● ●


বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা, তিন বছর পর ঢাকায় কিসিঞ্জার
প্রকাশ: ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ৩:৩০ অপরাহ্ণ |
অনলাইন সংস্করণ

বাংলাদেশের জন্মের বিরোধিতা, তিন বছর পর ঢাকায় কিসিঞ্জার

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের প্রশাসন পাকিস্তানের পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর গণহত্যার প্রতিবাদ জানিয়ে ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড ও কনস্যুলেটের কয়েকজন কর্মকর্তা ওয়াশিংটনে বার্তা পাঠিয়েছিলেন। কিন্তু তাঁদের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন অব্যাহত রাখে নিক্সন প্রশাসন। এমনকি পাকিস্তানের পক্ষে বঙ্গোপসাগরে সপ্তম নৌবহর পাঠানোর ঘোষণাও দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্রের এই ভূমিকার কারণে দেশটির তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার বাংলাদেশে ব্যাপকভাবে সমালোচিত ছিলেন।

স্বাধীনতার তিন বছর পর সেই হেনরি কিসিঞ্জারই বাংলাদেশ সফরে আসেন। ১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর তিনি ঢাকায় পৌঁছান যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে। এটি ছিল স্বাধীন বাংলাদেশে মার্কিন প্রশাসনের উচ্চপর্যায়ের কোনো প্রতিনিধির প্রথম সফর। প্রায় ২০ ঘণ্টার এই সফরে তিনি তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে বৈঠক করেন। আলোচনায় উঠে আসে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অমীমাংসিত বিষয়, দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা।

কিসিঞ্জারের বাংলাদেশবিরোধী অবস্থানের পাশাপাশি বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলার অভিযোগও ছিল তাঁর বিরুদ্ধে। ফলে স্বাধীনতার পর বাংলাদেশে তাঁর প্রথম সফরটি রাজনৈতিক ও কূটনৈতিকভাবে বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছিল।

.হেনরি কিসিঞ্জার, ইতিহাসের খলনায়ক.

১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ শুরু করে। ঢাকাসহ বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক হত্যাকাণ্ড চালানো হয়। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন কনসাল জেনারেল আর্চার কে ব্লাড এবং কনস্যুলেটের কয়েকজন কর্মকর্তা এ ঘটনায় মার্কিন প্রশাসনের নীতির বিরোধিতা করেন। তাঁরা ওয়াশিংটনে তারবার্তা পাঠান। মার্কিন জনগণ, কূটনীতিক ও শিল্পীদের অনেকেও বাংলাদেশের গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছিলেন। তবে নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানের প্রতি সমর্থন বজায় রাখে।

এর পেছনে কৌশলগত কারণও ছিল। চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কোন্নয়নে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছিল। এ ছাড়া দক্ষিণ এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের নিজস্ব কৌশলগত স্বার্থও ছিল। এসব কারণে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার বদলে নিক্সন প্রশাসন পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়েছিল।

বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ বলার বিষয়টিও কিসিঞ্জারের নামের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ১৯৭১ সালের ৬ ডিসেম্বর ওয়াশিংটনে দক্ষিণ এশিয়ার পরিস্থিতি নিয়ে ওয়াশিংটন স্পেশাল অ্যাকশন গ্রুপের একটি বৈঠক হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন তৎকালীন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার। বৈঠকে বাংলাদেশকে সহায়তার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আলোচনার একপর্যায়ে মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি অব স্টেট ফর পলিটিক্যাল অ্যাফেয়ার্স ইউরাল এলেক্সিস জনসন বলেন, ‘তারা (বাংলাদেশ) হবে ইন্টারন্যাশনাল বাস্কেট কেস।’ কিসিঞ্জার জবাবে বলেন, ‘হ্যাঁ, তবে শুধু আমাদের বাস্কেট কেস না।’

ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ কথাটি সরাসরি কিসিঞ্জার বলেননি। মন্তব্যটি করেছিলেন এলেক্সিস জনসন। তবে তাঁর বক্তব্যে কিসিঞ্জারের সম্মতি ছিল। পরে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে ‘বাস্কেট কেস’ কথাটি ব্যবহৃত হতে থাকে। এর মাধ্যমে বোঝানো হতো, বাংলাদেশকে যে সহায়তাই দেওয়া হোক, তা কাজে লাগবে না।

.

কিসিঞ্জারের ঢাকা সফরের চার দিন আগে, ২৬ অক্টোবর পদত্যাগ করেছিলেন বাংলাদেশের তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ। স্বাধীনতার পরপরই তিনি বলেছিলেন, বাংলাদেশ কখনো যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য নেবে না। এমন একজন অর্থমন্ত্রীর পদত্যাগের কয়েক দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর ছিল সে সময়ের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে উল্লেখযোগ্য ঘটনা।

১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর বেলা দেড়টায় স্ত্রী ন্যান্সি কিসিঞ্জারসহ ৭৭ সদস্যের প্রতিনিধিদল নিয়ে ঢাকায় পৌঁছান হেনরি কিসিঞ্জার। তিনি তখন যুক্তরাষ্ট্রের নতুন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। এর আগে তিনি জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন। বিমানবন্দরে তাঁকে ও তাঁর প্রতিনিধিদলকে অভ্যর্থনা জানান বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন ও তাঁর স্ত্রী।

কিসিঞ্জারের সফর ঘিরে ঢাকায় নেওয়া হয়েছিল কড়া নিরাপত্তাব্যবস্থা। তাঁর ব্যবহারের জন্য দিল্লি থেকে আনা হয়েছিল একটি কালো রঙের বুলেটপ্রুফ লিমুজিন গাড়ি। ন্যান্সি কিসিঞ্জারকে সংবর্ধনা দিয়েছিল বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মহিলা ফেডারেশন নামের একটি সংগঠন। ওই অনুষ্ঠানে গান গেয়েছিলেন শিল্পী শাহনাজ রহমতুল্লাহ। নৃত্য পরিবেশন করেছিলেন অঞ্জনা রহমান।

.মুজিব-হিথ সংলাপ ১৯৭২.

ঢাকায় অবস্থানকালে কিসিঞ্জার বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেনের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করেন। ৩০ অক্টোবর বেলা তিনটা থেকে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন মেঘনায় প্রায় দুই ঘণ্টা এই বৈঠক হয়। পরে বিকেল সাড়ে পাঁচটা থেকে সন্ধ্যা পৌনে সাতটা পর্যন্ত গণভবনে প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেন তিনি। বৈঠক চলে ৭৫ মিনিট। এ ছাড়া রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদউল্লাহর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন কিসিঞ্জার। রাতে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দেওয়া আনুষ্ঠানিক ভোজসভায় অংশ নেন তিনি।

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে বৈঠক শেষে কিসিঞ্জার সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা (বাসস) ২০২২ সালের ৫ আগস্ট প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে জানায়, সংবাদ সম্মেলনটি স্থায়ী হয়েছিল প্রায় তিন মিনিট। সেখানে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল, ১৯৭১ সালে কেন মার্কিন রণতরি ইউএসএস এন্টারপ্রাইজ বঙ্গোপসাগরে পাঠানো হয়েছিল। কিসিঞ্জার প্রশ্নটির উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান।

এসব বৈঠকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তার আশ্বাস দেন কিসিঞ্জার। খাদ্যসংকট মোকাবিলায় আরও এক লাখ টন খাদ্যশস্য দেওয়ার আশ্বাসও দেন তিনি। দ্বিপক্ষীয় আলোচনা শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে একটি যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। খাদ্যসহায়তার এই প্রতিশ্রুতিই পরদিন ৩১ অক্টোবর প্রকাশিত প্রায় সব পত্রিকার প্রধান শিরোনাম হয়েছিল।

ঢাকায় আসার আগে সোভিয়েত ইউনিয়ন ও ভারত সফর করেছিলেন কিসিঞ্জার। বাংলাদেশ সফরের পর তিনি পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও ইরান যান।

.

মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের প্রকাশিত পুরোনো নথিতে ১৯৭৪ সালের ৩০ অক্টোবর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও হেনরি কিসিঞ্জারের বৈঠকের বিস্তারিত বিবরণ রয়েছে। বৈঠকের শুরুতে কুশল বিনিময়ের পরই পাকিস্তানের কাছে বাংলাদেশের সম্পদের প্রাপ্য হিস্যা এবং বাংলাদেশে আটকে পড়া কয়েক লাখ বিহারির প্রত্যাবাসনের বিষয়টি তোলেন শেখ মুজিব।

দেশের দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমি পাঁচ হাজার ৩০৩টি লঙ্গরখানা চালু করেছি এবং প্রতিদিন এক লাখ মানুষকে খাবার দিচ্ছি। আমাদের সমস্যাগুলো অত্যন্ত কঠিন। আর এ বছরের বন্যা পরিস্থিতিকে আরও খারাপ করে তুলেছে।’

এ পর্যায়ে কিসিঞ্জার জানতে চান, শেখ মুজিব এসব বিষয় নিয়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জুলফিকার আলী ভুট্টোর সঙ্গে কথা বলবেন কি না। জবাবে মুজিব বলেন, ‘আপনি অবশ্যই তা করতে পারেন। কিন্তু শুধু কথা বললেই চলবে না; সহায়তাও করতে হবে! তাদের জানা উচিত, এখানে মানুষ মারা যাচ্ছে। তাদের জমি আছে, তারা আমাদের সহায়তা করতে পারে।’

বৈঠকে বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও খাদ্য উৎপাদন নিয়েও আলোচনা হয়। সফরের আগে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশকে দেড় লাখ টন খাদ্যশস্য দিয়েছিল। নতুন করে আরও এক লাখ টন খাদ্যশস্য দেওয়ার আশ্বাসের জন্য কিসিঞ্জারকে ধন্যবাদ জানান শেখ মুজিব। জবাবে কিসিঞ্জার বলেন, ‘বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি অপরিহার্য।’

.বাংলাদেশে হেনরি কিসিঞ্জারের প্রথম সফর কেমন ছিল.

শেখ মুজিব বলেন, বাংলাদেশের আরও এক-দুই বছর খাদ্যসহায়তা প্রয়োজন। দেশকে স্বনির্ভর করতে ব্যাপক সহায়তা দরকার। শিল্পের জন্য কাঁচামাল এবং পাটের ন্যায্য মূল্য পাওয়ার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন। খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে প্রযুক্তি ও সার উৎপাদনে সহায়তার ওপর গুরুত্ব দেন। জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় খাদ্যশস্যের সংরক্ষিত মজুত গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন।

বৈঠকে চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক নিয়েও আলোচনা হয়। শেখ মুজিব বলেন, দুর্ভাগ্যজনকভাবে বাংলাদেশ চীনাদের কাছ থেকে কোনো সহায়তা বা স্বীকৃতি পাচ্ছে না। কিসিঞ্জার বলেন, তাঁর ধারণা, শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ চীনের সহায়তা বা স্বীকৃতি পাবে। তবে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থাপিত হওয়া পর্যন্ত চীন অপেক্ষা করতে চাইতে পারে।

এর আগে ১৯৭৪ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের ২৯তম সাধারণ অধিবেশনে যোগ দিতে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়েছিলেন শেখ মুজিব। ১ অক্টোবর মার্কিন প্রেসিডেন্ট জেরাল্ড ফোর্ডের সঙ্গে তাঁর বৈঠক হয়। ঢাকায় কিসিঞ্জার সেই বৈঠকের প্রসঙ্গ তোলেন। তিনি বলেন, ওই বৈঠকের পর ফোর্ড বাংলাদেশকে খাদ্যসহায়তার ক্ষেত্রে আরও কী করা যায়, তা খতিয়ে দেখতে নির্দেশ দিয়েছিলেন।

.কখনো অনুশোচনা করেননি কিসিঞ্জার.

একপর্যায়ে কিসিঞ্জারকে সরকারের স্থাপন করা লঙ্গরখানাগুলো পরিদর্শনের আহ্বান জানান শেখ মুজিব। তিনি বলেন, ‘আমার দেশের মানুষ ক্ষুধায় মারা যাচ্ছে। গবাদিপশুও মারা যাচ্ছে। আমাকে আমার মানুষকে খাওয়াতে হবে এবং তাদের কাজের ব্যবস্থা করতে হবে। এর সঙ্গে আমাদের পুনর্বাসন কার্যক্রমের চাপও যুক্ত হয়েছে। আমরা অত্যন্ত গুরুতর সমস্যার মুখোমুখি।’

সদ্য সমাপ্ত বন্যার প্রসঙ্গ তুলে শেখ মুজিব জানান, ওই বন্যায় ১৭টি জেলা পানির নিচে তলিয়ে গিয়েছিল। খাদ্যসহায়তার পাশাপাশি বন্যা নিয়ন্ত্রণেও যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চান তিনি। বৈঠকে বাংলাদেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, স্বাস্থ্য পরিকল্পনা, ভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলোচনা হয়।

আলোচনার শেষ পর্যায়ে শেখ মুজিব বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের নীতি হচ্ছে ‘সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গে বিদ্বেষ নয়।’ এরপর কিসিঞ্জার ও শেখ মুজিব আলাদা একটি কক্ষে গিয়ে সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কথা বলেন।

.

পরদিন ৩১ অক্টোবর দৈনিক বাংলার প্রধান খবরের শিরোনাম ছিল ‘খাদ্যসমস্যা সমাধান ও উন্নয়নে সাহায্যের আশ্বাস’। প্রতিবেদনে বলা হয়, গণভবনে শেখ মুজিবের সঙ্গে বৈঠকের পর কিসিঞ্জার সাংবাদিকদের জানান, বাংলাদেশের খাদ্যসমস্যা সমাধান ও উন্নয়নের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সাধ্যমতো সব ধরনের সহায়তা দেবে। খাদ্য উৎপাদন বাড়াতেও দেশটি সম্ভাব্য সব ধরনের সাহায্য দিতে প্রস্তুত। বাংলাদেশের দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনেও যুক্তরাষ্ট্র সহায়তা করবে।

এক প্রশ্নের জবাবে কিসিঞ্জার বলেন, নবজাত এই রাষ্ট্রের প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর সামনে বড় সমস্যা হলো, সংকটের পর সংকট তাদের সম্পদের কার্যকর ব্যবহার বাধাগ্রস্ত করে। এতে উন্নয়নের সুযোগ কমে যায়।

বৈঠক শেষে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন জানান, অক্টোবর-ডিসেম্বর প্রান্তিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে আরও এক লাখ টন গম আসবে। পিএল-৪৮০ কর্মসূচির আওতায় ওই বছর বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের মোট গমসহায়তার পরিমাণ দাঁড়াবে আড়াই লাখ টন।

পিএল-৪৮০ হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের একটি খাদ্যসহায়তা কর্মসূচি। এর পূর্ণ নাম পাবলিক ল ৪৮০। ১৯৫৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসে ‘অ্যাগ্রিকালচারাল ট্রেড ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড অ্যাসিস্ট্যান্স অ্যাক্ট’ নামে আইনটি পাস হয়। পরে কর্মসূচিটি ‘ফুড ফর পিস’ নামে পরিচিতি পায়। এর আওতায় খাদ্যসংকটে থাকা দেশগুলোকে খাদ্যশস্য অনুদান ও সহজ শর্তে সরবরাহ করা হতো। একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষিপণ্যের উদ্বৃত্ত মজুত কাজে লাগানো এবং দেশটির আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক স্বার্থ এগিয়ে নেওয়াও ছিল এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য।

.শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের যে ঘোষণায় পুরো বিশ্ব হতবাক হয়েছিল .

আলোচনা শেষে দুই দেশের পক্ষ থেকে একটি যৌথ ইশতেহার প্রকাশ করা হয়। ৩১ অক্টোবর দৈনিক ইত্তেফাকে সেটি প্রকাশিত হয়। ইশতেহারে বলা হয়, উপমহাদেশের শান্তি, স্থিতিশীলতা ও অগ্রগতির স্বার্থে আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের অমীমাংসিত বিষয়গুলোর সন্তোষজনক সমাধান হবে। কিসিঞ্জারের সঙ্গে বাংলাদেশের নেতাদের আলোচনা হৃদ্যতাপূর্ণ পরিবেশে হয়েছে বলেও ইশতেহারে উল্লেখ করা হয়।

এতে আরও বলা হয়, গত তিন বছরে যুক্তরাষ্ট্রের দেওয়া সহায়তার জন্য বাংলাদেশ সরকার সন্তোষ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নে মার্কিন সরকারের সহায়তার সংকল্পকেও স্বাগত জানানো হয়েছে। দুই দেশ যোগাযোগ অব্যাহত রাখা এবং বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও উন্নত করতে সব পর্যায়ে মতবিনিময়ে আগ্রহ প্রকাশ করে।

যৌথ ইশতেহারে বলা হয়, জাতিসংঘে বাংলাদেশের অন্তর্ভুক্তির সময় বঙ্গবন্ধু ও কামাল হোসেনের যুক্তরাষ্ট্র সফরে যে আলোচনা শুরু হয়েছিল, তার ধারাবাহিকতায় কিসিঞ্জারের এই সফর অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে বিশ্বশান্তি, মধ্যপ্রাচ্যে সমঝোতার প্রচেষ্টা এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট নিয়েও আলোচনা হয়।

.

বাংলাদেশের খাদ্যসহায়তা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে টানাপোড়েনের একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল কিউবা ইস্যু। খাদ্যের উচ্চ মূল্য, আমদানি ব্যয় বহনের অক্ষমতা এবং সরবরাহের ঘাটতির কারণে ১৯৭৩ সালের মাঝামাঝি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে খাদ্যসহায়তা চেয়েছিল বাংলাদেশ।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান ‘খাদ্য ও দুর্ভিক্ষের রাজনীতি’ শীর্ষক এক প্রবন্ধে লিখেছেন, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ জুট মিলস করপোরেশন (বিজেএমসি) কিউবার কাছে প্রায় ৫০ লাখ মার্কিন ডলার মূল্যের ৪০ লাখ পাটের বস্তা বিক্রির চুক্তি করেছিল। এরপর যুক্তরাষ্ট্র থেকে খাদ্যসহায়তা পাঠানোর বিষয়টি পিছিয়ে যেতে থাকে।

১৯৭৪ সালের মার্চ থেকেই দেশে খাদ্যসংকটের লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। জুন থেকে তা আরও প্রকট হয়। জুলাই থেকে অক্টোবর ছিল দুর্ভিক্ষের সবচেয়ে ভয়াবহ সময়। একই বছরের এপ্রিল-মে মাসে বন্যা শুরু হয়। জুলাইয়ে তা চরম আকার ধারণ করে। পরে বন্যার পানি কমলেও ফসলের ব্যাপক ক্ষতি এবং খাদ্যের উচ্চমূল্য সংকটকে আরও বাড়িয়ে তোলে।

.

উইকিলিকসের ফাঁস করা একটি নথিতে দেখা যায়, ১৯৭৪ সালের ৬ আগস্টের এক মার্কিন তারবার্তায় কিউবা-সংক্রান্ত বিরোধের কারণে বাংলাদেশে অতিরিক্ত খাদ্যশস্য পাঠানো আটকে যাওয়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছিল। অন্যদিকে ৪ অক্টোবর মার্কিন কংগ্রেসের কংগ্রেশনাল রেকর্ডে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ভবিষ্যতে কিউবায় পাটের বস্তা পাঠানো বন্ধ করতে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ। এর ফলে এক লাখ টন গম ও ৫০ হাজার টন চাল সরবরাহের চুক্তি কয়েক দিনের মধ্যে হওয়ার কথা ছিল। এর ২৬ দিন পর ঢাকায় আসেন কিসিঞ্জার।

যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যান্ড ইউনিভার্সিটির স্কুল অব পাবলিক পলিসির অধ্যাপক আই এম ডেস্টলারের ১৯৭২ থেকে ১৯৭৬ সাল পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতি নিয়ে করা এক গবেষণায় বলা হয়েছে, ১৯৭৪ সালের নভেম্বরে বাংলাদেশের খাদ্যসংকট যখন সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছায়, তার আগে অধিকাংশ মার্কিন খাদ্যশস্য বাংলাদেশে পৌঁছায়নি। ওই বছরের আগস্ট থেকে নভেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশের বন্দরে যুক্তরাষ্ট্রের মাত্র ৬৮ হাজার টন খাদ্যশস্য পৌঁছেছিল।

১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়েও বিভিন্ন হিসাব রয়েছে। নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেন তাঁর ‘দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ’ বইয়ে সরকারি হিসাবের বরাতে ২৬ হাজার মানুষের মৃত্যুর কথা উল্লেখ করেছেন। একই বইয়ে গবেষক মহিউদ্দিন আলমগীরের ‘দক্ষিণ এশিয়ায় দুর্ভিক্ষ: গণঅনাহারের রাজনৈতিক অর্থনীতি’ বইয়ের তথ্য উদ্ধৃত করে তিনি লিখেছেন, ১৯৭৪ সালের আগস্ট থেকে ১৯৭৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত দুর্ভিক্ষে প্রায় ১০ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। পরবর্তী মাসগুলোতে কলেরা, গুটিবসন্ত, ডায়রিয়া ও আমাশয়ের মতো রোগের পরোক্ষ প্রভাবে আরও প্রায় পাঁচ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়ে থাকতে পারে।

.

খাদ্যসংকটে সীমাহীন দুর্ভোগের সেই সময়কে ধারণ করে আছে কবি রফিক আজাদের জনপ্রিয় পঙ্‌ক্তি—‘ভাত দে হারামজাদা/ তা না হলে মানচিত্র খাবো’। মাত্র তিন বছর বয়সী যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে তখন দুর্ভিক্ষ ও প্রলয়ঙ্করী বন্যা দেখা দিয়েছিল। এমন এক পরিস্থিতিতেই ঢাকায় এসেছিলেন কিসিঞ্জার।

বিশ্বব্যাংকের ১৯৭৫ সালের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৭৪ সালের বন্যায় খাদ্যশস্যের ব্যাপক ক্ষতি, বৈদেশিক মুদ্রার সংকট, পর্যাপ্ত মজুতের অভাব এবং সময়মতো খাদ্যসহায়তা না পৌঁছানোর কারণে দুর্ভিক্ষ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। ওই বছরের নভেম্বর থেকে বাংলাদেশে খাদ্যশস্যের আগমন বাড়তে শুরু করে। অর্থাৎ কিসিঞ্জারের ঢাকা সফরের পর যুক্তরাষ্ট্রের খাদ্যসহায়তার বড় অংশ বাংলাদেশে পৌঁছায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে মার্কিন কূটনীতির অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব ছিলেন হেনরি কিসিঞ্জার। ২০২৩ সালের ২৯ নভেম্বর ১০০ বছর বয়সে তিনি মারা যান। যুক্তরাষ্ট্রের ভার্জিনিয়া অঙ্গরাজ্যের আর্লিংটন ন্যাশনাল সিমেট্রিতে তাঁকে সমাহিত করা হয়েছে।

কিসিঞ্জারের জীবদ্দশাতেই বাংলাদেশ অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে। খাদ্য উৎপাদন, দারিদ্র্য হ্রাস, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন সূচকে দেশটি এগিয়েছে। একসময় যে বাংলাদেশকে ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছিল, সেই দেশই পরবর্তী সময়ে উন্নয়নের বিভিন্ন ক্ষেত্রে সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছে। বাংলাদেশের পরবর্তী অগ্রগতি দেশটি সম্পর্কে সে সময়ের নেতিবাচক মূল্যায়নকে ভুল প্রমাণ করেছে।




এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি।

© বিডি ২৪ নিউজ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

  বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা,আটকের দাবি : এ্যাংকর সিমেন্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ : তদন্তে দুদক ও ভ্যাট গোয়েন্দা   বরিশাল স্বাস্থ্যখাতে শত কোটি টাকার দুর্নীতি: পিপলাই পরিবারের টেন্ডার সিন্ডিকেট উন্মোচন   ইফতারে বৈষম্যের অভিযোগ: ভিআইপি ও সাধারণ কর্মচারীদের আলাদা মেন্যু, সমালোচনায় বরিশাল সিটি করপোরেশন   বরিশালের হলিমা খাতুন স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা   পটুয়াখালী মেডিকেলে ৭৬ কোটি টাকার টেন্ডার বাতিল হলেও জড়িতরা বহাল তবিয়তে   রাজাপুর এলজিইডির প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ   বরিশালে বদলি ঠেকাতে ৩ শিক্ষকের গ্রেফতার নাটক   বরিশালের সেই বিতর্কিত এডলিন বিশ্বাষ পুলিশের হাতে আটক   না ফেরার দেশে বেগম খালেদা জিয়া   রাজশাহী গণপূর্তে টেন্ডারের আগেই ভাগ হচ্ছে কাজ : প্রশ্নের মুখে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম   বরিশালের রুপাতলী ‘খাবার বাড়ি’ রেস্তোরাঁকে ১ লাখ টাকা জরিমানা   বাকেরগঞ্জে যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে গরু চুরির অভিযোগ   নলছিটিতে বৈদ্যুতিক ফাঁদে প্রাণ হারালেন কৃষক বাচ্চু মল্লিক   বদলি-নিয়োগ-দুর্নীতি, সিন্ডিকেটের দখলে প্রাথমিক শিক্ষাঅধিদপ্তর   উজিরপুরে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে বলৎকারের অভিযোগ,জুতা পেটা   বদলি-বাণিজ্য, ঘুষ নিয়ন্ত্রণ করতেন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে, ছয় বছরের সাম্রাজ্য শাহজাহান আলীর   বরিশালে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের জায়গা দখল চেষ্টার অভিযোগ   বরিশালে বিসিক উদ্যোক্তা মেলায় স্টল বরাদ্দে অনিয়ম   বরিশাল কর অফিসের রতন মোল্লার হাতে আলাদিনের চেরাগ,একই কর্মস্থলে ১০ বছর   বরিশালের ১৬টি আসনে বিএনপির প্রার্থী যারা
Translate »