
খাওয়ার সময় মুখে এলাচ পড়লে অনেকেই বিরক্ত হন। অথচ খাবার শেষে একটি এলাচ চিবানোর অভ্যাস দীর্ঘদিনের। বিরিয়ানি কিংবা কাবাবের মতো মসলাদার খাবারের পর এলাচের সতেজ সুবাস মুখের স্বাদ বদলে দেয়, কমায় খাবারের পর থেকে যাওয়া গন্ধও। তবে মুখের সতেজতা ছাড়াও হজমে স্বস্তি দিতে পারে কি এই ছোট্ট মসলা? এলাচের কিছু প্রাকৃতিক যৌগের সম্ভাব্য হজম-সহায়ক ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য নিয়ে গবেষণা হয়েছে। যদিও এসব উপকারিতা নিশ্চিত করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন।
এলাচের পরিচিত সুবাসের উৎস এর অপরিহার্য তেল বা এসেনশিয়াল অয়েল। এতে সিনিওল (১,৮-সিনিওল) ও টারপিনাইল অ্যাসিটেটের মতো সুগন্ধি যৌগ থাকতে পারে। এলাচের জাত, উৎপাদন ও সংরক্ষণের পদ্ধতি অনুযায়ী এসব উপাদানের পরিমাণে পার্থক্য দেখা যায়।
ঐতিহ্যগতভাবে দক্ষিণ এশিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলে খাবারের পর এলাচ চিবানোর প্রচলন রয়েছে। এর সুবাস মুখে সতেজ অনুভূতি তৈরি করে এবং খাবারের পর স্বাদ বদলে দিতে পারে। তবে এলাচের সুগন্ধি যৌগ সরাসরি মানুষের হজমপ্রক্রিয়ায় কতটা প্রভাব ফেলে, তা এখনো নিশ্চিত নয়।
খাবারের পর পেট ভার লাগা, গ্যাস কিংবা পেটের অস্বস্তি অনেকেরই পরিচিত সমস্যা। ঐতিহ্যবাহী খাদ্যসংস্কৃতিতে এ ধরনের অস্বস্তি কমাতে এলাচ ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। এর কিছু যৌগ নিয়ে পরীক্ষাগারে গবেষণায় মসৃণ পেশি শিথিল করার সম্ভাব্য প্রভাব দেখা গেছে।
পরিপাকতন্ত্রের বিভিন্ন অংশে থাকা মসৃণ পেশি খাবার এগিয়ে নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজে অংশ নেয়। এসব পেশির কার্যক্রমের সঙ্গে হজমপ্রক্রিয়ার সম্পর্ক থাকলেও পরীক্ষাগারে পাওয়া ফলাফল সরাসরি মানুষের শরীরের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ধরে নেওয়া যায় না। তাই এলাচ খেলে গ্যাস, পেট ফাঁপা কিংবা হজমের সমস্যা দূর হবে, এমন দাবি করার মতো পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
এলাচে থাকা কিছু উদ্ভিজ্জ যৌগের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট বৈশিষ্ট্য বিজ্ঞানীদের আগ্রহের বিষয়। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট শরীরের কোষকে ক্ষতিকর অক্সিডেটিভ প্রক্রিয়ার প্রভাব থেকে সুরক্ষিত রাখতে ভূমিকা রাখতে পারে।
তবে পরীক্ষাগারে কোনো যৌগের অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট কার্যক্রম দেখা গেলেই স্বাভাবিক পরিমাণে এলাচ খেয়ে একই মাত্রার স্বাস্থ্যগত উপকার পাওয়া যাবে, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এলাচের সম্ভাব্য উপকারিতা নিয়ে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তাই একে কোনো রোগের চিকিৎসা হিসেবে না দেখে সুষম খাদ্যাভ্যাসের একটি সুগন্ধি উপাদান হিসেবে বিবেচনা করাই যুক্তিযুক্ত।
এলাচের বীজ চিবানোর সময় মুখে লালা নিঃসরণ বাড়ে। লালা খাবার গিলতে সাহায্য করে এবং মুখের অম্লতা সাময়িকভাবে প্রশমিত করতে ভূমিকা রাখে। খাবারের পর এলাচ চিবালে এর সুবাস মুখে সতেজ অনুভূতি তৈরি করতে পারে। তবে শুধু এলাচ চিবালেই খাদ্যনালির অ্যাসিড পুরোপুরি দূর হয়ে যায়, এমন নয়। যাঁদের নিয়মিত বুকজ্বালা বা অ্যাসিড রিফ্লাক্সের সমস্যা রয়েছে, তাঁদের জন্য এলাচ নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা নয়। এ ধরনের সমস্যা বারবার হলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন।
খাবারের পর একটি ছোট এলাচ চিবিয়ে খেতে পারেন, যদি এতে কোনো অস্বস্তি না হয়। মুখের সতেজতা ও স্বাদের জন্য এই অভ্যাস উপভোগ্য হতে পারে। তবে বেশি পরিমাণে খাওয়ার প্রয়োজন নেই।
রান্নায় ব্যবহৃত এলাচ আর এর নির্যাস বা ঘনীভূত এসেনশিয়াল অয়েল এক বিষয় নয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া ঘনীভূত এসেনশিয়াল অয়েল খাওয়া উচিত নয়। হজমে স্বস্তি পেতে শুধু কোনো একটি মসলার ওপর নির্ভর না করে প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসেও নজর দেওয়া জরুরি। ধীরে খাওয়া, খাবার ভালোভাবে চিবানো, প্রয়োজনের অতিরিক্ত না খাওয়া এবং খাওয়ার পরপরই শুয়ে না পড়ার মতো অভ্যাস হজমের অস্বস্তি সামলাতে সহায়ক হতে পারে।
এলাচের আকর্ষণ এর মিষ্টি সুবাসে, আবার খাবারের পর এটি চিবানোর অভ্যাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে সতেজতার অনুভূতিও। এর প্রাকৃতিক যৌগ নিয়ে গবেষণায় সম্ভাবনাময় কিছু বৈশিষ্ট্য উঠে এলেও হজমের সমস্যা নিরাময়ে এলাচ কতটা কার্যকর, সে বিষয়ে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর মতো প্রমাণ এখনো পর্যাপ্ত নয়।
তাই খাবারের পর এলাচ চিবাতে পারেন মুখের সতেজতা ও স্বাদের জন্য। তবে সুস্থ হজমের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো সুষম খাবার, পরিমিত আহার, পর্যাপ্ত পানি পান এবং নিয়মিত জীবনযাপন।