● ●


নজরুলের কণ্ঠ থেমে গিয়েছিল, তাঁর কথা আমরা কতটা শুনেছি
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর, ২০২৬, ১:৫০ অপরাহ্ণ |
অনলাইন সংস্করণ

নজরুলের কণ্ঠ থেমে গিয়েছিল, তাঁর কথা আমরা কতটা শুনেছি

জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে কথা বলতে গেলে আমরা খুব সহজেই কয়েকটি শব্দের কাছে ফিরে যাই— বিদ্রোহ, সাম্য, অসাম্প্রদায়িকতা, প্রেম। শব্দগুলো ভুল নয়। কিন্তু একজন মানুষকে কয়েকটি শব্দে আটকে ফেলতে পারলে তাঁকে নিয়ে ভাবার ঝামেলাটা কমে যায়। তাঁকে স্মরণ করা যায়, তাঁর জন্মদিনে ফুল দেওয়া যায়, তাঁর কবিতা আবৃত্তি করা যায়। অথচ তাঁর চিন্তার মুখোমুখি না হয়েও এসব করা সম্ভব।

নজরুলের জীবন নিয়ে বরং অন্য একটি প্রশ্ন আছে—একটি সমাজ তার বিদ্রোহী কবিকে কত সহজে নিজের করে নিতে পারে, অথচ তাঁর বিদ্রোহকে নিজের জীবনের বাইরে রেখে দিতে পারে?

প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গেলে নজরুলের জীবনের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় দিয়ে শুরু করা যায়। তবে তাঁর বিখ্যাত কবিতা ‘বিদ্রোহী’ দিয়ে নয়, ‘ধূমকেতু’ দিয়ে।

১৯২২ সালে নজরুল সম্পাদিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে তাঁর ভাষা ছিল সরাসরি, আপসহীন। ওই বছরের সেপ্টেম্বরে পত্রিকায় প্রকাশিত হয় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’। ধর্মীয় প্রতীকের আড়ালে লেখা কবিতাটিতে ছিল ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে তীব্র রাজনৈতিক প্রতিবাদ। পরিণতিতে পত্রিকাটি নিষিদ্ধ এবং নজরুলের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা হয়। ১৯২৩ সালে তাঁকে এক বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। কারাগারে বন্দীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের প্রতিবাদে তিনি অনশনও করেছিলেন।

.

এখানে নজরুলের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে, যা তাঁকে শুধু সাহসী কবি হিসেবে দেখার চেয়ে বেশি কিছু ভাবতে বাধ্য করে। তিনি কেবল প্রতিবাদের কবিতা লিখে থেমে থাকেননি। নিজের লেখার রাজনৈতিক পরিণতিও তাঁকে বহন করতে হয়েছিল। আজ আমরা তাঁর প্রতিবাদী পঙ্‌ক্তি উদ্ধৃত করি; কিন্তু সেই প্রতিবাদের মূল্য কতটা ছিল, তা মনে রাখি কি?

কারাগারে যাওয়া কোনো মানুষকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মহৎ করে তোলে না। জেল খাটলেই কারও প্রতিটি মত সঠিক হয়ে যায় না। নজরুলকে বুঝতে হলে তাঁকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে বসানোর প্রয়োজন নেই। বরং সাহসের পাশাপাশি তাঁর সীমাবদ্ধতা, তাঁর সময়ের দ্বন্দ্ব এবং চিন্তার জটিলতাগুলো নিয়েও আলোচনা করা দরকার। মানুষকে প্রতীকে পরিণত করার একটা সমস্যা হলো, একসময় প্রতীকটি বাস্তব মানুষটির জায়গা দখল করে নেয়।

নজরুলের ক্ষেত্রে এই সমস্যাটি আরও স্পষ্ট। তাঁকে আমরা বিদ্রোহের প্রতীক হিসেবে চিনি, কিন্তু তাঁর বিদ্রোহের লক্ষ্যটা কী ছিল?
শুধু ব্রিটিশ শাসন থেকে মুক্তি? নাকি মানুষের ওপর মানুষের আধিপত্যেরও অবসান?

.

তাঁর সাহিত্য পড়লে দ্বিতীয় প্রশ্নটি এড়িয়ে যাওয়া কঠিন। তিনি সাম্প্রদায়িক বিভাজন, জাতপাত, ধর্মীয় গোঁড়ামি এবং সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে লিখেছেন। তাঁর কবিতা ও গানে যেমন ইসলামি ঐতিহ্যের অনুষঙ্গ আছে, তেমনি আছে হিন্দু পুরাণের দেবদেবী, শ্যামাসংগীতের আবহ এবং নানা ধর্মীয় সংস্কৃতির উপাদান। এগুলোকে কেবল একজন কবির শব্দচয়নের বৈচিত্র্য হিসেবে দেখলে কম দেখা হয়। এর মধ্যে এমন এক সাংস্কৃতিক অবস্থানও আছে, যেখানে মানুষের পরিচয়কে একটিমাত্র ধর্মীয় কিংবা সামাজিক খোঁপে বন্দী করার প্রবণতা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে।

অবশ্য নজরুলকে আজকের কোনো রাজনৈতিক মতাদর্শের নিখুঁত প্রতিনিধি বানানোর চেষ্টাও ঠিক হবে না। তিনি আমাদের বর্তমান রাজনৈতিক ভাষায় কথা বলেননি। তাঁর সময়ের বাস্তবতা আলাদা ছিল। কিন্তু তাঁর লেখার সামনে দাঁড়ালে নিজের সময়ের কিছু প্রশ্নও সামনে এসে পড়ে। যে সমাজে ধর্মের পরিচয় দিয়ে মানুষকে আলাদা করা হয়, যে রাজনীতিতে সাম্যের কথা বলা সহজ অথচ বৈষম্য কমানো কঠিন, সেখানে নজরুলকে পড়া নিছক সাহিত্যচর্চা থাকে না। তা নিজের অবস্থান যাচাই করারও একটি উপায় হয়ে ওঠে।

সমস্যা হলো, আমরা প্রায়ই কবির কাছ থেকে তাঁর সবচেয়ে সুবিধাজনক অংশটুকু বেছে নিই। যে পঙ্‌ক্তি আমাদের সভায় মানায়, সেটি রাখি; যে চিন্তা আমাদের অভ্যাসকে প্রশ্ন করে, সেটি এড়িয়ে যাই। নজরুলকে শ্রদ্ধা করার সঙ্গে তাঁর চিন্তার সঙ্গে দ্বিমত করা অবশ্যই সম্ভব। কিন্তু তাঁর নামে শ্রদ্ধা প্রকাশ করে তাঁর মূল প্রশ্নগুলোকে অপ্রাসঙ্গিক করে তোলা অন্য ব্যাপার।

.

এরপর আসে তাঁর জীবনের সবচেয়ে মর্মান্তিক অধ্যায়।
১৯৪২ সালে নজরুল গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন। ধীরে ধীরে তাঁর কথা বলার ক্ষমতা ও স্মৃতি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চিকিৎসার নানা চেষ্টা সত্ত্বেও তিনি আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি। জীবনের শেষ দীর্ঘ সময়টি তাঁকে কাটাতে হয় প্রায় সম্পূর্ণ নীরবতায়। যে মানুষটি কলম দিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলেছিলেন, সাম্প্রদায়িকতার বিরুদ্ধে লিখেছিলেন, মানুষের মুক্তির স্বপ্ন দেখেছিলেন, সেই মানুষটিই একসময় নিজের মনের কথাও আর প্রকাশ করতে পারলেন না।

এই জায়গায় এসে নজরুলের জীবনকে শুধু ট্র্যাজেডি হিসেবে বর্ণনা করলেই চলে না। তাঁর অসুস্থতা কোনো রাজনৈতিক রূপক ছিল না; এটি ছিল একজন মানুষের বাস্তব অসুস্থতা, তাঁর ব্যক্তিগত যন্ত্রণা। তাঁর নীরবতাকে রাষ্ট্রের বা সমাজের তৈরি নীরবতার সঙ্গে এক করে ফেলাও ইতিহাসের প্রতি সুবিচার হবে না। কিন্তু তাঁর জীবনের পরবর্তী অধ্যায় আমাদের একটি প্রশ্ন করার সুযোগ দেয়— মানুষের কণ্ঠস্বর যখন আর শোনা যায় না, তখন তাঁর রেখে যাওয়া কথাগুলোর প্রতি আমাদের দায়িত্ব কী?

১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশে নজরুলকে তাঁর পরিবারসহ নিয়ে আসা হয়। পরে তাঁকে রাষ্ট্রীয় সম্মান দেওয়া হয়; ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি দেয়, বাংলাদেশ সরকার তাঁকে নাগরিকত্ব প্রদান করে এবং একুশে পদকে ভূষিত করে। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকায় তাঁর মৃত্যু হয়।

.শরৎচন্দ্রের সাহিত্যে বাঙালির হৃদয়াবেগ ও মানবিকতার অনন্ত পাঠ.

একটি নতুন রাষ্ট্রের জাতীয় কবি হিসেবে তাঁকে গ্রহণ করার মধ্যে ঐতিহাসিক তাৎপর্য ছিল। কিন্তু এখানেও একটি পার্থক্য মনে রাখা দরকার: রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি একজন কবির প্রতি সম্মান প্রকাশ করতে পারে, তাঁর চিন্তার বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারে না। কোনো রাষ্ট্র কবির নামে প্রতিষ্ঠান করতে পারে, তাঁর জন্মদিন পালন করতে পারে, তাঁর প্রতিকৃতিতে ফুল দিতে পারে। কিন্তু সেই রাষ্ট্র ও সমাজে তাঁর সাম্য, মানবিক মর্যাদা এবং অসাম্প্রদায়িকতার ভাবনা কতটা কার্যকর, তার উত্তর পাওয়া যায় অন্য জায়গায়—মানুষের দৈনন্দিন জীবন, সামাজিক সম্পর্ক এবং ক্ষমতার ব্যবহারে।

নজরুলের জীবন নিয়ে লিখতে গিয়ে তাই তাঁকে শুধু ব্রিটিশবিরোধী বীর হিসেবে দেখলে একটি অংশ বাদ পড়ে যায়। আবার তাঁর অসুস্থতা ও নীরবতাকে কেন্দ্র করে তাঁকে কেবল করুণ এক চরিত্র বানালেও তাঁর জীবনের রাজনৈতিক শক্তিটা হারিয়ে যায়। তিনি একই সঙ্গে একজন কবি, সাংবাদিক, রাজনৈতিক প্রতিবাদী এবং এমন এক মানুষ, যাঁর জীবন নিজের সময়ের সঙ্গে সংঘাতে গড়ে উঠেছিল। তাঁর উত্তরাধিকারও এই বহুমাত্রিকতার মধ্যেই।

.পুঁথি সংগ্রহ ছাড়াও আর কী করতেন আবদুল করিম সাহিত্যবিশারদ.

কোনো কবিকে মনে রাখার সবচেয়ে সহজ উপায় তাঁর নামে অনুষ্ঠান করা। কঠিন উপায় হলো, তাঁর লেখাকে নিজের সময়ের সামনে দাঁড় করানো। নজরুলের ক্ষেত্রে এই কঠিন কাজটির প্রয়োজন এখনো ফুরিয়ে যায়নি।

হয়তো তাঁকে নিয়ে আমাদের নতুন করে ভাবা শুরু হতে পারে খুব সাধারণ একটি প্রশ্ন দিয়ে—আমরা যখন তাঁকে ‘বিদ্রোহী কবি’ বলি, তখন ঠিক কোন বিদ্রোহটির কথা বলি? শুধু পরাধীনতার বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থান, নাকি মানুষের ওপর মানুষের অন্যায় আধিপত্যের বিরুদ্ধেও তাঁর আপত্তি?

প্রশ্নটি জরুরি। কারণ, পরাধীনতার অবসান ঘটতে পারে, রাষ্ট্রের পতাকা বদলাতে পারে, ক্ষমতার আসনে নতুন মানুষ বসতে পারে। কিন্তু অন্যায়ের ধরন সব সময় একই থাকে না; কখনো তা নতুন ভাষা নেয়, নতুন যুক্তি খুঁজে পায়, এমনকি মুক্তি ও সাম্যের নামও ব্যবহার করে।

নজরুলকে জীবিত রাখার অর্থ তাঁর প্রতিটি কবিতাকে পূজা করা নয়। বরং তাঁর লেখার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের সময়কে নতুন করে পড়া। তাঁর কণ্ঠ থেমে গিয়েছিল বহু বছর আগে। কিন্তু তাঁর কথা আমাদের কাছে পৌঁছাতে কোনো বাধা নেই।
বাধাটা সম্ভবত অন্য কোথাও—আমরা তাঁর কথা শুনতে চাই কি না।




সর্বশেষ সংবাদ

সর্বাধিক পঠিত

এই ওয়েবসাইটের কোনো লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ছাড়া ব্যবহার করা বেআইনি।

© বিডি ২৪ নিউজ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত

  বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা,আটকের দাবি : এ্যাংকর সিমেন্ট কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, বিদেশে সম্পদের পাহাড় গড়ার অভিযোগ : তদন্তে দুদক ও ভ্যাট গোয়েন্দা   বরিশাল স্বাস্থ্যখাতে শত কোটি টাকার দুর্নীতি: পিপলাই পরিবারের টেন্ডার সিন্ডিকেট উন্মোচন   ইফতারে বৈষম্যের অভিযোগ: ভিআইপি ও সাধারণ কর্মচারীদের আলাদা মেন্যু, সমালোচনায় বরিশাল সিটি করপোরেশন   বরিশালের হলিমা খাতুন স্কুলের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা   পটুয়াখালী মেডিকেলে ৭৬ কোটি টাকার টেন্ডার বাতিল হলেও জড়িতরা বহাল তবিয়তে   রাজাপুর এলজিইডির প্রকৌশলী অভিজিৎ মজুমদারের বিরুদ্ধে বিস্তর অনিয়মের অভিযোগ   বরিশালে বদলি ঠেকাতে ৩ শিক্ষকের গ্রেফতার নাটক   বরিশালের সেই বিতর্কিত এডলিন বিশ্বাষ পুলিশের হাতে আটক   না ফেরার দেশে বেগম খালেদা জিয়া   রাজশাহী গণপূর্তে টেন্ডারের আগেই ভাগ হচ্ছে কাজ : প্রশ্নের মুখে নির্বাহী প্রকৌশলী রাশেদুল ইসলাম   বরিশালের রুপাতলী ‘খাবার বাড়ি’ রেস্তোরাঁকে ১ লাখ টাকা জরিমানা   বাকেরগঞ্জে যুবলীগ নেতার বিরুদ্ধে গরু চুরির অভিযোগ   নলছিটিতে বৈদ্যুতিক ফাঁদে প্রাণ হারালেন কৃষক বাচ্চু মল্লিক   বদলি-নিয়োগ-দুর্নীতি, সিন্ডিকেটের দখলে প্রাথমিক শিক্ষাঅধিদপ্তর   উজিরপুরে বিএনপি নেতার বিরুদ্ধে বলৎকারের অভিযোগ,জুতা পেটা   বদলি-বাণিজ্য, ঘুষ নিয়ন্ত্রণ করতেন সিন্ডিকেটের মাধ্যমে, ছয় বছরের সাম্রাজ্য শাহজাহান আলীর   বরিশালে জামায়াত নেতাদের বিরুদ্ধে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবের জায়গা দখল চেষ্টার অভিযোগ   বরিশালে বিসিক উদ্যোক্তা মেলায় স্টল বরাদ্দে অনিয়ম   বরিশাল কর অফিসের রতন মোল্লার হাতে আলাদিনের চেরাগ,একই কর্মস্থলে ১০ বছর   বরিশালের ১৬টি আসনে বিএনপির প্রার্থী যারা
Translate »