
একটা ভীষণ রকমের খুনখারাবি আর ঘৃণার ছায়া, একটা বোধহীন ভোঁতা যন্ত্রণা, জালে আটকে পড়া মাছের মতো অসহায়ত্ব।
অতল গহ্বর।
করোটিতে নানা অনুভূতি, কোনটা কখন তার কর্তৃত্ব নিচ্ছে, তা ধরা যাচ্ছে না। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখি, শুয়ে আছি ধবধবে সাদা চাদরের একটা বেডে। হাসপাতাল। জানালা দিয়ে একটা দুর্গম পাহাড়ি ছায়া দেখা যায়। কান পাতলে সকালের ব্যস্ততা ভেসে আসে। ফিনাইলের গন্ধে ভরপুর চারপাশ।
একটা মিশনারি হাসপাতাল। দেয়ালে উল্টো পাশে যিশু অভয় দিচ্ছেন।
সাদা পোশাকের কোমল মুখের একজন নার্স এলেন। এসে দারুণ উচ্ছ্বসিত গলায় বললেন, আপনার জ্ঞান ফিরেছে?
তিনি কাউকে ডাকলেন।
একটা হন্তদন্ত পায়ের আওয়াজ।
একজন বয়স্ক লোকের মুখ দেখতে পেলাম। সাদা চামড়া, ধূসর চুল আর নীলচে চোখের এক বিদেশি।
অ্যান্টিবায়োটিক কাজ করছে।
বয়স্ক লোকটির গলায় স্বস্তি। তাঁর হাতের স্টেথো জানান দিচ্ছে তিনি চিকিৎসক। স্টেথোর ডায়াফ্রাম তিনি বুকে চেপে ধরলেন। শুনতে চাইছেন আমি কিছু লুকিয়েছি কি না বুকের চামড়া আর মাংসপিণ্ডের দেয়াল দিয়ে।
জ্বর এখনো কমেনি। নার্সের রিনরিনে গলা শুনলাম।
জ্বর এত সহজে নামবে না। ভাঙা বাংলায় নিশ্চিত করলেন ডক্টর ডেভিড। তাঁর নাম ডেভিড কেন মনে হলো, সেটা বলতে পারছি না। হঠাৎই মনে হচ্ছে এঁদের নাম আমি জানি। নার্সের নাম যদিও এখনো মাথায় আসেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই যে চলে আসবে, তা টের পাচ্ছি। যে নিউরনগুলোতে নামটা জমা আছে, তাদের কম্পন আমি অনুভব করছি। একটা শীতল স্রোতের মতো নামটা জড়ো হলো, আর আমি মনে করতে পারলাম নার্সের নাম উছলা মারমা।
এর পরপরই আমি আবার অতল গহ্বরে পড়ে যেতে থাকি। যে স্রোত বেয়ে নামটা এসেছিল, তাতেই যেন আমি ভেসে যেতে থাকি।
আমি ভেসে হাজির হই একটা ছোট্ট কেবিনের মতো জায়গায়। দেয়ালটা ধাতব শিটের, তার ওপর সাদা রঙের প্রলেপের মতো প্লাস্টিকের শিট। এক পাশে ছোট একটা দরজা।
নাইট ডিউটির ডাক্তারের বিশ্রামকক্ষ।
২
দরজায় সজোরে করাঘাতের শব্দ। উঠে বসি শোয়া থেকে।
স্যার, রোগী। খারাপ মনে হচ্ছে।
স্টেথোটা টেবিল থেকে নিয়ে গলায় পেঁচিয়ে আমি দ্রুত বেরিয়ে পড়ি। সিলেট মেডিকেল কলেজ। সার্জারি ওয়ার্ড।
রাত তিনটা। সারাক্ষণ গমগম করা হাসপাতালও এখন নীরব, নিঝুম। কয়েকটা ছেলে একটা রোগীকে স্ট্রেচারে শুইয়ে নিয়ে এসেছে। আজকে আমাদের ওয়ার্ডে অ্যাডমিশন। সন্ধ্যা থেকে কপাল ভালো ছিল। দুটো অ্যাকিউট অ্যাবডোমেন কেসের পর এতক্ষণে আরেকটা কেস।
নতুন যে রোগী এল, তাকে দূর থেকে দেখেই বুঝলাম, বেশ অস্বস্তিকর একটা কেস হবে। প্রথমত, নাকে একটা তীব্র কটু গন্ধ এসে ধাক্কা দিল। এই গন্ধ আমার চেনা। মাংসে পচন ধরলে এই গন্ধ তৈরি হয়। এর তীব্রতার মাধ্যমেই শরীর জানান দেয়, দ্রুত ব্যবস্থা নাও, নাহলে মরবে।
রোগী ভবঘুরে টাইপের। রোড অ্যাকসিডেন্ট করে রাস্তার পাশে পড়ে ছিল। অ্যাকসিডেন্ট করেছে অন্তত তিন সপ্তাহ আগে। অন্য কোথাও থেকে প্রাথমিক চিকিৎসা পেয়েছিল। বোঝাই যাচ্ছে, সেটা কোনো হাসপাতাল ছিল না, সম্ভবত কোনো হাতুড়ে দাওয়াইখানায় গিয়েছিল।
.তানভীর আহমেদ সৃজনের গল্প—নীরিষ্কপু.
বাঁ পা ও হাতে প্লাস্টার ব্যান্ডেজ। সেটার ভেতরেই পচন ধরেছে মনে হচ্ছে। রোগীর অবস্থা দেখে কয়েকজন তরুণ পথচারী এখানে নিয়ে এসেছে।
এদের কেউই রোগীর সত্যিকারের আত্মীয় নয় বলে প্রথমেই একটু দমে গেলাম। সরকারি হাসপাতালে রোগীর সঙ্গের লোকদের বেশ কিছু দায়িত্ব পালন করতে হয়। এরা স্বভাবতই সেটা করতে প্রস্তুত নয়। রোগীকে পৌঁছে দিয়েই এরা যথাদ্রুত সম্ভব হাসপাতাল ত্যাগ করবে। এ ধরনের কেস আমরা মাঝেমধ্যেই পাই এবং সেসব নিয়ে আমাদের বেশ ভুগতে হয়।
আমি ডিউটি নার্স রিতাদিকে নিয়ে অ্যাটেন্ড করলাম।
রিতাদি নাক কুঁচকে ফেলেছেন রোগী দেখেই।
আপনার সঙ্গে ডিউটি মানেই আজেবাজে কেস। রাখঢাক না রেখেই বললেন।
আমি হেসে ফেললাম। বললাম, ভারী মাস্ক পরেন। দূর থেকেই ধাক্কা দিচ্ছে।
রোগীর নাম ‘রিজু পাগল’। নামটা জানতে পারলাম অ্যাডমিশন ফাইল দেখে। সঙ্গে যে এখনো আছে, সে অল্প বয়সী এক তরুণ। নাম ইকবাল।
কী সমস্যা হয়েছে জিজ্ঞেস করতে হড়বড় করে ইকবাল বলল, রিজু পাগল তাদের এলাকার পুরোনো পাগল। অনেক বছর ধরেই আছে। তার আপন কেউ আছে কি না, সেটা সে জানে না। হঠাৎ করেই লোকটা লাপাত্তা হয়ে গিয়েছিল। পরে তাকে পাওয়া গেল বড় রাস্তার পাশের এক নর্দমায়। ধারণা করলাম, কোনো গাড়ির সঙ্গে অ্যাকসিডেন্ট করে রিজু মূল রাস্তা থেকে ছিটকে নর্দমায় পড়েছে।
আমরা ভেবেছিলাম মরে গেছে। পরে আবিষ্কার করলাম, না, এখনো জীবিত। তবে শরীরে মারাত্মক জখম হয়েছে। একটা পা ভাঙা, ফুলে আছে। একই পাশের হাতও ভেঙেছে কবজির ওপরে। চোখেমুখেও জখমের চিহ্ন।
তারপর?
তারপর আমরা তার গায়ে বালতি বালতি পানি ঢেলে কোনোমতে পরিষ্কার করে কাছের এক পল্লিচিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাই। উনি বাঁ হাত ও পায়ে প্লাস্টার করে দেন। গায়ের জখমে সেলাই করে দেন। বুকের ওপরে, পেটে, হাতে যত জায়গায় জখম ছিল সব জায়গায় সেলাই করে ওষুধ দিয়ে দেন। আমাদের বলেন, পায়ের হাড় জোড়া লাগতে এক দুই মাস লাগবে। আর শরীরের বাকি জখম সারতে এক-দুই সপ্তাহ।
রিজুর আশ্রয় হলো কলোনির পরিত্যক্ত দারোয়ান-রুমে। এলাকার কয়েকজন, আমিসহ, তার নিয়মিত ওষুধপত্র আর খাওয়ার ব্যবস্থা করে যেতে থাকলাম।
কিন্তু কয়েক দিন ধরে বুঝতে পারলাম, ওর অবস্থা ভীষণ খারাপ। প্রচণ্ড দুর্গন্ধ বেরোচ্ছে। তাই বলতে পারেন, বাধ্য হয়ে এখানে নিয়ে এলাম।
ইকবাল শেষ করে।
হিস্ট্রি নেওয়া শেষে আমি ইকবালকে জানালাম এ ধরনের কেসে করণীয় কী। ওটিতে নিয়ে দেখতে হবে ইনফেকশন কত দূর ছড়িয়েছে। এমন হতে পারে, প্লাস্টার করা হাত বা পা কেটে ফেলা ছাড়া উপায় নেই। তবে সেসবও চট করে হয়তো করা যাবে না। রোগী অপারেশনের ঝুঁকি নিতে পারবে কি না, সেটাও পরীক্ষা–নিরীক্ষা করে ঠিক করতে হবে।
ইকবালকে কিছু ওষুধপত্রের লিস্ট ধরিয়ে দিলাম।
ও একবার জিজ্ঞেস করল, সব মিলিয়ে কত খরচ হতে পারে। আমি আনুমানিক একটা সংখ্যা বললাম। আর বলে দিলাম, হাসপাতালের সঙ্গে লাগোয়া হাসপাতাল-অনুমোদিত ফার্মেসি থেকে নিলে খরচ কম পড়বে। মাথা নেড়ে বোঝাল, সে বুঝতে পেরেছে এবং ওষুধগুলো নিয়ে আসতে বেরিয়ে গেল।
একটু স্বস্তি হলো, কারণ ইকবাল যদি বলত ওষুধ জোগাড় করার পয়সা তার কাছে নেই, তখন হাসপাতালের গরিব রোগীদের জন্য রাখা মজুত থেকে সেসব জোগাড় করা লাগত, সেখানে সব সময় সবকিছু থাকে না, তখন আরেকটা দুশ্চিন্তা। কখনো নিজের পকেট থেকে ডোনেশন দেওয়া বা ওষুধ কোম্পানির প্রতিনিধিদের কাছে চাওয়া।
আমি রোগীর ফাইল রেডি করে রিতাদিকে দিয়ে দিলাম। আপাতত আমার কাজ শেষ। রিতাদির কাজ শুরু, তিনি নিজে এবং ওয়ার্ড বয়দের দিয়ে বাকি ব্যবস্থা করবেন রুটিন ওটিতে ঢোকানোর আগপর্যন্ত।
৩
ডক্টর ডেভিড বললেন, আসিফ, তুমি খুব বাজেভাবে জখম হয়েছ।
ফ্র্যাকচার আছে পায়ে বুঝতে পারছি। আর কিছু?
হ্যাঁ, ফিমার ফ্র্যাকচার, শ্যাফট অব দ্য ফিমার। সঙ্গে পিঠে গভীর ক্ষত, গাছের ডালে লেগে সম্ভবত, তবে তোমার ভাগ্য ভালো, ফুসফুসে আঘাত লাগেনি। আর এই ফ্র্যাকচার ও ইনজুরি নিয়ে তুমি একটা খাদে পড়ে ছিলে নয় দিন।
কোথায়?
বান্দরবানের থানচিতে। তোমাদের গাড়ি অ্যাকসিডেন্ট করে। খাদে তোমাদের বাস উল্টে পড়ে, স্পট ডেড তিনজন। বাকিরা মারাত্মক জখম হয়। তুমি ছিলে জখম এবং লস্ট। উদ্ধারকারীরা তোমাকে খুঁজে পায়নি। তুমি ছিটকে বহুদূরে এক ঝোপে পড়ে ছিলে, অজ্ঞান হয়ে।
তোমাকে নয় দিন পর স্থানীয় কয়েকজন মুরং ছেলে আবিষ্কার করে, ওরা এখানে নিয়ে আসে।
এখন আমার কী অবস্থা?
তুমি বিস্ময়করভাবে বেঁচে আছ। এমন ইনজুরি নিয়ে এত দিন তুমি কীভাবে সারভাইভ করলে, সেটা আমি বোঝার চেষ্টা করছি। এখনো ব্যাখ্যাটা পরিষ্কার নয়। তবে একটা হাইপোথিসিস আছে আমার। সেটা আরেকটু খতিয়ে দেখে নিশ্চিত হয়ে তোমাকে বলতে পারব।
আমার ভাইটাল কেমন ছিল?
এগেইন, বিস্ময়করভাবে ভালো। তোমার কোনো ফিভার ছিল না, সেপটিসেমিয়া ছিল না। শুধু দুর্বল ছিলে, ডিহাইড্রেটেড ছিলে। খুব সম্ভবত তুমি কিছু বৃষ্টির পানি পান করতে পেরেছিলে, তাই মারাত্মক পানিশূন্যতা ছিল না। তবে এখন তোমার কমপ্লিকেশন ডেভেলপ করছে। গত দুই দিন প্রবল জ্বর ছিল, আজকে একটু কম। তোমার ইউরিনে ব্লাড আছে, অর্গান ফেইল করলে আশ্চর্য হব না। এখানে পরীক্ষা–নিরীক্ষা করার সুযোগ সীমিত। আমি সুযোগ পেলে তোমাকে বড় কোনো হাসপাতালে পাঠিয়ে দিতাম, এখনো পাচ্ছি না। জরুরি অবস্থা জারি হওয়ায় কোনো ট্রান্সপোর্ট নেই।
কীসের জরুরি অবস্থা?
পলিটিক্যাল ননসেন্স, ডোন্ট আস্ক মি, নট মাই এরিয়া। ডেভিডের চোখে স্পষ্ট বিরক্তি।
ডেভিড চলে গেলেন। আমি বেডে শুয়ে জানালার দিকে তাকালাম। আমি অনেক কিছুই মনে করতে পারছি না।
আমি জানি, আমি একজন ডাক্তার, ঢাকার এক বেসরকারি হাসপাতালে চাকরি করি। আমি বান্দরবান এসেছিলাম সম্ভবত ঘুরতে, ছুটি পেলেই আশপাশে ঘুরতে যাওয়ার বাতিক আছে আমার। স্মৃতিভ্রষ্টতা আমাকে ভীষণভাবে অসহায় বোধ করাল।
.নাবিল মুহতাসিমের গল্প—গত বৃহস্পতিবার.
৪
পরদিন হাসপাতালে ইভিনিং শিফটের ডিউটি ছিল। সার্জারি ওয়ার্ডের মেঝেতে রিজু পাগল বেড পেতে শুয়ে আছে—প্রথমেই এ দৃশ্যের মুখোমুখি হলাম। দেখে বুঝলাম, ওর এখনো ওটি হয়নি।
ডিউটিতে রিতাদি ছিলেন না। ওয়ার্ড বয় খলিলকে পেলাম।
সকালের ওটিতে যায়নি এ রোগী?
না স্যার, হান্নান স্যার প্লাস্টার অল্প একটু কাইটা অবস্থা দেইখা বলছে, পোকা জমছে। এখন ওটি করা যাবে না।
ধারণা করলাম, ম্যাগট হয়েছে। পুরোনো ক্ষত, পরিষ্কার জায়গায় ছিল না। ম্যাগট হওয়ার চান্স অনেক।
এই ম্যাগটকে এখনো আমি সহ্য করতে পারি না। ওদের দেখলে আমি এখনো এক অস্বস্তিকর ঘৃণায় কুঁকড়ে যাই।
ম্যাগট মূলত মাছির লার্ভা। মাছি যদি মনে করে কোথায় পচা মাংস আছে, সে ওখানে গিয়ে ডিম পাড়ে, যাতে তার অনাগত সন্তানেরা সেই পচনশীল মাংস খেয়ে পরে বেঁচে বড় হতে পারে। সেই লার্ভাই কয়েক দিনে ম্যাগটে পরিণত হয়, সাদাটে একটু লম্বাটে কোনো দৃশ্যমান অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ছাড়া জীবন্ত সত্তা, কিলবিল করছে ক্ষতস্থানে বা মৃতদেহে।
ইকবাল ছিল না, রাত দশটার দিকে এল। এসেই আমার সঙ্গে কথা বলতে চলে এল।
বলল, স্যার, রিজু পাগলার অপারেশন তো সকালে করল না। বলল পোকা আগে দূর করতে হবে।
আমি তাতে সায় জানালাম। বললাম, হ্যাঁ, ম্যাগট দূর করে তারপর অপারেশনে যেতে হবে। ওয়ার্ড বয়দের সঙ্গে কথা বলো, ওরা জানে কীভাবে এগুলো দূর করা যায়।
ইকবাল তারপর একটা বোতল উঁচু করে দেখাল।
হ্যাঁ, খলিল ভাই বলছে তারপিন নিয়া আসতে। তারপিন ঢাললে নাকি পোকা চলে যায়। এক লিটার নিয়ে আসছি।
হ্যাঁ, তারপিন দিয়েই ওয়ার্ডে ম্যাগট মারা হয়, তুমি খলিলকে দাও। সে ক্ষতস্থানে অল্প অল্প করে ঢেলে ওদের ঝেঁটিয়ে বিদায় করবে।
ইকবাল বুঝল, এই ম্যাগট দূরীকরণ অভিযানে আমার একদমই আগ্রহ নেই, বরং সীমাহীন ঔদাসীন্য আছে। ও খলিলকে খুঁজতে চলে গেল।
রাত একটার দিকে খলিল আমার রুমে নক দিল। বলল, স্যার, ওই পাগলা রোগীর অবস্থা তো বেশি খারাপ। সারা শরীরের চিপায় চাপায় পোকা। এক জায়গায় তারপিন ঢাললে অল্প কিছু মরে, কিন্তু পিলপিল করে বাইর হইয়া আরেক জায়গায় ঢুইকা পড়ে।
বর্ণনা শুনেই আমার গা গুলিয়ে উঠল।
বেশি তারপিন একবারে দিয়ো না। আস্তে আস্তে। তা নাহলে আবার পয়জনিং হতে পারে।
আজকের মতো বন্ধ করমু।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, একটু বিরতি দিয়ে কালকে আবার দাও।
মাথা নেড়ে খলিল চলে গেল।
.ডিউক জনের চার মূর্তি সিরিজের গল্প—দুঃসহ দুপুরে.
৫
ডক্টর ডেভিড একটা মিলিটারি জিপে ধরে ধরে আমাকে ওঠালেন।
সাবধানে আসিফ। তুমি পুরোপুরি সুস্থ নও। তবে আমার সঙ্গে যেতে পারবে।
আমি সিটে বসার পর সিট বেল্টটাও উনি বেঁধে দিলেন। তারপর চালকের সিটে গিয়ে বসলেন।
জ্ঞান ফেরার পর এই প্রথম আমি হাসপাতালের বাইরে বের হলাম।
ডেভিড জিপটা চালানো শুরু করলেন বেশ সাবধানে, যাতে খুব একটা ঝাঁকুনি না খায়। তবে পাহাড়ি রাস্তায় সেটা কতক্ষণ তিনি পারবেন, সেটাই প্রশ্ন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, এ জায়গাটা ঠিক কোথায়, আমি চিনতে পারছি না। বান্দরবন শহরের কাছে?
না না, শহর থেকে অনেক দূরে। আশপাশের পঞ্চাশ মাইলের ভেতরে আমাদের হাসপাতালটাই।
শুনে আমি বিস্ময় প্রকাশ করলাম।
এরপর ডেভিড একটা অদ্ভুত কথা বললেন, আসিফ, ডোন্ট বি স্কেয়ার্ড, আমরা এখন বান্দরবান থেকে বেরিয়ে যাচ্ছি। একটা ব্যাটল ফিল্ডে যাচ্ছি।
ব্যাটল ফিল্ড! আমি আকাশ থেকে পড়লাম।
হ্যাঁ, নিজের চোখেই দেখতে পাবে।
বলতে বলতে ডক্টর ডেভিড পাহাড়ি রাস্তা ছেড়ে সমতলের এক রাস্তায় নেমে এলেন। একটু এগোতেই আশপাশের গাছগাছালি, অরণ্য ইত্যাদি কমা শুরু করল। বনের স্বাভাবিক শব্দ, পাখির ডাক ইত্যাদিও মিলিয়ে গেল। এক নৈঃশব্দ্য যাত্রা শুরু হলো, লক্ষ করলাম, আশপাশে বিরান ভূমি আমাদের গ্রাস করে নিচ্ছে। আর বাতাসটা ভীষণ ঠান্ডা।
আমার বিস্মিত হওয়ার ক্ষমতা লোপ পেয়েছে। কারণ, বেশ নির্লিপ্তভাবেই আমি মেনে নিলাম, ডক্টর ডেভিড আমাকে এমন কোথাও নিয়ে এসেছেন, যা বান্দরবানের আশপাশে থাকার কথা নয়। এটি একটি যুদ্ধক্ষেত্র। দূরে এখন গোলাগুলির আওয়াজ, মানুষের চিৎকার–চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। রাস্তার পাশে অসংখ্য বাংকার, ট্রেঞ্চ।
আমি একবার অস্ফুট স্বরে প্রশ্ন করলাম, হোয়াট ইজ দিস প্লেস?
উনি সরাসরি আমার প্রশ্নের জবাব দিলেন না। বললেন, একটু ঝাঁকুনি লাগতে পারে। শক্ত করে চেপে ধরো সিট। এখানে রাস্তা ভালো না।
.পিটুলি বা লাটিমগাছের গল্প.
আমি আর কথা বাড়ালাম না। দেখলাম আমরা বড় বড় কাপড়ের চারকোনা তাঁবু দিয়ে তৈরি একটা মিলিটারি হাসপাতালের সামনে এসে হাজির হয়েছি।
এক সৈন্য স্যালুট ঠুকে ডেভিডের দরজা খুলে দিল। ডেভিড তাকে ইশারা করলেন, যাতে আমাকে নামতে সাহায্য করে।
সৈন্যটির কাঁধে ভর দিয়ে আমি গাড়ি থেকে নামলাম। ফরাসি সৈনিক। গায়ে বেশ জোর। আমাকে রীতিমতো শূন্যে তুলে একটা হুইলচেয়ারে বসিয়ে দিল।
ডেভিড এখানকার পরিচিত মুখ, সেটা আন্দাজ করতে পারলাম। মনে হলো তার জন্য অনেকে ইতিমধ্যে অপেক্ষা করছিল।
ডেভিড এসেছেন খবর পেয়ে ভেতর থেকে একজন সার্জন এগিয়ে এলেন।
ডক্টর বেয়ার! এভরিথিং অলরাইট? ডেভিড তাঁর দিকে হাত বাড়িয়ে দিলেন।
ফাইন প্রফেসর, উই কেপ্ট দ্য পেশেন্টস ফর ইউ! প্লিজ কাম ইনসাইড।
এক্সিলেন্ট, বিফোর সিয়িং দেম, মিট মাই ফ্রেন্ড ডক্টর আসিফ, পিওর জিনিয়াস ইন মেডিসিন, উই মে নিড হিজ অপিনিয়ন অলসো।
শুনে আমি বিব্রতই হলাম। আমি যে ডাক্তার, সেটা এত দিনে ভুলেই গেছি। ডক্টর বেয়ারের সঙ্গে হাত মেলালাম।
তারপর আমরা তাঁবুর ভেতরে ঢুকলাম, সেখানে পাশাপাশি দুটো বেডের একটিতে একজন রোগী। দেখে বুঝলাম বড়সড় ফ্র্যাকচার আছে পায়ে, হাঁটুর ওপরে পা ভেঙেছে, সঙ্গে পেটে বোমার বিস্ফোরণের ক্ষত, চামড়া মাংসসহ একটা স্তর নেই।
ডক্টর বেয়ার কেসটি এমনভাবে আমাদের সামনে প্রেজেন্ট করলেন, যেন আমরা ওয়ার্ডে রাউন্ডে এসেছি।
গত সপ্তাহে ফ্রন্ট থেকে এই সৈন্যকে উদ্ধার করা হয়। ছেলেটির বয়স একুশ, বোমা হামলায় ও ট্রেঞ্চ থেকে বেশ দূরে ছিটকে পড়ে জ্ঞান হারায়। উদ্ধারকারীরা প্রথম দফায় ওকে খুঁজে পায়নি। পেয়েছে সাত দিন পর।
ওর ফিমারে কম্পাউন্ড ফ্র্যাকচার হয়েছে, অর্থাৎ অন্তত দুটি জায়গায় ভেঙেছে। পেটেও বড় ক্ষত তৈরি হয়েছে। সাত দিন ব্যাটেল ফিল্ডে পড়ে ছিল কাদাপানিতে। দ্বিতীয় দফায় যখন উদ্ধারকারীরা খুঁজে পায়, তখন জ্ঞান ছিল, কিন্তু ক্ষুধা-তৃষ্ণায় মৃতপ্রায়। হাসপাতালে নিয়ে আসার পর ফ্লুইড দেওয়ামাত্রই দ্রুত উন্নতি করে। এখন ভাইটাল ভালো।
ডক্টর ডেভিড ক্ষতস্থানটা দেখতে চাইলেন। ব্যান্ডেজ সরাতেই দেখলাম পেটে এবং পায়ের ক্ষতস্থানে লাল গোলাপি মাংস দেখা যাচ্ছে। চিকিৎসাবিদ্যার দৃষ্টিতে খুবই ভালো অবস্থা। গ্র্যানুলেশন টিস্যু তৈরি হয়েছে, এটা সেরে ওঠা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।
ডেভিড বেশ সন্তুষ্ট হলেন দেখে।
মুখে বললেন, ওয়ান্ডারফুল। ইট মাস্ট বি আ মিরাকল।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, অ্যান্টিবায়োটিক কি দেওয়া হয়েছে?
ডক্টর বেয়ার আমার প্রশ্ন ভালোভাবে বুঝলেন বলে মনে হলো না। ডেভিড বললেন, হি আস্কড হোয়াট ড্রাগ ইউ ইউজড?
উই ওয়াশড দ্য ওউন্ড উইথ নরমাল স্যালাইন। অ্যান্ড গিভেন সাম আয়োডিন সলিউশন।
আমি একটু বিস্মিত হলেও চেপে গেলাম।
ডেভিড আমার মুখ দেখে আমার অস্বস্তিটা অনুমান করতে পারলেন, আমাকে গলা নামিয়ে বললেন, দেখতে যতই খারাপ লাগুক, এই ম্যাগট বহু মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে। এই সৈন্যদের আক্ষরিক অর্থেই বাঁচানোর আর কোনো উপায় নেই, ম্যাগটরাই ওদের অ্যান্টিবায়োটিকের কাজ করছে, মৃত টিস্যু পরিষ্কারের কাজ করছে। কারণ, ওদের খাবারই ক্ষতের মৃত ক্ষতিকর অংশগুলো।
আমরা তাঁবু থেকে বের হয়ে ফের জিপে গিয়ে বসলাম। ডক্টর বেয়ার বিদায় জানাতে এসে বললেন, আই অ্যাম থিঙ্কিং অব ইউজিং দিস থেরাপি অ্যাট মাই হসপিটাল ব্যাক ইন বোস্টন, হোয়াট ডিউ থিঙ্ক প্রফেসর।
ডেভিড হেসে বললেন, হোয়াই নট ডক্টর। জাস্ট ডোন্ট লেট ইয়োর পেশেন্ট সি দেম ডিরেক্টলি।
জিপ ছাড়ার পর আমি ডেভিডকে বললাম, আমরা কোথায় এসেছি ডেভিড?
ডেভিড মুচকি হেসে বললেন, আমরা এ মুহূর্তে আছি প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একটা রণক্ষেত্রে, ১৯১৭ সাল। এটা ফরাসি ফ্রন্ট। ডক্টর বেয়ার জন হপকিনসের সার্জন, ফ্রন্টে কিছুদিন দায়িত্ব পালন করতে এসেছেন। ভাগ্য ভালো এসেছেন, না হলে এই চমৎকার থেরাপিটা আমাদের জানা হতো না।
আমি কিছুটা বাক্রুদ্ধ হয়ে রইলাম খানিকক্ষণ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ফরাসি ফ্রন্ট, এ কারণেই ডক্টর বেয়ার অ্যান্টিবায়োটিক চেনেননি। এখনো অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কৃত হয়নি।
রাইট, আরও প্রায় দশ বছর পর প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক আমরা পাব আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের গবেষণাগারে।
তার মানে এতক্ষণ যা দেখলাম, সবই আমার কল্পনা?
না, কল্পনা না, এসবই ঘটেছে। তুমি হয়তো ছিলে না। তবে তুমি নিজ চোখে দেখলে, থ্যাংকস টু ইয়োর এনসেফালাইটিক ব্রেন।
শুনে আমি আতঙ্কিত হলাম। আমার মস্তিষ্কে ইনফেকশন হয়েছে তাহলে?
হ্যাঁ, ভেবো না, সেটা সারার পথে। তবে এটা তোমাকে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে ভ্রমণের সুযোগ করে দিল, তুমি এখনো বান্দরবানে আমার ছোট হাসপাতালে শুয়ে আছ। এটা একটা ভালো পাওনা হলো তোমার ইনফেকশন থেকে।
আমি আপত্তি করে বললাম, এই বীভৎস চিকিৎসা দেখা ভালো পাওনা?
অবশ্যই। কারণ, ওই সৈন্যদের মতো একইভাবে বান্দরবানের খাদে তুমি পড়ে ছিলে ফ্র্যাকচার ও ক্ষত নিয়ে, ম্যাগটরা তোমাকেও বাঁচিয়েছে।
ওরা ইনফেকশনটা এ কদিন নিয়ন্ত্রণে না রাখলে আমাদের হাতে কিছুই করার উপায় ছিল না।
.আহমেদ খান হীরকের গল্প—ভয়.
৬
ডক্টর রুমে সবে ঢুকেছি একটু বিশ্রাম নেব বলে। এমন সময় দরজায় জোরে নক।
ওয়ার্ড বয় খলিল।
স্যার, পাগলা রোগী কেমন যেন করতেছে?
আমি নিশ্বাস আটকে জিজ্ঞেস করলাম, রিজু পাগলা?
জি স্যার, পোকের পেশেন্ট। মনে হয় শ্বাসকষ্ট হইতেছে।
দেখলাম পেছনে ইকবাল ছেলেটাও দাঁড়ানো।
আমি স্টেথোটা গলায় পেঁচিয়ে রওনা হলাম। বিশাল ওয়ার্ডের শেষ মাথায় রিজু শায়িত। বেড পায়নি এখনো, মেঝেতে একটা ম্যাট্রেসে রাখা। কিছুটা দৌড়ে ওর কাছাকাছি গেলাম।
রিজু ঘন ঘন নিশ্বাস নিচ্ছে। ওর ভীষণ কষ্ট হচ্ছে, তা চোখ দেখে বুঝলাম। ওর কোটর থেকে চোখ যেন বের হয়ে আসতে চাইছে।
খলিল বলল, স্যার, তারপিন আরও দেব? ইকবাল ভাই আরও দুই লিটার নিয়া আসছে পোক দেইখা।
আমি বিরক্ত হয়ে বললাম, আরে কী বলো! রোগী শ্বাস নিতে পারছে না। অক্সিজেন মাস্ক লাগাও।
তড়িঘড়ি করে একটা লাইন টেনে মাস্ক লাগানো হলো। কিন্তু খুব একটা সুবিধা হলো না। আমি বুঝলাম, হার্ট অ্যাটাক হচ্ছে। নিশ্বাস নেওয়া বন্ধ করে দিল, পুরোপুরি অচেতন হয়ে পড়ল।
এখন একটা উপায়ই আছে। আমি হাঁটু গেড়ে সিপিআর দেওয়া শুরু করি। খলিলকে সঙ্গে সঙ্গে বলে দিই কার্ডিওলজিতে যোগাযোগ করতে, ওরা আসার আগপর্যন্ত এটা করে যেতে হবে।
বুকের ওপর দুই হাত রেখে যথেষ্ট শক্তি দিয়ে বুকে চাপ দিয়ে ছেড়ে দিই। প্রতি সেকেন্ডে দুইবার।
প্রতিবার বুকে চাপ দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা ভীষণ বাজে ব্যাপার ঘটতে থাকে। লক্ষ করি, রোগীর শরীরে থাকা শত শত ম্যাগট কিলবিল করে শরীর থেকে বের হতে থাকে। আমার হাতের পাশ দিয়ে, রোগীর পেটের ক্ষতস্থান দিয়ে প্রতি ধাক্কায় ওরা যেন চাপ এড়াতে শরীরের বাইরে বের হতে চায়!
আমি চোখমুখ বন্ধ করে তারপরও একই রিদমে সিপিআর অব্যাহত রাখি। রিজুকে হয়তো এটাই বাঁচাতে পারবে।
হঠাৎ খেয়াল করলাম, জবজব করে আমার হাতের ওপর তীব্র গন্ধের কোনো তরল পড়ছে। আমি আঁতকে উঠে হাত সরাই।
ইকবাল কী করছে! ও একটা দুই লিটারের বোতল থেকে তারপিন ঢালছে রিজু পাগলার বুকে, পেটে। তারপিনের তেলে আমিও যেন মাখামাখি হয়ে গেলাম।
ইকবালের মানসিক ভারসাম্য লোপ পেয়েছে বুঝলাম। আমাকেও কেয়ার করছে না, এক অপরিসীম জিঘাংসায় ও তারপিন ঢালতে থাকে ম্যাগটদের নিধনে।
আমি বাধা দেওয়ার আগেই ও পুরো বোতলটা রিজুর দেহে খালি করে দিল।
তারপিন তেল ম্যাগটরা সহ্য করতে পারে না। অল্প করে ঢাললে হয়তো শরীরের আরেক কোণে গিয়ে ওরা আশ্রয় নেয়; কিন্তু এত পরিমাণে ঢাললে ওদের আর দেহের ভেতরে অবস্থানের সুযোগ নেই। অনেক অনেক ম্যাগট একসঙ্গে শরীর থেকে বের হয়ে যাবে—এমন কোনো দৃশ্য দেখব, সেই প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। কিন্তু তার বদলে একটা অনাকাঙ্ক্ষিত অশরীরী অবস্থার সম্মুখীন হলাম।
ইকবাল সে দৃশ্য দেখে তারস্বরে চিৎকার করছে; কিন্তু ওর গলার স্বরও যেন আমার কানে ঢুকছে না দৃশ্যটির অস্বাভাবিকতায়।
আমরা দেখলাম, রিজু পাগলার শরীরটা কয়েক হাজার খণ্ড হয়ে কিলবিল করে চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল। শরীরের প্রতিটি অংশ বহন করছে অসংখ্য ম্যাগট। মিনিট এক–দুইয়ের মধ্যে ওরা দ্রুতগতিতে চারপাশে এমনভাবে ছড়িয়ে পড়ল যে আমাদের মনে হলো, রিজু পাগলা নামের রোগীটা এ হাসপাতালে ছিল না।
ম্যাগটরা রিজুকে এমনভাবে বাঁচিয়ে রেখেছিল, ওদের ছাড়া রিজুর মূলত অস্তিত্বই ছিল না।
.মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরে চিল আর চড়ুইয়ের গল্প