
ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়াম, মুম্বাই।
চলছে ২০২৩ বিশ্বকাপ। মাঠে মুখোমুখি অস্ট্রেলিয়া ও আফগানিস্তান। প্রথমে ব্যাট করে আফগানরা টার্গেট দেয় ২৯২ রান। অজিদের জন্য এই রান তাড়া করা খুব কঠিন নয়; কিন্তু ব্যাট হাতে নামতেই পরিস্থিতি বদলাতে থাকে অস্ট্রেলিয়ার। দলীয় ৯১ রানে ৭ উইকেট। জয়ের জন্য তখনো দরকার ২০১ রান। এমন পরিস্থিতে অবুঝ ক্রিকেটপ্রমীও হয়তো বলবে না, ম্যাচটা অস্ট্রেলিয়া জিতবে; কিন্তু ২২ গজে যদি থাকেন ম্যাক্সওয়েল, তাহলে কিছুই অসম্ভব নয়। সেই অসম্ভবকে সম্ভব করেছিলেন তিনি একাই, ২০১ রানে অপরাজিত থেকে।
কিন্তু সেই ম্যাক্সিকে (পড়ুন ম্যাক্সওয়েলকে) আর দেখা যাবে না অস্ট্রেলিয়ার জার্সিতে। ৩৮ বছর বয়সে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ান এই অলরাউন্ডার। ২ নভেম্বর রাতে দ্য ফাইনাল ওয়ার্ড পডকাস্টে নিজের সিদ্ধান্তের কথা জানান তিনি। এর মধ্য দিয়ে শেষ হলো তাঁর প্রায় ১৪ বছরের আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ার। তবে ক্রিকেট থেকে এখনই বিদায় নিচ্ছেন না ম্যাক্সওয়েল। টি-টোয়েন্টি লিগে খেলা চালিয়ে যাবেন। অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি আসর বিগ ব্যাশে মেলবোর্ন স্টার্সের হয়েও খেলবেন তিনি।
অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ৭টি টেস্ট, ১৪৯টি ওয়ানডে ও ১৩০টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেছেন ম্যাক্সওয়েল। তিন সংস্করণ মিলিয়ে তাঁর রান ৭ হাজার ২২৬, উইকেট ১৩৬টি। ওয়ানডেতে করেছেন ৩ হাজার ৯৯০ রান, টি-টোয়েন্টিতে ২ হাজার ৮৯৭। টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে তাঁর পাঁচটি সেঞ্চুরি। এই রেকর্ডে ভারতের রোহিত শর্মার সঙ্গে যৌথভাবে সবার ওপরে তিনি।
.কোচ বদলিয়েও টাকা ছড়ানোর স্বভাব গেল না ম্যানচেস্টার সিটির.
তবে ম্যাক্সওয়েলকে শুধু এই পরিসংখ্যান দিয়ে চেনা কঠিন। তাঁর ব্যাটিংয়ের ধরনই ছিল আলাদা। মাঠের যেকোনো দিকে শট খেলতে পারতেন তিনি। প্রচলিত ব্যাটিংয়ের বাইরে গিয়ে কখনো রিভার্স সুইপ, কখনো সুইচ হিট, আবার কখনো অদ্ভুত সব ভঙ্গিতে বল সীমানার বাইরে পাঠাতেন। ডানহাতি ব্যাটসম্যান হলেও তাঁর শটের বৈচিত্র্য ছিল চোখে পড়ার মতো। অফ স্পিন বোলিংয়ের পাশাপাশি দুর্দান্ত ফিল্ডিংয়েও দলের কাজে আসতেন। এ কারণেই তিনি পরিচিতি পেয়েছিলেন ‘দ্য বিগ শো’ নামে।
ম্যাক্সওয়েলের ক্যারিয়ারের কথা উঠলে সবার আগে মনে পড়বে ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে আফগানিস্তানের বিপক্ষে তাঁর ২০১ রানের অপরাজিত ইনিংস। অনেকের চোখে এটি ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে অন্যতম সেরা ইনিংস। শুধু রানসংখ্যার জন্য নয়, যেভাবে তিনি দলকে অসম্ভব জায়গা থেকে জিতিয়ে এনেছিলেন, সে কারণেই ইনিংসটি আলাদা হয়ে থাকবে।
ক্রিকেটে এমন পরিস্থিতি থেকে জেতা খুব কঠিন। সাধারণত এ অবস্থায় ব্যাটসম্যানরা চেষ্টা করেন যত বেশি সম্ভব সময় উইকেটে থাকতে; কিন্তু ম্যাক্সওয়েল শুধু টিকে থাকেননি, রানও তুলেছেন দ্রুত। একের পর এক চার-ছক্কায় আফগান বোলারদের চাপে ফেলে দেন। অন্য প্রান্তে ছিলেন অধিনায়ক প্যাট কামিন্স। দুই ব্যাটসম্যান মিলে অষ্টম উইকেটে ২০২ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়েন। কামিন্সের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একদিকে তিনি উইকেট ধরে রেখেছেন, অন্যদিকে ম্যাক্সওয়েলকে আক্রমণ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দিয়েছেন।
ম্যাক্সওয়েল শেষ পর্যন্ত ১২৮ বলে ২০১ রান করে অপরাজিত থাকেন। সেই ম্যাচে ২১টি চার ও ১০টি ছক্কা হাকিয়েছেন তিনি। অস্ট্রেলিয়া ৪৬.৫ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে লক্ষ্যে পৌঁছে যায়। হাতে থাকে ১৯ বল। বিশ্বকাপের ইতিহাসে রান তাড়া করতে নেমে সেটিই হয়ে ওঠে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংস। আর অস্ট্রেলিয়ার পুরুষ ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রথম দ্বিশতকও করেন ম্যাক্সওয়েল।
ইনিংসটির সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল তাঁর শারীরিক অবস্থা। ব্যাটিংয়ের সময় প্রচণ্ড পেশির টানে ভুগছিলেন ম্যাক্সওয়েল। পায়ের পেশি, হ্যামস্ট্রিং, এমনকি পিঠেও সমস্যা হচ্ছিল। একসময় ঠিকমতো দৌড়াতেও পারছিলেন না। তবু উইকেট ছাড়েননি। অনেক সময় এক পায়ে দাঁড়িয়েই শট খেলেছেন। রান নেওয়ার বদলে বাউন্ডারিতে জোর দিয়েছেন। প্যাট কামিন্সও অন্য প্রান্তে ধৈর্য ধরে সঙ্গ দিয়েছেন। দুজনের সেই জুটিই ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
.দ্বিতীয়বার ফিরে কীভাবে রিয়ালকে সাজাচ্ছেন মরিনহো?.
আফগানিস্তানের বিপক্ষে দ্বিশতকই ২০২৩ বিশ্বকাপে ম্যাক্সওয়েলের একমাত্র স্মরণীয় কীর্তি নয়। এর আগে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষেও খেলেছিলেন দুর্দান্ত এক ইনিংস। দিল্লির অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে সেদিন মাত্র ৪০ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন তিনি। শেষ পর্যন্ত ৪৪ বলে ১০৬ রান করেন। সেটি ছিল পুরুষদের ওয়ানডে বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্রুততম সেঞ্চুরি। এই ইনিংসে ছিল ৯টি চার ও ৮টি ছক্কা।
বিশ্বকাপের একই আসরে একজন ব্যাটসম্যানের কাছ থেকে এমন দুটি ইনিংস পাওয়া বিরল ঘটনা। তবে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ম্যাক্সওয়েলের প্রথম বড় সাফল্য আসে ২০১৫ ওয়ানডে বিশ্বকাপে। সেবার নিজেদের মাঠে বিশ্বকাপ জেতে অস্ট্রেলিয়া। পুরো টুর্নামেন্টে ব্যাট হাতে ভালো করেছেন তিনি। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে করেন ৬৬ রান। আফগানিস্তানের বিপক্ষে করেন ৩৯ বলে ৮৮। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে তাঁর প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি আসে মাত্র ৫৩ বলে ১০২ রানের ইনিংসে।
শুধু ব্যাটিং নয়, বল হাতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিলেন ম্যাক্সওয়েল। অস্ট্রেলিয়ার হয়ে বেশির ভাগ ম্যাচে তিনিই ছিলেন মূল স্পিনার। পাকিস্তানের বিপক্ষে কোয়ার্টার ফাইনালে মিসবাহ-উল-হক ও উমর আকমলের গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নেন। ফাইনালে নিউজিল্যান্ডের মার্টিন গাপটিলকে আউট করেন। অর্থাৎ ২০১৫ সালের বিশ্বকাপ জয়ে তাঁর অবদান ছিল ব্যাটিং-বোলিং দুই দিকেই।
এরপর ২০২১ সালে অস্ট্রেলিয়ার প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপজয়ী দলের সদস্য হন ম্যাক্সওয়েল। ২০২৩ সালে আবার ওয়ানডে বিশ্বকাপ জেতেন। ফলে তাঁর আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে রয়েছে দুটি ওয়ানডে বিশ্বকাপ ও একটি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা। তিনটি বিশ্বকাপজয়ী দলের অংশ হওয়াও তাঁর ক্যারিয়ারের বড় অর্জন।
ম্যাক্সওয়েলের ব্যাটিংয়ের সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল দ্রুত রান তোলার ক্ষমতা। বিশেষ করে টি-টোয়েন্টিতে তিনি ছিলেন অস্ট্রেলিয়ার অন্যতম আক্রমণাত্মক ব্যাটসম্যান। ১৩০টি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচে করেছেন ২ হাজার ৮৯৭ রান। তাঁর ব্যাটিং স্ট্রাইক রেট ১৫৪-এর বেশি। অর্থাৎ প্রতি ১০০ বল খেলে গড়ে ১৫৪ রানের মতো তুলেছেন। টি-টোয়েন্টির মতো ছোট সংস্করণে এই স্ট্রাইক রেট বেশ ভালো।
এই সংস্করণে তাঁর সর্বোচ্চ ইনিংস ১৪৫ রানের অপরাজিত। ২০১৬ সালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সেই ইনিংস খেলেছিলেন তিনি। মাত্র ৬৫ বলে ১৪৫ রান করে ম্যাচটি একাই প্রায় অস্ট্রেলিয়ার পক্ষে নিয়ে এসেছিলেন। পাঁচটি টি-টোয়েন্টি সেঞ্চুরি করার কীর্তিও তাঁর। ব্যাটিংয়ের পাশাপাশি টি-টোয়েন্টিতে নিয়েছেন ৫১টি উইকেট।
টেস্ট ক্রিকেটে অবশ্য তাঁর ক্যারিয়ার খুব বড় হয়নি। খেলেছেন মাত্র সাতটি ম্যাচ। করেছেন ৩৩৯ রান, আছে একটি সেঞ্চুরিও; কিন্তু সীমিত ওভারের ক্রিকেটে তাঁর প্রভাব ছিল অনেক বেশি। ওয়ানডেতে প্রায় ১২৭ এবং টি-টোয়েন্টিতে ১৫৪-এর বেশি স্ট্রাইক রেটেই বোঝা যায়, তিনি কতটা আক্রমণাত্মক ছিলেন। তাঁর মতো ব্যাটসম্যান দলের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, তা হয়তো আর আলাদাভাবে বলতে হবে না।
.ক্রিকেটের পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট হতে হলে কী করতে হবে.
ওয়ানডে ক্রিকেট থেকে ম্যাক্সওয়েল অবসর নিয়েছিলেন ২০২৫ সালের জুনে। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির সেমিফাইনালে ভারতের বিপক্ষেই ছিল তাঁর শেষ ওয়ানডে। এরপরও টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট চালিয়ে গেছেন। ২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে খেলেছেন। ওমানের বিপক্ষে ম্যাচটিই হয়ে থাকবে তাঁর শেষ আন্তর্জাতিক ম্যাচ। ওই বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়া গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নেয়।
অবসরের কারণ হিসেবে বয়সের কথা সরাসরি বলেননি ম্যাক্সওয়েল। তবে শরীরের যত্ন নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথা জানিয়েছেন। হাঁটুর চিকিৎসা ও পুনর্বাসনেও সময় দিতে চান তিনি। দ্য ফাইনাল ওয়ার্ড পডকাস্টে তিনি বলেন, ‘ক্যারিয়ারের বাকি টুর্নামেন্টগুলো খেলতে হলে শরীরের দিকে আরও মনোযোগ দিতে হবে।’
ভিক্টোরিয়া রাজ্যের হয়ে শেষ ওয়ানডে ম্যাচের পর সতীর্থদের সামনে অবসরের কথা জানানোও তাঁর জন্য সহজ ছিল না। দীর্ঘদিন ধরে যাঁদের সঙ্গে খেলেছেন, যাঁদের কাছ থেকে সমর্থন পেয়েছেন, তাঁদের সামনে বিদায়ের কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েছিলেন তিনি।
তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ছাড়লেও ম্যাক্সওয়েলকে আর ব্যাট হাতে দেখা যাবে না, তা নয়। অস্ট্রেলিয়ার বিগ ব্যাশ লিগে মেলবোর্ন স্টার্সের হয়ে খেলবেন তিনি। ২০২৭-২৮ মৌসুমের শেষ পর্যন্ত দলটির সঙ্গে তাঁর চুক্তি রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন দেশের ফ্র্যাঞ্চাইজি টি-টোয়েন্টি টুর্নামেন্টেও খেলার সুযোগ থাকবে।
ম্যাক্সওয়েলের ক্যারিয়ারকে শুধু রান, উইকেট বা সেঞ্চুরির হিসাব দিয়ে মাপা কঠিন। তিনি মাঠে এমন কিছু করেছেন, যা আগে খুব বেশি দেখা যায়নি। ব্যাটিংয়ের প্রচলিত নিয়ম ভেঙে নতুন ধরনের শট খেলেছেন, কঠিন পরিস্থিতিতে ম্যাচ জিতিয়েছেন, আবার বল হাতেও দলের প্রয়োজনে উইকেট নিয়েছেন। তাঁর খেলার ধরন অনেক তরুণ ব্যাটসম্যানকে আক্রমণাত্মক ক্রিকেট খেলতে উৎসাহিত করেছে।
২০১৫ ও ২০২৩ সালের বিশ্বকাপ জয়, ২০২১ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের শিরোপা, পাঁচটি টি-টোয়েন্টি সেঞ্চুরি—সব মিলিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেটে তাঁর অবদান গুরুত্বপূর্ণ হয়েই থাকবে।
সূত্র: আইসিসি, ক্রিকবাজ ও ক্রিকেট অস্ট্রেলিয়া
.লিওনেল মেসি: লাল কার্ড দিয়ে শুরু, লেজার শোতে শেষ