
ভারতের মিজোরামের দুর্গম এলাকায় অস্ত্রের গোপন মজুত করা হচ্ছে, যার লক্ষ্য বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রাম—এমন তথ্য সামনে এসেছে দেশটির তদন্ত সংস্থা ও পুলিশের বক্তব্যে। গত বছর ও চলতি বছর পৃথক অভিযানে একে-৪৭ রাইফেল ও বিপুল গোলাবারুদ উদ্ধারের ঘটনায় উঠে এসেছে বাংলাদেশে অস্ত্র সরবরাহের পরিকল্পনার তথ্য। গত বছরের জানুয়ারিতে ছয়টি একে-৪৭ রাইফেল ও ১০ হাজারের বেশি গুলি উদ্ধারের ঘটনায় বাংলাদেশের একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর কাছে অস্ত্র সরবরাহের ষড়যন্ত্রের তথ্য পায় ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা (এনআইএ)। চলতি বছরের মে মাসে গ্রেপ্তার তিন সন্দেহভাজনের সূত্র ধরে উদ্ধার হয় আরো দুটি একে-৪৭ রাইফেল ও বিপুল গোলাবারুদ।প্রশ্ন উঠেছে, অস্ত্র জব্দ ও সন্দেহভাজনদের গ্রেপ্তারের পরও সীমান্তের ওপারে সরবরাহের চেষ্টা কেন থামছে না। ধরা পড়া ব্যক্তিরা কি শুধু পরিবহন বা অস্ত্র সংরক্ষণের দায়িত্বে ছিলেন, নাকি তাদের পেছনে আরো বড় সংগ্রহকারী, অর্থদাতা ও সমন্বয়কারী নেটওয়ার্ক রয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছে বাংলাদেশের গোয়েন্দারা।এদিকে গত বছরের শুরু থেকে চলতি বছরের ২৯ অক্টোবর পর্যন্ত রাঙামাটিতে সেনাবাহিনীর অভিযানে অস্ত্র উদ্ধারের অন্তত চারটি ঘটনার তথ্য পাওয়া গেছে। আইএসপিআরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের ৭ মার্চ কাউখালীর অভিযানে পিস্তলের ১৭ রাউন্ড গুলিসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম উদ্ধার হয়। ২৪ জুন জীবতলী মোনপাড়ায় উদ্ধার করা হয় একটি এসএমজি, একটি গুলিভর্তি ম্যাগাজিন ও ৪৭ রাউন্ড গুলি। ২৯ জুলাই সাজেকের মাচলং এলাকায় একটি এসএমজি, তিনটি দেশীয় বন্দুক ও একটি এলজিসহ অস্ত্র-গোলাবারুদ উদ্ধার হয়। সর্বশেষ চলতি বছরের ২৪ আগস্ট মাচলংয়ে একটি এলজি ও দুই রাউন্ড কার্তুজ পাওয়া যায়।সেনাবাহিনী সূত্র জানায়, মিজোরামে ধরা পড়া অস্ত্র পাহাড়ে সন্ত্রাসীদের জন্য আনা হচ্ছিল। সূত্রগুলোর দাবি, ধরা পড়া চালানের সংখ্যা খুবই কম; বেশির ভাগ অস্ত্রই ঢুকে পড়ছে। এছাড়া রাঙামাটি জেলায় সেনাবাহিনীর অভিযানে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনাগুলোও পাহাড়ে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অস্ত্রের উৎস নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক অধ্যাপক ড. এম শাহিদুজ্জামান বলেন, পাহাড়ে অস্ত্রের প্রবাহ বন্ধ করতে শুধু উদ্ধার নয়, অস্ত্রের উৎস, সশস্ত্র গোষ্ঠীর হাতে পৌঁছানোর প্রক্রিয়া এবং সরবরাহব্যবস্থায় জড়িত ব্যক্তিদেরও শনাক্ত করতে হবে।অস্ত্র সরবরাহের বিষয়ে জানতে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) অতিরিক্ত মহাপরিচালক (সদর) ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মমতাজুর রহমানকে ফোন করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।এনআইএর অভিযোগপত্র ও নতুন গ্রেপ্তার২০২৫ সালের ১৫ জানুয়ারি মিজোরামের সাইথাহে ছয়টি একে-৪৭ রাইফেল, ১৩টি ম্যাগাজিন ও ১০ হাজার ৫০টি গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। পরে মামলার তদন্ত নেয় এনআইএ। পরে ওই বছরের ১১ জুলাই প্রকাশিত সংস্থাটির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাইথাহে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় পাঁচজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন লালবিয়াকচুঙ্গা ওরফে ডেভিড, লালথাওমচেউভা, মালসাওমা, রুয়ালিয়ানসাঙ্গা ও অলক বিকাশ চাকমা। এনআইএর ভাষ্য, বাংলাদেশের চট্টগ্রাম অঞ্চলে সক্রিয় ইউনাইটেড পিপলস ডেমোক্র্যাটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) সশস্ত্র সদস্যদের কাছে অস্ত্র সরবরাহের ষড়যন্ত্র হয়েছিল।এর প্রায় ১৬ মাস পর চলতি বছরের ২৫ মে দ্য টাইমস অব ইন্ডিয়া জানায়, ইউপিডিএফ-প্রসিত বা ইউপিডিএফ-প্রগ্রেসিভের (ইউপিডিএফ-পি) তিন সন্দেহভাজন সদস্য—আপন চাকমা, নিরহ রঞ্জন চাকমা ও মনি কারবারি চাকমাকে গ্রেপ্তার করে বিএসএফ ও মিজোরাম পুলিশের সিআইডির বিশেষ শাখা।পুলিশের দাবি, তাদের জিজ্ঞাসাবাদ ও পরবর্তী তল্লাশিতে জঙ্গল থেকে ৭.৬২ মিলিমিটার ক্যালিবারের ১,৭৯৯টি গুলি এবং মামিত জেলার ডাম্পা টাইগার রিজার্ভ এলাকার আরেকটি স্থান থেকে দুটি একে-৪৭ রাইফেল, দুটি ম্যাগাজিন ও আরো ১২টি গুলি উদ্ধার করা হয়।মিজোরাম পুলিশ আরো জানায়, গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জিজ্ঞাসাবাদে বলেছেন, আইজলে অবস্থানকারী ডা. প্রীতি চাকমা তাদের লুকানো অস্ত্রের চালান সংগ্রহ করে বাংলাদেশে পাঠানোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন। ডাম্পা টাইগার রিজার্ভের দুর্গম জঙ্গলপথ ব্যবহার করে অস্ত্র সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে পুলিশ। প্রতিবেদনে ইউপিডিএফ-পি ছাড়াও পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির (জেএসএস) নাম এসেছে। মিজোরামে সশস্ত্র শিবিরের উপস্থিতিমিজোরামে পার্বত্য চট্টগ্রামের সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর অবস্থান নিয়ে উদ্বেগ নতুন নয়। ২০২০ সালের ২৫ ডিসেম্বর গুয়াহাটিতে বিজিবি ও বিএসএফের মহাপরিচালক পর্যায়ের সীমান্ত সম্মেলন শেষে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছিল। বিজিবির তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল শাফিনুল ইসলাম এসব শিবির ধ্বংসে বিএসএফের সহযোগিতা চান। জবাবে বিএসএফের তৎকালীন মহাপরিচালক রাকেশ আস্তানা সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথা উল্লেখ করে বলেন, শিবিরের অস্তিত্ব পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিজিবির প্রকাশিত বক্তব্যের বরাত দিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যম এ তথ্য জানায়।তবে কয়েক দিন পর মিজোরাম পুলিশের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বাংলাদেশের অভিযোগ অস্বীকার করেন। ৩১ ডিসেম্বর প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে মিজোরাম পুলিশের ডেপুটি ইন্সপেক্টর জেনারেল লালবিয়াকথাঙ্গা খিয়াংতের বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলা হয়, তদন্ত করেও রাজ্যে বাংলাদেশি সশস্ত্র গোষ্ঠীর কোনো শিবির পাওয়া যায়নি।২০২৪ সালের জানুয়ারিতে মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্টের সাবেক সশস্ত্র সদস্যদের সংগঠন পিস অ্যাকর্ড এমএনএফ রিটার্নিজ অ্যাসোসিয়েশন (পামরা) দাবি করে, জেএসএসের সশস্ত্র সদস্যরা মিজোরামের লুংলেই ও মামিত জেলার কয়েকটি স্থানে প্রশিক্ষণ নিচ্ছেন। সংগঠনটি লুংলেইয়ের ছয়টি ও মামিতের দুটি স্থানের নামও উল্লেখ করে। তবে মিজোরাম পুলিশের আইজি (সদর দপ্তর) লালবিয়াকথাঙ্গা খিয়াংতে অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছিলেন, বাংলাদেশভিত্তিক চাকমা সশস্ত্র গোষ্ঠীর প্রশিক্ষণকেন্দ্র থাকার তথ্য পুলিশের কাছে নেই।পামরার অভিযোগ ছিল জেএসএসের প্রশিক্ষণ নিয়ে; এনআইএর গত বছরের মামলায় এসেছে ইউপিডিএফের নাম। আর চলতি বছরের অভিযানে পুলিশের বক্তব্যে এসেছে ইউপিডিএফ-পি ও জেএসএসের নাম। সাবেক সেনাপ্রধান যখন রাজ্যপালবিজয় কুমার সিং ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত ভারতীয় সেনাবাহিনীর প্রধান ছিলেন। পরে রাজনীতিতে যোগ দিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। গত বছরের ১৬ জানুয়ারি তিনি মিজোরামের রাজ্যপাল হিসেবে শপথ নেন। এর আগের দিন রাজ্যের সাইথাহে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা ঘটে। চলতি বছরের মে মাসের অভিযানটিও হয় তার দায়িত্বকালে।নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর ডেল এইচ খানের মতে, বিজয় কুমার সিং রাজ্যপাল হওয়ার পর পার্বত্য চট্টগ্রামে অস্ত্র সরবরাহের তৎপরতা ও পাহাড়ের অস্থিরতা বেড়েছে। বিশ্লেষকরা জানান, ভারতের সাবেক সেনাপ্রধানের মতো উচ্চপর্যায়ের সামরিক ব্যক্তিত্ব কোনো সীমান্তবর্তী রাজ্যের রাজ্যপাল হলে ওই অঞ্চলের কৌশলগত গুরুত্ব ও ভূরাজনীতি নতুন মাত্রা পায়। ভূকৌশলগত বিশ্লেষকদের একটি অংশের ধারণা, এমন সামরিক পটভূমির নেতৃত্বকে কাজে লাগিয়ে সীমান্ত অঞ্চলে দীর্ঘমেয়াদি ভূরাজনৈতিক কৌশল বাস্তবায়ন করা হচ্ছে, যার পেছনে পার্বত্য চট্টগ্রাম অস্থিতিশীল করার পরিকল্পনা থাকতে পারে।এমই