
তাঁকে নিয়ে কৌতূহলের শেষ নেই। সৌন্দর্য আর অভিনয়দক্ষতা তো ছিলই, যৌনতার প্রতীক হিসেবেও সারা দুনিয়ায় সম্ভবত সবচেয়ে বেশি চর্চা হয়েছে তাঁকে নিয়েই। সম্প্রতি নতুন করে প্রকাশিত এক পুরোনো সাক্ষাৎকারে উঠে এসেছে অভিনেত্রীর খাদ্যাভ্যাস। সেটা ধরে আবারও চর্চায় মেরিলিন মনরো।
১৯৫২ সালের সেপ্টেম্বর মাসে ‘পেজেন্ট’ সাময়িকীতে প্রকাশিত ‘হাউ আই স্টে ইন শেপ’ শিরোনামের লেখায় নিজের খাদ্যাভ্যাস, শরীরচর্চা ও ঘুমের অভ্যাসের কথা জানিয়েছিলেন মনরো। লেখাটি গুরুত্বপূর্ণ এ কারণে যে এখানে তাঁর জীবনযাপনের বিবরণ এসেছে তাঁর নিজের ভাষায়। পরবর্তী সময়ে ভোগ ও দ্য গার্ডিয়ানের মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমেও লেখাটির বিষয়বস্তু নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
সকালের নাশতায় দুধ ও কাঁচা ডিম
মনরোর সকালের নাশতার কথা শুনলে এখনকার দিনে অনেকেই অবাক হবেন। তিনি লিখেছিলেন, সকালে গোসলের আগে হোটেলের ঘরে রাখা ছোট চুলায় এক কাপ দুধ গরম করতেন। দুধ গরম হলে তাতে ভেঙে দিতেন দুটি কাঁচা ডিম। এরপর কাঁটাচামচ দিয়ে ভালোভাবে ফেটিয়ে পোশাক পরার সময় পান করতেন সেই মিশ্রণ। সঙ্গে নিতেন একটি মাল্টিভিটামিন বড়ি।
.
ব্যস্ত কর্মজীবনে দ্রুত নাশতা সারার জন্য এটিই ছিল মনরোর পছন্দের উপায়। নিজের খাবারের অভ্যাসকে অদ্ভুত বলে মনে করা হলেও মনরো তা নিয়ে খুব একটা চিন্তিত ছিলেন না। বরং তাঁর ধারণা ছিল, কর্মব্যস্ত একজন নারীর জন্য এটি বেশ পুষ্টিকর সকালের খাবার।
রাতের খাবারে মাংস ও গাজর
মনরোর রাতের খাবারের তালিকাও ছিল বেশ সাদামাটা। তিনি লিখেছিলেন, হোটেলের কাছের বাজার থেকে প্রায় প্রতিদিনই স্টেক, ভেড়ার মাংস কিংবা কলিজা কিনে আনতেন। হোটেলের ঘরে থাকা বৈদ্যুতিক চুলায় সেগুলো রান্না করতেন। মাংসের সঙ্গে খেতেন চার-পাঁচটি কাঁচা গাজর। সাধারণত এর বাইরে আর কিছু থাকত না।
গাজরের প্রতি মনরোর বিশেষ ভালোবাসা ছিল। এ নিয়ে মজা করে লিখেছিলেন, ‘আমাকে বোধ হয় খরগোশের মতোই দেখতে হবে; কাঁচা গাজর খেতে কখনো বিরক্তি আসে না।’
.
আইসক্রিমের প্রতি দুর্বলতা
খাবারের তালিকায় মাংস ও গাজরের আধিক্য থাকলেও মিষ্টির প্রতি মনরোর দুর্বলতা ছিল বেশ স্পষ্ট। সন্ধ্যায় অভিনয়ের ক্লাস শেষে বাড়ি ফেরার পথে প্রায়ই থামতেন উইল রাইটের আইসক্রিমের দোকানে। সেখানে তাঁর পছন্দ ছিল হট ফাজ সানডে—আইসক্রিমের ওপর গরম চকলেট সস দেওয়া একধরনের মিষ্টান্ন।
নিজের লেখায় মনরো জানিয়েছিলেন, দিনের খাবার তুলনামূলকভাবে সাধারণ রাখতেন বলেই হয়তো এই মিষ্টি খাওয়ার সুযোগ পেতেন। তাঁর এই বর্ণনা থেকে বোঝা যায়, খাবারের ক্ষেত্রে নিজেকে সব সময় কঠোর নিয়মে আটকে রাখার চেষ্টা করতেন না।
প্রতিদিন ১০ মিনিটের শরীরচর্চা
শুধু খাবার নয়, শরীরচর্চার অভ্যাস নিয়েও বিস্তারিত লিখেছিলেন মনরো। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিদিন সকালে দাঁত ব্রাশ ও মুখ ধোয়ার পর বিছানার পাশে মেঝেতে শুয়ে ব্যায়াম শুরু করতেন। এ জন্য ব্যবহার করতেন পাঁচ পাউন্ড ওজনের দুটি ডাম্বেল।
বিশেষ করে শরীরের নির্দিষ্ট পেশি দৃঢ় রাখার জন্য নিজের মতো করে কিছু ব্যায়াম তৈরি করেছিলেন তিনি। দুই হাত ছড়িয়ে ডাম্বেল বুকের ওপর থেকে মাথার ওপর পর্যন্ত তুলতেন। ধীরে ধীরে ১৫ বার করে ব্যায়ামটি করতেন। এরপর হাতের অবস্থান বদলে আরও কয়েকবার একই ধরনের অনুশীলন করতেন। হাত মেঝে থেকে ৪৫ ডিগ্রি কোণে রেখে ডাম্বেল ঘোরানোর ব্যায়ামও ছিল তাঁর রুটিনে।
.
মনরো লিখেছিলেন, আগে নিয়মিত ব্যায়াম করতেন না। কিন্তু পরে প্রতিদিন অন্তত ১০ মিনিট ছোট ওজনের ডাম্বেল নিয়ে শরীরচর্চা শুরু করেন। ব্যায়ামের ক্ষেত্রে কঠোর নিয়মের চেয়ে নিজের শরীরের প্রয়োজন বুঝে অনুশীলন করতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন।
ঘুমের সময় ৫ থেকে ১০ ঘণ্টা
মনরোর কাছে ঘুমও ছিল দৈনন্দিন জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিজের লেখায় জানিয়েছিলেন, কাজের ব্যস্ততার ওপর নির্ভর করে রাতে ৫ থেকে ১০ ঘণ্টা ঘুমাতেন। সকালে ঘুম থেকে উঠতে তাঁর বেশ সময় লাগত। ছুটির দিনে কখনো কখনো বিছানায় শুয়ে দীর্ঘ সময় কাটাতেন।
ঘুমের পরিবেশ নিয়েও ছিল মনরোর নিজস্ব পছন্দ। গরম কিংবা শীত—সব ঋতুতেই একটি ভারী ডাউন কমফোর্টার ব্যবহার করতেন। পায়জামা বা রাতের পোশাক পরে ঘুমাতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতেন না বলেও উল্লেখ করেছিলেন।
.১০০ বছর পরও মনরো–রহস্য.
যে সময়ে তৈরি হচ্ছিল হলিউডের কিংবদন্তি
মনরোর এই খাদ্যাভ্যাসের বিবরণ প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ এক সময়ে। ১৯২৬ সালের ১ জুন লস অ্যাঞ্জেলেসে জন্ম নেওয়া এই অভিনেত্রীর আসল নাম নরমা জিন মর্টেনসন। মডেলিং দিয়ে শুরু হলেও ১৯৪৬ সালে টুয়েন্টিয়েথ সেঞ্চুরি ফক্সের সঙ্গে চুক্তির পর অভিনয়জগতে তাঁর যাত্রা শুরু হয়।
‘দ্য অ্যাসফল্ট জাঙ্গল’ ও ‘অল অ্যাবাউট ইভ’-এর মতো ছবিতে ছোট চরিত্রে অভিনয় করে নজর কাড়েন তিনি। ১৯৫২ সালে ‘পেজেন্ট’-এ নিজের জীবনযাপন নিয়ে লেখার সময় তাঁর পরিচিতি বাড়ছিল। পরের বছর ‘নিয়াগ্রা’, ‘জেন্টলমেন প্রেফার ব্লন্ডস’ ও ‘হাউ টু ম্যারি আ মিলিয়নিয়ার’ ছবির মাধ্যমে আন্তর্জাতিক তারকাখ্যাতি পান। পরে ‘দ্য সেভেন ইয়ার ইচ’ ও ‘সাম লাইক ইট হট’-এর মতো ছবি তাঁকে হলিউডের অন্যতম স্মরণীয় মুখে পরিণত করে।