
নাভি পিল্লাই প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে দক্ষিণ আফ্রিকায় আইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। ১৯৯৫ সালে প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে দেশটির হাইকোর্টের বিচারক নিযুক্ত হন তিনি। গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনা জাতিসংঘ কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করে তিনি আলোচিত হন।
শান্তি ও আন্তর্জাতিক আইন প্রতিষ্ঠায় প্রচেষ্টার স্বীকৃতি পেয়েছেন দক্ষিণ আফ্রিকার মানবাধিকারকর্মী নাভি পিল্লাই। শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন তিনি।
নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটি গতকাল শুক্রবার এ পুরস্কার ঘোষণা করে।
গাজায় ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ আনা জাতিসংঘ কমিশনের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন নাভি পিল্লাই (৮৫)। তিনি রুয়ান্ডার গণহত্যার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিআর) প্রধান ছিলেন। বর্তমানে তিনি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন, যেখানে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে গণহত্যার অভিযোগ রয়েছে।
নাভি পিল্লাই এই পুরস্কার আন্তর্জাতিক অপরাধের শিকার ভুক্তভোগীদের উদ্দেশে উৎসর্গ করেছেন। পুরস্কার পাওয়ার পর অভিনন্দন ও শুভেচ্ছায় ভাসছেন পিল্লাই। তবে পিল্লাইকে পুরস্কার দেওয়ার কঠোর সমালোচনা করেছে ইসরায়েল।
নরওয়ের অসলোতে গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে নরওয়েজিয়ান নোবেল কমিটির চেয়ারম্যান ইয়োরগেন ওয়াটনে ফ্রিডনেস শান্তি নোবেল পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে নাভি পিল্লাইয়ের নাম ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, যুদ্ধাপরাধ, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং গণহত্যার মতো অপরাধ বিচারের আওতায় আনা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন পিল্লাই। ফ্রিডনেস বলেন, আন্তর্জাতিক আইনি ব্যবস্থা প্রচণ্ড চাপের মুখে রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আক্রমণের শিকার হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, তাঁরা আইনি কাঠামো এবং আইন ও ন্যায়বিচারের প্রতি বৈশ্বিক শ্রদ্ধা ক্ষমতার রাজনীতির দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা দেখতে পাচ্ছেন।
নোবেল কমিটি বলেছে, আন্তর্জাতিক আইন ও বিচারব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে পিল্লাইয়ের অগ্রণী ভূমিকার পাশাপাশি তাঁর বিচারিক দৃঢ়তা, ব্যক্তিগত সততা ও সাহসকে গুরুত্ব দিয়েছে তারা।
নোবেল কমিটি পুরস্কার বিজয়ী হিসেবে নাম ঘোষণার সময় নাভি পিল্লাই জার্মানিতে ছিলেন। শুরুতে পুরস্কার পাওয়ার খবর কৌতুক হিসেবে মনে করেছিলেন তিনি। তাই তাৎক্ষণিকভাবে অভিনন্দন ও শুভেচ্ছা জানানো সবাইকে তিনি বলছিলেন, ‘এটি নিশ্চয়ই একটি কৌতুক!…আপনাদের এই করতালি আমার কাছে অনেক মূল্যবান। তবে একজন আইনজীবী ও বিচারক হিসেবে আমি বিষয়টি যাচাই করে নিতে চাই।’ পরে কৌতুক করে তিনি বলেন, ‘আপনারা যদি আরেকটু বেশি তালি দেন, তবে আমি হয়তো এই পুরস্কার ট্রাম্পের সঙ্গে ভাগ করে নিতে পারি।’
পরে পুরস্কারের বিষয়ে নিশ্চিত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ায় নাভি পিল্লাই বলেন, এই পুরস্কার তিনি আন্তর্জাতিক অপরাধের শিকার বেঁচে যাওয়া সব ভুক্তভোগী এবং আন্তর্জাতিক বিচার প্রতিষ্ঠার সঙ্গে যুক্ত সবার উদ্দেশে উৎসর্গ করছেন।
আন্তর্জাতিক আইনকে দুর্বল করার অপচেষ্টার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘এটি আমাদের আবারও এমন এক বিশ্বের দিকে ফিরিয়ে নেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করে, যেখানে কার কষ্ট গুরুত্বপূর্ণ, তা আইনের বদলে ক্ষমতা দিয়ে নির্ধারিত হয়।’ তিনি জানান, বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালনের সময় তিনি প্রত্যেক মানুষের সমান মর্যাদা এবং বিশেষ করে নারী ও শিশুদের অধিকার রক্ষা ও এগিয়ে নেওয়ার প্রতিশ্রুতি রক্ষার চেষ্টা অবিচল থেকেছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার ফলকার টুর্ক বলেন, নাভি পিল্লাইয়ের নোবেল শান্তি পুরস্কার পাওয়াকে মানবাধিকারের জন্য ‘সমষ্টিগত বিজয়’ বলে উল্লেখ করেন। জাতিসংঘে এক সংবাদ সম্মেলনে ফলকার টুর্ক বলেন, ‘আমি আমার বড় বোন নাভি পিল্লাইকে এই দুর্দান্ত ও অসাধারণ পুরস্কারের জন্য উষ্ণ অভিনন্দন জানাই।’
আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মহাসচিব অ্যাগনেস ক্যালামার্ড নিজের এক্স অ্যাকাউন্টে একটি ভিডিও পোস্ট করে জানান, নাভি পিল্লাইয়ের সঙ্গে তিনি জার্মানিতে আছেন। ক্যালামার্ড লিখেছেন, ‘আমরা নুরেমবার্গ আদালতে আছি। তাঁর নোবেল পুরস্কারের জন্য এর চেয়ে শক্তিশালী প্রতীকী বিষয়…আমি আর ভাবতেই পারছি না। আমরা সবাই ভীষণ রোমাঞ্চিত!’নাভি পিল্লাইকে পুরস্কার দিয়ে ‘ইসরায়েলবিরোধী বিদ্বেষকে’ বৈধতা দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে ইসরায়েল। ইসরায়েলের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক্স পোস্টে এই অভিযোগ তোলা হয়েছে।
ইসরায়েলে অধিকৃত ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড নিয়ে জাতিসংঘের স্বাধীন আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিশনের সভাপতি হিসেবে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন পিল্লাই। ওই কমিশন ইসরায়েলের বিরুদ্ধে গাজায় গণহত্যা চালিয়েছে বলে উল্লেখ করেছে।
গতকাল ইসরায়েলের অভিযোগ নাকচ করে দিয়ে নোবেল কমিটি বলেছে, গাজায় ইসরায়েল গণহত্যা চালাচ্ছে কি না, সে বিষয়ে তারা কোনো পক্ষ নিচ্ছে না। পিল্লাইয়ের পেশাদারি ও সততার ওপর নোবেল কমিটি আস্থা রেখেছে। তবে গাজা নিয়ে তদন্তের কাজটি জাতিসংঘের একটি তদন্ত কমিশনেরই।
১৯৪১ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ডারবানে ভারতীয় তামিল বংশোদ্ভূত একটি পরিবারে জন্ম নেন নাভি পিল্লাই। বাবা ছিলেন বাসচালক। নোবেল পুরস্কারের ওয়েবসাইটে বলা হয়, আইন বিষয়ে পড়াশোনা শেষে তিনি বর্ণবৈষম্যের বিরুদ্ধে আন্দোলন করা ব্যক্তিদের পক্ষে আইনি লড়াই শুরু করেন। ১৯৬৭ সালে ডারবানে নিজের আইনি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন তিনি। নাভি পিল্লাই প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী হিসেবে আইন ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। পরে যুক্তরাষ্ট্রের হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন।
১৯৮৮ সালে সেখান থেকে আইন বিষয়ে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। ১৯৯৫ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার হাইকোর্টের বিচারক নিযুক্ত হন পিল্লাই। তিনিই প্রথম অশ্বেতাঙ্গ নারী, যিনি হাইকোর্টের বিচারক হিসেবে নিযুক্ত হন। এর চার বছর পর নাভি পিল্লাই রুয়ান্ডার জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটিআর) বিচারক ও সভাপতি হন। সেখানে যৌন সহিংসতা, ধর্ষণ ও ঘৃণা ছড়ানোর মতো কর্মকাণ্ড কীভাবে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে বিচারের আওতায় আসতে পারে, তা প্রতিষ্ঠায় ভূমিকা রাখেন তিনি।
পরে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) বিচারক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন পিল্লাই। ২০০৮ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনার (ওএইচসিএইচআর) ছিলেন।