ফলে গতকাল শনিবার বিকেলে বিক্ষোভকারীরা রাজধানীজুড়ে ছড়িয়ে পড়েন এবং বিভিন্ন স্থানে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে ঝটিকা মিছিল প্রদর্শন করেন।
দিনভর ব্যারিকেড, গণ-আটক, বিপুলসংখ্যক নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন ও যাতায়াতে বিধিনিষেধের কারণে বিক্ষোভকারীদের পক্ষে যন্তর মন্তরে পৌঁছানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। সিজেপির শীর্ষ নেতারা সকালের দিকেই আটক হওয়ায় এবং ওপর থেকে পরবর্তী কোনো নির্দেশনা না থাকায় নিজেদের মতো করে পরিকল্পনা ও গন্তব্য নির্ধারণের চেষ্টা চালান বিক্ষোভকারীরা। অবশেষে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষিপ্তভাবে ‘ঝটিকা প্রতিবাদ’ শুরু করলে সেখানেও পুলিশের দমনপীড়নের মুখে পড়েন তাঁরা।
সেন্ট্রাল দিল্লিতে ঢোকার কোনো উপায় নেই—এমন পরিস্থিতি স্পষ্ট হওয়ার পর বেলা একটা নাগাদ আইএনএ এলাকা থেকে অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (এআইএসএ) সভাপতি নেহা বোরা অন্য কর্মীদের সঙ্গে নিয়ে একটি মিছিল শুরু করেন। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জ্যেষ্ঠ আইনজীবী প্রশান্ত ভূষণ ও সমাজকর্মী যোগেন্দ্র যাদব।
বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা পোস্টার ও ব্যানারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ ও ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) কার্যক্রম বাতিল করার দাবি জানানো হয়।
আইএনএ মার্কেট-দিল্লি হাটের কাছে পুলিশ এই নেতা–কর্মীদের পথ রোধ করে। এ সময় বিপুল পুলিশ সদস্য সেখানে এসে তাঁদের বাসে উঠিয়ে বিভিন্ন থানায় নিয়ে যান।
তবে শীর্ষ নেতাদের আটকে রাখার পরও আইএসএর মিছিলের ডাকে সাড়া দিয়ে দিল্লি হাটের বাইরে আরও বেশি সংখ্যায় বিক্ষোভকারী জড়ো হতে ও স্লোগান দিতে থাকেন। পরে পুলিশ তাঁদেরও আটক করে।
কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, দিল্লি হাটের আশপাশ থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টা পর্যন্ত প্রায় ২০০ বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয়েছে।
বাইরে এমন টানা বিক্ষোভের কারণে দিল্লি হাট কর্তৃপক্ষ দর্শনার্থীদের জন্য জনপ্রিয় এ বাজার বন্ধ করে দেয়।
দিল্লি হাটে যাওয়ার পথে নেহা বোরাসহ অন্যদের পুলিশ আটকে দিলে আইএনএর কাছে সফদারজং ফ্লাইওভার কয়েক ঘণ্টার জন্য প্রতিবাদস্থলে পরিণত হয়। এর ফলে তৈরি হয় এক অচলাবস্থা।
বেলা তিনটার দিকে সেখানে প্রায় অর্ধশত মানুষ জড়ো হয়ে ‘জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ চাই’ স্লোগান দিতে থাকেন।
হিন্দু কলেজের শিক্ষার্থী অতুল বলেন, ‘ওনারা (আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য) নেহা ও অভিজিৎ দিপকেকে আটক করে ভেবেছিলেন আমাদের মনোবল ভেঙে দেবেন। কিন্তু তা হবে না। জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ না হওয়া পর্যন্ত এবারও আমরা থামব না।’
দলিত সমাজকর্মী বালা বলেন, ‘আমরা জোর বাগ মেট্রো স্টেশন থেকে আসছি। এখন আইএনএর দিকে যাচ্ছি।’ সেন্ট্রাল দিল্লি অবরুদ্ধ হয়ে থাকতে পারে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের চূড়ান্ত পরিকল্পনা হলো যেকোনো উপায়ে কন্নট প্লেসে পৌঁছানো।’
এর কিছুক্ষণ পরই পুলিশ ফ্লাইওভারটি খালি করে দেয় এবং বেলা সাড়ে তিনটার দিকে বোরা ও অন্যদের বহনকারী একটি বাস সামনের দিকে রওনা হয়।
তবে বিক্ষোভকারীরা আবারও সংগঠিত হওয়ায় ফ্লাইওভারে নতুন করে মানুষের ঢল নামে। কিন্তু ফ্লাইওভারের শেষ প্রান্তে তাঁরা ব্যারিকেডের মুখে পড়েন। এতে দুই ঘণ্টা পুলিশ ও বিক্ষোভকারীদের মধ্যে মুখোমুখি সংঘাত চলে।
অবশেষে পুলিশ বিক্ষোভকারীদের পিছু হটতে বাধ্য করে এবং সন্ধ্যা ছয়টার দিকে ফ্লাইওভারটি পুরোপুরি ফাঁকা করা হয়। সেখান থেকে প্রায় ৫০ জন বিক্ষোভকারীকে আটক করা হয় এবং অন্যরা ছত্রভঙ্গ হয়ে যান।
সেন্ট্রাল দিল্লির কন্নট প্লেসজুড়ে দিনভর কয়েক ডজন মানুষের ছোট ছোট বেশ কয়েকটি বিক্ষোভ দানা বাঁধতে থাকে। এমনই একটি বিক্ষোভ হয় আউটার সার্কেলে, যেখানে বেশ কয়েকটি ব্যারিকেড ও বিভিন্ন স্তরের নিরাপত্তাব্যবস্থা এড়িয়ে প্রায় ১৫০ জন পৌঁছাতে সক্ষম হন। সেখানে জড়ো হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই তাঁদের বেশির ভাগকে আটক করা হলেও অন্যরা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
কন্নট প্লেসের আরেকটি স্থানে প্রায় ১০০ বিক্ষোভকারী জড়ো হয়ে স্লোগান দেওয়া শুরু করেন। এ সময় রাজীব চক মেট্রো স্টেশন থেকে পুলিশের একটি দল তাঁদের দিকে ছুটে যায় এবং তাড়া করে তাড়িয়ে দেয়।
নয়ডা থেকে আসা ২৩ বছর বয়সী বিক্ষোভকারী সিদ্ধার্থ বলেন, ‘পুলিশ প্রতিটি প্রচেষ্টাই নস্যাৎ করে দিচ্ছে এবং এখানকার সবাইকে আটক করছে। আমরা প্রোটিন বার, পানি আর মাস্ক নিয়ে প্রস্তুতি নিয়েই এসেছিলাম; কিন্তু আজ সেগুলো খুব একটা কাজে এল না।’
নয়াদিল্লির অতি সুরক্ষিত এই এলাকায় মূলত স্টুডেন্টস ফেডারেশন অব ইন্ডিয়ার (এসএফআই) কর্মীদের দুই দফার ঝটিকা বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে চরম উত্তেজনা ছড়ায়। তাঁরা যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার ব্যারিকেডগুলো ভেঙে ফেলার চেষ্টা চালান।
প্রথম ঘটনাটি ঘটে বেলা একটার দিকে। তখন প্রায় ৫০ জন এসএফআই–সমর্থক সংসদ মার্গের প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই) অফিসের কাছের ব্যারিকেডগুলো উপড়ে ফেলে হুড়মুড় করে ভেতরে ঢুকে পড়েন।
পুলিশ প্রথম দিকে কয়েকজনকে পেছনের দিকে ঠেলে দেওয়ার চেষ্টা করতেই বড় একটি দল মারমুখী হয়ে এগিয়ে আসে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ তখন লাঠিচার্জ শুরু করে এবং তাঁদের মধ্য থেকে প্রায় ৩০ জনকে আটক করে।
এরপর বেলা পৌনে তিনটার দিকে গোল মার্কেটে আরেকটি ঝটিকা বিক্ষোভ শুরু হয়। সেখানে প্রায় ১০০ বিক্ষোভকারী যন্তর মন্তরের দিকে মিছিল নিয়ে এগোতে থাকলে তাঁদের পথরোধকারী সেন্ট্রাল রিজার্ভ পুলিশ ফোর্সের (সিআরপিএফ) সদস্যদের সঙ্গে সংঘর্ষ বাধে। বিক্ষোভকারীদের একটি দল ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ ও ‘জয় ভীম’ স্লোগান দিতে দিতে কিছুটা পথ এগোতে সক্ষম হয়।
বিক্ষোভের আঁচ পড়ে শংকর রোডেও। বিকেল চারটার দিকে রামমনোহর লোহিয়া হাসপাতালের কাছে এ ঝটিকা প্রতিবাদ শুরু হয়। প্রায় ২০ জন বিক্ষোভকারী রাস্তার মাঝখানে বসে ‘জ্ঞানেশ কুমার, পদত্যাগ করো’ বলে স্লোগান দিতে থাকেন। অবশ্য পুলিশ দ্রুতই তাঁদের চ্যাংদোলা করে তুলে নিয়ে বাসের ভেতর ঢুকিয়ে দেয়।
ছাত্রসংগঠনের সদস্যসহ ৫০ থেকে ৭০ জনের একটি দল রাজঘাটের উদ্দেশ্যে ঘাটা মসজিদ রোডে এক কিলোমিটারের বেশি পথ মিছিল করে এগিয়ে যায়। তবে শেষ রক্ষা হয়নি। একটি ট্রাফিক সিগন্যালে পৌঁছালে পুলিশ তাদের আটকে দেয়।
সকাল থেকেই এই বিক্ষোভকারীরা পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে এলাকার বিভিন্ন পার্ক ও খালি জায়গায় ওত পেতে ছিলেন। পরে ঘাটা মসজিদ রোডের কাছে সবাই একজোট হন। এ সময় তাঁদের কণ্ঠে ‘মোদি সরকার ইস্তফা দাও, ইস্তফা দাও’ এবং ‘জ্ঞানেশ তুমকো জানা হোগা (জ্ঞানেশ, তোমাকে যেতেই হবে)’–এর মতো স্লোগান শোনা যায়।
আশপাশে থাকা হকারদের মধ্যে প্রচারপত্র বিতরণ করার সময় আশিস নামের এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘মানুষের কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া মৌলিক অধিকার—যেমন ভোটের অধিকার ও স্বাধীনতার অধিকারের লড়াইয়ে আমি এখানে এসেছি।’
বিক্ষোভকারীদের হাতে থাকা ব্যানারে লেখা ছিল, ‘অসাংবিধানিক ও অবৈধ এসআইআর বাতিল করতে হবে।’