
মানুষের জীবনে এমন কিছু লক্ষ্য থাকে, যেগুলো অর্জন করতে পারলেই সব অপূর্ণতা দূর হবে বলে মনে হয়। কাঙ্ক্ষিত চাকরি, পদোন্নতি, ভালো ফলাফল কিংবা নিজের লেখা বই প্রকাশের সুযোগ—এসব অর্জনের সঙ্গে জড়িয়ে যায় আত্মবিশ্বাস, আত্মতৃপ্তি ও নিজের যোগ্যতা প্রমাণের আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু কোনো একটি অর্জন কি সত্যিই মানুষের সব অতৃপ্তি দূর করতে পারে? নাকি স্বীকৃতি পাওয়ার পরও নতুন কোনো লক্ষ্যের পেছনে ছুটতে থাকে মানুষ?
সম্প্রতি একটি বই প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা এক লেখকের অভিজ্ঞতা এই প্রশ্ন সামনে এনেছে। তাঁর সাহিত্যিক এজেন্ট বইটির প্রস্তাব বিভিন্ন প্রকাশকের কাছে পাঠিয়েছেন। প্রকাশকেরা বইটি গ্রহণ করবেন কি না, সেটিই এখন অপেক্ষার বিষয়। কিন্তু এই অপেক্ষা কেবল বই প্রকাশের অনিশ্চয়তায় সীমাবদ্ধ থাকেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নিজের পরিশ্রমের সার্থকতা এবং মানুষ হিসেবে নিজের মূল্য নিয়ে সংশয়।
লেখক মনে করছেন, বইটি প্রকাশের চুক্তি হলে দীর্ঘদিনের অস্থিরতা কমবে। বইটি লেখার পেছনে ব্যয় করা সময়কে সার্থক মনে হবে। অন্য কোনো কাজে সময় ব্যয় করা উচিত ছিল কি না, সেই প্রশ্নও হয়তো আর তাড়া করবে না। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের অর্জন নিয়ে সন্তুষ্ট হওয়া যাবে।
এমন অনুভূতি অনেকের জীবনেই দেখা যায়। কেউ মনে করেন, কাঙ্ক্ষিত চাকরিটি পেলে জীবন গুছিয়ে যাবে। কেউ ভাবেন, নির্দিষ্ট পরিমাণ আয় করতে পারলেই নিরাপত্তা ও তৃপ্তি আসবে। আবার কেউ সামাজিক স্বীকৃতি বা অন্যের প্রশংসার মধ্য দিয়ে নিজের যোগ্যতার প্রমাণ খোঁজেন। কিন্তু এসব লক্ষ্য অর্জনের পরও প্রত্যাশা শেষ হয় না; বরং নতুন কোনো লক্ষ্য সামনে এসে দাঁড়ায়।
.
আকাঙ্ক্ষার পেছনে ছোটা কেন শেষ হয় না
‘ফিফটি ওয়ার্ডস ফর স্নো’ নামের একটি পডকাস্টে ফরাসি মনোবিশ্লেষক জাক লাকাঁর একটি ধারণা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ধারণাটির নাম ‘অবজে পতি আ’। সহজভাবে বললে, এই ধারণা এমন একটি আকাঙ্ক্ষার উৎসকে বোঝায়, যা মানুষকে কোনো নির্দিষ্ট বস্তুর বা অর্জনের পেছনে ছুটতে প্ররোচিত করে। মানুষ মনে করে, কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি হাতে পেলেই সুখ, পরিপূর্ণতা ও মানসিক শান্তি আসবে। অথচ সেই জিনিসের পক্ষে বাস্তবে মানুষের সব প্রত্যাশা পূরণ করা সম্ভব নয়।
লেখকের কাছে বই প্রকাশের চুক্তিটি এমন একটি আকাঙ্ক্ষার বস্তু হয়ে উঠেছে। প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান বইটি প্রকাশের সুযোগ দিতে পারে, কিন্তু তার কাছে প্রত্যাশা আরও বড়—জীবনের অপূর্ণতা থেকে মুক্তি, নিজের যোগ্যতা নিয়ে সন্দেহের অবসান এবং দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টার চূড়ান্ত স্বীকৃতি।
এখানেই মূল সমস্যাটি। একটি নির্দিষ্ট অর্জনের সঙ্গে জীবনের সামগ্রিক সুখ ও আত্মমর্যাদাকে জুড়ে দিলে সেই অর্জনের ওপর অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি হয়। ফলে কাঙ্ক্ষিত ফল না এলে হতাশা বাড়ে, আর ফল পাওয়া গেলেও সন্তুষ্টি দীর্ঘস্থায়ী না-ও হতে পারে।
.
অন্যের অগ্রগতি কি নিজের পিছিয়ে পড়ার প্রমাণ
পডকাস্টটির আরেকটি পর্বে জ্যোতিষী কেট রুট ‘রেট্রোগ্রেড’ শব্দটি নিয়ে আলোচনা করেন। জ্যোতিষশাস্ত্রে ব্যবহৃত এই শব্দের সঙ্গে গ্রহের আপাত বিপরীতমুখী গতির ধারণা যুক্ত। পৃথিবী ও অন্য গ্রহের অবস্থানের পরিবর্তনের কারণে কোনো গ্রহকে পৃথিবী থেকে দেখলে পেছনের দিকে চলতে দেখা যেতে পারে। বাস্তবে গ্রহটি তার কক্ষপথেই চলতে থাকে; গতির এই বিপরীতমুখী চেহারা তৈরি হয় পর্যবেক্ষকের অবস্থানের কারণে।
কেট রুটের আলোচনায় বিষয়টি ফিরে দেখা ও আত্মপর্যালোচনার সুযোগ হিসেবেও উঠে আসে। জীবনে কী কী ঘটনা ঘটেছে, সেগুলো থেকে কী শেখা হয়েছে এবং কোন অভিজ্ঞতাগুলো বোঝার জন্য যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়নি—এসব প্রশ্ন নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।
অন্যের সাফল্যের সঙ্গে নিজের জীবন তুলনা করার প্রবণতা এ প্রসঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ। বয়সে ছোট কেউ যখন এমন কিছু অর্জন করেন, যা অন্য একজন বহুদিন ধরে অর্জনের স্বপ্ন দেখছেন, তখন নিজের অগ্রগতি নিয়েও সন্দেহ তৈরি হতে পারে। অন্যের এগিয়ে যাওয়াকে নিজের পিছিয়ে পড়ার প্রমাণ বলে মনে হয়।
কিন্তু প্রত্যেক মানুষের জীবনের পরিস্থিতি, সুযোগ, অভিজ্ঞতা ও অগ্রগতির ধরন আলাদা। ফলে অন্যের অর্জন দিয়ে নিজের জীবনের সার্থকতা বিচার করা যথাযথ নয়।
.এআই কি কাজ সহজ করছে, নাকি কাজের চাপ বাড়াচ্ছে.
ভবিষ্যতের স্বীকৃতির অপেক্ষায় বর্তমানকে অবহেলা নয়
পডকাস্টে কেট রুট একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন তোলেন: মানুষের পৃথিবীতে আসার উদ্দেশ্য কি কেবল অর্জন করা?
কেট রুট ভবিষ্যতে বই লিখে অচেনা কোনো পাঠকের উপকার করার আকাঙ্ক্ষার কথা বলেন। তবে সেই উপকার করার সুযোগ কেন ভবিষ্যতের কোনো অর্জনের ওপর নির্ভর করবে, সেই প্রশ্নও সামনে আনেন। বর্তমানেই তো কাছের মানুষের পাশে দাঁড়ানোর, তাঁদের কথা শোনার এবং তাঁদের জীবনে অর্থপূর্ণ ভূমিকা রাখার সুযোগ রয়েছে।
কেট জানান, মায়ের মৃত্যুর সময় তিনি বিষয়টি গভীরভাবে উপলব্ধি করেন। প্রিয় মানুষের সঙ্গে সময় কাটানোর মুহূর্তেও কখনো কখনো তাঁর মন চলে যেত সেই অভিজ্ঞতা নিয়ে ভবিষ্যতে কীভাবে লেখা যায়, সেই চিন্তায়। তখন তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে, ভবিষ্যতে লেখা পড়তে পারেন, এমন একজন অচেনা মানুষের কথা ভেবে কেন পাশের মানুষটির সঙ্গে কাটানো বর্তমান মুহূর্তকে কম গুরুত্ব দেওয়া হবে?
.ইন্টার্নশিপে বেতন নেই, তবু কেন করবেন.
তাঁর উপলব্ধি হলো, ভবিষ্যতের পাঠকের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি করার আকাঙ্ক্ষা গুরুত্বপূর্ণ হলেও বর্তমানের মানুষদের সঙ্গে আন্তরিকভাবে যুক্ত থাকাও সমান জরুরি; বরং বর্তমানের অভিজ্ঞতা ও সম্পর্কের প্রতি মনোযোগী হলে ভবিষ্যতে লেখার মধ্য দিয়ে অন্যদের দেওয়ার মতো অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।
এটি শুধু লেখকদের জন্য নয়, সবার জন্যই প্রাসঙ্গিক। পড়াশোনা, চাকরি, ক্যারিয়ার কিংবা আর্থিক নিরাপত্তা অর্জনের চেষ্টায় অনেকেই বর্তমানের সম্পর্ক ও আনন্দকে পিছিয়ে দেন। মনে করেন, নির্দিষ্ট লক্ষ্য পূরণ হলেই নিজের জন্য সময় বের করা যাবে। কিন্তু একটি লক্ষ্য পূরণের পরই যখন আরেকটি লক্ষ্য সামনে আসে, তখন বর্তমানকে উপভোগ করার সুযোগ ক্রমেই সীমিত হয়ে পড়ে।
ভবিষ্যতের পরিকল্পনা জরুরি, তবে সেই পরিকল্পনার জন্য বর্তমানের জীবনকে পুরোপুরি উপেক্ষা করার প্রয়োজন নেই।
লেখা: ম্যাগি রো/সাইকোলজি টুডে