● ●


‘আমি কে’: সুরা আসরে মুমিনের পরিচয় গড়ার ৪ মূলনীতি
প্রকাশ: ৯ অক্টোবর, ২০২৬, ৬:৪১ পূর্বাহ্ণ |
অনলাইন সংস্করণ

‘আমি কে’: সুরা আসরে মুমিনের পরিচয় গড়ার ৪ মূলনীতি

ঘরের ভেতরে পরিচ্ছন্ন ও বাধ্যগত সন্তান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্যদের সঙ্গে খাপ খাইয়ে চলা ভিন্ন এক সত্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাইক কিংবা প্রশংসার আশায় সাজানো এক ভার্চ্যুয়াল কৃত্রিম রূপ, আর ধর্মীয় বা সামাজিক অঙ্গনে একটু ভদ্র ও সংশীল হয়ে হাজির হওয়া—এই হলো বর্তমান তরুণ প্রজন্মের নিত্যদিনের বাস্তবতা।

বিভিন্ন পরিবেশে বিভিন্ন মানুষের প্রত্যাশা পূরণের জন্য একেকটি মুখোশ পরতে পরতে একসময় তরুণদের মনে দানা বাঁধে এক গভীর প্রশ্ন, ‘যখন কেউ আমাকে দেখছে না, তখন আসল আমিটা কে?’

এটি শুধু বয়ঃসন্ধিকালের মামুলি কোনো আবেগীয় অস্থিরতা নয়, বরং আধুনিক সমাজে বেড়ে ওঠা তরুণদের এক গভীর অস্তিত্বসংকট।

একের পর এক রূপ বদলানোর এই ক্লান্তিকর প্রক্রিয়ায় নিজের ভেতরের মূল সত্তাটি একসময় হারিয়ে যেতে বসে। যখন জীবনের প্রতিটি অঙ্গন শুধু একটি অভিনয়ে পরিণত হয়, তখন মনের ভেতরে জন্ম নেয় এক চরম ক্লান্তি।

কোরআনের অন্যতম ছোট অথচ ভাবগাম্ভীর্যে ভরপুর সুরা হলো সুরা আসর। মাত্র তিনটি আয়াত এবং সামান্য কয়েকটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত এই সুরাটিতে রয়েছে মানুষের পরিচয় গঠন ও জীবনের চরম সফলতা অর্জনের এক পরিপূর্ণ পথনকশা।

ইমাম শাফেয়ি (রহ.) এই সুরার তাৎপর্য ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, যদি মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টির জন্য কোরআনের অন্য কোনো সুরা নাজিল না করতেন, তবে শুধু এই সুরা আসরই গোটা মানবজাতির হেদায়েত ও দিকনির্দেশনার জন্য যথেষ্ট হতো। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ৪/৫৫৮, দারুল ফিকর, বৈরুত, ১৯৯৪)

কারণ মানুষের পুরো জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতার পুরো সমীকরণকে এই তিনটি আয়াতে এক অনন্য শৈল্পিক সুষমায় বেঁধে দেওয়া হয়েছে।

সুরা আসরের শুরুতেই মহান আল্লাহ সময়ের শপথ করে ঘোষণা করেছেন, নিশ্চয়ই সব মানুষ চরম ক্ষতির মধ্যে রয়েছে। (সুরা আসর, আয়াত: ১-২)

এই বাক্যটি আমাদের আত্মপরিচয়ের সংকটকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে চিহ্নিত করে। তরুণরা মূল পথ থেকে বিচ্যুত হচ্ছে বা হারিয়ে যাচ্ছে কারণ তারা অপচয় করছে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ—সময়।

আমরা শুধু খারাপ কাজ করে হারিয়ে যাই না; বরং উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়িয়ে, সাময়িক মোহের পেছনে ছুটে এবং লোকদেখানো কৃত্রিম চরিত্র ফুটিয়ে তুলতে গিয়ে নিজেদের জীবন ধ্বংস করি।

প্রতিটি মুহূর্ত যখন অন্যের সামনে নিজেকে জাহির করতে বা মেকি অভিনয় করতে ব্যয় হয়, তখন তা আর কখনোই ফিরে পাওয়া যায় না। সময়ের এই হিসাবহীন অপচয়ই মানুষকে আত্মিক ধ্বংসের দিকে ঠেলে দেয়।

তবে কোরআন শুধু ক্ষতির চিত্র তুলে ধরেই ক্ষান্ত হয়নি, বরং সুরা আসরের শেষ আয়াতে এই ক্ষতি থেকে বাঁচার এবং একটি শক্তিশালী চরিত্র ও সত্তা গড়ে তোলার চারটি মূল উপাদান বা প্রতিষেধক বাতলে দিয়েছে। (সুরা আসর, আয়াত: ৩)

১. ইমান: ইমান মানে শুধু মুখে ‘আল্লাহ আছেন’ তা স্বীকার করে নেওয়া নয়; বরং চরম সত্যের সঙ্গে অন্তরের এক গভীর ও নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করা। নিজের জীবনের আদর্শ কী এবং আমি কিসের ওপর দাঁড়িয়ে আছি, তা জানা। অন্ধ বিশ্বাস দিয়ে ইমান ধরে রাখা যায় না; এর জন্য প্রয়োজন সঠিক জ্ঞান অর্জন।

কোরআনে নামাজের পাশাপাশি সঠিক আমল ও বিশ্বাসের ভারসাম্যের প্রতি বারবার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। (সুরা বাকারা, আয়াত: ৪৩)।

২. ভালো কাজ: মানুষের পরিচয় শুধু তার মনের ভাবনায় নয়, বরং প্রকাশ পায় তার দৈনন্দিন কাজে। জ্ঞানের পর কাজ না থাকলে তা হয়ে ওঠে শুধু ভণ্ডামি। একজন মানুষ যা করে, সে আসলে তাতেই পরিণত হয়।

৩. সত্যের উপদেশ ও ভালো সঙ্গ: কোনো মানুষ একা একা নিজের আদর্শ ধরে রাখতে পারে না। চারপাশের বন্ধু, পরিবার ও সমাজ মানুষকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। তাই এমন মানুষের সঙ্গে যুক্ত থাকা প্রয়োজন, যারা সত্যের পথে চলতে উদ্বুদ্ধ করবে এবং ভুল পথে বাধা দেবে।

৪. ধৈর্য ও সহনশীলতা: কাঙ্ক্ষিত আদর্শিক সত্তা গড়ে তোলার পথটি সহজ নয়। এতে নানা সামাজিক বাধা, বিরোধিতা এবং নিজের ভেতরের অলসতা ও প্রলোভন আসবে। এসব অতিক্রম করতে প্রয়োজন অবিচল ধৈর্য।

কোরআনের এই বার্তা আমাদের শেখায় যে মানুষের আসল পরিচয় বা সত্য সত্তা কোনো নাটকীয় মুহূর্তে হঠাৎ পাওয়া যায় না। এটি একদিনের অলৌকিক কোনো ঘটনা নয়; বরং প্রতিদিনের ছোট ছোট সঠিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নিজের চরিত্র ও সত্তাকে নির্মাণ করতে হয়।

প্রতিটি ওয়াক্তের নামাজ আদায় করা, সত্য বলার সাহস দেখানো, ক্ষণস্থায়ী সুবিধার চেয়ে নীতিকে প্রাধান্য দেওয়া এবং আবেগের বদলে ধৈর্য বেছে নেওয়ার মাধ্যমে ধীরে ধীরে একজন মানুষ তার প্রকৃত রূপ লাভ করে।

এই সত্যটি তরুণদের অপ্রয়োজনীয় মানসিক চাপ থেকে মুক্তি দেয়। হঠাৎ করে একদিনেই সবকিছু বদলে ফেলার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন প্রতিদিনের ধারাবাহিক চেষ্টা।

মহানবী (সা.) নির্দেশ করেছেন, আল্লাহর কাছে সেই কাজই সবচেয়ে প্রিয়, যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬৪৬৫)

প্রতিদিনের ছোট ছোট ভালো অভ্যাস ও সঠিক সিদ্ধান্তই একজন তরুণের আসল রূপ তৈরি করে দেয়, যা কেউ না দেখলেও আল্লাহর কাছে মূল্যবান হয়ে থাকে।

আজকের এই জটিল পৃথিবীতে তরুণদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এটি নয় যে, ‘মানুষ আমার সম্পর্কে কী ভাবছে?’ বরং আসল প্রশ্ন হলো, ‘যখন কেউ আমাকে দেখছে না, তখন মহান আল্লাহর সামনে আমি কে হয়ে উঠছি?’




এই ক্যাটেগরির আরো সংবাদ

সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি।

© বিডি ২৪ নিউজ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

  বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা,আটকের দাবি : এ্যাংকর সিমেন্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ : তদন্তে দুদক ও ভ্যাট গোয়েন্দা   বরিশাল স্বাস্থ্যখাতে শত কোটি টাকার দুর্নীতি: পিপলাই পরিবারের টেন্ডার সিন্ডিকেট উন্মোচন   ইফতারে বৈষম্যের অভিযোগ: ভিআইপি ও সাধারণ কর্মচারীদের আলাদা মেন্যু, সমালোচনায় বরিশাল সিটি করপোরেশন   বরিশালের হলিমা খাতুন স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা   পটুয়াখালী মেডিকেলে ৭৬ কোটি টাকার টেন্ডার বাতিল হলেও জড়িতরা বহাল তবিয়তে   রাজাপুর এলজিইডির প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ   বরিশালে বদলি ঠেকাতে ৩ শিক্ষকের গ্রেফতার নাটক   বরিশালের সেই বিতর্কিত এডলিন বিশ্বাষ পুলিশের হাতে আটক   না ফেরার দেশে বেগম খালেদা জিয়া   রাজশাহী গণপূর্তে টেন্ডারের আগেই ভাগ হচ্ছে কাজ : প্রশ্নের মুখে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম   বরিশালের রুপাতলী ‘খাবার বাড়ি’ রেস্তোরাঁকে ১ লাখ টাকা জরিমানা   বাকেরগঞ্জে যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে গরু চুরির অভিযোগ   নলছিটিতে বৈদ্যুতিক ফাঁদে প্রাণ হারালেন কৃষক বাচ্চু মল্লিক   বদলি-নিয়োগ-দুর্নীতি, সিন্ডিকেটের দখলে প্রাথমিক শিক্ষাঅধিদপ্তর   উজিরপুরে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে বলৎকারের অভিযোগ,জুতা পেটা   বদলি-বাণিজ্য, ঘুষ নিয়ন্ত্রণ করতেন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে, ছয় বছরের সাম্রাজ্য শাহজাহান আলীর   বরিশালে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের জায়গা দখল চেষ্টার অভিযোগ   বরিশালে বিসিক উদ্যোক্তা মেলায় স্টল বরাদ্দে অনিয়ম   বরিশাল কর অফিসের রতন মোল্লার হাতে আলাদিনের চেরাগ,একই কর্মস্থলে ১০ বছর   বরিশালের ১৬টি আসনে বিএনপির প্রার্থী যারা
Translate »