|
সৌদি-হুতি দুশমনির আদি ও আসল কারণ
|
|
![]() মোহাম্মাদ বিন সালমান প্রাণ বাঁচাতে আজ এই প্রাসাদে, কাল ওই প্রাসাদে থাকছেন। মাঝে মাঝে বাংকারে লুকাচ্ছেন। কখন কোথায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হবে তার কোনো ঠিক নেই। সময়টা তাঁর মোটেও ভালো যাচ্ছে না। ৯ আগস্ট সৌদি আরবের বন্দরনগর জিজানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন তেল কোম্পানি আরামকোর তেল শোধনাগারে ভয়ংকর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা দিয়ে শুরু। এরপর থেকে একের পর এক হামলা হচ্ছে। আমেরিকার অতি ঘনিষ্ঠ সৌদি আরব অনেক আগে থেকেই তেল বিক্রির বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার দিয়ে তাদের অত্যাধুনিক প্রতিরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছে। গত বছরের ১৩ মে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সৌদি সফরের সময় আমেরিকার ইতিহাসের সবচেয়ে বড় প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বিক্রির চুক্তি হয়েছে। শুধু ওই চুক্তির আওতায় মোহাম্মদ বিন সালমান আমেরিকার কাছ থেকে ১৪২ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র কিনেছেন। এত অস্ত্রপাতি কেনার পরও সৌদি আরবে যেভাবে তেলের খনি ও বিমানবন্দরের মতো সবচেয়ে সুরক্ষিত জায়গায় হামলা হচ্ছে, তা দেখে মোহাম্মদ বিন সালমানের বারবার প্রাসাদ বদল করে বম্বপ্রুফ বাংকারে ঢোকারই কথা। অবাক করা কথা হলো, যাদের হামলার মুখে আজ সৌদির প্রতিরক্ষাব্যবস্থার এই বাজে দশা, যাদের কারণে বাব আল–মানদেব প্রণালি দিয়ে সৌদির তেলের ট্যাংকারগুলো যেতে পারছে না, ইয়েমেনের সেই হুতি বিদ্রোহীদের নাম বছর বিশেক আগেও তেমন কেউ শোনেনি। . দুনিয়ার সবাই দেখেছে, এক দশক আগে হুতিদের দমন করতে গিয়ে সৌদি আরব ও তাদের মিত্ররা ইয়েমেনের উত্তরাঞ্চলে নির্বিচারে বোমা ফেলেছে। খাবার ও পানি বন্ধ করে দিয়ে কৃত্রিম দুর্ভিক্ষ চাপিয়ে দিয়েছে। কলেরায় সাড়ে চার লাখের বেশি শিশু মারা গেছে। গৃহযুদ্ধে ১১ হাজারের বেশি শিশু নিহত বা পঙ্গু হয়েছে। তাদের কাছে ওষুধ পৌঁছানোর সুযোগও দেওয়া হয়নি। এভাবে ইয়েমেনের একটি বিশাল অংশকে অনেকটা গাজার মতো আক্ষরিক অর্থেই ধ্বংস করে ফেলা হয়েছে। তারপরও হুতিরা শেষ হয়ে যায়নি। উল্টো তারা এখন ঘুরে দাঁড়িয়ে সৌদি আরবে পাল্টাহামলা চালিয়ে তাদের আতঙ্ক হয়ে উঠেছে। এই অবস্থায় অনেকগুলো প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে জেগে উঠছে। হুতিরা আসলে কারা? তাদের সঙ্গে সৌদির যে সাপে-নেউলে সম্পর্ক, তার পেছনের আদি ও আসল কারণ কী? এর পেছনে কি শুধুই রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কারণ? নাকি ধর্মীয় মতাদর্শ ও ভাষ্যের দ্বন্দ্ব আছে? এসব প্রশ্নের জবাব হিসেবে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে প্রতিদিন নানা ধরনের লেখালেখি হচ্ছে। .
. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের অডিও-ভিডিও কনটেন্ট প্রকাশিত হচ্ছে। কিন্তু সেসব লেখাজোখা ও অডিও-ভিডিও কনটেন্টের প্রায় সবগুলোতেই ভাসা-ভাসা আলাপ আসছে। হুতি ও সৌদি সরকারের যে দুশমনি আজ দেখা যাচ্ছে, সেটি যে একটি সহস্রাব্দপ্রাচীন আদর্শিক দ্বন্দ্বের অনিবার্য ফল, তা খুব কম আলোচকের আলোচনায় উঠে আসছে। ‘যদি দেখা যায়, শাসক ন্যায়ভ্রষ্ট হয়েছেন, তার পরও প্রকাশ্যে তাঁর সমালোচনা করা বা বিদ্রোহ করা যাবে না; চুপ থাকতে হবে’ এবং ‘শাসক জালিম হলে তাঁর বিরুদ্ধে কথা না বলে চুপ থাকাটাই সবচেয়ে বড় গুনাহ’—এই দুটি পরস্পরবিরোধী ভাষ্যই যে আজকের হুতি-সৌদি সংঘাতের মূল কারণ, তা বিশ্লেষকদের লেখা ও আলোচনায় উঠে আসছে না। অথচ এই দুই আদর্শিক অবস্থানের সংঘাতের কারণেই সুদীর্ঘকাল ধরে মধ্যপ্রাচ্যে হানাহানি চলে আসছে। তাই এই দুই আদর্শকে বোঝা দরকার। তার জন্য চলুন একটু ইতিহাস থেকে বেড়িয়ে আসি। .ইরান যুদ্ধ, নাকি দাজ্জালতত্ত্বে মোড়া ‘আমেরিকান ক্রুসেড’!.ইরান যুদ্ধ নিয়ে ‘আসল কথাডা কেউ কইলেন না’. জিলহজ মাস। হজ চলছে। এ বছর মনে হচ্ছে হাজির সংখ্যা অন্যবারের চেয়ে বেশি। তাওয়াফের সময় কাবাঘরের চারপাশে ঠাসাঠাসি অবস্থা। হাজরে আসওয়াদে চুমু খাওয়ার জন্য ঠেলাঠেলি চলছে। পরবর্তী সময়ে খলিফা হবেন, এমন তালিকায় থাকা এক যুবরাজ বা ক্রাউন প্রিন্স একটু দূরে তাঁর বন্ধুদের নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। তাঁকে ঘিরে আছেন নিরাপত্তা বাহিনীর লোকজন। যুবরাজের নাম হিশাম। হিশাম ইবনে আবদুল মালিক। যখনকার কথা বলছি, তখন গোটা আরব দুনিয়ায় উমাইয়া রাজবংশের শাসন চলছে। রাজধানী তখন সিরিয়ার দামেস্ক নগরে। গদিতে ষষ্ঠ খলিফা প্রথম আল-ওয়ালিদ। হিশাম সিরিয়া থেকে মক্কায় এসেছেন। সঙ্গে থাকা বন্ধুদের কারও বাড়ি সিরিয়ায়, কারও বাড়ি মিসরে। তাঁদের চেহারা দেখে বোঝা যাচ্ছে, তাঁরা বাদশাহি পরিবার বা উচ্চপদস্থ মন্ত্রীদের স্বজন। তাঁরা কাবাঘর তাওয়াফে যাচ্ছেন না। কারণ, ভিড় করা লোকেরা সরছেন না। ভিড় কমার জন্য হিশাম ও তাঁর বন্ধুরা একটু দূরে বসে অপেক্ষা করছেন। এমন সময়ে সেখানে কয়েকজন সাথি নিয়ে এক ব্যক্তি কাবাঘরের দিকে হেঁটে আসতে লাগলেন। লোকেরা তাঁকে দেখামাত্র অতি সম্ভ্রমের সঙ্গে সরে গিয়ে রাস্তা করে দিল। তিনি কাবা তাওয়াফ করলেন। হাজরে আসওয়াদ চুম্বন করলেন। উপস্থিত সবাই একে একে এসে তাঁর সঙ্গে হাত মেলাতে লাগলেন। . হিশামের বন্ধুরা অবাক হলেন। তাঁরা বুঝতে পারছিলেন না, যেখানে যুবরাজকে দেখে হাজিরা সরলেন না, সেখানে দেখতে শুনতে অতি সাধারণ এই লোককে দেখে তাঁরা এমন সম্মান করছেন কেন? হিশাম নিজেও বিব্রতবোধ করছিলেন। অপমানবোধে ভেতরে-ভেতরে ফেটে পড়ছিলেন। সঙ্গে থাকা বিদেশি বন্ধুরা হিশামকে জিজ্ঞাসা করলেন, ভদ্রলোক কে? তাঁকে দেখে সবাই এভাবে সম্মান করছে কেন? হিশাম থতমত খেয়ে বললেন, ‘আমিও তো চিনি না। ইনি কে?’ সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন আরবি সাহিত্যের উমাইয়া যুগের শ্রেষ্ঠ কবি আল ফারাজদাক। এটি তাঁর কবিনাম; আসল নাম হাম্মাম ইবনে গালিব। তিনি মূলত স্যাটায়ারধর্মী বা বিদ্রূপমূলক কবিতা লিখতেন। আমাদের দেশের কবিয়ালরা যেভাবে তাৎক্ষণিকভাবে মুখে মুখে ছন্দ মিলিয়ে কবিতা বলেন, সেভাবে ফারাজদাক কবিতা বলতেন। সেগুলো পরে লিখে ফেলা হতো। ফারাজদাককে কবি হিসেবে রাষ্ট্রীয় ভাতা দেওয়া হতো। তো, কবি ফারাজদাক হিশামের জবাব শুনে হতভম্ব হয়ে গেলেন। কারণ তিনি জানতেন, হিশাম ‘চিনি না’ বললেও আসলে তিনি তাঁকে খুব ভালোভাবে চেনেন। .সৌদি-হুতি যুদ্ধে বাংলাদেশের শ্রমিক কেন আলোচনার কেন্দ্রে.হুতি যেভাবে ইরানের ‘বিপ্লবী গার্ড’ হয়ে উঠেছে. কবি জানতেন, যুবরাজ হিশাম ঈর্ষা থেকে এ কথা বলেছেন। এটি তাঁকে ক্ষুব্ধ করল। তিনি হিশামকে বিদ্রূপ করে সেখানেই একটি কবিতা উচ্চ স্বরে আওড়াতে শুরু করলেন। কবিতাটা হলো: ‘হা-যাল্লাযি তা ‘রিফুল বাতহা ওয়াতআতাহু, (এই সেই মানুষ, যাঁর পায়ের ছাপ পর্যন্ত চেনে মক্কার জমিন; যাঁর বিষয়ে কবি ফারাজদাক এই কবিতা বললেন, তিনি হলেন ইসলামের চতুর্থ খলিফা আলী (রা.)–এর দৌহিত্র এবং কারবালায় ইয়াজিদ বাহিনীর হাতের শহীদ হওয়া হোসাইন (রা.)–এর ছেলে আলী ইবনে হোসাইন; ইতিহাসে যিনি জয়নুল আবেদিন নামে বেশি পরিচিত। . উমাইয়া রাজবংশের একজন ক্রাউন প্রিন্সকে কটাক্ষ করে কবিতা বলার জন্য ফারাজদাককে যথেষ্ট মাশুল গুনতে হয়েছিল। হিশাম ফারাজদাককে শাস্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। কবির রাষ্ট্রীয় ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হলো এবং তাঁকে মক্কা ও মদিনার মাঝামাঝি উসফান নামের একটি জায়গায় গৃহবন্দী করা হলো। তো, জয়নুল আবেদিনকে হিশামের ‘চিনি না’ বলার পেছনে যে রাজনৈতিক কারণ, তা খুঁজতে আমাদের ৬৮০ সালের ১০ অক্টোবরে ফিরতে হবে। ওই দিন উমাইয়া রাজবংশের দ্বিতীয় শাসক ইয়াজিদ ইবনে মুয়াবিয়ার বাহিনী ইরাকের কারবালায় হোসাইন (রা.)-এর পরিবারের ৭০ জনকে (মতান্তরে ৭২ জন) ভয়াবহ কষ্ট দিয়ে হত্যা করেছিল। তাদের হাত থেকে সেদিন শিশু-নারী-বৃদ্ধ কেউ রেহাই পায়নি। তবে জয়নুল আবেদিন প্রাণে বেঁচে গিয়েছিলেন। ইয়াজিদ তাঁকে হত্যা না করে কোনো ধরনের রাজনীতিতে না জড়ানোর শর্তে মদিনায় পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। ইয়াজিদ যত দিন বেঁচে ছিলেন, তত দিন তিনি জয়নুল আবেদিনের ওপর নজরদারি করেছেন। ইয়াজিদ ৬৮৩ সালে মারা যাওয়ার পর খুব কম সময়ের ব্যবধানে উমাইয়াদের গদিতে পরপর তিনজন শাসকের পরিবর্তন হয়। .সৌদি ও হুতির সামনে এখন যে দুই পথ খোলা রয়েছে.সৌদি শ্রমবাজারে সংকট: সামনে বিকল্প কী. ৭০৫ সালে ওয়ালিদ ইবনে মালিক গদিতে বসলেন। ওয়ালিদ ৭১৫ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় ছিলেন। তাঁর শাসনামলেই কাবাঘরের সামনে হিশাম ইবনে মালিকের সঙ্গে জয়নুল আবেদিনের দেখা এবং ফারাজদুকের কবিতা পড়ার ঘটনা ঘটেছিল। এই ওয়ালিদের শাসনামলেই মদিনায় জয়নুল আবেদিনকে ৭১৩ সালে বিষপ্রয়োগে হত্যা করা হয়। ঐতিহাসিকদের একটি অংশ মনে করেন, এই হত্যার পেছনে মূল পরিকল্পনাকারী ছিলেন যুবরাজ হিশাম। জয়নুল আবেদিন একাধিক স্ত্রী এবং ১১ জন ছেলে ও চারজন মেয়ে রেখে গিয়েছিলেন। এই ১৫ ভাই–বোনের মধ্যে একজনের নাম মুহাম্মদ আল-বাকির ইবনে জয়নুল আবেদিন। আরেকজনের নাম জাইদ ইবনে জয়নুল আবেদিন। এই দুই ভাইয়ের নাম মনে রাখা দরকার। কারণ, এই দুই ভাই থেকেই শিয়াদের দুটি ধারা তৈরি হয়েছে। আজকে ইরানকেন্দ্রিক মূল ধারার যে শিয়া সম্প্রদায় আছে, তাদের বলা হয় বারো ইমামতির শিয়া। তারা বারোজন ইমামে বিশ্বাসী। এ কারণে তারা ‘টুয়েলভার’ নামে পরিচিত। তাদের পঞ্চম ইমাম হলেন এই আল-বাকির ইবনে জয়নুল আবেদিন। আল-বাকিরের পরবর্তী প্রজন্মকে টুয়েলভাররা তাদের পরবর্তী ইমাম হিসেবে নিয়েছে। . অন্যদিকে আল–বাকিরের ভাই জাইদকে ইমাম ধরে নিয়ে যে শিয়া ধারার জন্ম হয়েছে, তারা হলো আজকের ইয়েমেনকেন্দ্রিক জাইদি শিয়া সম্প্রদায়। আজকের সৌদি বনাম ইয়েমেনের হুতি কিংবা সৌদি বনাম ইরান সংঘাতের আদি ও আসল কারণের সঙ্গে এই দুই ভাইয়ের নাম, বিশেষ করে জাইদ ইবনে জয়নুল আবেদিনের নাম গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। আল-বাকিরের ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা, কোরআনের ব্যাখ্যা ও ইসলামি আইনের প্রতি মূল মনোযোগ ছিল। তাঁকে শিয়ারা ইমাম হিসেবে মানেন সেই সময় থেকেই। উমাইয়া শাসনের বিরোধিতা করা শিয়াদের সঙ্গে আল-বাকির সম্পর্ক রাখলেও তিনি কখনো সশস্ত্র অভ্যুত্থানের পথে যাননি। ওদিকে ওয়ালিদের পর এক এক করে আরও তিনজন শাসক বদল হলো। ৭২৪ সালে সিংহাসনে বসলেন কাবাঘরের পাশে কবিতা পড়ার ঘটনার সেই হিশাম ইবনে মালিক। আগের অন্য উমাইয়া শাসকদের মতো হিশামও মদিনার দিকে সতর্ক চোখ রাখছিলেন। বিশেষ করে আল-বাকির এবং তাঁর ভাই জাইদের ওপর নজর রাখছিলেন তিনি। .
. কারণ, উমাইয়াবিরোধী শিয়ারা আল-বাকিরকে তাঁদের ইমাম হিসেবে মানছিলেন। আল–বাকির বিদ্রোহ না করলেও তাঁকে সামনে রেখে উমাইয়াবিরোধীরা বড় আকারে সংগঠিত হয়ে বসতে পারে, এমন ধারণা হিশামের মনে গেঁথে গিয়েছিল। ওই সময়টাতে আল–বাকির রহস্যজনকভাবে ৭৩২ সালে মারা যান। ধারণা করা হয়, হিশাম যেভাবে মদিনার গভর্নরকে নির্দেশ দিয়ে জয়নুল আবেদিনকে বিষপ্রয়োগে হত্যা করেছিলেন, ঠিক একইভাবে তাঁর ছেলে আল–বাকিরকেও বিষপ্রয়োগে হত্যা করেন। আল–বাকির তাঁর প্রজ্ঞা ও পাণ্ডিত্যের জন্য যেমন জনপ্রিয় ছিলেন, তাঁর সৎভাই জাইদ ইবনে জয়নুল আবেদিনও তেমনি বিচক্ষণতার জন্য খ্যাতিমান হয়ে উঠেছিলেন। জাইদের মা ছিলেন আমাদের ভারতবর্ষের সিন্ধু এলাকার। তাঁর নাম জাইদা আল-সিন্দিয়া। জাইদ মদিনাতে বড় হয়েছেন। টানা ১৩ বছর কোরআন নিয়ে গবেষণা করেন। একসময় তাঁর মনে হলো, উমাইয়াদের জুলুমের বিরুদ্ধে যদি তিনি মুখ না খোলেন, তাহলে তিনি গুনাহগার হবেন। তবে তিনি সরাসরি উমাইয়াদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ না করে বিভিন্ন স্থানে গিয়ে কোরআনের আলোকে সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত, তা নিয়ে বক্তব্য দিতে লাগলেন। . জাইদের মতে, একজন সত্যিকারের নেতা বা ইমাম হবেন তিনি, যাঁর কাছে ইলম (জ্ঞান), তাকওয়া (আল্লাহভীতি) ও নেতৃত্বের সাহস আছে। তাঁর দর্শন হলো, শাসক যদি জালিম হয়, তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে তলোয়ার ওঠাতে হবে। তাঁর প্রধান ভাষ্য হলো, জুলুমের সামনে চুপ থাকা কবিরা গুনাহ। এটিই পরবর্তী সময়ে জাইদি শিয়াদের মূল দর্শন হয়ে ওঠে। জাইদের এই প্রচারের খবর গেল হিশামের কানে। তিনি জাইদকে দামেস্কে তলব করলেন। জাইদকে তিনি অপমান–অপদস্থ করলেন এবং তাঁকে মদিনায় না ফিরে ইরাকে গিয়ে থাকতে বললেন। জাইদ প্রথমে ইরাকে, সেখান থেকে কুফায় যান। ৭৪০ সাল। কুফার বাসিন্দারা দলে দলে জাইদের হাতে বায়াত নিলেন। তাঁরা উমাইয়া শাসন থেকে মুক্ত হয়ে মদিনায় খোলাফায়ে রাশেদিনের খেলাফত রাষ্ট্র ফিরিয়ে আনার জন্য একটি সশস্ত্র আন্দোলনের প্রস্তুতি নিতে শুরু করলেন। তাদের সংখ্যা ছিল ৪০ হাজার। খবর শুনে হিশাম খেপে গেলেন। . তিনি ইরাকের গভর্নর ইউসুফ বিন আমরকে বিদ্রোহ মাথাচাড়া দেওয়ার আগেই তাদের দমন করতে বললেন। ইউসুফ বিন আমর কুফার গভর্নরকে জাইদের লোকদের বিরুদ্ধে অভিযান চালাতে বললেন। কুফার গভর্নরের সামরিক বাহিনী ধেয়ে আসতে লাগল। এই দেখে জাইদকে সমর্থন করা ৪০ হাজার লোকের প্রায় সবাই তাঁকে ছেড়ে গেলেন। জাইদের সঙ্গে থাকলেন মাত্র ২১৮ জন লোক। তাঁদের নিয়েই জাইদ লড়াই চালালেন। স্বাভাবিকভাবেই বিরাট উমাইয়া বাহিনীর কাছে তাঁরা পরাস্ত হলেন। একটি তির জাইদের কপালে ঢুকে গেল। তিরটি বের করার পর তাঁর মৃত্যু হলো। জাইদের অনুসারীদের আশঙ্কা ছিল, উমাইয়া কর্তৃপক্ষ তাঁর লাশের অবমাননা করবে। তাই তাঁরা তাঁর দেহ গোপনে দাফন করলেন। কিন্তু পরদিনই উমাইয়া বাহিনী কবরটি খুঁজে বের করে। তারা লাশ তুলে মাথা কেটে মাথাটি খলিফা হিশামের কাছে দামেস্কে পাঠিয়ে দেয়। সেখানে মাথাটি জনসমক্ষে প্রদর্শন করা হয়। .সৌদি যুবরাজকে আবারও কেন হতাশ করলেন ট্রাম্প.হুতিদের হামলায় বিপর্যস্ত সৌদি এখন কী করতে পারে. জাইদির সমর্থকদের মনে ভয় ধরানোর জন্য পরে মাথাটি মদিনায় পাঠানো হয় এবং সেখানেও প্রদর্শন করা হয়। জাইদের মুণ্ডুহীন দেহ একটি ক্রুশে বিদ্ধ করে সেটি কুফার আল-কুনাসা নামের এলাকায় টাঙিয়ে রাখা হয়। এর মধ্য দিয়ে উমাইয়া প্রশাসন শুধু জাইদকে শাস্তি দেয়নি; তাঁর স্মৃতি ধ্বংস ও তাঁর নামে নতুন বিদ্রোহের সম্ভাবনাকেও দমন করার চেষ্টা করেছিল। হিশাম ৭৪৩ সালে মারা যাওয়ার পর খলিফা হন দ্বিতীয় আল-ওয়ালিদ। তাঁর নির্দেশে কুনাসায় ঝুলিয়ে রাখা জাইদের কঙ্কাল নামিয়ে সেটি পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং ছাই ফোরাত নদীতে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। কুফায় জাইদ শহীদ হওয়ার পর তাঁর অনুসারীদের ধরে মেরে ফেলার জন্য উমাইয়ারা অভিযান চালিয়ে যাচ্ছিল। প্রাণে বাঁচতে তাঁর অনুসারীরা আজকের যে সৌদি আরব, তার সর্বদক্ষিণ দিকে পালাতে থাকেন। সর্বদক্ষিণে হলো ইয়েমেন। দক্ষিণে এডেন সাগরের পাড়ে ইয়েমেন। তবে জাইদিরা উত্তের ইয়েমেনের পাহাড়ি এলাকায় বসতি শুরু করলেন। . জাইদের অনুসারীরা ইয়েমেন ছাড়াও ইরানেও ছড়িয়ে–ছিটিয়ে যায়। তবে তাদের মূল বসতি গড়ে ওঠে ইয়েমেনের সা’দা এলাকায়। সা’দা এলাকাটি দুর্গম পাহাড় পর্বতে ঘেরা। তবে এর মধ্যে বিস্তীর্ণ উপত্যকায় উর্বর সমতল ভূমিও আছে। এলাকাটি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১৮০০ মিটার উঁচুতে। এত উঁচুতে হওয়ার কারণে এখানকার তাপমাত্রা আরবের মরুভূমির মতো না। এখানে তাপমাত্রা খুবই বসবাসবান্ধব। এখানে আঙুর, ডালিম, পিচ, এপ্রিকট ও ডুমুরের চাষ হয়। পশুপালনও এখানকার ঐতিহ্যগত জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ইয়েমেনে কয়েক হাজার বছর ধরে মানুষের বাস ছিল। প্রাচীনকালে এটি ছিল সমৃদ্ধ অঞ্চল। রোমানরা এই এলাকাকে বলত, ‘অ্যারাবিয়া ফেলিক্স’ বা ‘সুখী-সমৃদ্ধ আরব’। পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত সাবা, মারিবের বাঁধ, আসহাবুল উখদুদ ও আবরাহার ঘটনা এই অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত। মদিনায় আউস ও খাজরাজ নামের যে দুটি গোত্র মহানবী (সা.)-কে স্বাগত জানিয়েছিল, সেই আনসারদের মূল শিকড়ও ছিল ইয়েমেনে। ইউনেসকোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টার এই জনবসতিকে প্রাগৈতিহাসিক সভ্যতা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। জাইদের মৃত্যুর পর আস্তে আস্তে তাঁর অনুসারীরা ইয়েমেনসহ আশপাশের স্থানে জাইদি শিয়া মতাদর্শ প্রচার করতে থাকে। এরাই জাইদি শিয়া নামে পরিচিত হয়ে ওঠে। . জাইদি শিয়া মতবাদের মূলনীতি ছয়টি: ১. মুসলিম উম্মাহর নেতৃত্বের বিশেষ অধিকার মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর পরিবার বা আহলুল বাইতের। বিশেষত আলী ইবনে আবি তালিব ও ফাতেমার বংশধরদের মধ্যে যাঁরা হাসান বা হোসাইনের বংশধর, তাঁরা ইমাম হওয়ার যোগ্য হতে পারেন। তবে প্রত্যেক বংশধর স্বয়ংক্রিয়ভাবে ইমাম হন না। ধর্মীয় জ্ঞান, ন্যায়পরায়ণতা, সাহস ও নেতৃত্বের যোগ্যতাও থাকতে হয়। ২. শাসক যদি জালিম হয়ে ওঠেন তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানো অবশ্যকর্তব্য। অর্থাৎ যোগ্য ইমামকে শুধু নবী পরিবারের বংশধর হলেই হবে না; তাঁকে জালিম শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নিতে হয়। ৩. ইমাম নিষ্পাপ বা ভুলের ঊর্ধ্বে নন। অর্থাৎ জাইদিরা বারো ইমামি শিয়াদের মতো ইমামদের নিষ্পাপ বলে মনে করেন না। ৪. যুক্তিবাদী ধর্মতত্ত্ব। জাইদি ধর্মতত্ত্বের বড় একটি অংশ মুতাজিলা চিন্তাধারার সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁরা মনে করেন, মানুষের ইচ্ছাকে স্বাধীন করা হয়েছে এবং তাঁরা নিজের কাজের জন্য নৈতিক দায়বদ্ধ। ৫. সুন্নি ইসলামের সঙ্গে সাদৃশ্য। জাইদিরা শিয়া হলেও তাঁদের ধর্মীয় আইনচর্চা ও কিছু বিশ্বাস সুন্নি ইসলামের কাছাকাছি। তাঁরা নবী পরিবারের প্রতি বিশেষ আনুগত্য রাখেন, কিন্তু বারো ইমামি শিয়াদের মতো ইমামদের ঐশীভাবে মনোনীত ও নিষ্পাপ বলে মানেন না। ধর্মীয় বিধান নির্ধারণে কোরআন, নবীর সুন্নাহ, আলী ও নবী পরিবারের শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেন। ৬. জাইদিদের কিছু স্বতন্ত্র ধর্মীয় রীতি রয়েছে। যেমন তাঁদের প্রচলিত আজানে ‘হাইয়া আলা খাইরিল আমাল’—অর্থাৎ ‘সর্বোত্তম কাজের দিকে এসো’ বাক্যটি উচ্চারিত হয়। নামাজে অনেক জাইদি হাত পাশে রাখেন এবং সুরা ফাতিহা শেষে ‘আমিন’ বলেন না। তবে অঞ্চল ও সম্প্রদায়ভেদে আচারে কিছু পার্থক্য থাকতে পারে। .সৌদি বিমানবন্দরে হুতিদের ভয়াবহ হামলা, যুক্তরাষ্ট্র এখন কী করবে.হুতি–সৌদি যুদ্ধে কেন মিসর জড়িয়ে পড়ছে. জাইদি শিয়ারা সা’দায় আসার পর দেড় শ বছর পার হয়েছে। উমাইয়াদের খেলাফত বহু আগে (৭৫০ সালে) অস্ত গেছে। আব্বাসীয়রা শাসকের গদিতে বসেছেন। উমাইয়াদের হটানোর আন্দোলনে আব্বাসীয়রা নবী পরিবারের প্রতি সমর্থন এবং আহলুল বাইতের মর্যাদা রক্ষার স্লোগান ব্যবহার করেছিলেন। এর ফলে সে সময় তাঁদের সমর্থন করেছিল জাইদিরা। কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর আব্বাসীয় খলিফারা খেলাফতের কর্তৃত্ব উমাইয়াদের মতো নিজেদের পরিবারের হাতে নিয়ে নেন। কিন্তু জাইদি রাজনৈতিক চিন্তায় নেতৃত্বের অধিকার ছিল আলী (রা.) ও ফাতেমার বংশধরদের মধ্যে যোগ্য কোনো ব্যক্তির। ফলে আব্বাসীয়দের বংশগত খেলাফত এবং জাইদি ইমামতের ধারণার মধ্যে মৌলিক রাজনৈতিক বিরোধ তৈরি হয়। এতে আব্বাসীয়রাও উমাইয়াদের মতো জাইদিদের দমন করতে থাকে। এভাবে দেড় শ বছর পার হলো। তত দিনে সা’দায় জাইদিরা শক্ত ঘাঁটি গড়ে তুলেছেন। কিন্তু সমস্যা হলো, তাঁদের মধ্যে এমন কোনো নেতা ছিলেন না, যাঁকে সবাই বিনা বাক্যে মেনে নেবেন। .সৌদি আরব যা পারে, আমরা কেন পারি না.সৌদি-আমিরাত ক্ষমতার লড়াই বদলে দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যকে. এতে নিজেদের মধ্যে হানাহানি লেগেই ছিল। এই সমস্যা থেকে মুক্তির জন্য তাঁরা চাচ্ছিলেন এমন একজন নেতা, যাঁকে সবাই ইমাম হিসেবে মেনে নেবেন। আর নবী পরিবারের বাইরে সেই নেতা কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হবে না। সেই নেতা হিসেবে তাঁরা মেনে নিলেন যাঁকে, তিনি হলেন ইমাম ইয়াহইয়া ইবনে আল-হোসাইন। তিনি হাসান (রা.)-এর বংশধর। তিনি ধর্মীয় জ্ঞানের দিক থেকে উচ্চতর পণ্ডিত ছিলেন। তিনি তখন মদিনায় ছিলেন। সা’দার গোত্রগুলোর মধ্যে বিরোধ মীমাংসার জন্য তাঁকে স্থানীয় গোত্রগুলোর পক্ষ থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়। ৮৯৫ সালে তিনি সা’দায় এসে সেখানে থেকে জাইদি ইমামতের ভিত্তি গড়ে তোলেন। তাঁর উপাধি হয় ‘আল-হাদি ইলাল হক’, অর্থাৎ ‘সত্যের পথে পথপ্রদর্শক’। হাদি ইলাল হক ফতোয়া দেন: জাইদিদের ইমাম হবেন সেই ব্যক্তি যাঁর মধ্যে তিনটি বৈশিষ্ট্য আছে। ১. আলী (রা.) ও ফাতেমার বংশধর হতে হবে। সেটি হাসান বা হোসাইনের বংশের হতে পারে। . ২. তাঁকে কোরআনের বড় আলেম হতে হবে। ৩. জুলুমের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার সাহস থাকতে হবে। এই নীতি মেনেই ইয়েমেনে জাইদি ইমামতির শাসন চলে আসছিল। কালের পরিক্রমায় উসমানীয় খেলাফত চলে এল। উসমানীয়রা ইয়েমেনের বড় অংশ দখল করে ফেলল। কিন্তু জাইদি রাজনৈতিক চিন্তায় তাঁদের বিবেচনায় যিনি জালিম শাসক, তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর ধারণার ঐতিহাসিক ভিত্তি আগে থেকেই ছিল। যেহেতু জাইদি মতবাদের গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো খুরুজ বা অন্যায় শাসনের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ বা বিদ্রোহ, তাই তারা বিদ্রোহ চালিয়ে যাচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত জাইদিরা ১৬৩৫ সালে উসমানীয়দের ইয়েমেন থেকে বিতাড়িত করে নিজেদের ইমামত প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। উসমানীয় বাহিনী বিতাড়িত হওয়ার পর সেখানে জাইদিরা কাসিমি বংশের ইমামত প্রতিষ্ঠিত করল। তেমন কোনো সংঘাত ও হানাহানি ছাড়াই স্বাধীনভাবে কাটল আরও প্রায় এক শ বছর। এ সময়টাতে তারা সেখানে যথেষ্ট শক্তিশালী অবস্থান গড়ে তুলল। .
. ওদিকে হেজাজে (আজকের সৌদি আরব) তখন অন্য ছবি। সেখানে তখন উসমানীয়দের গভর্নরের শাসন চলছে। তবে সেখানেও বিদ্রোহের ঢোল বেজে উঠছিল। আর সেই ঢোলে বাড়ি মারছিলেন দুজন লোক। একজনের নাম মুহাম্মদ বিন সৌদ। অন্যজনের নাম মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব নাজদি ইবনে সুলাইমান আত-তামিমি (১৭০৩-১৭৯২)। মুহাম্মদ বিন সৌদ রিয়াদের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় উপকণ্ঠের দিরিয়াহ এলাকার আমির ছিলেন। ১৭২৭ সালে আমির পদে বসেছিলেন তিনি। মুহাম্মদ বিন সৌদ যখন আমির, তখন আরবের বিরাট অংশের দখল ছিল উসমানীয় সালতানাতের হাতে। তবে কিছু কিছু এলাকা দুর্গম হওয়ায় সেগুলো উসমানীয়দের দখলমুক্ত ছিল। এর মধ্যে দিরিয়াহও ছিল। উসমানীয়রা মূলত হানাফি মাজহাবের অনুসারী ও কিছুটা সুফি ঘরানার ছিলেন। তাঁরা মক্কা ও মদিনার ধর্মীয় বিষয়গুলোয় চার সুন্নি মাজহাবকেই (হানাফি, মালিকি, শাফিই, হাম্বলি) সরকারি স্বীকৃতি দিতেন। উসমানীয়দের এই ধর্মীয় আকিদার বিরোধিতা করে ওই সময় প্রচার চালানো শুরু করলেন মধ্য আরবের নাজদ অঞ্চলের ধর্মীয় নেতা ও সংস্কারক মুহাম্মদ ইবনে আবদুল ওয়াহাব। . বর্তমানে সৌদি আরবের সরকারি ধর্মীয় মতবাদ যে ওয়াহাবি ধারার, তিনি সেই ওয়াহাবি আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা। তাঁর সমর্থকেরা তাঁকে ইসলামের বিশুদ্ধ তাওহিদ পুনঃপ্রতিষ্ঠাকারী মনে করেন। তো, আবদুল ওয়াহাবের নতুন মতবাদ প্রচারের কথা উসমানীয় শাসকদের কানে যেতেই তাঁরা তাঁর বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করলেন। গ্রেপ্তার এড়াতে ওয়াহাব দিরিয়াহর আমির মুহাম্মদ বিন সৌদের কাছে গিয়ে আশ্রয় চাইলেন। মুহাম্মদ বিন সৌদ তাঁকে শুধু আশ্রয় দিলেন না, নিজের ছেলে আবদুল আজিজ বিন মুহাম্মদের সঙ্গে ওয়াহাবের মেয়ে আমিনা বিনতে ওয়াহাবের বিয়ে দিয়ে দিলেন। দুই ‘মুহাম্মদ’ বেয়াই হয়ে গেলেন। ‘দিরিয়াহ চুক্তি’ নামের একটি চুক্তির মধ্য দিয়ে দুই বেয়াই ১৭৪৪ সালে (মতান্তরে ১৭৪৫ সালে) একটি জোট গড়ে তুললেন। ঠিক হলো, নতুন এই শাসনব্যবস্থার প্রশাসনিক ও সামরিক দিকটি দেখবে সৌদি বংশ; আর ধর্মীয় ও সামাজিক অনুশাসনের বিষয়গুলো দেখবে ওয়াহাবি বংশ। একদিকে ওয়াহাবিদের ধর্মীয় খানদান, আরেক দিকে সৌদিদের সামরিক খানদান। দুই খানদান মিলে আজকের রিয়াদকেন্দ্রিক দিরিয়াহতে এক মজবুত আমিরাত কায়েম করল। এই শাসনই ‘প্রথম সৌদি রাষ্ট্র’। . কায়রোর আমেরিকান বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট আহমদ দাল্লাল তাঁর গবেষণাপত্র ‘দ্য অরিজিনস অ্যান্ড অবজেক্টিভস অব ইসলামিক রিভাইভালিস্ট থট (১৭৫০-১৮৫০)’-এ ইবনে আবদুল ওয়াহাবের রাজনৈতিক চিন্তা বিশ্লেষণ করেছেন। সেখানে দাল্লাল লিখেছেন, ইবনে আবদুল ওয়াহাব শাসকদের বাড়াবাড়ি বা অন্যায়ের ক্ষেত্রে তাঁদের সরাসরি বিরোধিতা না করে তাঁদের নম্রভাবে উপদেশ দেওয়ার কথা বলেছেন। শাসক সেই উপদেশ না শুনলে তাঁর অন্যায় ধৈর্যের সঙ্গে সহ্য করার অবস্থানও তাঁর চিন্তায় দেখা যায়। সৌদি-ওয়াহাবিরা ‘দিরিয়াহ আমিরাত’ নামের মজবুত হুকুমত কায়েম করতে পারলেও উসমানীয় খেলাফতের সামনে তাঁদের তেমন কোনো ক্ষমতাই ছিল না। তবু তাঁরা আস্তে আস্তে সীমানা বাড়াচ্ছিলেন। প্রথমে তাঁরা নাজদ দখল করলেন। এরপর তাঁরা পূর্বাঞ্চলীয় উপকূল দখল করেন। এর দৈর্ঘ্য ছিল কুয়েত থেকে ওমানের উত্তর সীমানা পর্যন্ত। এ ছাড়া তাঁরা ইয়েমেন সীমান্তের কাছাকাছি এলাকা আসিরের উচ্চভূমিও দখল করে ফেলল। এর মধ্য দিয়ে সৌদ ও ওয়াহাবি পরিবার আরবের প্রধান সার্বভৌম শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করল। দিরিয়াহ আমিরাতের সীমানা বাড়িয়ে মুহাম্মদ বিন সৌদ ১৭৬৫ সালে মারা গেলেন। . ১৯১৪ সাল। ২৮ জুলাই শুরু হলো প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। এই যুদ্ধে মূলত দুটি ভাগ ছিল। এক ভাগে ছিল অ্যালাইড বা মিত্রশক্তি। আরেক ভাগে সেন্ট্রাল বা কেন্দ্রীয় শক্তি। মিত্রশক্তিতে ছিল ব্রিটেন, রাশিয়া, ফ্রান্স ও সার্বিয়া। আর কেন্দ্রীয় শক্তির শিবিরে ছিল জার্মানি, অস্ট্রীয় হাঙ্গেরি ও উসমানীয় সাম্রাজ্য। এ যুদ্ধে সবচেয়ে বড় লড়াই হচ্ছিল ব্রিটিশ এম্পায়ার আর উসমানীয় সালতানাতের মধ্যে। আরবের বেশির ভাগ গোত্র ও সম্প্রদায় উসমানীয় শাসকদের সমর্থক ছিল। আর ব্রিটিশরা ভালোমতোই জানত যতক্ষণ পর্যন্ত আরবরা উসমানীয়দের পক্ষে থাকবে ততক্ষণ উসমানীয় সালতানাতকে উৎখাত করা সম্ভব হবে না। ব্রিটিশরা ভাবতে লাগল কী করে উসমানীয় সালতানাতের বিরুদ্ধে আরবদের খেপিয়ে তোলা যায়। এটি খুব সহজ কাজ ছিল না। এই কাজের জন্য ব্রিটিশদের এমন একজন আরব নেতার দরকার ছিল, যাঁর কথা আরবরা সহজেই মেনে নেবে। অবশেষে ব্রিটিশরা সেই নেতাকে পেয়ে গেল। তাঁর নাম হুসেইন ইবনে আলী। তিনি ছিলেন মক্কার ঐতিহ্যবাহী হাশেমি বংশের লোক ও মহানবী (সা.)-এর বংশধর। . যেহেতু তাঁরা আহালুল বাইত বা নবী পরিবারের ছিলেন, সেহেতু মহানবী (সা.)-এর সম্মানে এই পরিবারের সদস্যরা সেই আব্বাসীয় আমল থেকে প্রায় ৭০০ বছর ধরে মক্কার ‘শরিফ’ বা গভর্নর হয়ে আসছিলেন। সেই সুবাদে হুসেইন উসমানীয় খেলাফতের অধীন মক্কার ‘শরিফ’ হিসেবে নিয়োজিত ছিলেন। এ কারণে ইতিহাসে তিনি মূলত ‘শরিফ হুসেইন’ নামে বেশি পরিচিত। এই পরিবারকে গোটা আরবের মানুষ সম্ভ্রমের চোখে দেখত। তাই শরিফ হুসেইনকেই ব্রিটিশরা দাবার ঘুঁটি হিসেবে বেছে নিল। ব্রিটিশরা শরিফ হুসেইনকে বলল, তিনি যদি উসমানীয় খেলাফতের বিরুদ্ধে ব্রিটিশদের সহযোগিতা করেন, তাহলে উসমানীয়দের হটিয়ে তাঁকে পুরো জাজিরাতুল আরব, অর্থাৎ আরব উপদ্বীপ, শাম ও ইরাকের স্বাধীন খলিফা বানানো হবে। অন্যদিকে ব্রিটিশরা ১৯১৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর নজদ ও আল-আহসা অঞ্চলের শাসক আবদুল আজিজ ইবনে সৌদের সঙ্গে একটি চুক্তি করে ফেলেন। এই চুক্তির নাম দারিন চুক্তি। এই চুক্তি অনুযায়ী, ব্রিটিশ সরকার আবদুল আজিজকে উসমানীয়দের বিরুদ্ধে লড়তে আর্থিক সহায়তা ও অস্ত্র দেওয়ার ব্যবস্থা করল। আরবরা ব্রিটিশদের সহযোগিতা করায় ১৯১৬ সালে উসমানীয় সাম্রাজ্য ভেঙে যেতে শুরু করল। . ১৯১৮ সাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলো। আরব ভূমি উসমানীয়দের হাতছাড়া হলো। কিন্তু ব্রিটিশ ও ফরাসিরা শরিফ হুসেইনকে প্রতিশ্রুতি মাফিক ভূমি না দিয়ে ম্যান্ডেট সিস্টেম চালু করল। শরিফ হুসেইন তখনো মক্কা ও মদিনা তথা হেজাজের শাসক। তিনি ক্ষুব্ধ হলেন। ১৯২৪ সালের মার্চে তুরস্কে মুস্তাফা কামাল পাশা উসমানীয় খেলাফত বিলুপ্ত করলেন। কোনো খলিফা না থাকায় মুসলিম বিশ্ব নেতৃত্বশূন্য হলো। তখনই শরিফ হুসেইন নিজেকে আরব বিশ্বের ‘খলিফা’ ও ‘মুসলিম বিশ্বের স্বাধীন শাসক’ হিসেবে ঘোষণা দিলেন। তাঁর ধারণা ছিল তিনি যেহেতু মহানবী (সা.)-এর বংশধর, সেহেতু মুসলিম নেতারা তাঁকে খলিফা মানবেন। কিন্তু তা হলো না। অনেক আরব নেতা তাঁকে সমর্থন দিলেন না। নিজেকে স্বাধীন খলিফা বলে ঘোষণা দেওয়ায় ব্রিটিশ সরকার শরিফ হুসেইনের ওপর রেগে গেল। তারা শরিফ হুসেইনকে সরিয়ে সেখানে আবদুল আজিজ বিন সৌদকে বসানোর পরিকল্পনা করল। ব্রিটিশদের সহযোগিতা নিয়ে আবদুল আজিজ ১৯২৪ সালের সেপ্টেম্বরে মক্কা দখলে অভিযান চালালেন। তাঁর বিশাল সৌদি বাহিনীর সামনে টিকতে না পেরে শরিফ হুসেইন শাসনভার নিজের ছেলে আলী বিন হুসেইনের হাতে দিয়ে হেজাজ ছেড়ে সাইপ্রাসে চলে গেলেন। . মক্কা-মদিনা ও জেদ্দা দখলের পর আবদুল আজিজ ১৯২৬ সালে নিজেকে হেজাজ ও নাজদের আমির ঘোষণা করলেন। এবার আবদুল আজিজ আবার ব্রিটিশ সরকারের সঙ্গে চুক্তি করলেন। ১৯২৭ সালের ২০ মে সই করা ওই চুক্তির নাম জেদ্দা চুক্তি। এরপর ১৯৩২ সালে তিনি হেজাজ ও নাজদ—এ দুই এলাকা এক করে নতুন এক রাজত্ব প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলেন। এই রাজত্বের নাম ‘আল-মামলাকা আল-আরবিয়া আস-সৌদিয়া’ বা আজকের ‘কিংডম অব সৌদি অ্যারাবিয়া’। জেদ্দা চুক্তির মধ্য দিয়ে বাদশাহ আবদুল আজিজকে ব্রিটিশ এম্পায়ারের দিক থেকে অনেকেটা এভাবে বলে দেওয়া হলো, আরব ভূমির বাদশাহ আপনিই থাকবেন। এখানকার সব মুসলমান জনগোষ্ঠীর ভালোমন্দের বিচার আপনারাই করবেন। এখানকার দালানকোঠা, কলকারখানা, ইমারত, সেতু—সব আপনারাই বানাবেন। লোকে জানবে আরবের বাদশাহ আপনারাই। আপনারা তাদের ওপর পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে থাকবেন। কিন্তু আরবের সমস্ত সেনাবাহিনী এবং ডিফেন্স সিস্টেম থাকবে ব্রিটিশ এম্পায়ারের হাতে। .ট্রাম্পের ইরান আক্রমণে কেন বাধা দিচ্ছে সৌদি আরব.সৌদি আরব ও ইরান দুই পক্ষকেই কীভাবে কাছে রাখছে চীন?. মানে, ব্রিটিশের অনুমতি ছাড়া আরব শাসকদের বাহিনী কিছু করতে পারবে না। এ কথায় আবদুল আজিজসহ অন্য আরব শাসকদের সায় না দিয়ে উপায় ছিল না। ফলে আরব বিশ্বে ব্রিটিশদের পরোক্ষ শাসন জারি হলো। একটার পর একটা ব্রিটিশ ঘাঁটি গড়ে উঠতে লাগল। (এ বিষয়ে মার্কিন ঘাঁটির নিরাপত্তাচাদর ফালাফালা, বাদশাহ-আমিরদের কী হবে শিরোনামে এই লেখকের একটি দীর্ঘ লেখায় বিশদে আলোচনা করা হয়েছে।) সৌদি সরকারের এসব ঘাঁটির দরকারও ছিল। কারণ তত দিনে, অর্থাৎ ১৯৩৮ সালে দাম্মাম ৭ নম্বর কূপে বিপুল পরিমাণে তেল পাওয়া গেছে। ‘প্রসপারিটি ওয়েল’ বা ‘সমৃদ্ধির কূপ’ নামের এই কূপ থেকে তোলা তেল রপ্তানির মধ্য দিয়ে বিশ্বের একজন দরিদ্র বাদশাহ থেকে আবদুল আজিজ রাতারাতি মহাধনী হয়ে উঠলেন। ১৯৬০-এর দশকে উপসাগরীয় অঞ্চলে জাতীয়তাবাদী আন্দোলন জোরালো হওয়ায় ব্রিটেনের পক্ষে ঘাঁটি ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ল। . শেষ পর্যন্ত ১৯৬৮ সালে ব্রিটিশ সরকার উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তাদের সামরিক ঘাঁটি তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিল। সেখানে দ্বিপক্ষীয় চুক্তির মাধ্যমে সেই জায়গায় চলে এল মার্কিন সেনা। তারা ভাবল ব্রিটিশরা যেভাবে ঘাঁটিগুলোতে সেনা মোতায়েন করে গোটা আরবকে হাতের মুঠোয় রেখেছিল, আরবকে তার চেয়ে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য তাদের আরও বড় স্থাপনা এবং আরও বেশি সেনা মোতায়েন দরকার। তারা তা–ই করল। তেল রপ্তানির মধ্য দিয়ে বন্যার মতো পেট্রোডলার আসতে লাগল। সাধারণ সৌদিদের হাতে প্রচুর পয়সা আসতে লাগল। পশ্চিমা ভোগবিলাসে তারা অভ্যস্ত হতে লাগল। এর সঙ্গে পশ্চিমা দেশে তাদের পড়াশোনার আগ্রহও বাড়ল। শাসকশ্রেণি দেখল এটি জনগণের মনে ব্যক্তিস্বাধীনতার বোধের জন্ম দিচ্ছে। তাঁরা ভাবলেন, এই ব্যক্তিস্বাধীনতার বোধ তাদের মধ্যে গণতন্ত্রের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলতে পারে। সেটি রাজতন্ত্রকে হুমকির মধ্যে ফেলে দেবে। সেই জায়গা থেকে ওয়াহাবি মতাদর্শের ব্যাপক প্রচার চালানো হয়। . এই মতবাদের কেন্দ্রীয় নীতি হলো তাওহিদ বা আল্লাহর একত্ববাদ। ওয়াহাবি মতানুসারে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা বা এমন কোনো ধর্মীয় আচারে অংশ নেওয়া, যা তাঁদের ব্যাখ্যায় আল্লাহর একত্বের পরিপন্থী, গুরুতর অপরাধ। কবর বা মাজারে গিয়ে মৃত ব্যক্তির কাছে সাহায্য চাওয়া, পীর-আউলিয়ার কাছে প্রার্থনা করা কিংবা তাঁদের অতিপ্রাকৃত ক্ষমতার অধিকারী মনে করাকে তাঁরা শিরক মনে করেন। ওয়াহাবি মতবাদের সঙ্গে ঐতিহাসিকভাবে যুক্ত সুন্নি রাজনৈতিক চিন্তার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধারা হলো মুসলিম শাসকের প্রতি আনুগত্য এবং বিশৃঙ্খলা বা গৃহযুদ্ধ সৃষ্টিকারী বিদ্রোহ এড়িয়ে চলা। এ দৃষ্টিভঙ্গিতে শাসক অন্যায় করলেও তাঁর বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহকে অনেক আলেম অনুচিত মনে করেন। তবে আনুগত্যেরও সীমা আছে: আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কাজে আনুগত্য করা যাবে না। এখানে একটি ঐতিহাসিক পার্থক্য মনে রাখা দরকার। শাসকের আনুগত্যের ধারণাটি শুধু ওয়াহাবি মতবাদের নিজস্ব উদ্ভাবন নয়; সুন্নি রাজনৈতিক চিন্তায় এর পুরোনো ভিত্তি রয়েছে। . কিন্তু সৌদ পরিবারের সঙ্গে ওয়াহাবি ধর্মীয় নেতৃত্বের জোটের ফলে এই নীতি সৌদি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক বৈধতা রক্ষায় বিশেষ ভূমিকা পেয়েছে। এখানে ধর্মীয় নেতৃত্ব শাসনব্যবস্থাকে সমর্থন করেছে, আর সৌদ পরিবার ওয়াহাবি ধর্মীয় মতাদর্শের প্রসারে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও পৃষ্ঠপোষকতা দিয়েছে। সৌদি আরবের প্রখ্যাত সালাফি আলেম ও দেশটির সাবেক প্রধান মুফতি শায়খ আবদুল আজিজ ইবনে বায (১৯১০-১৯৯৯) শাসকের আনুগত্য, শাসকের অন্যায়ের প্রতিবাদ এবং প্রকাশ্যে শাসকের সমালোচনা নিয়ে একাধিক ফতোয়া দিয়েছেন। তাঁর বক্তব্যের মূল কথা ছিল—শাসক অন্যায় করলেও তাঁর বিরুদ্ধে সশস্ত্র বিদ্রোহ করা যাবে না; তবে অন্যায় কাজে শাসকের আনুগত্যও করা যাবে না, আর শাসককে সংশোধনের জন্য উপদেশ দিতে হবে। এই ভাষ্য সৌদি সরকারের দিক থেকে দেশের ভেতরে ও বাইরে ব্যাপকভাবে প্রচার করা হয়। সাধারণ সৌদি নাগরিকদের প্রতি এই মতাদর্শের প্রধান রাজনৈতিক বার্তা হলো, শাসকের সমালোচনা করা যাবে না। আর শাসকের প্রতি এই মতাদর্শের বার্তা হলো, সাধারণ জনগণের কোনো সমালোচনা বা বিদ্রোহের লেশমাত্র সহ্য করা যাবে না। . গত বছরের সেপ্টেম্বরে গাজায় ইসরায়েলের হামলায় নিহত লোকের সংখ্যা যখন ৬২ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল; যখন সেখানে খাবার, পানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি সব বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল; যে মুহূর্তে সেখানে না খেয়ে থাকা শিশু রুটি চাইতে চাইতে মায়ের কোলে নেতিয়ে পড়ে মরে যাচ্ছিল; যে মুহূর্তে গোটা গাজা মৃত্যুযন্ত্রণায় চিৎকার করছিল; সে মুহূর্তে আমেরিকান ও ব্রিটিশসহ বিভিন্ন দেশের কৌতুকশিল্পীদের নিয়ে ২৬ সেপ্টেম্বর রিয়াদে শুরু হয়েছিল এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় কৌতুক উৎসব ‘রিয়াদ কমেডি ফেস্টিভ্যাল’। এর আগে এপ্রিলে যখন গাজায় ভয়াবহ আক্রমণ চলছিল, তখন ১৯ এপ্রিল সৌদি আরবের জেদ্দার কর্নিশ সার্কিটে অনুষ্ঠিত ফর্মুলা ১ গ্রাঁ প্রি ইভেন্টের অংশ হিসেবে মার্কিন পপ তারকা জেনিফার লোপেজ একটি কনসার্টে পারফর্ম করছিলেন। তারও আগে মোহাম্মাদ বিন সালমানের সমালোচনা করে লেখালেখি করা সাংবাদিক জামাল খাসোগিকে কেটে টুকরা টুকরা করার বিষয়ে অকাট্য প্রমাণ সামনে এসেছিল। কিন্তু বিশ্বের কোথাও কোনো সালাফি মতাবলম্বী আলেম সে বিষয় ধরে সৌদি শাসকদের কোনো সমালোচনা করেছেন বলে শুনিনি। সেখানকার শাসক পরিবারের কোনো ভোগবিলাস বা অন্যায়ের কোনো সমালোচনা তাঁরা করেন না। এই শাসকদের যে কোনো অন্যায়ের সমালোচনাকে তাঁরা সরাসরি মক্কা–মদিনা তথা ইসলামের ওপর আঘাত হিসেবে ব্যাখ্যা করে থাকেন। শাসক পরিবারটিকে ক্লিনচিট দেওয়ার এই মূল শিক্ষা ওয়াহাবি মতাদর্শে নিহিত। . অন্যদিকে ইয়েমেনের জাইদিরা ৮৯৭ সাল থেকে ১৯৬২ সাল পর্যন্ত, অর্থাৎ ১০২৯ বছর এই পাহাড়ি এলাকায় ইমামতির শাসন ছিল। এই দুর্গম জায়গায় উসমানীয় শাসকেরা পর্যন্ত অভিযান চালিয়ে তাদের বশ মানাতে পারেননি। তবে ইয়েমেনের দক্ষিণ অঞ্চল, অর্থাৎ এডেন এলাকা ব্রিটিশরা ১৮৩৯ সালে দখল করে সেখানে ঔপনিবেশিক শাসন কায়েম করেছিল। অর্থাৎ ইয়েমেন তখন উত্তর ও দক্ষিণ—এই দুই ভাগে বিভক্ত ছিল। সা’দার জাইদি ইমাম হাদি ইলাল হক ৯১১ খ্রিষ্টাব্দে মারা যাওয়ার পরবর্তী শতাব্দীগুলোতে উত্তর ইয়েমেনে জাইদি ইমামদের ক্ষমতা কখনো বিস্তৃত হয়েছে, কখনো সংকুচিত হয়েছে। স্থানীয় গোত্র, আঞ্চলিক রাজবংশ এবং বাইরের শক্তির সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে এই ব্যবস্থা টিকে ছিল। হাদি ইলাল হকের বংশধর ইমাম আহমদ বিন ইয়াহিয়া ১৯৪৮ সাল থেকে উত্তর ইয়েমেন শাসন করে আসছিলেন। তবে ইতিমধ্যে সেনাবাহিনীর মধ্যে ইয়েমেনের এই জাইদি রাজতন্ত্রের বিরোধিতা শুরু হয়ে গিয়েছিল। . আহমদ ইয়াহিয়ার শাসনামলে ইয়েমেনের অর্থনীতি অনুন্নত ছিল, আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা ও স্বাস্থ্যসেবার ঘাটতি ছিল এবং রাজনৈতিক বিরোধিতার ওপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ ছিল। উপজাতীয় নেতা, সংস্কারপন্থী কর্মকর্তা ও আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তিদের বিভিন্ন অংশের মধ্যে ইমামতন্ত্রের বিরুদ্ধে অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। তবে সব বিরোধীর উদ্দেশ্য এক ছিল না। কেউ রাজনৈতিক সংস্কার চাইতেন, কেউ রাজতন্ত্রের অবসান চাইতেন, আবার কারও বিরোধের পেছনে ব্যক্তিগত বা উপজাতীয় ক্ষমতার দ্বন্দ্বও ছিল। এই অবস্থায় ১৯৬২ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর আহমদ বিন ইয়াহিয়ার মৃত্যু হলো। তাঁর ছেলে মুহাম্মদ আল-বদর সিংহাসনে বসলেন। তবে তিনি শাসন করার সুযোগ পান মাত্র এক সপ্তাহের মতো। কারণ, ২৬ সেপ্টেম্বর রাতে রাজতন্ত্রের অবসান চাওয়া সেনাবাহিনীর একদল সংস্কারপন্থী কর্মকর্তা সানার রাজপ্রাসাদে ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান নিয়ে আক্রমণ চালান। এই অভ্যুত্থানের নেতৃত্বে ছিলেন রাজকীয় বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা কর্নেল আবদুল্লাহ আল-সাল্লাল। ওই রাতে সেনারা রাজপ্রাসাদে গোলাবর্ষণ করলেন। অভ্যুত্থানকারীরা রেডিও সানার মাধ্যমে ইয়েমেন আরব প্রজাতন্ত্র নামে নতুন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দিলেন। আল-সাল্লাল নতুন প্রজাতন্ত্রের প্রধান হলেন। . অভ্যুত্থানকারীরা প্রথমে ভেবেছিলেন, ইমাম আল-বদর নিহত হয়েছেন। কিন্তু তিনি বেঁচে যান। তিনি উত্তরাঞ্চলে পালিয়ে গিয়ে নিজের অনুগত গোত্রগুলোর সহায়তায় প্রতিরোধ গড়ে তুললেন। ওই গোত্রগুলো আল-বদরের পক্ষে অস্ত্র তুলে নিল। আবদুল্লাহ আল-সাল্লালের নেতৃত্বে নতুন প্রজাতন্ত্রের সমর্থক ছিলেন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তা, রাজনৈতিক সংস্কারপন্থী ও বিভিন্ন গোত্র। তাঁদের প্রধান বিদেশি সমর্থক ছিল মিসর। মিসরের প্রেসিডেন্ট গামাল আবদেল নাসের আরব জাতীয়তাবাদ ও প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে ছিলেন। তিনি ইয়েমেনের নতুন প্রজাতন্ত্রকে সমর্থন করে সেখানে সেনা পাঠালেন। কারণ, তাঁর কাছে ইয়েমেন ছিল আরব উপদ্বীপে মিসরের প্রভাব বাড়ানোর গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এর বাইরে সোভিয়েত ইউনিয়নও আল সাল্লালকে মদদ দিচ্ছিল। ওয়াহাবি মতাদর্শের সঙ্গে জাইদি মতাদর্শের শুরু থেকেই মৌলিক বিরোধ আছে। তারপরও ইয়েমেনের ক্ষমতাচ্যুত জাইদি ইমাম আল-বদর ও তাঁর সমর্থকদের সৌদি আরব সমর্থন দিয়েছিল। কারণ, সৌদি আরবের সঙ্গে ইয়েমেনের দীর্ঘ সীমান্ত থাকলেও জাইদি ধারার ইয়েমেনিরা সৌদি শাসকদের কখনো বিরক্ত করেনি। সৌদি শাসকেরা ভাবলেন, নাসেরের মিসর যদি ইয়েমেনে শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করে তাহলে সোভিয়েতের সমাজতান্ত্রিক ভাবধারা বিস্তার লাভ করতে পারে। আর কমিউনিজমের ভাবধারা সৌদি–লাগোয়া এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে তা সৌদি রাজতন্ত্রের নিরাপত্তাকে ধ্বংস করে দিতে পারে। .
. এই চিন্তা থেকে ওয়াহাবি মতাদর্শের সৌদি শাসকেরা জাইদি মতাদর্শের ক্ষমতাচ্যুত ইমাম ও তাঁর রাজতন্ত্রপন্থী বাহিনীকে সমর্থন দেন। দক্ষিণ ইয়েমেন শাসন করা ব্রিটেনও এই রাজতন্ত্রপন্থীদের সহায়তা করছিল। ফলে ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই ক্রমে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হয়ে উঠল। ১৯৬২ থেকে উত্তর ইয়েমেনে রাজতন্ত্রপন্থী ও প্রজাতন্ত্রপন্থীদের যুদ্ধ চলছিল। ১৯৬৭ সালের আরব-ইসরায়েল যুদ্ধ বেধে গেলে মিসর তার ভূখণ্ডকে ইসরায়েলের হাত থেকে বাঁচাতে ইয়েমেন থেকে নিজের সেনা সরিয়ে আনা শুরু করে। এর ফলে সৌদি সরকারের রাজনৈতিক হিসাব–নিকাশও বদলে যায়। ১৯৭০ সালে সৌদি আরব রাজতন্ত্রপন্থীদের ওপর থেকে সমর্থন তুলে নিয়ে ইয়েমেন আরব প্রজাতন্ত্রকে স্বীকৃতি দেয়। রাজতন্ত্রপন্থীদের একটি অংশ নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে সমঝোতা করে। জাইদি ইমাম মুহাম্মদ আল-বদর লন্ডনে চলে যান এবং সেখানেই মারা যান। এর মধ্য দিয়ে উত্তর ইয়েমেনে ইমামত পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা একেবারে শেষ হয়ে যায়। এই ১৯৬৭ সালেই ব্রিটিশ সরকার দক্ষিণ ইয়েমেন থেকে সরে আসে। স্বাধীন হয় দক্ষিণ ইয়েমেন। ইয়েমেনি জাতীয়তাবাদীদের একটি অংশ দীর্ঘদিন ধরেই উত্তর ও দক্ষিণকে এক রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাইছিল। . দুই অঞ্চলের রাজনৈতিক বিভাজনকে তারা ঔপনিবেশিক ইতিহাসের পরিণতি হিসেবে দেখত। ১৯৬৭ সালে ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের পর দক্ষিণ ইয়েমেনে সোভিয়েত ইউনিয়নের প্রভাব দ্রুত বাড়তে থাকে। ১৯৬৯ সালে দেশটির ক্ষমতায় মার্ক্সবাদী নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এই প্রভাব আরও গভীর হয়। একপর্যায়ে দক্ষিণ ইয়েমেন আরব বিশ্বের একমাত্র মার্ক্সবাদী রাষ্ট্রে পরিণত হয়। তবে ১৯৭২ ও ১৯৭৯ সালে এই দুই ইয়েমেনের মধ্যে সীমান্তযুদ্ধ হলেও ঐক্যের আলোচনা বন্ধ হয়নি। সোভিয়েত ইউনিয়ন দক্ষিণ ইয়েমেনকে এত দিন অর্থ ও সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছিল। কিন্তু সোভিয়েত পতনের পর দক্ষিণ ইয়েমেন দুর্বল হয়ে পড়ে। এই সময়ে উত্তর ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট ছিলেন আলী আবদুল্লাহ সালেহ এবং দক্ষিণ ইয়েমেনের শাসক ছিলেন ইয়েমেনি সমাজতান্ত্রিক দলের নেতা আলী সালেম আল-বেইধ। তাঁরা দুই ইয়েমেন এক করার আলোচনা এগিয়ে নেন। ১৯৯০ সালের এপ্রিলে সানা চুক্তির মাধ্যমে দুই ইয়েমেন এক হয়ে যায়। আলী আবদুল্লাহ সালেহ একীভূত রাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন। আলী সালেম আল-বেইধ হন ভাইস প্রেসিডেন্ট। সানা হয় রাজধানী। .ইরান যুদ্ধ, নাকি দাজ্জালতত্ত্বে মোড়া ‘আমেরিকান ক্রুসেড’!.ইরান যুদ্ধ নিয়ে ‘আসল কথাডা কেউ কইলেন না’. উত্তর ও দক্ষিণের শাসক দলগুলোকে নিয়ে যৌথ সরকার গঠন করা হয়। পাঁচ সদস্যের প্রেসিডেনশিয়াল কাউন্সিলে উত্তরের তিনজন ও দক্ষিণের দুজন সদস্য ছিলেন। একীভূত রাষ্ট্রে প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয় ১৯৯৩ সালের এপ্রিলে। কিন্তু নির্বাচনের ফল দুই অঞ্চলের পুরোনো ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দেয়। উত্তরাঞ্চলে জনসংখ্যা বেশি হওয়ায় সালেহর জেনারেল পিপলস কংগ্রেস ও ইসলামপন্থী ইসলাহ পার্টি সংসদে বেশি আসন পায়। দক্ষিণের সাবেক শাসক দল সমাজতান্ত্রিক দল তৃতীয় অবস্থানে চলে যায়। দক্ষিণের নেতাদের মধ্যে আশঙ্কা তৈরি হয় যে একীভূত রাষ্ট্রে তাঁদের রাজনৈতিক প্রভাব ক্রমে কমে যাচ্ছে। এই একীকরণ কি স্থায়ী হয়েছিল? উত্তর হলো: না। ১৯৯০ সালের একীকরণের পরও উত্তর ও দক্ষিণের সেনাবাহিনী ও প্রশাসনিক কাঠামো পুরোপুরি একীভূত হয়নি। ক্ষমতা ভাগাভাগি, সামরিক নিয়ন্ত্রণ, তেলসম্পদ এবং দক্ষিণের রাজনৈতিক স্বায়ত্তশাসন নিয়ে বিরোধ বাড়তে থাকে। ১৯৯৪ সালে আলী সালেম আল-বেইধ দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতা ঘোষণা করেন। শুরু হয় গৃহযুদ্ধ। সালেহর অনুগত বাহিনী ও তাদের মিত্ররা যুদ্ধে জয়ী হয়; জুলাই ১৯৯৪-এ দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রচেষ্টা পরাজিত হয়। এরপর সালেহ কার্যত সমগ্র ইয়েমেনের ওপর নিজের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করেন। . উত্তর ইয়েমেনে জাইদিদের এক হাজার বছরের শাসন শেষ হওয়ার পর সেখানে ব্যাপক পরিবর্তনের বাতাস বইতে শুরু করে। জাইদিদের মূল এলাকা, মানে সা’দায় সরকার রাস্তাঘাট, স্কুল–কলেজ বানাচ্ছিল না। কোনো রকম উন্নয়নকাজ করছিল না। ওই এলাকায় জাইদি শিয়া পরিবারে জন্ম নেওয়া মুকবিল বিন হাদি নামের এক ব্যক্তি সৌদি আরবে গিয়ে ধর্মীয় শিক্ষা গ্রহণ করেছিলেন। সেখানে সুন্নি সালাফি চিন্তাধারার সঙ্গে পরিচিত হয়ে তিনি জাইদি মতবাদ থেকে সরে আসেন। মুকবিল সৌদি আরবে দীর্ঘ সময় মদিনার ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পড়াশোনা করেছিলেন এবং আবদুল আজিজ ইবনে বায ও মুহাম্মদ নাসিরুদ্দিন আল-আলবানির মতো আলেমদের চিন্তাধারার সংস্পর্শে এসেছিলেন। এই মুকবিল বিন হাদি প্রভাবশালী সালাফি আলেম ও হাদিসবিশারদ হয়ে ওঠেন। মুকবিল বিন হাদি সৌদি থেকে ১৯৭৯ সালে ইয়েমেনে ফিরে সা’দার দাম্মাজ এলাকায় দারুল হাদিস নামের একটি মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন। এটি ছিল এমন একটি ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র, যেখানে কোরআন, হাদিস ও সালাফি আকিদার পাঠ দেওয়া হতো। ইয়েমেনের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও বিদেশি শিক্ষার্থীরা সেখানে পড়তে আসতেন। এটি পরবর্তী সময়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সালাফি শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। . এরপর ইয়েমেনে ১৯৮২ সালের মধ্যে প্রায় ৫০০টি এবং ২০০০-এর দশকের শুরুতে প্রায় ১,২০০টি নতুন মাদ্রাসা গড়ে ওঠে। এর সবগুলো সালাফি মাদ্রাসা বলা যাবে না। এর কিছু অংশ মুসলিম ব্রাদারহুড প্রভাবিতও ছিল। সেখানে সুন্নি ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি বিভিন্ন ইসলামি মতধারা পড়ানো হতো। সালাফি মাদ্রাসাগুলোতে সৌদি সরকারের অনুদান যেত। সেখানে পড়া শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার জন্য মদিনা বিশ্ববিদ্যালয়ে স্কলারশিপ দেওয়া হতো। ১৯৭৯ সালের ইরানি বিপ্লবের পর সৌদি নেতাদের মনে উদ্বেগ ছিল, জাইদি সম্প্রদায়ের মধ্যে ইরানের প্রভাব বিস্তার ঘটতে পারে। তাই সৌদিরা চাচ্ছিল, জাইদিরা যেন মূলধারার সুন্নি হয়ে ওঠে বা সালাফি ধারায় চলে আসে। এতে জাইদিদের আলেমরা মনে করলেন, এর মধ্য দিয়ে সৌদিরা জাইদিদের মূল সংস্কৃতি ও আকিদা থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলছে। তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ জন্ম নিল। এই অবস্থায় কিছু জাইদি আলেম ও তরুণ সা’দার বিভিন্ন স্থানে ছড়িয়ে থাকা জাইদি শিক্ষাচক্রগুলোকে সংগঠিত করা, জাইদি পাঠ্যক্রম উন্নত করা এবং তরুণদের ধর্মীয় শিক্ষা দেওয়ার উদ্যোগ নিলেন। . এর জন্য তাঁরা একটি সংগঠন বানালেন। সংগঠনটির নাম ‘আশ-শাবাব আল-মুমিন’। এর অর্থ ‘মুমিন তরুণদের দল’। এটি ছিল মূলত সাংস্কৃতিক ও শিক্ষামূলক উদ্যোগ। সংগঠনটি পাঠচক্র, গ্রীষ্মকালীন শিক্ষাশিবির, বক্তৃতা এবং ধর্মীয় পাঠ্যসামগ্রী প্রচারের মাধ্যমে কাজ করত। অল্প কয়েক বছরের মধ্যে এর শিক্ষাচক্র সা’দার বাইরে উত্তর ইয়েমেনের অন্যান্য এলাকাতেও ছড়িয়ে পড়ে। এই সংগঠনটির নেতৃত্বে ছিল আল–হুতি পরিবার। এই পরিবারের সবচেয়ে প্রভাবশালী তরুণ নেতা হলেন আল হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতি। তাঁর বাবা বদরুদ্দিন আল-হুতি ছিলেন প্রভাবশালী জাইদি আলেম। হুসেইন এমন এক পরিবারে বেড়ে ওঠেন, যে পরিবার মহানবী (সা.)-এর বংশধর হিসেবে পরিচিত সৈয়দ সম্প্রদায়ের অন্তর্ভুক্ত। আল হুসেইন বদরুদ্দিন আল-হুতি জাইদি ধর্মতত্ত্বের পণ্ডিত ছিলেন। তিনি জাইদি বক্তব্যকে সাধারণ মানুষের কাছে সহজ ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করেন। তিনি বক্তা হিসেবে অসাধারণ ছিলেন। তাঁর বক্তৃতা ও লেখার সংকলন (যা সাধারণত মালাজিম নামে পরিচিত) হুতি আন্দোলনের আদর্শিক ভিত্তি বোঝার একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। হুসেইন আল–হুতি শুধু ঐতিহ্যগত জাইদি ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না। ইরানের ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লব এবং আয়াতুল্লাহ রুহুল্লাহ খোমেনির রাজনৈতিক চিন্তার প্রতিও তাঁর আগ্রহ ছিল। . যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্যনীতি, ইসরায়েলের প্রতি মার্কিন সমর্থন এবং মুসলিম দেশগুলোর ওপর পশ্চিমা শক্তির প্রভাব তাঁর বক্তব্যের গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে। হুসেইন আল–হুতি হিজব আল-হক বা ‘সত্যের দল’ গঠনেও যুক্ত ছিলেন। দলটির উদ্দেশ্য ছিল ইয়েমেনের রাজনীতিতে জায়দি সম্প্রদায়ের স্বার্থ ও প্রতিনিধিত্ব তুলে ধরা। ১৯৯৩ সালে তিনি হিজব আল-হকের প্রতিনিধি হিসেবে ইয়েমেনের সংসদে এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন। ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৭ সাল পর্যন্ত তিনি এমপি ছিলেন। এরপর সংসদীয় রাজনীতি থেকে সরে গিয়ে ধর্মীয় অধ্যয়ন ও আদর্শিক কর্মকাণ্ডে মনোযোগ দেন। হুসেইন আল–হুতি শাবাব আল-মুমিনের কার্যক্রমকে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক রূপ দেন। তাঁর বক্তব্যে তিনটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পায়। প্রথমত, তিনি কোরআনকে মুসলমানদের ব্যক্তিগত জীবন ও রাজনৈতিক অবস্থান নির্ধারণের প্রধান নির্দেশনা হিসেবে তুলে ধরতেন। দ্বিতীয়ত, তিনি মহানবী (সা.)-এর বংশধরদের ধর্মীয় নেতৃত্বের ঐতিহ্যকে গুরুত্ব দিতেন। তৃতীয়ত, তিনি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক অবস্থান নেন এবং মুসলিম দেশগুলোর শাসকদের পশ্চিমা শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের সমালোচনা করেন। . এর মধ্যে ২০০১ সালে নাইন–ইলেভেন হামলার জের ধরে যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে হামলা চালাল। এরপর ২০০৩ সালে তারা ইরাকে আক্রমণ করল। ইরাকিদের ওপর মার্কিন বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ চলল। আরব বিশ্বের সাধারণ মানুষ ক্ষোভে ফেটে পড়লেও তাদের পশ্চিমাপন্থী শাসকেরা মুখে কুলুপ এঁটে বসে থাকলেন। এই সময়টাতে হুসেইন আল–হুতি জাইদি মতাদর্শের সেই ‘জালিম শাসকদের বিরুদ্ধে তলোয়ার ওঠানোর’ বক্তব্যকে সামনে নিয়ে এলেন। তিনি সরাসরি মার্কিন বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্রধারণে নিজের সম্প্রদায়কে ডাক দিলেন। এ সময় নিজ অনুসারীদের মধ্যে তাঁর মার্কিনবিরোধী স্লোগান জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। এর মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত স্লোগান ছিল: ‘মাওত লি-আমরিকা, মাওত লি-ইসরাঈল, লা ‘নাতুল্লাহি আলাল-ইয়াহুদ, ওয়ান-নাসরু লিল-ইসলাম।’ (‘আমেরিকা মুর্দাবাদ, ইসরায়েল মুর্দাবাদ, ইহুদিদের ওপর অভিশাপ, ইসলামের বিজয় হোক।’) এই স্লোগানটি আশ–শাবাব আন্দোলনের পরিচিত রাজনৈতিক প্রতীকে পরিণত হয়। এটি নিয়ে সমালোচনাও রয়েছে, বিশেষত ইহুদিদের সামগ্রিকভাবে লক্ষ্যবস্তু করার কারণে। হুতিরা অবশ্য নিজেদের এই বক্তব্যকে সাধারণ ইহুদি নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের নীতির বিরুদ্ধে প্রতিরোধের অংশ হিসেবে ব্যাখ্যা করে। আমেরিকা ও ইসরায়েলবিরোধী স্লোগানের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্রদেশ সৌদি আরব হুসেইন আল–হুতির বিরুদ্ধে খেপে যায়। . সৌদির পৃষ্ঠপোষকতায় থাকা ইয়েমেনের প্রেসিডেন্ট আলী আবদুল্লাহ সালেহ নিজেও জাইদি শিয়া ছিলেন। কিন্তু তিনি সৌদিপন্থী হওয়ার কারণে হুসেইন আল–হুতির বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেন। ২০০৪ সালের জুনে সালেহ সরকারের সঙ্গে হুসেইন আল–হুতির বাহিনীর লড়াই বেধে যায়। কয়েক মাসের লড়াইয়ের পর ২০০৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বর হুসেইন আল-হুতি সালেহ বাহিনীর হাতে নিহত হন। কিন্তু দেখা গেল, জীবিত হুসেইনের চেয়ে নিহত হুসেইন বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠলেন। তাঁর আন্দোলন আরও জোরালো হলো। তাঁর অনুসারীরা তাঁকে আদর্শিক পথপ্রদর্শক হিসেবে তুলে ধরল। তাঁর বক্তৃতা ও ধর্মীয় ব্যাখ্যা আন্দোলনের পরিচয়ের কেন্দ্রীয় অংশ হয়ে উঠল। আশ–শাবাব আন্দোলনের নাম বদলে গেল। তাঁর নামেই আন্দোলনের নাম হলো আনসারুল্লাহ। এটিকেই বলে হুতি আন্দোলন। হুসেইনের ভাই আবদুল মালিক আল-হুতি এর নেতৃত্ব নিলেন। তখন তাঁর বয়স ২৫ বছর। এই আবদুল মালিক আজ পর্যন্ত হুতিদের নেতা হিসেবে টিকে আছেন। . সৌদি আরবের সমর্থন পাওয়া প্রেসিডেন্ট সালেহ ২০০৪ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত অন্তত ছয়বার অভিযান চালিয়ে আবদুল মালিককে হত্যা করতে চেয়েছেন। ছয়বারই বড় সংঘাত হয়েছে। ছয়বারই সালেহ ব্যর্থ হয়েছেন। এই লড়াইগুলোকে ‘সা’দা যুদ্ধ’ বলে। এই সা’দা যুদ্ধে হুতিরা গেরিলা যুদ্ধে, বিশেষ করে পাহাড়ি এলাকার যুদ্ধে অভিজ্ঞ হয়ে ওঠে। ২০১১ সালে আরব বসন্ত শুরু হলে তার ঢেউ ইয়েমেনেও আছড়ে পড়ল। জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাওয়া, দুর্নীতি ও স্বজনতোষণের কারণে প্রেসিডেন্ট সালেহর ওপর জনগণ আগে থেকেই ক্ষুব্ধ ছিল। আরব বসন্ত শুরু হলে সালেহকে গদি থেকে সরাতে রাজধানী সানার রাস্তায় লাখ লাখ ইয়েমেনি নেমে আসেন। বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিল। সৌদি আরব এত দিন প্রেসিডেন্ট সালেহকে সমর্থন দিয়ে এলেও জনগণের বিক্ষোভ দেখে তারা সালেহকে সরে দাঁড়াতে বলল। সালেহ ক্ষমতা ছাড়লেন। প্রেসিডেন্ট হলেন তাঁরই ভাইস প্রেসিডেন্ট আব্দ-রাব্বু মানসুর হাদি। সালেহ ক্ষমতা ছাড়লেও দীর্ঘদিন প্রেসিডেন্ট থাকার কারণে সেনাবাহিনীতে তাঁর ব্যাপক প্রভাব রয়ে গিয়েছিল। তিনি ক্ষমতায় ফেরার জন্য সেনাবাহিনীর কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিলেন। . এর মধ্যে হুতিরা নতুন প্রেসিডেন্ট হাদির বিরুদ্ধেও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছিল। এখন দেখা গেল সালেহ এবং হুতিদের কমন শত্রু প্রেসিডেন্ট হাদি। যে সালেহ হুতিদের নির্বংশ করতে ছয়বার ভয়াবহ অভিযান চালিয়েছিলেন, সেই সালেহ এবার প্রেসিডেন্ট হাদিকে উৎখাত করতে তাঁর পুরোনো শত্রু হুতিদের সঙ্গে জোট গড়লেন। ২০১৪ সালের সেপ্টেম্বরে হাদি সরকার তেলের ওপর থেকে ভর্তুকি তুলে নেওয়ার পর জিনিসপত্রের দাম অনেক বেড়ে গেল। সাধারণ মানুষ এবার হাদির ওপর খেপে গেল। হুতিরা এটিকে সুযোগ হিসেবে কাজে লাগাল। তারা সরাসরি রাজধানী সানা দখলে অভিযান চালাল। এই সময়টাতে আগের প্রেসিডেন্ট সালেহ হুতিদের সঙ্গে ছিলেন। যেহেতু সেনা কর্মকর্তাদের একটি বড় অংশ সালেহকে সমর্থন করত, সেহেতু সালেহর অনুরোধে সেনাবাহিনী হুতিদের বাধা দিল না। এতে খুব সহজেই হুতিরা প্রায় বিনা বাধায় ২০১৪ সালের ২১ সেপ্টেম্বর রাজধানী সানা দখল করে ফেলল। . ২০১৫ সালের জানুয়ারিতে হুতিরা প্রেসিডেন্ট হাদিকে ক্ষমতাচ্যুত করে গৃহবন্দী করে রাখে। হাদি পরে সানা থেকে পালিয়ে দক্ষিণের বন্দরনগরী এডেনে চলে যান। সেখান থেকে তিনি হুতিদের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা করেন। ২০১৫ সালের মার্চে হুতিরা হাদিকে ধরতে এডেনের দিকে অগ্রসর হলে হাদি সৌদি আরবে আশ্রয় নেন এবং বাইরের সামরিক সহায়তা চান। ২৬ মার্চ সৌদি আরবের নেতৃত্বে একটি সামরিক জোট এবার ইয়েমেনে বিমান হামলা শুরু করে। এই অভিযান শুধু হুতিদের সামরিক অবস্থান লক্ষ্য করেই সীমাবদ্ধ থাকেনি; কয়েক মাসের মধ্যে তা ইয়েমেনের শহর, বন্দর, সড়ক, সেতু, কারখানা ও অন্যান্য বেসামরিক স্থাপনার ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। হাজার হাজার বেসামরিক মানুষ নিহত হন, লাখ লাখ মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে পালাতে বাধ্য হন এবং দেশটির আগে থেকেই দুর্বল অর্থনীতি ও জনজীবন ভয়াবহ সংকটে পড়ে। সৌদি সরকারের লক্ষ্য ছিল হুতিদের অগ্রযাত্রা থামানো এবং হাদির আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা। . এদিকে হুতিদের সানা দখল ইরানের মধ্যে নতুন উচ্চাভিলাস তৈরি করে। ইরান জানে, হুতিরা তাদের মতো বারো ইমামতির শিয়া না; তাঁরা জাইদি শিয়া। জাইদি শিয়ারা মূল শিয়াদের চেয়ে আকিদার দিক থেকে সুন্নিদের বেশি কাছাকাছি। কিন্তু যেহেতু সৌদি আরবের সঙ্গে হুতিদের বিরোধ আছে, সেহেতু হুতিদের সানা দখলকে তারা কাজে লাগাতে পারে। ওই সময় ইরান ভাবল, লেবাননে তাদের অনুগত গ্রুপ হিজবুল্লাহ আছে, ফিলিস্তিনে হামাস আছে। এখন সৌদি আরবের পাশে যদি হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো ইরানের একটি প্রক্সি শক্তি থাকে তাহলে তেহরানের প্রভাব এ অঞ্চলে বাড়বে। এই চিন্তা থেকে ইরান হুতিদের সঙ্গে যোগাযোগ করে এবং তাদের পয়সাকড়ি ও অস্ত্রপাতি দেওয়া শুরু করে। এটি সৌদি আরবকে আরও বেশি খেপিয়ে তোলে। এত দিন তাদের সহযোগিতার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল হাদির সরকারকে উৎখাত করা। এখন সৌদি আরব ও তার মিত্রদের সামরিক অভিযানের বিরুদ্ধে টিকে থাকাও তাদের অভিন্ন স্বার্থে পরিণত হয়। . সালেহর জন্য সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিরুদ্ধে লড়াই করার আরেকটি রাজনৈতিক তাৎপর্য ছিল। সৌদি আরব দীর্ঘদিন ইয়েমেনের রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তার করে এসেছে। সালেহ নিজেও একসময় সৌদি আরবের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছিলেন। কিন্তু ক্ষমতা হারানোর পর তাঁর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তনের সম্ভাবনা নির্ভর করতে শুরু করে হুতিদের সঙ্গে সহযোগিতার ওপর। ২০১৬ সালে সালেহর দল জেনারেল পিপলস কংগ্রেস এবং হুতিরা আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনৈতিক অংশীদারত্বের ঘোষণা দেয়। কিন্তু বাস্তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও সামরিক সিদ্ধান্তের ওপর হুতিদের নিয়ন্ত্রণ বাড়তে থাকে। সালেহর সমর্থকেরা এতে নিজেদের ক্রমে কোণঠাসা মনে করতে থাকেন। এতে হুতি ও সালেহ শিবির আবার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। ২০১৭ সালে সালেহ সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সঙ্গে সমঝোতার ইঙ্গিত দেন। এরপর ২ ডিসেম্বর তিনি হুতিদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করার আহ্বান জানান। এর পরপরই সানায় হুতি ও সালেহর অনুগত বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষ শুরু হয়। . এর পর থেকে উত্তর ইয়েমেনের ক্ষমতায় আছেন হুতিদের আন্দোলন আনসার আল্লাহর প্রধান আবদুল মালিক আল-হুতি। তাঁর নিয়ন্ত্রণে রাজধানী সানা এবং উত্তর-পশ্চিম ইয়েমেনের ঘনবসতিপূর্ণ বিস্তীর্ণ এলাকা রয়েছে। তাঁরা নিজেদের প্রশাসন, নিরাপত্তা বাহিনী ও মন্ত্রিসভার মাধ্যমে এসব অঞ্চল পরিচালনা করেন। তাঁদের সরকার আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত নয়। আর দক্ষিণ ও হুতিবিরোধী এলাকায় আছে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকার। এই সরকারের সর্বোচ্চ নেতৃত্বে রয়েছে আট সদস্যের প্রেসিডেনশিয়াল লিডারশিপ কাউন্সিল (পিএলসি)। এর চেয়ারম্যান রাশাদ আল-আলিমি। সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদ রাব্বুহ মনসুর হাদি ২০২২ সালের ৭ এপ্রিল নিজের ক্ষমতা এই কাউন্সিলের কাছে হস্তান্তর করে গিয়েছিলেন। . হুতিরা সানা দখলের পর থেকে ইয়েমেনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলকে সৌদি আরব বলা যায় দুনিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে। এতে সেখানকার জাইদি শিয়ারা ছাড়াও সাধারণ ইয়েমেনি মানুষ মানবেতর জীবন যাপন করছে। গত ফেব্রুয়ারিতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর হামলা চালানোর পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিলে আন্তর্জাতিক তেল সরবরাহ ধাক্কা খায়। এটিকেই বড় সুযোগ হিসেবে নিয়েছে হুতিরা। তারা দেখেছে, এখন যদি লোহিত সাগর এবং এডেন উপসাগরের সংযোগস্থল বাব আল-মানদেব প্রণালি দিয়ে তেলবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া যায়, তাহলে সৌদি আরব আরও চাপে পড়বে। কারণ, এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ সুয়েজ খাল হয়ে ইউরোপ ও এশিয়ার মধ্যে চলাচল করে। ফলে এখানে সামরিক প্রভাব বিস্তার করতে পারলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনে চাপ সৃষ্টি করা যাবে। হুতিদের নিয়ন্ত্রিত ইয়েমেনের পশ্চিম উপকূল যেহেতু এই প্রণালির কাছেই অবস্থিত, সেহেতু তারা বাব আল–মানদেবের পূর্ব পাশ দখলে নিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা সৌদি আরব ও তার মিত্রদের ওপর চাপ তৈরির চেষ্টা করছে। হুতিদের হামলার লক্ষ্য সৌদি আরবকে ইয়েমেনের বন্দর ও বিমানবন্দরের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল করতে, সামরিক অভিযান বন্ধ করতে এবং হুতিদের অন্যান্য দাবি মেনে নিতে চাপ দেওয়া। একই সঙ্গে ইরানের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের চাপ কমানোর ক্ষেত্রেও সৌদি আরবকে একটি চাপের বিন্দু হিসেবে ব্যবহার করা। . ইসলামের রাজনৈতিক চিন্তায় শাসকের আনুগত্য ও ন্যায়বিচারের প্রশ্নে দুটি বিপরীত দর্শন দীর্ঘকাল ধরে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে এমন এক রাজনৈতিক ধর্মতত্ত্ব, যেখানে শাসকের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিরোধিতাকে ফিতনা, বিশৃঙ্খলা ও মুসলিম উম্মাহর ঐক্যের জন্য বিপজ্জনক মনে করা হয়। অন্যদিকে এমন এক বিশ্বাস, যেখানে শাসক ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত হলে তাঁর বিরুদ্ধে দাঁড়ানোই হয়ে উঠতে পারে ধর্মীয় কর্তব্য। প্রথম দর্শনে শান্তি ও স্থিতিশীলতা মুখ্য; দ্বিতীয় দর্শনে ন্যায়বিচার ও শাসকের নৈতিক বৈধতা মুখ্য। সৌদি আরবের ওয়াহাবি ধারার ধর্মীয়-রাজনৈতিক ঐতিহ্যে প্রথম দৃষ্টিভঙ্গির প্রভাব প্রবল। এর যুক্তি হলো, শাসকের অন্যায় সত্ত্বেও তাঁর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিণতি আরও ভয়াবহ হতে পারে; রক্তপাত ও বিশৃঙ্খলা এড়ানো তাই অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। বিপরীতে, জাইদি রাজনৈতিক ঐতিহ্যে শাসকের বৈধতা শুধু ক্ষমতার দখল কিংবা আনুগত্য আদায়ের ওপর নির্ভর করে না। ন্যায়বিচার থেকে বিচ্যুত শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ধারণা সেখানে ধর্মীয় ও নৈতিক তাৎপর্য বহন করে। .
. এই দুই দর্শনের সংঘাত যেন একই ধর্মীয় উত্তরাধিকারের ভেতর থেকে উঠে আসা দুটি বিপরীত প্রশ্নের সংঘাত: শান্তির জন্য অন্যায় কত দূর সহ্য করা যায়, আর ন্যায় প্রতিষ্ঠার জন্য কত দূর যাওয়া যায়? এক পক্ষের চোখে বিদ্রোহ সমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিতে পারে; অন্য পক্ষের চোখে অন্যায়ের সামনে নীরবতা শাসকের স্বেচ্ছাচারকে বৈধতা দেয়। ফলে যে কাজ এক পক্ষের কাছে ফিতনা, অন্য পক্ষের কাছে তা প্রতিরোধের নৈতিক দায়িত্ব হয়ে উঠতে পারে। সৌদি আরব ও ইয়েমেনের জাইদি হুতিদের সংঘাতে এই আদর্শিক ব্যবধান রাজনৈতিক বাস্তবতার সঙ্গে মিশে গেছে। সৌদি নেতৃত্বের কাছে হুতিদের সশস্ত্র উত্থান সীমান্তনিরাপত্তা, রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব ও আঞ্চলিক প্রভাবের জন্য হুমকি। হুতিদের রাজনৈতিক বয়ানে সৌদি সামরিক হস্তক্ষেপ বিদেশি আধিপত্যের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের যুক্তিকে শক্তিশালী করেছে। ফলে ধর্মতত্ত্ব এখানে নিছক পুঁথিগত বিতর্ক নয়; তা ক্ষমতার ভাষা, প্রতিরোধের বৈধতা এবং শত্রুকে সংজ্ঞায়িত করার হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। তবে এটিও ঠিক, এই যুদ্ধকে শুধু ওয়াহাবি ও জাইদি মতবাদের সংঘাত বললে ইতিহাসের পূর্ণ সত্য ধরা পড়ে না। ইয়েমেনের রাষ্ট্রক্ষমতার লড়াই, সৌদি আরবের নিরাপত্তা-উদ্বেগ এবং ইরান-সৌদি প্রতিদ্বন্দ্বিতাও সংঘাতকে দীর্ঘায়িত করেছে। ধর্মীয় বিশ্বাস একা যুদ্ধ সৃষ্টি করেনি; কিন্তু তা যুদ্ধরত পক্ষগুলোর কাছে নিজেদের অবস্থানকে ন্যায়সংগত এবং প্রতিপক্ষের অবস্থানকে অগ্রহণযোগ্য করে তোলার ভাষা জুগিয়েছে। এ কারণে এই দ্বন্দ্বের অবসান শিগগির তো নয়ই, হয়তো কোনো দিনই হবে না।
|