
‘রিসোর্স কার্স’ বা সম্পদের অভিশাপ হলো এমন একটি অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক পরিস্থিতি, যেখানে প্রচুর প্রাকৃতিক সম্পদ (যেমন তেল, গ্যাস, সোনা বা হীরা) থাকা সত্ত্বেও কোনো দেশ কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক উন্নয়ন অর্জন করতে পারে না; বরং অর্থনৈতিক মন্দা, অস্থিতিশীলতা ও দুর্নীতির শিকার হয়। একে অনেক সময় ‘প্যারাডক্স অব প্লেন্টি’ বা প্রাচুর্যের প্যারাডক্স বলা হয়। চট্টগ্রাম বন্দর নিয়ে বাংলাদেশ কি এমন প্যারাডক্সের শিকার?
একটি বন্দরের গভীরতা মাপা হয় তার নাব্যতায়, কিন্তু রাষ্ট্রের গভীরতা বোঝা যায় তার সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতায়। চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ১৫ বছরের জন্য বিদেশি প্রতিষ্ঠানের হাতে পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার প্রশ্নটি কেবল তাই দক্ষতা, বিনিয়োগ কিংবা মুনাফার নয়; প্রশ্নটি রাষ্ট্রীয় সম্পদের ওপর জনগণের অধিকার এবং সেই সম্পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে গণতান্ত্রিক জবাবদিহিরও।
.চট্টগ্রাম বন্দর: আমাদের সোনার ডিম পাড়া রাজহাঁসটি….
সম্প্রতি সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা নিয়ে চুক্তি হয়েছে। কিন্তু এত বড় একটি জাতীয় অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত সংসদে আলোচনা হলো না কেন? চুক্তির শর্ত, রাষ্ট্রের আর্থিক লাভ-ক্ষতি, বন্দরের শত শত শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্নগুলো নিয়ে সংসদে অর্থবহ বিতর্কের প্রয়োজন বোধ করা হলো না কেন?
এই প্রশ্ন বিদেশি বিনিয়োগের বিরোধিতা থেকে নয়; বরং বিনিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে গণতান্ত্রিক জবাবদিহির দাবি থেকেই উঠছে। চুক্তি আইনগতভাবে বৈধ হতে পারে, কিন্তু তাই বলে তার প্রতিটি সিদ্ধান্ত স্বয়ংক্রিয়ভাবে জনস্বার্থের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যায় না। বিশেষত যে সিদ্ধান্তের প্রভাব বর্তমান সরকারের মেয়াদ ছাড়িয়ে পরবর্তী দেড় দশক পর্যন্ত বিস্তৃত হবে, সে ক্ষেত্রে সংসদে আলোচনা কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়—এটি রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের অংশ।
.বিদেশি কোম্পানিকে বন্দর ব্যবস্থাপনার ইজারা দেওয়ার ঝুঁকিগুলো কী.
চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো জরুরি। জাহাজের অপেক্ষা, কনটেইনার খালাসে বিলম্ব, কাস্টমসের দীর্ঘসূত্রতা এবং সড়ক-রেল যোগাযোগের সীমাবদ্ধতা আমদানি-রপ্তানির ব্যয় বাড়ায়। আন্তর্জাতিক অপারেটরের প্রযুক্তি, অভিজ্ঞতা ও পেশাদার ব্যবস্থাপনা এসব সমস্যার কিছু সমাধান করতে পারে। বিদেশি প্রতিষ্ঠান মানেই জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী—এমন সরল সিদ্ধান্ত গ্রহণেরও কারণ নেই। কিন্তু বিদেশি অপারেটর নিয়োগের পক্ষে যুক্তি থাকলেই নির্দিষ্ট একটি প্রতিষ্ঠানকে নির্দিষ্ট শর্তে দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনার দায়িত্ব দেওয়ার সিদ্ধান্ত প্রশ্নের ঊর্ধ্বে উঠে যায় না। বরং বিনিয়োগের প্রয়োজন যত বেশি, চুক্তির স্বচ্ছতা ও প্রতিযোগিতার গুরুত্বও তত বেশি।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, এনসিটি পরিচালনা ও আধুনিকায়নে ডিপি ওয়ার্ল্ডের ১৫ কোটি ডলার বিনিয়োগ করার কথা। এর মধ্যে পাঁচ কোটি ডলার এককালীন অর্থ হিসেবে বন্দর কর্তৃপক্ষকে দেওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তির মেয়াদ ১৫ বছর। রাজস্ব ভাগাভাগির ব্যবস্থায় বন্দর কর্তৃপক্ষ কনটেইনারপ্রতি আয়ের ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পেতে পারে বলে জানানো হয়েছে; এর বাইরে বার্ষিক নির্ধারিত ফি পাওয়ার কথাও প্রকাশিত হয়েছে।
.
এসব তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এগুলোই পুরো চুক্তির মূল্যায়নের জন্য যথেষ্ট নয়। বিনিয়োগের অর্থের পাশাপাশি জানতে হবে, টার্মিনালটির বর্তমান আয় ও ব্যয় কত, নতুন ব্যবস্থায় নিট আয় কীভাবে নির্ধারিত হবে, পরিচালন ব্যয় কে বহন করবে, মাশুল পরিবর্তনের ক্ষমতা কার হাতে থাকবে এবং চুক্তির মেয়াদ শেষে সম্পদ ও প্রযুক্তি কী অবস্থায় রাষ্ট্রের কাছে ফিরে আসবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, এনসিটি এমন একটি সচল টার্মিনাল, যেখানে ইতিমধ্যে বিপুল সরকারি বিনিয়োগ রয়েছে। প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, নির্মাণ ও যন্ত্রপাতি স্থাপনসহ এতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ২ হাজার ৭১২ কোটি টাকা। গত অর্থবছরে এখানে ১৩ লাখ ৮৫ হাজার একক কনটেইনার ওঠানো-নামানো হয়েছে। তাহলে এই বিদ্যমান সক্ষমতার আর্থিক মূল্যায়ন কীভাবে করা হয়েছে? দেশীয় ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা অব্যাহত রাখার বিকল্পটি কি সমান গুরুত্ব দিয়ে যাচাই করা হয়েছিল? রাষ্ট্রকে শুধু সম্ভাব্য আয় দেখলেই চলবে না; বিকল্প ব্যবস্থায় কত আয় হতে পারত, সেটিও হিসাব করতে হবে।
.
এখানেই বিষয়টি একটি বাণিজ্যিক চুক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে গণতান্ত্রিক শাসনের প্রশ্নে পরিণত হয়। সংসদ রাষ্ট্রের বাজেট, ব্যয়, নীতি ও নির্বাহী বিভাগের জবাবদিহি নিশ্চিত করার প্রধান প্রতিষ্ঠান। প্রতিটি বাণিজ্যিক চুক্তি সংসদে অনুমোদন করতেই হবে—এমন দাবি আইনগত ভিত্তি ছাড়া করা সমীচীন নয়। কিন্তু দেশের বৃহত্তম কনটেইনার টার্মিনালের মতো কৌশলগত সম্পদের দীর্ঘমেয়াদি পরিচালনা নিয়ে সংসদে আলোচনা হওয়া উচিত কি না, সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রশ্ন। গণতান্ত্রিক জবাবদিহির বিচারে এর উত্তর স্পষ্টতই ‘হ্যাঁ’।
উল্লেখ্য, বাংলাদেশের সংবিধানের ১৪৫ক অনুচ্ছেদে বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তি সংসদে উপস্থাপনের বিধান রয়েছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করতে হবে: সংসদে আলোচনা করার রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক প্রয়োজনীয়তা এবং আলোচনা করার আইনগত বাধ্যবাধকতা এক নয়। বন্দরটির কৌশলগত গুরুত্বের কারণে সংসদীয় জবাবদিহির প্রশ্নটি জোরালো; কিন্তু সেই গুরুত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা সৃষ্টি করে না।
তবে সংসদে আলোচনা হলে সরকারকে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর দিতে হতো। কেন এই টার্মিনালের জন্য উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের পরিবর্তে নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তির পথ বেছে নেওয়া হলো? দেশীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তাব কেন বিবেচনায় নেওয়া হয়নি? বিনিয়োগ, রাজস্ব, প্রযুক্তি, শ্রমিকের অধিকার ও নিরাপত্তার নিরিখে বিকল্প প্রস্তাবগুলোর তুলনামূলক মূল্যায়ন হয়েছে কি না? চুক্তির কোন ধারাগুলো প্রকাশ করা যাবে না এবং কেন? এসব প্রশ্ন সরকারের বিরোধিতা করার জন্য নয়; সরকারের সিদ্ধান্তকে জনস্বার্থের বিচারে যাচাই করার জন্যই প্রয়োজন।
.
চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিক করতে হবে—এ নিয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই; বিদেশি বিনিয়োগও প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু আধুনিকায়নের নামে জবাবদিহি দুর্বল করা কিংবা দক্ষতার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ক্ষয় হতে দেওয়া যাবে না। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সংসদে আলোচিত না হওয়া তাই শুধু একটি প্রক্রিয়াগত ঘাটতি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তোলে। উন্নয়ন যদি জনস্বার্থে হয়, তবে সেই উন্নয়নের যুক্তি জনগণের প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরতে অসুবিধা কোথায়?
.
জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ নিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংসদকে কেবল তথ্য উপস্থাপনের ‘মঞ্চ’ হিসেবে দেখলে চলবে না; সংসদীয় বিতর্ক নির্বাহী বিভাগের সিদ্ধান্ত যাচাই–বাছাই করার সুযোগ দেয়, বিরোধী দলকে বিকল্প যুক্তি তুলে ধরতে সাহায্য করে এবং জনগণকে সিদ্ধান্তের পক্ষে-বিপক্ষে যুক্তি বুঝতে দেয়। চুক্তির সব বাণিজ্যিক ধারা প্রকাশ করা সম্ভব না হলেও অন্তত তার মূল আর্থিক কাঠামো, রাষ্ট্রীয় দায়, ঝুঁকি, নিয়ন্ত্রণ এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে সংসদে আলোচনা হতে পারত। বাণিজ্যিক কৌশলগত গোপনীয়তার প্রয়োজন থাকতে পারে; কিন্তু গোপনীয়তা যেন জবাবদিহি এড়িয়ে যাওয়ার আশ্রয় না হয়ে ওঠে।
এখানে ‘পাবলিক ট্রাস্ট ডকট্রিন’ বা জনসম্পদের বিষয়ে রাষ্ট্রের ন্যস্ত দায়িত্বের মতবাদ একটি প্রাসঙ্গিক ধারণা। এই মতবাদের মূল বক্তব্য হলো, জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট সম্পদ পরিচালনায় রাষ্ট্র কেবল মালিকের মতো ইচ্ছামতো সিদ্ধান্ত নেওয়ার অধিকারী নয়; তাকে জনগণের স্বার্থ রক্ষার দায়িত্বশীল অভিভাবক হিসেবেও কাজ করতে হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের মতো কৌশলগত অবকাঠামোর ক্ষেত্রে এই ধারণা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, এর পরিচালনার দায়িত্ব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়া হলেও জনস্বার্থ রক্ষার দায়িত্ব রাষ্ট্র এড়িয়ে যেতে পারে না।
.
বন্দর পরিচালনায় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি ব্যবস্থা। বিশ্বব্যাংকের বন্দর সংস্কারবিষয়ক প্রকাশনা এবং আন্তর্জাতিক বন্দর পরিচালনার অভিজ্ঞতা দেখায়, সরকারি মালিকানা বজায় রেখেও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে টার্মিনাল পরিচালনা করা যায়। বিশ্বের বহু বন্দরে এ ধরনের ব্যবস্থায় দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতা বেড়েছে।
কিন্তু বন্দর পরিচালনার মডেল আর অপারেটর নিয়োগের পদ্ধতি এক বিষয় নয়। ‘ল্যান্ডলর্ড মডেল’–এ সরকারি কর্তৃপক্ষ জমি ও মৌলিক অবকাঠামোর মালিক থাকে, আর বেসরকারি প্রতিষ্ঠান চুক্তির অধীনে বিনিয়োগ ও পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এই মডেল উন্মুক্ত প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের মাধ্যমেও বাস্তবায়ন করা সম্ভব। তাই বিদেশি অপারেটর নিয়োগের সিদ্ধান্তকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দক্ষতার সমার্থক ধরে নেওয়া উচিত নয়।
চট্টগ্রাম বন্দরের সমস্যা শুধু টার্মিনালের ভেতরে সীমাবদ্ধ নয়; জাহাজকে জেটিতে ভেড়ানোর অপেক্ষা, নদীর নাব্যতা, কাস্টমসের ছাড়পত্র, পণ্য খালাসের দীর্ঘসূত্রতা এবং সড়ক-রেল যোগাযোগের দুর্বলতা সামগ্রিক দক্ষতাকে প্রভাবিত করে। একটি অপারেটর টার্মিনালের ভেতরে কনটেইনার ওঠানো-নামানোর গতি বাড়াতে পারে, কিন্তু কাস্টমসের প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা বন্দরের বাইরের যানজট তার পক্ষে দূর করা সম্ভব নয়।
তাই বিদেশি প্রতিষ্ঠানকে দায়িত্ব দেওয়ার পাশাপাশি কাস্টমসের ডিজিটালাইজেশন, রেল ও নৌপথে কনটেইনার পরিবহন বৃদ্ধি, বন্দরের তথ্যব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানের দক্ষতা বাড়াতে হবে। রাষ্ট্রের সক্ষমতা দুর্বল রেখে বিদেশি কোম্পানির দক্ষতার ওপর নির্ভরতা বাড়ালে একসময় চুক্তিতে রাষ্ট্রীয় অধিকার থাকলেও বাস্তবে তা আদায় করা কঠিন হবে।
.
জিবুতির ডোরালেহ কনটেইনার টার্মিনাল নিয়ে ডিপি ওয়ার্ল্ড ও জিবুতি সরকারের বিরোধ একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক দৃষ্টান্ত। দীর্ঘমেয়াদি কনসেশন চুক্তি নিয়ে বিরোধের পর ২০১৮ সালে জিবুতি সরকার চুক্তিটি বাতিল করে টার্মিনালের নিয়ন্ত্রণ নেয়। এরপর বিরোধ আন্তর্জাতিক সালিস ও আদালত পর্যন্ত গড়ায়। বিভিন্ন আইনি পর্যায়ে চুক্তিভঙ্গ, সালিসি সিদ্ধান্তের স্বীকৃতি এবং প্রতিকারের প্রশ্ন সামনে আসে।
এ অভিজ্ঞতা থেকে ডিপি ওয়ার্ল্ডকে ভালো বা খারাপ প্রতিষ্ঠান হিসেবে চিহ্নিত করার প্রয়োজন নেই; বরং শিক্ষা হলো, বন্দর পরিচালনার চুক্তি কখনো কখনো রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক দায় ও আন্তর্জাতিক আইনি জটিলতার উৎস হয়ে উঠতে পারে। যে বিষয়টা মনে রাখতে হবে—সরকার বদলায়, নীতির অগ্রাধিকার বদলায়, কিন্তু রাষ্ট্রের করা চুক্তির দায় সহজে শেষ হয় না।
সুতরাং, এনসিটির চুক্তিতে বিরোধ নিষ্পত্তি, সালিসের স্থান, প্রযোজ্য আইন, চুক্তি বাতিলের শর্ত, ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ, জাতীয় নিরাপত্তার প্রয়োজনে রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ এবং জরুরি পরিস্থিতিতে পরিচালনার নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নেওয়ার বিধান কী—এসব জানা জরুরি। শুধু চুক্তিতে রাষ্ট্রের অধিকার লেখা থাকলেই হবে না; সেই অধিকার কার্যকর করার মতো দক্ষ আইনগত ও প্রশাসনিক সক্ষমতাও থাকতে হবে।
.
এনসিটি নিয়ে শ্রমিক সংগঠনগুলোর উদ্বেগ উপেক্ষা করা যায় না। সরকার বলেছে, বিদ্যমান কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরি হারানোর আশঙ্কা নেই এবং আধুনিকায়নের ফলে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়তে পারে। এই আশ্বাস বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করবে চুক্তির শর্ত ও বাস্তবায়নের ওপর। শ্রমিকদের চাকরির নিরাপত্তা, প্রশিক্ষণ, কর্মপরিবেশ এবং প্রযুক্তিগত পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের উদ্বেগও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে। অপারেটরের দক্ষতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাশুল বেড়ে গেলে আমদানি-রপ্তানির ব্যয় বাড়তে পারে। শেষ পর্যন্ত সেই ব্যয়ের চাপ ভোক্তা ও উৎপাদককেই বহন করতে হবে।
তাই দক্ষতার মূল্যায়ন শুধু ঘণ্টায় কতটি কনটেইনার ওঠানো-নামানো হলো, তা দিয়ে করা যাবে না। দেখতে হবে, বন্দরের সেবার মান কতটা বাড়ল, জাহাজের অপেক্ষা কমল কি না, ব্যবসার ব্যয় কমল কি না, শ্রমিকের অধিকার সুরক্ষিত থাকল কি না এবং রাষ্ট্রের নিট আয় কতটা বাড়ল।
.
বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব চুক্তির মাধ্যমে দেওয়া যায়। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তের দায় কোনো অপারেটরের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। সেই দায় সরকারের, সংসদের এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের। চট্টগ্রাম বন্দরের প্রশ্নে তাই বিতর্কটি বিদেশি বনাম দেশি নয়। আসল প্রশ্ন, দক্ষতা অর্জনের পথে রাষ্ট্র কতটা স্বচ্ছ, কতটা জবাবদিহিমূলক এবং নিজের স্বার্থ রক্ষায় কতটা সক্ষম। কারণ, বন্দর বিদেশি কোম্পানির ইজারা দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব, জনগণের অধিকার ও জাতীয় স্বার্থকে ইজারা দেওয়া যায় না।
.
চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার পর সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হলো জন–আস্থা নিশ্চিত করা। জাতীয় নিরাপত্তা বা বাণিজ্যিক গোপনীয়তার কারণে যেসব তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব নয়, সেগুলো যুক্তিসংগতভাবে সংরক্ষণ করা যেতে পারে। কিন্তু বিনিয়োগ, রাজস্ব ভাগাভাগি, মাশুল নির্ধারণ, কর্মদক্ষতার লক্ষ্যমাত্রা, শ্রমিকের অধিকার, চুক্তি বাতিল এবং ক্ষতিপূরণের মূল শর্ত জনগণের কাছ থেকে আড়াল রাখা উচিত নয়।
সরকারের উচিত সংসদে চুক্তির মূল বিষয়গুলো উপস্থাপন করা এবং সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটির মাধ্যমে এর আর্থিক, আইনগত, নিরাপত্তা ও শ্রম–সংক্রান্ত বিভিন্ন দিক পর্যালোচনার ব্যবস্থা করা। স্বাধীন নিরীক্ষার মাধ্যমে চুক্তির আর্থিক সুবিধা ও ঝুঁকি যাচাই করতে হবে। নির্দিষ্ট সময় অন্তর অপারেটরের কর্মদক্ষতা মূল্যায়নের ফলাফলও প্রকাশ করা উচিত।
চট্টগ্রাম বন্দরকে আধুনিক করতে হবে—এ নিয়ে দ্বিমতের অবকাশ নেই; বিদেশি বিনিয়োগও প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু আধুনিকায়নের নামে জবাবদিহি দুর্বল করা কিংবা দক্ষতার প্রতিশ্রুতির বিনিময়ে রাষ্ট্রীয় সক্ষমতার ক্ষয় হতে দেওয়া যাবে না। দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরের দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি সংসদে আলোচিত না হওয়া তাই শুধু একটি প্রক্রিয়াগত ঘাটতি নয়; এটি রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত গ্রহণের ধরন নিয়ে মৌলিক প্রশ্ন তোলে। উন্নয়ন যদি জনস্বার্থে হয়, তবে সেই উন্নয়নের যুক্তি জনগণের প্রতিনিধিদের সামনে তুলে ধরতে অসুবিধা কোথায়?
.
বন্দর পরিচালনার দায়িত্ব চুক্তির মাধ্যমে দেওয়া যায়। কিন্তু দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্তের দায় কোনো অপারেটরের হাতে ছেড়ে দেওয়া যায় না। সেই দায় সরকারের, সংসদের এবং শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রের। চট্টগ্রাম বন্দরের প্রশ্নে তাই বিতর্কটি বিদেশি বনাম দেশি নয়। আসল প্রশ্ন, দক্ষতা অর্জনের পথে রাষ্ট্র কতটা স্বচ্ছ, কতটা জবাবদিহিমূলক এবং নিজের স্বার্থ রক্ষায় কতটা সক্ষম। কারণ, বন্দর বিদেশি কোম্পানির ইজারা দেওয়া যেতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব, জনগণের অধিকার ও জাতীয় স্বার্থকে ইজারা দেওয়া যায় না।
[email protected]
*মতামত লেখকের নিজস্ব