
ধীর আঁচে রান্না, মসলার সূক্ষ্ম ব্যবহার, বাদামের সমৃদ্ধ স্বাদ আর কত্থক ও কাওয়ালির পরিবেশনা—ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্টের মোজাইক রেস্তোরাঁয় লখনউয়ের রন্ধন ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য তুলে ধরছে সপ্তাহব্যাপী উৎসব ‘দস্তরখান-এ-আওধ’।
খাবার কখনো কখনো একটি অঞ্চলের ইতিহাস ও সংস্কৃতির পরিচয় তুলে ধরে। কোনো কাবাবের কোমলতা, বিরিয়ানির সুবাস কিংবা দুধে তৈরি মিষ্টির স্বাদে ধরা পড়ে সেই অঞ্চলের রন্ধনশৈলী, উপকরণের ব্যবহার ও খাদ্যসংস্কৃতির বিবর্তন। ভারতের ঐতিহাসিক আওধ অঞ্চলের খাবারের ঐতিহ্যও তেমন। নবাবি আভিজাত্য, আতিথেয়তা ও শৈল্পিক রুচির সংমিশ্রণে গড়ে উঠেছে লখনউয়ের স্বতন্ত্র রন্ধনধারা।
এই ঐতিহ্যকে ঢাকার ভোজনরসিকদের সামনে তুলে ধরতে ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্টের মোজাইক রেস্তোরাঁয় আয়োজন করা হয়েছে ‘দস্তরখান-এ-আওধ’। ৮ অক্টোবর সন্ধ্যায় উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে শুরু হওয়া এই উৎসব চলবে ১৭ অক্টোবর পর্যন্ত। এই উৎসবে খাবারের পাশাপাশি রয়েছে সংগীত ও নৃত্যের পরিবেশনা। উদ্বোধনী সন্ধ্যায় ছিল কত্থক নৃত্য। উৎসবজুড়ে অতিথিদের জন্য কাওয়ালি উপভোগেরও সুযোগ রয়েছে। ফলে আয়োজনটি শুধু বুফে ডিনারে সীমাবদ্ধ থাকেনি; খাবারের সঙ্গে আওধের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে যুক্ত করারও চেষ্টা করেছে।
লখনউয়ের খাবারের পরিচিত বৈশিষ্ট্য হলো ধীর আঁচে রান্না, মসলার পরিমিত ব্যবহার এবং উপকরণের স্বতন্ত্র স্বাদ বজায় রাখার প্রতি মনোযোগ। আওধি রন্ধনশৈলীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কৌশল ‘দম’। এ পদ্ধতিতে পাত্রের মুখ বন্ধ করে অল্প আঁচে খাবার রান্না করা হয়, যাতে উপকরণের স্বাদ ও সুগন্ধ ধীরে ধীরে একে অপরের সঙ্গে মিশে যায়।
ঐতিহ্যগতভাবে আওধি রান্নায় দীর্ঘ সময় ধরে মাংস মেরিনেট করা, সুগন্ধি মসলা ব্যবহার এবং রান্নার প্রতিটি ধাপে যত্ন নেওয়ার গুরুত্ব রয়েছে। বাদাম ও দুগ্ধজাত উপকরণের ব্যবহারও অনেক পদে স্বাদ ও ঘনত্ব বাড়ায়। তবে এসব বৈশিষ্ট্য সব পদে সমানভাবে প্রকাশ পায় না। উপকরণের গুণমান, মসলার ভারসাম্য এবং রান্নার কৌশলই শেষ পর্যন্ত খাবারের স্বাদ নির্ধারণ করে।
‘দস্তরখান-এ-আওধ’-এর মেনুতেও এই রন্ধনধারার নানা পরিচিত পদ রয়েছে। কাবাব, কোর্মা, বিরিয়ানি, নিরামিষ পদ ও মিষ্টির বৈচিত্র্য উৎসবটির অন্যতম আকর্ষণ।
খাবারের তালিকায় শুরুতেই নজর কাড়ে লখনউই পায়া ও মাটন গালৌটি কাবাব। গালৌটি কাবাবের প্রধান বৈশিষ্ট্য এর অত্যন্ত কোমল গঠন। মিহি করে কিমা করা মাংস, মসলার সুনির্বাচিত মিশ্রণ এবং কোমলকারী উপাদানের ব্যবহারে তৈরি হয় এই কাবাব। প্রচলিত একটি গল্প অনুযায়ী, দাঁতের সমস্যায় ভোগা এক নবাবের জন্য সহজে খাওয়া যায় এমন কাবাব তৈরির নির্দেশ থেকেই গালৌটির উদ্ভব। গল্পটির ঐতিহাসিক সত্যতা নিয়ে মতভেদ থাকলেও কাবাবটির কোমল গঠন আওধি রন্ধনশৈলীর কারিগরি দক্ষতার পরিচায়ক।মাটন গালৌটি কাবাবে মাংসের কোমলতা ও মসলার সুবাসের সমন্বয় পাওয়া যায়। অন্যদিকে লখনউই পায়ার স্বাদে প্রাধান্য পায় দীর্ঘ সময় ধরে রান্না করা মাংসের নির্যাস ও ঝোলের বৈশিষ্ট্য। দুটি পদই খাবারের শুরুতে আওধি রন্ধনশৈলীর পরিচিত স্বাদ তুলে ধরে।
মূল খাবারের আয়োজনে রয়েছে লখনউ দম আলু, জাফরানি পনির, লখনউ চিকেন কোর্মা, আওধি গোস্ত দম বিরিয়ানি, দম পোক্ত রান ও মোরাদাবাদি ডাল। মাংসের বিভিন্ন পদের পাশাপাশি নিরামিষ খাবারের উপস্থিতি মেনুতে বৈচিত্র্য এনেছে।
দম আলু ও জাফরানি পনিরে পরিচিত উপকরণের সঙ্গে লখনউয়ের মসলা ব্যবহারের ধরন মিলেছে। জাফরানের সুবাস পনিরের পদটিকে স্বতন্ত্র করেছে। দম আলুতেও মসলার ব্যবহার ও রান্নার ধরনে আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্য ফুটে ওঠে। তবে এই দুই পদের স্বাতন্ত্র্য আরও স্পষ্ট হতে পারত, যদি মসলার সূক্ষ্মতা ও উপকরণের নিজস্ব স্বাদ আরও জোরালোভাবে প্রকাশ পেত।
দম পোক্ত রানে মসলার তীব্রতা তুলনামূলক বেশি। মাংসের স্বাদ উপভোগ্য হলেও মসলার প্রাধান্য কারও কারও কাছে কিছুটা বেশি মনে হতে পারে। এ ক্ষেত্রে মসলার ভারসাম্য আরও পরিমিত হলে মাংসের নিজস্ব স্বাদও ভালোভাবে ফুটে উঠত।
অন্যদিকে আওধি গোস্ত দম বিরিয়ানিতে চাল, মাংস, মসলা ও সুগন্ধের সমন্বয় উল্লেখযোগ্য। মসলার উপস্থিতি থাকলেও তা অন্য উপকরণের স্বাদকে পুরোপুরি ছাপিয়ে যায় না। ধীর আঁচে রান্নার ফলে স্বাদ ও সুবাসের যে মেলবন্ধন তৈরি হয়, এই পদে তার পরিচয় পাওয়া যায়। মেনুর উল্লেখযোগ্য পদগুলোর মধ্যে বিরিয়ানিটি তাই বিশেষভাবে নজর কাড়ে।
মোরাদাবাদি ডালও মূল খাবারের তালিকায় একটি ভালো সংযোজন। উত্তর প্রদেশের মোরাদাবাদ অঞ্চলের এই ডাল ঘন ও মসৃণ গঠনের জন্য পরিচিত। এর ক্রিমি টেক্সচার মাংসের তুলনামূলক সমৃদ্ধ পদগুলোর পাশে স্বাদে ভিন্নতা আনে।
আওধি রন্ধনশৈলীতে বাদামের ব্যবহার গুরুত্বপূর্ণ। কাবাব, কোর্মা, গ্রেভি ও মিষ্টিতে বাদাম স্বাদ, ঘনত্ব ও সুবাসে আলাদা মাত্রা যোগ করে। সেই ধারার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পানীয়ের তালিকায় রয়েছে বাদামের শরবত। এর সমৃদ্ধ স্বাদ নবাবি খাবারের আভিজাত্যের সঙ্গে মানানসই।
তবে সমৃদ্ধ ও মসলাদার খাবারের মাঝে কাঞ্জি জিরা নিম্বু পানি বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। লেবুর টক স্বাদ ও জিরার সুবাস পানীয়টিকে সতেজ করে। ভারী খাবারের পর এমন পানীয় স্বাদের একঘেয়েমি কাটাতে সাহায্য করে। মেনুতে পানীয়টির উপস্থিতি তাই কেবল বৈচিত্র্য নয়, খাবারের সামগ্রিক অভিজ্ঞতায় ভারসাম্য আনার ক্ষেত্রেও কার্যকর।
‘দস্তরখান-এ-আওধ’-এর মিষ্টির আয়োজনও বেশ বৈচিত্র্যময়। তালিকায় রয়েছে ক্লাসিক শাহী টুকরা, জাফরানি ফিরনি, গুলাব জামুন, কেসারি বরফি, লখনউই রসমালাই, মালাই গিলোরি, নিমিশ, মালাই রোল ও জিলাপি। রং, গঠন ও পরিবেশনায় মিষ্টিগুলোর মধ্যে ভিন্নতা রয়েছে।
শাহী টুকরা উত্তর ভারতীয় মিষ্টির পরিচিত পদ। ঘিয়ে ভাজা রুটি বা পাউরুটি, ঘন দুধ, চিনি ও সুগন্ধি উপকরণের সমন্বয়ে তৈরি এই মিষ্টি সমৃদ্ধ স্বাদের জন্য পরিচিত। জাফরানি ফিরনি ও কেসারি বরফিতে দুধ, জাফরান ও সুগন্ধি উপকরণের ব্যবহার নবাবি খাদ্যসংস্কৃতির বিলাসী দিকটির কথা মনে করিয়ে দেয়।
মালাই গিলোরি ও নিমিশের মতো পদ লখনউয়ের মিষ্টি তৈরির ঐতিহ্যের সঙ্গে বিশেষভাবে যুক্ত। মালাই গিলোরির সূক্ষ্ম গঠন এবং নিমিশের হালকা, ফেনার মতো কোমলতা অন্য মিষ্টিগুলোর তুলনায় আলাদা অভিজ্ঞতা দেয়। বিশেষ করে নিমিশের মতো স্থানীয় ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি মেনুতে থাকায় লখনউয়ের খাদ্যসংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তবে মিষ্টির সংখ্যা ও বৈচিত্র্যের পাশাপাশি স্বাদ, মিষ্টির মাত্রা এবং পরিবেশনের ধারাবাহিকতাও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিটি পদে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য স্পষ্টভাবে ফুটে উঠলে এই আয়োজন আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।
লখনউয়ের খাবার ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথা উঠলে সত্যজিৎ রায়ের ‘শতরঞ্জ কে খিলাড়ি’ চলচ্চিত্রের কথা মনে পড়ে। উনিশ শতকের আওধ, শেষ নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের শিল্পানুরাগ এবং ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক বিস্তারের পটভূমিতে নির্মিত ছবিটিতে অভিজাত সমাজের জীবনযাপন ও তৎকালীন রাজনৈতিক বাস্তবতা পাশাপাশি উঠে এসেছে।
ওয়াজিদ আলি শাহ সংগীত, কবিতা ও নৃত্যের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। ১৮৫৬ সালে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আওধ দখল করে নেয়। নবাবি দরবারের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল, বিশেষ করে সংগীত ও নৃত্যের প্রতি অনুরাগ, লখনউয়ের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে আছে।
‘দস্তরখান-এ-আওধ’-এ খাবারের সঙ্গে কত্থক নৃত্য ও কাওয়ালির আয়োজন এই সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কথাই মনে করিয়ে দেয়। যদিও একটি রেস্তোরাঁর উৎসবের পক্ষে ঐতিহাসিক লখনউয়ের সম্পূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল তুলে ধরা সম্ভব নয়, তবু খাবারের সঙ্গে পরিবেশনা যুক্ত হওয়ায় অভিজ্ঞতাটি নিছক ভোজনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ পায়।
ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্টের মোজাইক রেস্তোরাঁয় আওধি খাবারের পাশাপাশি কন্টিনেন্টাল, চীনা ও বাংলাদেশি খাবারের আলাদা স্টেশনও রয়েছে। ফলে অতিথিদের জন্য খাবার বেছে নেওয়ার পরিসর বিস্তৃত। তবে উৎসবটির মূল আকর্ষণ আওধি পদগুলোর বৈচিত্র্য এবং সেগুলোর সঙ্গে সাংস্কৃতিক পরিবেশনার সংযোগ।
সামগ্রিকভাবে ‘দস্তরখান-এ-আওধ’ লখনউয়ের নবাবি রন্ধনশৈলীর পরিচিত পদগুলোকে এক জায়গায় তুলে ধরেছে। গালৌটি কাবাব, আওধি গোস্ত দম বিরিয়ানি, মোরাদাবাদি ডাল, কাঞ্জি জিরা নিম্বু পানি এবং ঐতিহ্যবাহী মিষ্টির আয়োজন এর উল্লেখযোগ্য দিক। কিছু পদে মসলার তীব্রতা ও স্বাদের ভারসাম্য আরও উন্নত করার সুযোগ থাকলেও মেনুর বৈচিত্র্য এবং খাবারের সঙ্গে সংগীত ও নৃত্য যুক্ত করার প্রচেষ্টা আয়োজনটিকে আলাদা করেছে।
যাঁরা দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক রান্না, ঐতিহ্যবাহী মিষ্টি ও নবাবি খাদ্যসংস্কৃতি সম্পর্কে জানতে আগ্রহী, তাঁদের জন্য এই উৎসব নতুন স্বাদের সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে। খাবারকে কেন্দ্র করে একটি অঞ্চলের ইতিহাস ও সংস্কৃতির দিকে তাকানোর এই প্রচেষ্টাই ‘দস্তরখান-এ-আওধ’-এর মূল আকর্ষণ।