
তেহরিক–ই–ইনসাফের (পিটিআই) লংমার্চ ঘিরে পাকিস্তানে রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধির মধ্যে ক্ষমতাসীন জোটের দুই প্রধান শরিক—পিএমএল-এন ও পিপিপির শীর্ষ নেতারা গতকাল শনিবার অশান্ত খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশকে কেন্দ্রের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেছেন। এ জন্য সংবিধান অনুযায়ী জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির বিধানকে কাজে লাগানো হবে। বিষয়টির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে ডন এ তথ্য জানিয়েছে।
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ আজ রোববার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক ডেকেছেন। বৈঠকে এ পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। ক্ষমতাসীন জোটের নেতারা আগামী মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) জাতীয় পরিষদ ও সিনেটের পৃথক অধিবেশন আহ্বানের সিদ্ধান্তও নিয়েছেন।
গতকাল শনিবার পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে দিনভর নানা রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা গেছে। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ পৃথকভাবে প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-ফজল (জেইউআই-এফ)–এর প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। খাইবার পাখতুনখাওয়ায় পিটিআইয়ের সঙ্গে সরাসরি সংঘাত এড়াতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া যায়, বৈঠকগুলোতে তা নিয়ে আলোচনা হয়।
খাইবার পাখতুনখাওয়ায় কারাবন্দী সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) ক্ষমতায়।
পাকিস্তানের সরকার ও বিরোধী দল পিটিআইয়ের মধ্যে আলোচনা এগিয়ে নিতে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছেন মাওলানা ফজলুর রহমান। তিনি পিটিআইয়ের চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার গওহর আলী খান ও আসাদ কায়সারের সঙ্গেও বৈঠক করেন। পিটিআই লংমার্চ চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে অনড় থাকলে সরকার কী পদক্ষেপ নিতে পারে, বৈঠকে তিনি তাঁদের তা জানান।
প্রধানমন্ত্রী ও পিটিআই নেতাদের সঙ্গে মাওলানা ফজলুর রহমানের বৈঠকের পর জেইউআই-এফের একজন জ্যেষ্ঠ নেতা বলেন, ‘চলমান উত্তেজনা কমাতে আমরা শুধু আলোচনা এগিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছি। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত সরকার ও পিটিআইকেই নিতে হবে।’
খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশ কেন্দ্রের শাসনে নেওয়া হবে কি না, সে বিষয়ে পাকিস্তান সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে এখনো কিছু জানানো হয়নি। তবে কয়েকজন মন্ত্রীর বক্তব্য এবং পিপিপির কয়েকজন নেতার সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনায় পাওয়া তথ্য থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, খাইবার পাখতুনখাওয়া নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিতে শাহবাজ সরকার সংবিধানের ২৩২, ২৩৩ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদের বিভিন্ন বিধান প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর মাধ্যমে মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদিকেও সরিয়ে দেওয়া হবে।
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি বিষয়টি নিয়ে অনেকটা স্পষ্ট করে কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, ‘খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি করা এড়ানোর আর কোনো সুযোগ নেই।’
সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নাকভি বলেন, সরকার সম্ভাব্য সব ধরনের চেষ্টা করেছে। কিন্তু পিটিআইকে দেওয়ার মতো আর কিছুই তাদের হাতে নেই।
নাকভি বলেন, ‘আমি কতটা চেষ্টা করেছি, তা মাওলানা ফজলুর রহমানের কাছ থেকেই জেনে নিন। এ বিষয়ে আমি যে চেষ্টা করেছি, তা নিশ্চিত করতে ব্যারিস্টার গওহরের সঙ্গেও কথা বলতে পারেন। শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত আমি সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছি। কিন্তু এখন আর আমার হাতে কিছুই নেই।’
এ বিষয়ে জানতে ডন থেকে যোগাযোগ করা হলে তথ্যমন্ত্রী আতাউল্লাহ তারার নিশ্চিত করে বলেন, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারির সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে প্রধানমন্ত্রী আজ রোববার কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার বৈঠক ডেকেছেন।
খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারির বিষয়ে সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে তথ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘রোববার (সাপ্তাহিক ছুটির দিন) মন্ত্রিসভার বৈঠক ডাকার অর্থ কী, তা আপনারা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।’
একইভাবে, একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী বলেন, বিভিন্ন পর্যায়ে একাধিক বিকল্প নিয়ে আলোচনা চলছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে আর কী পথ খোলা আছে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন তালাল চৌধুরী। তাঁর ভাষ্য, সন্ত্রাসবিরোধী লড়াইয়ে সহযোগিতা করতে কেন্দ্রীয় সরকারের বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও পিটিআই তা মেনে চলেনি। বরং চলমান লংমার্চের সময় তারা মানুষকে উসকে দিচ্ছে এবং জাতীয় নীতির বিরোধিতা করে বক্তব্য দিচ্ছে।
কারাবন্দী পিটিআই নেতা এবং পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে তাঁর দলের নেতা–কর্মীরা পাখতুনখাওয়া প্রদেশ থেকে ৪ অক্টোবর রাজধানী ইসলামাবাদ অভিমুখী লংমার্চ শুরু করেছে। যদিও লংমার্চ গতকাল সপ্তম দিনেও খাইবার পাখতুনখাওয়াতেই রয়েছে। ইমরানের মুক্তিসহ বিভিন্ন দাবিদাওয়া নিয়ে পিটিআই ও কেন্দ্রীয় সরকার মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছে।
খাইবার পাখতুনখাওয়া সরকারের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা ডনকে বলেছেন, পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত প্রদেশের সব জেলার ডেপুটি কমিশনার ও জেলা পুলিশ কর্মকর্তাদের নিজ নিজ জেলায় অবস্থান করতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় সরকারের এক সূত্র ডনকে বলেছেন, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারির জন্য সংবিধানের ২৩২ ও ২৩৪ অনুচ্ছেদের আওতায় একগুচ্ছ পদক্ষেপ অনুমোদন করবে কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা।
সূত্রটির ভাষায়, এটি হবে ‘দুই অনুচ্ছেদের সমন্বিত প্রয়োগ’। তাঁর মতে, সংবিধান অনুযায়ী এ ক্ষেত্রে মন্ত্রিসভার অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
সূত্রটি জানায়, এ ক্ষেত্রে গভর্নর, প্রেসিডেন্ট ও প্রধানমন্ত্রী—এই তিন পক্ষের ভূমিকা রয়েছে। অতিরিক্ত সতর্কতা হিসেবে মন্ত্রিসভার অনুমোদন নেওয়া হচ্ছে।