
যুক্তরাজ্যে আশ্রয় আবেদনের জন্য জাল নথি, সাজানো ছবি ও মনগড়া প্রমাণ তৈরির অভিযোগে আবারও বাংলাদেশিসহ দক্ষিণ এশীয় কয়েকজনের নাম সামনে এসেছে।
সমকামী পরিচয়ে ভুয়া আশ্রয় আবেদন তৈরিতে সহায়তার অভিযোগে গত মঙ্গলবার (৬ অক্টোবর) লন্ডনের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালায় ব্রিটিশ অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। এ সময় বাংলাদেশি সংগীতশিল্পী সাজ্জাদ মিয়াসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। সাজ্জাদ মিয়া পরে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
অভিযানে মোবাইল ফোন, অলংকার ও কয়েক হাজার পাউন্ড নগদ অর্থ জব্দ করে ব্রিটিশ অভিবাসন কর্তৃপক্ষ। তদন্তকারীদের সন্দেহ, পূর্ব লন্ডনের বাংলাদেশি এলজিবিটি সংগঠন ‘আপনজন’-এর সঙ্গে যুক্ত একটি চক্র অর্থের বিনিময়ে আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য জাল প্রত্যয়নপত্র, সাজানো ছবি এবং সমলিঙ্গের সম্পর্কের পক্ষে মনগড়া প্রমাণ তৈরি করত।
এর আগেও বিবিসির একটি অনুসন্ধানে কয়েকজন বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি অভিবাসন পরামর্শদাতার বিরুদ্ধে জাল নথি ও মনগড়া প্রমাণ ব্যবহার করে আশ্রয় আবেদন সাজানোর অভিযোগ উঠেছিল।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপরাধ তদন্ত বিভাগের আঞ্চলিক প্রধান ক্রিস ফস্টার জানিয়েছেন, ‘আপনজন’-এর সঙ্গে সম্পর্কিত সন্দেহজনক আশ্রয় আবেদনের তদন্ত থেকেই সাম্প্রতিক অভিযানের সূত্রপাত।
তদন্তকারীদের অভিযোগ, আবেদনকারীদের কাছ থেকে এক হাজার থেকে সাড়ে চার হাজার পাউন্ড পর্যন্ত নেওয়া হতো। বিনিময়ে দেওয়া হতো জাল প্রত্যয়নপত্র, সাজানো ছবি এবং সমলিঙ্গের সম্পর্কের পক্ষে মনগড়া চিঠি। এসব নথি ব্যবহার করে আবেদনকারীরা দাবি করতেন, নিজ দেশে ফিরে গেলে সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশন (যৌন–সংশ্লিষ্টতা) কারণে তাঁরা নির্যাতন বা প্রাণনাশের ঝুঁকিতে পড়বেন।
ক্রিস ফস্টারের ভাষ্য অনুযায়ী, আশ্রয় আবেদন যাচাইয়ের সময় কর্মকর্তারা কয়েকটি আবেদনে অস্বাভাবিক মিল দেখতে পান। এরপর কয়েক মাস ধরে তদন্ত চলে।
সন্দেহভাজন চক্রটির সঙ্গে সম্পর্ক থাকতে পারে, এমন শতাধিক আশ্রয় আবেদন পুনঃপরীক্ষা করে দেখছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সরকারি হিসাবে পাকিস্তান প্রথম, বাংলাদেশ দ্বিতীয়
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৮ সালে ১ হাজার ৫০২টি আবেদনে সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনকে আশ্রয় আবেদনের একটি কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল। এর মধ্যে পাকিস্তানি নাগরিকদের আবেদন ছিল ৩২৪টি। বাংলাদেশিদের আবেদন ছিল ১৪৮টি।
২০২৩ সালে এ ধরনের আবেদন ছিল ১ হাজার ৩৭৭টি। এর মধ্যে পাকিস্তানি নাগরিকদের আবেদন ছিল ৫৭৮টি এবং বাংলাদেশিদের ১৭৫টি।
তবে এই পরিসংখ্যান থেকে কোনোভাবেই বলা যায় না যে এসব আবেদন ভুয়া ছিল। আবেদনকারীদের সবাই আশ্রয় পেয়েছেন, এমন তথ্যও এই পরিসংখ্যানে নেই। অর্থাৎ সেক্সুয়াল ওরিয়েন্টেশনের ভিত্তিতে আশ্রয় আবেদনের সংখ্যা আর জালিয়াতির অভিযোগ দুটি আলাদা বিষয়।
বিবিসির অনুসন্ধানে কী উঠে এসেছিল
চলতি বছরের এপ্রিলে বিবিসির একটি গোপন অনুসন্ধানে যুক্তরাজ্যের আশ্রয়ব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে জাল নথি ও মনগড়া প্রমাণ তৈরির অভিযোগ উঠে আসে। ছদ্মবেশী সাংবাদিকেরা বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি শিক্ষার্থী পরিচয়ে কয়েকজন পরামর্শদাতার সঙ্গে যোগাযোগ করেন।
বিবিসির অনুসন্ধান অনুযায়ী, তাঁদের কাউকে সমকামী, নাস্তিক বা রাজনৈতিকভাবে নিপীড়িত ব্যক্তি হিসেবে পরিচয় দিয়ে আশ্রয় আবেদন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। অর্থের বিনিময়ে সাজানো ছবি, প্রত্যয়নপত্র, চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি এবং ধর্মীয় বা রাজনৈতিক নিপীড়নের দাবির পক্ষে প্রমাণ তৈরির প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল।
অনুসন্ধানে ভুয়া সংবাদমাধ্যমের ওয়েবসাইট তৈরি, সাজানো রাজনৈতিক বিক্ষোভে অংশ নেওয়া এবং চিকিৎসকের কাছে অসুস্থতা সম্পর্কে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার পরামর্শের অভিযোগও উঠে আসে। একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে জাল আশ্রয় আবেদন তৈরির জন্য সাত হাজার পাউন্ড পর্যন্ত অর্থ নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া যায়।
আলোচনায় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আইনজীবী
বিবিসির অনুসন্ধানে জাহিদ হাসান আকন্দ নামের এক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত আইনজীবীর কার্যক্রমও আলোচনায় আসে। পূর্ব লন্ডনের মাইল অ্যান্ড রোডের কাছে একটি কার্যালয়ে তাঁর সঙ্গে দেখা করেন বিবিসির ছদ্মবেশী সাংবাদিক। বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, আকন্দ ওই সাংবাদিককে সমকামী, নাস্তিক বা রাজনৈতিক কর্মী পরিচয়ে আশ্রয় আবেদন করার পরামর্শ দেন।
ধর্মীয় নিপীড়নের প্রমাণ তৈরির জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইসলাম বা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) সম্পর্কে অবমাননাকর বক্তব্য প্রকাশের পরামর্শও তিনি দিয়েছিলেন বলে বিবিসির প্রতিবেদনে দাবি করা হয়।
বিবিসির ধারণ করা কথোপকথনে আশ্রয় আবেদনের আইনি প্রস্তুতির জন্য দেড় হাজার পাউন্ড এবং অতিরিক্ত প্রমাণ সংগ্রহের জন্য দুই থেকে তিন হাজার পাউন্ড খরচের কথাও উঠে আসে।
বিবিসির তথ্য অনুযায়ী, আকন্দ ২০২২ সালে ব্যারিস্টার হিসেবে যোগ্যতা অর্জন করেন। তবে তাঁর আইন পেশা পরিচালনার অনুমতি নেই। তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে বেআইনি বা অসৎ আচরণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
ব্রিটিশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ আশ্রয়ব্যবস্থায় প্রতারণাকারী চক্রগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
সরকার জানিয়েছে, প্রতারণার মাধ্যমে কেউ অভিবাসন মর্যাদা অর্জন করে থাকলে তা বাতিল করা হতে পারে। আশ্রয় জালিয়াতির অপরাধ প্রমাণিত হলে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ডের বিধানও রয়েছে।